Showing posts with label FolkCraft. Show all posts
Showing posts with label FolkCraft. Show all posts

Tuesday, June 18, 2013

মেয়েটির নাম দিল্লি সরকার। চান্দোল হাট মেলার একটি অতুলনীয় অভিজ্ঞতা, A Lady Named Dilli Sarkar, an unforgettable experience at Chandol Hat Mela, Uttor(North) Dinajpur

 মেয়েটির নাম দিল্লি সরকার। 

ছোটবেলায় তিন সন্তানের মৃত্যুর পর পিসি নতুন মেয়েটির নাম রাখলেন দিল্লি। তত্ব হল দিল্লি বহু দূর। সন্তানের এই নামটি রাখলে যদি সন্তানটি বাঁচে(তখন ভারত সরকার অথবা দেশি, বিদেশি দাতা সংস্থার দেওয়া অর্থে তখন স্বেচ্ছাসেবীরা কন্যা ভ্রূণ হত্যা বিরোধী প্রকল্প রচনা করেছিলেন কিনা সে তথ্য লোকফোকের কাছে নেই, কিন্তু দিনাজপুরের{তখন রাজনৈতিকভাবে পশ্চিম উপসর্গযুক্ত জেলা} এক অজ পাড়াগাঁয়ে, আজকের মানুষ আর জনগণের ভালকরা রাজনীতির ভাষায়, প্রায় সহায়-সম্বলহীন এক আদিবাসী, রাজবংশী পরিবারের মাথারা কন্যা শিশুকে মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলতে চাননি। প্রাণপণে চেষ্টা করে গেছেন কীভাবে মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখাযায়। কে জানে শহরের মানুষেরা কাদের কথা বলেন, কাদের কথা ভেবে প্রকল্প রচনা করেন!)। 
সবার প্রার্থনা কীভাবে এবারটি কাজে লেগে গিয়েছিল(আদতে ততদিনে ভারত সরকারের মদতে আর স্পন্সরশিপে দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যার গঙ্গা প্রাপ্তি ঘটেছে। আরও অনেক বিদেশি ধারকরা ভাবনার মত বড় পুঁজির অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা একমাত্র চিকিৎসাব্যবস্থার মর্যাদা পেয়েছে। আর সকলে গ্রাম্ভারি নামে দুয়ো রানিমাত্র। কিন্তু দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যা অর্থে আজকের দিনে সরকারি ভাষায় মান্যতাপ্রাপ্ত শুধুই আয়ুষের কথা বলছিনা, দেশিয় গ্রামীণ লৌকিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বলছি। পরে পড়ে দেখেছি, আয়ুর্বেদও ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশিয় গ্রামীণ চিকিৎসাবিদ্যাকে দুচ্ছাই করে আজও। আয়ুর্বেদ তখন অ্যালোপ্যাথির আক্রমণে নাভিশ্বাস(অগ্নিশ্বর সিনেমাটি মনে করুন, অ্যালোপ্যাথি মানেই বিজ্ঞান আর সব ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, জলপড়া।)। আয়ুর্বেদ ডাক্তারেরা আজও অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করেন। আয়ুর্বেদের যখন নাভিস্বাস তখন তার পাশে দাঁড়াবার জন্য কেউ নেই, কেননা তত দিনে অ্যালোপ্যাথি আর আয়ুর্বেদের যৌথ-আক্রমণে লৌকিক চিকিৎসা মুখ লুকিয়েছে।)। সমবেত প্রার্থনায় দিল্লি শুধু বাঁচল না, ক্রমশঃ বড়ও হয়ে উঠল। সবার মুখে ছাই দিয়ে তার বিয়ে হল, সন্তানও প্রসব করল। দিল্লির তখন ভরা সংসার। অন্যান্য রাজবংশী মেয়েদের মত সেও বুনতে ওস্তাদ হয়ে উঠল। অঞ্চলের একদা ডাকসাইটে কাঠের মুখা শিল্পী প্রয়াত আজিত সারকারের হাত ধরে অন্যান্য ঢোকড়া (ঢোকড়া সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিশদে জানতে http://lokfolk.blogspot.in/2012/08/blog-post_14.html) শিল্পীদের সঙ্গে (ঢোকড়া তাঁতের চেহারা দেখার জন্য এই লিঙ্কটা  http://lokfolk.blogspot.in/2012/04/dokra-weavers-at-work.html দেখুন। কলকাতায় শিক্ষিতরা এই তাঁতকে মণিপুরী তাঁত বলেন। কেন? তারাই জানেন) কলকাতায় মেলায়ও এসেছে(২০০৯এ কলকাতা মেলায় দিল্লির ছবি। সেখানেই তার সঙ্গে আলাপ। পরে দেখেছি দিল্লি সেই আলাপ ভুলে গিয়েছে। কিন্তু তার নামের জন্যই হোক বা তার অত্যন্ত আদুরে ভাবে তার কাজ দেখানোর জন্যই হোক, বা কাজের গুনমানেই হোক, দিল্লিকে আমার মনে থেকে গিয়েছে। 
চান্দোল মেলা আয়োজন করছিল সঙ্ঘের দিনাজপুর জেলা কমিটি। তাদের যোগাযোগেই দিল্লি চান্দোল মেলায় এসেছেন অংশ নিতে। সঙ্গে আরও কয়েকজন শিল্পী। দিল্লিকে মেলার শেষেরদিকে পুরনো ঘটনাটা বলেছিলাম। গ্রামের কর্মঠ মহিলাদের মত সে চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে শুধুই হেসেছিল। অন্যদের মত, প্রথমে সে মেলা দেখে হতাশ হয়েছিল। যদিও শহুরে বা স্থানীয় রাজনীতি করা কারু শিল্পীদের মত উচ্চৈঃস্বরে বলেনি, কিন্তু তার মনে, হাটে তার মাল বিক্রি নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিল। পাড়াগাঁয়ের অনপনীয় ভদ্রতায় সে মুখবুজে সব মেনে নিয়েছে। কিন্তু সে শুধু নয়, তার পরিবারও যে তাঁকে মেলায় আসতে বারন করেছিল, তার প্রমান পেলাম শেষের আগের দিনের রাতের মিটিঙে।
মেলা উদ্বোধন করলেন স্থানীয় বিধায়ক অমল আচার্য মহাশয়। ছিলেন স্বপন সারকার এবং আশিম ঘোষ। উদ্বোধনের বিশদ বিবরণ কয়েক মাস আগের পোস্টে পাওয়া যাবে। আজ আর সেই গালগল্পে যাচ্ছি না। যাই হোক, প্রথম দিনই প্রায় সকলের বউনি হল, দু একজনের বাদে। আরও অনেকের সঙ্গে, দিল্লির বিক্রি হল প্রায় পাঁচ হাজার টাকার। ব্যাপারটা খুব একটা ছোট করে আমরা দেখলাম না। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করে রোজের বিক্রির হিসেব রাখতাম। ব্যাপারটা খুব কম দাঁড়াল না। প্রথম দিনেই আমরা বেশ উত্তেজিত। একে অজ পাড়াগাঁয়ে মেলা। তারপরে প্রচার নেই। বাংলাদেশের দুই শিল্পী এসেই চলে গেছেন। তাঁরা বললেন আমাদের এত দামী কাপড় এখানে বিক্রি হবে না(বলা ভাল মেলার যায়গা দেখে পালিয়ে গিয়েছে। কলকাতার, নিদেন পক্ষে জেলা সদর ছাড়া, সরকারি-বেসরকারি প্রচারে এটি যেন আজ প্রমাণিত, গ্রামে শিল্প দ্রব্যের বাজার নেই, কারোর শিল্পবোধ নেই। স্থানীয় মালগার কার্পেট শিল্পী আবু তাহের[সে আবার মালগা পঞ্চায়েত প্রধান। কংগ্রেস করে] বলল দাদা কোন ভাগাড়ে এনে ফেললেন!!! অথচ তাকে চান্দোল মেলায় ডাকার জন্য পি এন রায় পর্যন্ত আমাদের কাছে দরবার করেছেন। আবুর বিক্ষোভে আমরা প্রায় মুহ্যমান। আবু কংগ্রেস করে, উদ্বোধন এবং অন্যান্য সাহায্য করছে তৃণমূল আর সঙ্ঘের জেলা সম্পাদক সিপিএম। গোলযোগ লাগলেই চিত্তির। এত দিনের সব পরিশ্রম ভেস্তে যাবে। কোনও বিতর্কে না গিয়ে আবুর সামনে হাত জড়ো করে তাকে সামাল দিই। মনে খচখচানিতো ছিলই। সবাই এত খারাপ বলছে। মেলা খারাপ হলে কেউ আস্ত রাখবে না)। আবুর কার্পেট বিক্রি হল প্রত্যাশার তুলনায় শুধু ভাল নয়, বেশ ভাল, এত ভাল বোধহয় কলকাতাতেও হয় নি। উদ্বোধনী মেলা শেষে তার গাল ভরা, কান এঁটো করা হাসি। পরের দিনই তার একটা দোকান চারটা হল।
তো শেষের আগের রাতে মুখ খুলল দিল্লি। আমরা ত পেরিয়ে থ, থ পেরিয়ে দ। বর আর ছেলে তাকে মেলায় আসতে দিতে চায়নি। বলেছিল এই দিনাজপুর জেলার চান্দোল হাটে কে তার ঢোকড়া কিনবে? সপ্তাহে, স্থানীয় এলাকার পাঁচ ছটা হাটে ট্রাক বোঝাই করে ঢোকড়া চালান যায়। আর প্রত্যেকের বাড়িতেই তিন চারটের বেশি ঢোকড়া আছে। এতগুলো বিক্রিতো হবেই না। সে গাঁয়ের লোক হাসাবে। কিন্তু দিল্লি জেদ ধরেছিল, মেলায় সে যাবেই। তাকে মেলায় পাঠিয়েছিল জেলা শিল্প দপ্তর, আমাদের অনুরোধে। তাই তার বর খুব একটা জোর ফলাতে পারে নি। প্রথমদিন তার ৫ হাজার বিক্রি হতেই প্রায় হতভম্ভ দিল্লি প্রথমে তার বরকে ফোন করে। বর বিশ্বাস করেনি। ছেলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখন লিখতে লিখতে মনে পড়ল, সেই রাতে দিল্লি সবার সঙ্গে ছিল না। সে আমাদের বলেই বাড়ি গেল। আমরা একটু বিরক্তই হয়েছিলাম। ইস্কুল বাড়িতে সবার সঙ্গে থাকার ইচ্ছে হলনা বলে পেছনে বেশ নিজেদের মধ্যে তার প্রতি কটুক্তি করেছিলাম। শেষদিন পর্যন্ত সে বেশ ভাল টাকার ঢোকড়া এবং বাতিল শাড়ি থেকে হাতপাখা, পাটের তৈরি জলের বোতল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জালসহ অনেক কিছু বিক্রি করল। সে বাড়িতে মাত্র একটা ঢোকড়া ফিরিয়ে নিয়ে গেল। খালি হাতে কোনও বিবাহিত মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বাড়ি ফিরতে নেই।

দিল্লির বরেরমত আমরা মেলায় বিক্রি নিয়ে সন্দিগ্ধ ছিলাম না ঠিকই, কেননা আমরা সন্দেহ কাঁটাকে পাত্তা দিই নি। এই মেলা আসলে দিল্লিরমত শিল্পীদের শুধুই নিজেদের চিনতে সাহায্য করেছে তাই নয়, তাদের কাছের বাজারকে নতুন চোখে দেখতেও সাহায্য করেছে। দিল্লি এখন তার এলাকায় রোজ মিটিং করতে ডাকে। তাঁকে জানিয়েছি আমরা পঞ্চায়েত ভোটের পর যাব।  

Saturday, January 21, 2012

শিলদা বেলপাহাড়ির পাথরের কাজ






না্ড়াজোলের পুতুল







খড়ুইএর গালার পুতুল

কয়েক দশক আগেও পূর্ব মেদিনীপুরের বহু কারিগরপরিবার বাঙলার অন্যতম প্রধান ও পরম্পরাগত নিজস্ব শিল্প, গালার পুতুল, গালার গয়না তৈরির যুক্ত ছিলেন। বিগত তিন-চার দশকের টালমাটাল সময়ে, বাঙলার সামগ্রিক পারম্পরিক শিল্পের ভাঁটার টানে, গালার পুতুল তৈরির অনেক পরিবার বৃত্তিচ্যুত হয়ে দিনমজুর বনে গিয়েছেন।  পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি থেকে এগরা অথবা খড়্গপুর থেকে এগরা হয়ে ভাগবানপুর-বাজকুলের পথে বাস বা ট্রেকারে খড়ুই বাজার। বাজারের পথ বেয়ে খড়ুই গ্রামের প্রখ্যাততম বাসিন্দা-পরিবার গদাধর চন্দ, বৃন্দাবন চন্দ আর কানাই নন্দী গালার পুতুল তৈরির অদম্য কারিগর পরিবার। বৃন্দাবন অগ্রজ, শ্রীবাস দৃষ্টি খুইয়েছে চিরকালের জন্য। বাঙলার পারম্পরিক শিল্প বিকাশে তাঁর শরীরের অমূল্যতম অঙ্গ, চক্ষুরত্নটি চিরকালের জন্য হারিয়েছেন, এ অসাধারণ অবদানময় তথ্যটুকুও বাঙলার সমাজে স্বীকৃতি পায় নি। চোখ হারিয়ে শ্রীবাস আর তার পরিবার আজ কর্মহীন।
ঐতিহ্যেস্থিত থেকে বৃন্দাবন চন্দের কাজে সূক্ষ্মতম অন্তর্লীন নিজস্বতা শিল্প সংগ্রাহক-রসিকদের অন্যতম প্রধান পাওনা। আজও তার কর্মে কলকাতার পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত শিল্প নির্দেশকদের ছোঁয়া লাগেনি, এ তথ্য আশ্বাসজনক। এই শিল্প-নিজস্বতা বৃন্দাবন, অদম্য বাঙলার গ্রামীণ সমাজ থেকেই অর্জন করেছেন অননুকরনীয় পারম্পরিক অনপনেয় অনেককালের প্রাচেষ্টিক দক্ষতায় – অশিক্ষিতের পটুত্ব বাঙলার মধ্যবিত্তের প্রযোজনায় তৈরি অশ্লীলতম বাক্যবন্ধশুধু। কলকাতার প্রখ্যাত বিদ্যালয়ে বৃন্দাবন আজও বাঙলার ঐতিহ্য-মন্ডিত শিল্পকে নিয়মিত নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কাজ করে চলেছেন, নানান বন্ধুর উদ্যমেও কর্মশাল আয়োজন করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্বদ্যালয়েও। গালাঋদ্ধ প্রামাণ্য চেহারার মুর্তি তৈরিতে আজও নানান প্রান্ত থেকে তিনি ডাক পান। ভারতীয় বর্ণময় পারম্পরিক পুতুলকলার সঙ্গে খড়ুইএর গালার পুতুল গড়ার ধারার এক সরলরৈথিক পরম্পরা রেখা অঙ্কন করা যায় স্বচ্ছন্দে। খড়ুইএর শিল্পীরা বাঙলার এই চিরাচরিত সম্পদের ধারকবাহক। নানান পিছুটান, অভাব, বঞ্চনা, অযাচিত অপমান সত্বেও, তারা চিরাচরিত শিল্পবিদ্যা প্রদর্শণে একাভিমানমুখী।  মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে পশ্চিমমুখীনতার আদেখলেপনা সত্বেও সাধারণ এই তথ্যটি আজও দেশজভাবনায় উদ্বুদ্ধ শিল্পী, রসিকদের দেশের মাটির গভীরে পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে প্রাণিত করে।
অদম্য বৃন্দাবন আজও বয়ে চলেছেন কয়েক হাজার বছরের বাঙলার প্রাচীণ শিল্পধারা, হয়ত স্বরস্বতী-মহেঞ্জোদাড়োর সভ্যতা রেশের অন্যতম শেষ প্রতিভূ তিনি। আর কত দিন পারবেন কে জানে। যে ব্যস্তানুপাতিক হারে অনুপানগুলির দাম বাড়ছে আর শিল্পদ্রব্যের দাম আর বাজারের ওপর শিল্পীর পকড় কমছে গুণোত্তর প্রগতিতে, তাতে শুধু বৃন্দাবনেদেরমত শিল্পনৈপুণ্যধারী পরিবারের বেঁচে থাকার আশংকা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। বাংলার ইতিহাস অথবা সংস্কৃতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা হাজারো পারম্পরিক কারু, বয়ন ও অভিকর শিল্পের সঙ্গে যাঁরা হাতেকলমে যুক্ত, তাঁদের প্রত্যেক পরিবারের সম্বন্ধে একই কথা বলা যায়। পারম্পরিক হাট-বাজারের নাগাল চলে যাচ্ছে বৃন্দাবনেদের হাত ছাড়িয়ে অভঙ্গুর প্লাস্টিকের পুতুল ব্যবসায়ীদের হাতে, মাটির তলার তেল ব্যবসায়ী আর প্রশাসকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অদৃশ্য পরিকল্পনায়। বাঙলার পারম্পরিক শিল্পী আর শিল্পের উন্নয়ণ বিষয়ে যাঁরা আগ্রহী বলে শোনা যায়, সেই মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রব্যবস্থার সমাজপতি রাজনীতিক অথবা তাদের স্নেহধন্য সরকারি অথবা বেসরকারি অর্থদান উদ্যমে ব্যস্ত প্রশাসকদের শুধুমাত্র চাকরি বাঁচানো, নিয়মরক্ষার হাতেগোণা চটজলদি প্রকল্প তৈরির বাইরে, পারম্পরিক শিল্প-শিল্পীর বিলীনতার এই আশংকা, ভাবনারূপে ভাবিয়ে তুলে নতুন প্রচেষ্টায় উদ্যমী করানো যে যাচ্ছে না, সেটাও বোধহয় বিন্দুমাত্র আশ্চর্যের নয়। বৃন্দাবনদেরমত প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়েই কী শেষ হয়ে যাবে বাঙলার আর এক বিশ্ববরেণ্য প্রযুক্তি আর শিল্প-উদ্যম, গালার পুতুলাদি!
ইওরোপিয় ব্যবসায়ী-প্রশাসকেরা বাংলায় জাঁকিয়ে বসার আগেই বাংলা শুধু উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ ছিল না, প্রযুক্তিতেও বাংলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জনপদ ছিল, বেশকিছু প্রযুক্তি বাংলার নিজস্ব ছিল। ব্রিটিশ আমলের পূর্বে বিশ্বের রপ্তানি বাজারে বাংলার গালা বা লাক্ষার পাশাপাশি আফিম, নীল রং, লৌহ আকরিক, প্রশিক্ষিত হাতি, হাজার হাজারমনি নৌকো, পান, সুপুরি, তাঁত, রেশম, মুগা, গুড় এবং গুড়জাত মদ্য- গৌড়ির চাহিদা ছিল অসীম। বিশ্বজোড়া প্রায় একচেটিয়া বাজার, অথচ বাঙলার প্রখ্যাতসব বণিকেরা সমাজের বিধিনিষেধের আওতার মধ্যে থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করতেন। ইওরোপিয় উদ্যমী এবং বণিকদেরমত, সামাজিক গঠণ অথবা প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটিয়ে বিশ্ব বাজার দখল করার বিধ্বংসী পরিকল্পনা তৈরি করে নি- বলাভাল সমাজ করতে দেয় নি। দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকে ইওরোপিয় আধিপত্য বিকাশের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে বাঙালির যে নিপীড়ণ আর ধংসমূলক বাণিজ্য বা উত্পাদনের পরিকাঠামো বিকাশ প্রচেষ্টার শুরু হল, তার মাধ্যমে বাংলায় বৃন্দাবন চন্দদেরমত স্বনির্ভর কারিগরদের স্বনির্ভরতার বিলয়, বাংলার বিশ্বজয়ী পারম্পরিক বণিকদের পরাধীণতা, বাংলার অর্থনীতি-প্রযুক্তির ধংসের উদ্যমের যুগ শুরু। ভারত-চিন-পারস্য, এই তিন অক্ষ ১৮০০ সন পর্যন্ত বিশ্ববাজারের ৭০ শতাংশ শিল্পদ্রব্য উত্পন্ন করত। এই অকেন্দ্রীকৃত উত্পাদন ব্যবস্থার বড় অংশিদারিত্ব ছিল বৃন্দাবনেরমত বাঙলার শিল্পী-ব্যবসায়ীদের।
এই গালা গলানোর, গালা রাঙানোর, ছোপানোর প্রযুক্তি বাঙলার কারিগরদের হাতে বিকশিত হয়েছে বছরের পর বছর। শুধু শিশুদের উপযোগী রঙিন খেলনা পুতুল নয়, অসম্ভব সুন্দর রঙিন গালার চুড়ি, দুল, লকেটসহ নানান ধরণের দৈনন্দিনতায়ঋদ্ধ ব্যবহার্যের সঙ্গে ঘর সাজানোর বহু শৌখিন দ্রব্যও তৈরি করতেন শ্রীবাস, বৃন্দাবনেরমত কারিগরের পূর্বজ, হাজার হাজার বছরের অর্জিত অসীমতম দক্ষতামানক ব্যবহার করে। এঁরাই একদা এবং আজও বাঙলা শিল্পের অন্যতম ধারকবাহক ছিলেন আছেন, মধ্যবিত্ত বাঙালি মানুক ছাই না মানুক।পাঠকেরা দয়াকরে মনে রাখুন ব্রিটিশপূর্ব বাঙলা তথা গৌড়বঙ্গের সীমা ছিল(বাঙলা সুবা নয়), পশ্চিমে দ্বারভাঙা(দ্বারভাঙা অর্থাত দ্বারবঙ্গ, বঙ্গের দ্বার – মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ উবাচ) পূর্বে ছিল মায়ানমার সীমান্ত, দক্ষিণে ওড়িশা।
গালার পুতুল অথবা সাজনের দ্রব্য আদতে পোড়ামাটির ওপর রঙিন গালার কাজ। প্রথম উদ্যম উইএর ঢিবির মাটিতে পুতুল তৈরি। এই মাটিতে কাঁকর থাকে না, আর মাটি মসৃণ আর আঠালো হয় - চিট ধরে। মাটির পুতুল তৈরি করে পোড়ানোর পর মসৃণতার ধর্মের জন্য যদৃচ্ছভাবে গালা লাগানো চলে। প্রায় সারা বছর এই মাটি সংগ্রহ করা গেলেও বছরের বর্ষার সময় এই মাটি বেশি পরিমানে সংগৃহীত হয়। বড় পাত্রে এই মাটি নিয়ে জল মিশিয়ে দু-তিনদিন রেখে তাল তৈরি করে কাঠের পাটাতনে মাটিকে ডলে ডলে মিহি করা হয়, রসগোল্লা অথবা সন্দেশের জন্য ছানা তৈরির কারিগরীতে। এর পর হাত দিয়ে টিপে গণেশ, লক্ষ্মী, ত্রিনাথ, নানান ধরনের পশু, কচ্ছপ, ডাইনোসর, পাখি, গলার হারের লকেটসহ নানান ধরনের ব্যবহার্য তৈরি করা হয়। পুতুলের বর্ধিত অংশে সরু লোহার তার ঢোকানো হয়, তার স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য। শিল্পদ্রব্য গড়ে দিন-তিনেক ছায়ায় রেখে, বেশ দু-তিন দিন রোদ খাওয়ানো চলে। মোট সাতদিনের ছায়া-সূর্যের খেলা চলে। শুকনো পুতুল ভাটিতে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। ভাটি হয় আড়াই ফুট থেকে তিন ফুট উঁচু। ভাটির নিচের থেকে কিছু ওপরে লোহার রড দিয়ে ঘুঁটে সাজানোর পর আনুভূমিকস্তরে কিছু পুতুল রেখে আবার ঘুঁটে সাজানো হয়, এরপর স্তরে স্তরে ১৫০টি পুতুল-ঘুঁটে সজ্জার পর আগুণ দেওয়া হয়। যতক্ষননা ওপরের স্তরের ঘুঁটে পুরো পুড়ে না যাচ্ছে, ততক্ষণ পোড়ানো চলে। সাধারণতঃ সকালে আগুণ লাগালে বিকেলে পোড়া পুতুল ভাটি থেকে বার করা হয়।
শিরিষ আর কুসুম গাছের বর্জ গালা – কিন্তু আজকাল শিল্পীরা বড়বাজার থেকেই গালা কেনেন। পুতুল তৈরির মতই গালার সুতো আর খড়ি তৈরির পদ্ধতিও বেশ সময়-দক্ষতাসাধ্য প্রক্রিয়া। বাঁশের দুটো কঞ্চির দণ্ড নিয়ে সেটিকে গরম করে দুটি দণ্ডের মুণ্ড দিয়ে গরম গালা চটকে চটকে সুতো তৈরি হয় অলঙ্করণের জন্য আর গালার খড়ি তৈরি হয় সাধারণ রং করার জন্য। হলুদ হরিতাল সর্বঘটে কাঁঠালি কলা। পুতুলে রং করার জন্য প্রথমে একটি পাত্রে(প্রতিবেদকের দেখা, বাতিল আর্ধেক ভেঙে কলসির মুখ মাটিতে বন্ধ করে, মুখটি মেঝের দিকে রেখে, আধখোলা কলসির পেটে জ্বালানো হয় কাঠকয়লা) কাঠকয়লা ধিকিধিকি করে জ্বেলে দুটি একটি পুতুল গরম করা হয়, এরপর পুতুলের নিচের দিকে ফুটোতে লোহা অথবা বাঁশের দণ্ড আটকে দন্ডটিতে আটকানো পুতুলকে আগুনের ওপরে ধরে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রয়োজনীয় রং আর অলঙ্করণ হয়। এই কাজে বড় অনুপান, গালা। দাম বাড়ছে শশীকলাপ্রায়। অথচ পুতুলের অথবা গয়নার দাম বাড়ালে বাজার হারানোর সমস্যা। ঠান্ডাপানীয়ের, শহুরে ছবির দাম বাড়লে সেই বাড়বাড়ন্ত নতমস্তকে গৃহীত হয় আর পারম্পরিক শিল্পদ্রব্যের কয়েক টাকা দাম বাড়লে, ব্যাটারা লুঠে নিল, গরীব তবু খাঁই কম নয় জাতীয় মন্তব্যও হামেশাই ভেসে আসে।
ইংরেজ আমল থেকে বাংলা তথা ভারতের পারম্পরিক শিল্পউদ্যোগকে অবাঞ্ছিততম হস্তশিল্প বলার চল তৈরি হয়েছে, যে লব্জ গবেষক, কর্মীদের বহুব্যবহারে চুঁইয়ে চলে গিয়েছে সমাজের নানান স্তরে। বেশ ভাল কথা, কেননা বাংলার পারম্পরিক শিল্পী-উদ্যমীরা আজও কেন্দ্রীকৃত সমাজ-বিশ্ব ধংসকারী দৈত্যসম শিল্পদ্যোগে আদৌ বিশ্বাসী নন, যদিও তাঁরা একদা বিশ্বজয়ী বাঙালি শিল্পী ছিলেন।  শ্রীবাস অথবা বৃন্দাবনেরাই নয়, বাংলার অযুত পারম্পরিক শিল্পী-উদ্যোগী আজ বাঙলার মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছেন। শুধু বাজার হারানোর যন্ত্রণাই তাঁদের একমাত্র যন্ত্রণা নয়।
পশ্চিমি গণতন্ত্রের বনিয়াদ যত দৃঢ় হচ্ছে ভারতের মাটিতে ততই বৃন্দাবনেদেরমত শিল্পী-উদ্যমীরা বিলুপ্তপ্রায় হচ্ছেন আগ্রাসী বাজারের খাঁই আর মধ্যবিত্ত আমলাদের নিশ্ছিদ্র লুঠ-পরিকল্পনায়। ইংরেজ আমল থেকেই এদের, গরীব, আনপড়, অজ্ঞাণী, পরনির্ভররূপে চিহ্নিত করার যে চেষ্টা চলেছে, তার প্রভাব পড়েছে স্বাধীণতার পরের সরকারি-বেসরকারি পরিকল্পনায়। ফলে অদম্য ভারতীয় তথা বাঙলার সভ্যতা সৃষ্টিকারী শিল্পী-উদ্যমী থেকে স্বাধীণতার পর থেকে নানান উদ্যমে, বৃন্দাবনদেরমত শিল্পীদের পিঠে সাধারণ দিনমজুর, খেটেখাওয়া, গরীব, বিপিএল, অথবা করুনতম হস্তশিল্পীর ছাপ পড়ে গিয়েছে। এরা সকলেই দাগি শ্রমিক, সরকারি পরিকল্পনা আর অনুদানরাশিতে তা স্পষ্ট। শিল্পী-উদ্যমীরূপে যতটুকু অহং অবশিষ্ট ছিল, তাও শুষে নিয়েছে মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক ইওরোপিয় বামপন্থার সংগঠিত ভালকরার উদ্যম। পারম্পরিক শিল্পীরা বিপিএলশ্রমকার্ডধারী, ভারত সরকারের ন্রেগা পরিকল্পনার ১৫০ টাকার মাটিকাটার মজুরমাত্র। সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় শূন্য, রোজগারও তথৈবচ, সামাজিক সম্মানের কথা যত কম বলাযায় তত ভাল।
তবুও নতুন মধ্যবিত্ত প্রজন্মের একটি অংশ নতুন করে সামাজিকভাবে আবার শেকড়ে ফিরতে চাইছেন, এটিই সব থেকে বল-ভারসার কথা – তাই কলকাতা তথা জেলার নানান শিল্প মেলায় বিক্রি বাড়ছে। তাদের দিকে বৃন্দাবনদের প্রজন্ম আজও তাকিয়ে রয়েছেন। এই শেকড়ছেঁড়া উদ্দাম সময়ে শ্রীবাস, বৃন্দাবনদেরমত সামাজিক শিল্পীদের বাঁচা একান্ত প্রয়োজন। তবেই বাঙলার শিল্প-প্রযুক্তির ইতিহাস বাঁচবে। আশ্বাসের কথা মধ্যবিত্ত নতুন প্রজন্ম বোধ হয় সেটুকু বুঝতে পেরেছেন।

ভারতই ব্রিটেনকে সভ্য করেছে


১৭৫৭র পালাশি চক্রান্তের পর থেকেই সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা বাঙলা এবং ভারত ধনে, মানে, জ্ঞাণে উত্তমর্ণ থেকে অধমর্ণ জনপদে পরিণত হল। ১৭৫৭র পরপরই বাংলার জ্ঞাণী গ্রামাণেরা বুঝে ছিলেন ব্রিটিশদের চরিত্র। তাঁরা বুঝেছিলেন ১০,০০০ বছরের ভারত সভ্যতার চাকা মাটিতে বসিয়ে দিতে এসেছে ব্রিটিশেরা। হাতিয়ার আর্য তত্ব, উত্পাদন আর ব্যবসার ধংস আর প্রযুক্তি চুরি। এই প্রথম ইওরোপ থেকে এশিয়ায় দামি ধাতুর স্রোত আসা হেঁটমুন্ড উর্ধপদ হল। তত্বটি বোঝার জন্য গ্রামীণেরা ব্রিটিশদের হাতে বিশ্বজুড়ে নানান সুপ্রাচীণ সভ্যতা ধংস আর লুঠ কর্ম দেখেন নি। পড়তে হয় নি ভারি ভারি বিপ্লবী কেতাব অথবা লড়়াইখ্যাপা জনগণের ভাল করার জন্য রাজনৈতিক দলও তৈরি করতে হয় নি। পলাশি চক্রান্তের পাঁচ বছর যেতে না যেতেই গ্রামীণেরা স্বাধীণতা সংগ্রাম শুরু করেছিলেন(অথচ পাঠ্য পুস্তকে লেখা, ভারতের প্রথম স্বাধীণতা সংগ্রাম নাকি সিপাই বিদ্রোহ – দয়া করে আরও একবার আনন্দমঠটি অথবা দেবী চৌধুরাণীটি পড়ুন – এই উপন্যাস দুটি যে কোনও রগরগে বলিউডি সিনেমাকে হার মানাতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের ঘটমান বর্তমানকে তুলে ধরেছিল অসীম দক্ষতায়)।
১৭৬৩ থেকে ফকির-সন্ন্যাসীদের আত্মবলিদানে বাঙলার স্বাধীণতা সংগ্রামের যে সূচনা হল, সেই লড়াইতে কোটি কোটি সাধারণে অসাধারণ গ্রামীণ আত্মাহুতি দিয়েছেন, নিজেদের পরিবারকে ছুঁড়ে দিয়েছেন ব্রিটিশ রাজের রোষানলে, কারাবরণ করেছেন ব্যক্তিস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে। সমাজের স্বার্থে হাজার হাজার বছরের সভ্যতার অন্যতম অবলম্বন, ঋজু শিরদাঁড়ায় আবলীলায় দাঁড়িয়েছেন গর্জে ওঠা ব্রিটিশ কামান, বন্দুকের ছুঁচোলো বেয়নেট আর কলকাতায় তৈরি টোটার সামনে চোখ রাঙিয়ে, গালপাট্টা ফুলিয়ে, মালকোঁচা মেরে। অসম সেই যুদ্ধে গ্রামীণরা জয়ী হননি – বাংলার উচ্চমধ্যবিত্তরাও এই সংগ্রামের পাশে দাঁড়ান নি। ইওরোপিয় ধারা অনুযায়ী, বর্তমান ইতিহাস আর লেখ্য ইতিহাসের কারিগরেরা বিজয়ী পক্ষাবলম্বী। বাঙলার স্বাধীণতাকামী অকুতোভয় গ্রামীণদের স্মৃতি প্রায়অতলে প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। ১৭৬৩ থেকেই যাঁরা ব্রিটিশ সরকারের লুন্ঠনকর্মে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের স্মৃতি ইতিহাসে বেঁচে রয়েছে আজও।
ইওরোপিয় ব্যবসায়ী-প্রশাসকেদের বাংলা তথা ভারত দখলের প্রায় অর্ধ দশক পর্যন্ত, বিশ্বের অন্যতম ধণী অঞ্চল, বাংলা সুবা শুধু উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ ছিল না, প্রযুক্তিতেও বাংলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জনপদ ছিল। বেশকিছু প্রযুক্তি বাংলার নিজস্ব ছিল। সে সব প্রযুক্তি বাংলা রপ্তানিও করেছে পেটেন্টের পরোয়া না করেই। বিশ্বদ্যালয় খুলে শিখিয়েছে বিশ্বের নানান সমাজকে। তার নিজের মেধা আর পরিশ্রমে এতই বিশ্বাস ছিল, যে সে প্রযুক্তি ভাবনা কেউ চুরি করলেও সেই প্রযুক্তি অতিক্রম করে নতুন কিছু সৃষ্টি করার যোগ্যতা আর বিশ্বাস ছিল সেই অদম্য মানুষগুলির। ব্রিটিশ শাসনের আগেও সেই যোগ্যতার বিচ্ছুরণ দেখা যেত বিশ্বের রপ্তানি বাজারে বাংলার গালা বা লাক্ষা, আফিম, নীল রং, লৌহ আকরিকজাত দ্রব্য, প্রশিক্ষিত হাতি, হাজার হাজারমনি নৌকো, পান, সুপুরি, তাঁত, রেশম, মুগার বস্ত্র দ্রব্য, গুড় এবং গুড়জাত মদ্য রপ্তানিতে। অন্তত ১৫০তির বেশী একচেটিয়াভাবে বিশ্বে বাজার ধরা উতপাদনগুলো বাঙলার গ্রামীনেরা তৈরি আর ব্যাবসা করে এসেছেন – যতদিননা তার শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে দিয়ে তার উতপাদন আর ব্যাবসা উদ্যমকে ধংস করা হয় নি। ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের শিল্প উত্পদনের প্রায় ৮০ শতাংশ উত্পাদিত হত ভারত, চিন আর পারস্যে। এর মধ্যে বাংলার অবদান খুব কম ছিল না।
প্রায় প্রত্যেকটি দ্রব্যের বিশ্বজোড়া একচেটিয়া বাজার। অথচ বাঙলার ছোটবড় দব বণিক বা উত্পাদকেরা সমাজের বিধিনিষেধের আওতার মধ্যে থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করতেন। তাদের একচেটিয়া কারবার করতে ভারতীয় সমাজ কোনওদিনও উত্সাহ দেয় নি। ইওরোপিয় উদ্যমী এবং বণিকদেরমত, নিজের দেশ অথবা সামগ্রিক বিশ্বের সামাজিক গঠণ পাল্টে অথবা প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটিয়ে বিশ্ব বাজার দখল করার বিধ্বংসী পরিকল্পনা তৈরি করে নি - বলাভাল সমাজ করতে দেয় নি। এই উত্পাদন প্রক্রিয়ার ছিল বিকেন্দ্রিভূত। এই বিকেন্দ্রীকৃত উত্পাদন ব্যবস্থার বড় অংশিদারিত্ব ছিল বাঙলার পারম্পরিক শিল্পী-ব্যবসায়ীদের, যাদের উদ্যমকে পরের দিকে অসংগঠিত অথবা হস্তশিল্প ছাপ মেরে দেওয়া হয়েছে বড় ব্যবসার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য। ফলে লাভের গুড় সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে না গিয়ে, কয়েকটি হাতে কেন্দ্রিভূত হয়েছে। পেছনে সরে গেছে সামাজিক সাম্য।
বাঙ্গালি জিবনে পরিবর্তনটা এল দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকে। ইওরোপিয় আধিপত্য বিকাশের সঙ্গে, চাকরি আর ব্যাবসার টোপ দিয়ে বাঙালি উচ্চমধ্যবিত্ত সাম্রাজ্যের ছোট অংশিদার করে নেওয়া হল। প্রথমে বাঙলা-বিহারে, পরে সারা ভারতে জনপদে জনপদে অসীম অত্যাচার, আর ধংসমূলক বাণিজ্য এবং উত্পাদনের পরিকাঠামো ধংসের প্রচেষ্টা শুরু হল। সেই সময় থেকেই বাংলার বিশ্বজয়ী ছোটবড় পারম্পরিক বণিকদের পরাধীণতা, বাংলার পারম্পরিক শিল্প উত্পাদনের বাংলার অর্থনীতি-প্রযুক্তির পরাধীণতার যুগের শুরু।
মানসিকভাবে মেরে দেওয়া হয়েছে এই ব্যবসায়ী আর উদ্যমী মানুষগুলিকে। গ্রমীণ মানুষগুলির সভ্যতার ধারকরূপে মানসিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, তাদের অনুপস্থিতিও ঘটেছে লেখ্য ইতিহাসেও। আজও সমানে চলেছে ভারতের পারম্পরিক সমাজ গড়নে তাদের ভূমিকার ন্যুনতা প্র্চারের ধারাবাহিকতা। ব্রিটিশ প্রশাসক আর বণিক দস্যুদের অমিত অত্যাচারের সঙ্গে সঙ্গে বাঙলার শহুরে সাহিত্যিক অভিচারে একের পর এক উজ্জ্বল উত্কর্ষের, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দর্শণ, এলাকাগুলো প্রায় হারিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলে। পুরোনো সাহিত্যগুলি থেকে বাঙলার বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙালির উতপাদন আর ব্যবসাকর্মও ব্রিটিশ আর মধ্যবিত্ত অনাচারে, অত্যাচারে নষ্ট হয়েছে। সমাজের কর্মকারকের সৃষ্টি করেছেন যাঁরা, স্বাধীণতার পরও সরকারি ও সমাজের নানান স্তরে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে তাদের অনুপস্থিতির ছবি গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে।
ব্রিটিশদের প্রযোজনায় চলে আসা অনাচারগুলি রোধ করার নানান উদ্যমের সূচনা হবে, এমন রঞ্জিত আশাবাদ রোপিত হয়েছিল স্বাধীণতাপূর্ব আমলে। অথচ, স্বাধীণতার পর ভায়বহ আতঙ্কের ফল ফলল দেশজুড়ে। স্বাধীণতার পর বিগত ছ দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যাচারী শাসক ব্রিটিশ সৃষ্ট অনাচারগুলি রোখার চেষ্টা হল না। সবথেকে বেশি ক্ষতি হল গ্রামীণ ভারতের। ইওরোপিয় উচ্চমধ্যবিত্তকেন্দ্রিক উন্নয়ণ প্রক্রিয়ায়, সরাসরি নিপীড়িত হলেন ভারতের আপামর গ্রামীণ। গ্রামীণদের নিরবিচ্ছিন্ন কর্মপ্রচেষ্টা, দর্শণ আর মানবমুখীনতায় গড়ে উঠেছিল যে বাঙলা তথা ভারতের সামাজিক সার্বিক সম্পদ, যে প্রযুক্তি, যে জ্ঞাণের বিকাশ ঘটেছিল বিগত কয়েক সহস্রাব্দে, দেশ বিকাশের ধারায় গ্রামীণ মানুষদের সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে, প্রযুক্তির বিকাশ, গবেষণা বিকাশ, উদ্ভাবনার কর্মে ছেদ পড়ল।
১৭৫৭র পর থেকে যে সমাজ-অর্থনীতির বিকাশের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ১৯৪৭এর পর নতুন পরিবর্তন এল না যার দ্বারা গ্রামীণেরা নতুন করে প্রযুক্তি বা কর্মবিকাশের অনুরূপ পরিবেশ ফিরে পেতে পারেন। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও, ১৭৫৭র ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটলনা। সরকারিস্তরে গ্রামীণদের উদ্দেশ্যকরে নানান প্রকল্প রচিত হল ঠিকই, কিন্তু তার মূল খাতক গোষ্ঠী উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজ। গ্রাম সমাজে আরও বড় আঘাত নামে এল বিদেশি দাতাদের দেওয়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে। গ্রাম্যস্তরে প্রযুক্তি নিযুক্তি (টেকনলজি ট্রান্সফার)র নামে গড়ে উঠল নতুনতর এর কর্মযজ্ঞ। সমাজ বদলানোর ছুতোয়, সমাজ-উন্নয়ণকর্মের নামে বিদেশি প্রযুক্তি কিনে, ভারতে বিকশিত প্রযুক্তির নির্মূলীকরণ প্রক্রিয়ার কাজ আরও দ্রুতগিতে এগোল। যে প্রাযুক্তিগুলো এল, তার অধিকাংশই ইওরোপ আমেরিকা অথবা জাপানের বাতিল প্রযুক্তি। সেই বাতিল প্রযুক্তি ভারতে এনে করপোরেটদেরজন্য আরও বেশি মুনাফার বাজার তৈরি হল শাসক মধ্যবিত্তের পরিকল্পনায়। 
একসময় ভারত থেকে সুতোর বস্ত্র আমদানি করে ব্রিটিনের সমাজে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত স্বাস্থ্যবিধানকে যেমন ন্যুনতম একটি মান দিয়েছে, তেমনি গ্রীষ্মে সুতিবস্ত্র পরে কাটানোর স্বস্তিও অনুভব করেছে ইওরোপিয়রা। ভারত আর চিনের চা, ব্রিটনের দৈনন্দিন জীবনকে পাল্টে দিয়েছে চিরতরে। অন্যান্য ভারতীয় খাদ্যদ্রব্য নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে – তাই বিরত থাকা গেল। ভারতই একদা ব্রিটেনকে সভ্য করেছে, দিল্লি স্কুল আর ইকনমিক্স-এর অধ্যাপক, ওম প্রকাশের এই দাবি খুব একটা আজকের ভারতে দাগ কাটেনা তা বোঝাই যায় বিভিন্ন লেখপত্রেয নমুনায়।
বোঝা যায় ভারতের শহরে শহরে, বাজারের পর বাজারে সেদিনের লন্ডনের দোকানে দোকানে বাংলা তথা ভারতীয় দ্রব্য সাজিয়ে রাখারমত, ব্রিটিশ, চিনের আর আমেরিকার ফোরেন জিনিস কেনার জন্য উচ্চ-মধ্যবিত্তের আদিখ্যেতায়। ১৮০০র আগে, ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যগুলো ব্রিটেনের উচ্চ-মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল সেটি আজ ঐতিহাসিক সত্য। বছরের পর বছর ধরে পণ্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে গ্রামীণ শিল্পীদের কারিগরির যন্ত্রের বিকাশ, ভারতে আর বিশ্বে বাজার তৈরি, আর নতুন নতুন পণ্যদ্রব্য উদ্ভাবনী আবিষ্কারের অননুকরণীয় দক্ষতায় ভারত তথা বাংলা ছিল মাহির। শুধু বস্ত্র উত্পাদনে অসাধারণ দক্ষতাই নয়, নানান ধরণের ধাতুজ দ্রব্য(আকরির লৌহ আর ক্রুসিবল স্টিল – প্রখ্যাত দামাস্কাস তরোয়ালের পিন্ডটি তৈরি করত ডোকরা কামারেরা, আজও তারা যে লোহার দ্রব্য তৈরি করেন, তাতে মাথাখাপকরা জং ঢাকতে, বিন্দুমাত্র রংএর প্রয়োজন হয় না – যে প্রযুক্তি আজও প্রযুক্তিগর্বী ইওরোপ আবিষ্কার করতে পারে নি – দিল্লির মিনার অথবা বিষ্ণুপুরের মদনমোহন অথবা পুরোনো পরিবারের লোহার তৈরি দেবতা কোনও বিশেষ প্রসাধণ ছাড়াই শয়ে শয়ে বছর খোলা আকাশের তলায় পড়ে থাকেমাথা উঁচু করে), খাবারদাবার(পান, সুপুরি, গুড়, চা, নুন, মশলা, চাল), পরিধেয়(চামড়া, সুতো, সিল্ক, তসর), রং(নীল অর্থাত ইন্ডিগো), শিল্পী(মস্করী বা পটুয়ারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানান বৌদ্ধগুম্ফা তৈরি করেছেন), মাটির বাড়ি তৈরির (পোড়া মাটির মন্দির অন্ততঃ তিনশো বছর ধরে রোদ, জল, ঝঞ্ঝায় দাঁড়িয়ে থেকেছে বাংলার প্রযুক্তির অনন্য বিজ্ঞাপণ হয়ে, আজও বিলাসবাহুল বাড়ির ব্রিটিশ নাম কিন্তু বাংলা বা বাংলো) প্রযুক্তি অথবা পণ্য সরবরাহ করত বাংলার তথাকথিত হস্তশিল্পীরা। তবে তার অকলঙ্ক খ্যাতি ছিল নানান ধরনের বস্ত্র উত্পাদনে, লৌহ দ্রব্য তৈরিতে, শিল্পীর গুণমানে আর তাদের কারিগরীর চূড়ান্ত দক্ষতায়।
-----
এই কলামে আমরা দেখার চেষ্টা করব সেই সব মানুষ, সেই সব সমাজের উদ্যম, সেই সব প্রযুক্তি, যাদের অসীম প্রচেষ্টায় বাংলা ১৮০০ সন পর্যন্ত বিশ্ব বিজয়ী শিল্প আর ব্যবসা উদ্যমের আঁতুড় ঘর রূপে প্রখ্যাত ছিল। পাঠকেরা দয়াকরে মনে রাখুন ব্রিটিশপূর্ব বাঙলা তথা গৌড়বঙ্গের সীমা ছিল(বাঙলা সুবা নয়), পশ্চিমে দ্বারভাঙা(দ্বারভাঙা অর্থাত দ্বারবঙ্গ, বঙ্গের দ্বার – মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ উবাচ) পূর্বে ছিল মায়ানমার সীমান্ত, দক্ষিণে ওড়িশা, উত্তরে আসাম ছাড়িয়ে প্রায় তিব্বত। বাংলার যে সব শিল্প উদ্যম নিয়ে পূর্বে আলোচনা করলাম, সেগুলি আজও ব্রিটিশদের অসীম অত্যাচার মধ্যবিত্তের অসীম উদাসীনতা সয়ে আজও টিকে রয়েছে টিমটিম করে বাংলার নানান গ্রামে। একদা যে দ্রব্য তৈরি করতে সমগ্র অঞ্চল আজ হয়ত সেই কাজটি করছে কয়েকটি পরিবারমাত্র। সেই পারম্পরিক শিল্পীরা বিগত কয়েক দশকে হয়ত ভুলেছেন তাঁদের বর্ণময় ঐতিহ্য, বাংলা তথা ভারতের বিকাশে তাঁদের দান। সেই মানুষদের আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত করব এই কলামে, যাতে তাঁরা আবারও নতুনভাবে একটু কাজ করার উদ্যম এঁচে নিতে পারেন। আজ আলোচনা করব মেদিনীপুরের খড়ুই গ্রামের গালা পুতুল শিল্পী বৃন্দাবন চন্দের উদ্যম।

বৃন্দাবনের গালার পুতুল
কয়েক দশক আগেও পূর্ব মেদিনীপুরের বহু কারিগরপরিবার বাঙলার অন্যতম প্রধান ও পরম্পরাগত নিজস্ব শিল্প, গালার পুতুল, গালার গয়না তৈরির যুক্ত ছিলেন। বিগত তিন-চার দশকের টালমাটাল সময়ে, বাঙলার সামগ্রিক পারম্পরিক শিল্পের ভাঁটার টানে, গালার পুতুল তৈরির অনেক পরিবার বৃত্তিচ্যুত হয়ে দিনমজুর বনে গিয়েছেন।  পূর্ব মেদিনীপুরের খড়্গপুর-দীঘা রাস্তায় এগরা-বাজকুল পথে, অথবা দীঘা-মেচেদা রাস্তায় বাজকুল হয়ে ভাগবানপুর-এগরার পথে বাস বা ট্রেকারে খড়ুই বাজার। বাজারের পথ বেয়ে খড়ুই গ্রামের প্রখ্যাততম কয়েকটি বাসিন্দা-পরিবার গদাধর চন্দ, বৃন্দাবন চন্দ আর কানাই নন্দী গালার পুতুল তৈরির অদম্য কারিগর পরিবার। বৃন্দাবন অগ্রজ, শ্রীবাস দৃষ্টি খুইয়েছে চিরকালের জন্য। বাঙলার পারম্পরিক শিল্প বিকাশে তাঁর শরীরের অমূল্যতম অঙ্গ, চক্ষুরত্নটি চিরকালের জন্য হারিয়েছেন, এ অসাধারণ অবদানময় তথ্যটুকুও বাঙলার সমাজে স্বীকৃতি পায় নি। চোখ হারিয়ে শ্রীবাস আর তার পরিবার আজ কর্মহীন।
এই গালা গলানোর, গালা রাঙানোর, ছোপানোর প্রযুক্তি বাঙলার কারিগরদের হাতে বিকশিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। শুধু শিশুদের উপযোগী রঙিন খেলনা পুতুল নয়, অসম্ভব সুন্দর রঙিন গালার চুড়ি, দুল, লকেটসহ নানান ধরণের দৈনন্দিনতায়ঋদ্ধ ব্যবহার্যের সঙ্গে ঘর সাজানোর বহু শৌখিন দ্রব্যও তৈরি করতেন শ্রীবাস, বৃন্দাবনেরমত কারিগরের পূর্বজ, হাজার হাজার বছরের অর্জিত পারিবারিক অসীমতম দক্ষতামানক ব্যবহার করে। এঁরাই একদা এবং আজও বাঙলা শিল্পের অন্যতম ধারকবাহক ছিলেন আছেন, মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালি মানুক ছাই না মানুক।
ঐতিহ্যেস্থিত থেকে বৃন্দাবন চন্দের কাজে সূক্ষ্মতম অন্তর্লীন নিজস্বতা শিল্প সংগ্রাহক-রসিকদের অন্যতম প্রধান পাওনা। আজও তার কর্মে কলকাতার পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত শিল্প নির্দেশকদের ছোঁয়া লাগেনি, এ তথ্য আশ্বাসজনক। এই শিল্প-নিজস্বতা বৃন্দাবন, অদম্য বাঙলার গ্রামীণ সমাজ থেকেই অর্জন করেছেন অননুকরনীয় পারম্পরিক অনপনেয় অনেককালের প্রাচেষ্টিক দক্ষতায় – অশিক্ষিতের পটুত্ব বাঙলার মধ্যবিত্তের প্রযোজনায় তৈরি অশ্লীলতম বাক্যবন্ধশুধু। কলকাতার প্রখ্যাত বিদ্যালয়ে বৃন্দাবন আজও বাঙলার ঐতিহ্য-মন্ডিত শিল্পকে নিয়মিত নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কাজ করে চলেছেন, নানান বন্ধুর উদ্যমেও কর্মশাল আয়োজন করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্বদ্যালয়েও। গালাঋদ্ধ প্রামাণ্য চেহারার মুর্তি তৈরিতে আজও নানান প্রান্ত থেকে তিনি ডাক পান।
ভারতীয় বর্ণময় পারম্পরিক পুতুলকলার সঙ্গে খড়ুইএর গালার পুতুল গড়ার ধারার এক সরলরৈথিক পরম্পরা রেখা অঙ্কন করা যায় স্বচ্ছন্দে। বৃন্দাবনেরমত খড়ুইএর শিল্পীরা বাঙলার এই চিরাচরিত সম্পদের ধারকবাহক। নানান পিছুটান, অভাব, বঞ্চনা, অযাচিত অপমান সত্বেও, তারা চিরাচরিত শিল্পবিদ্যা প্রদর্শণে একাভিমানমুখী।  মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে পশ্চিমমুখীনতার আদেখলেপনা সত্বেও সাধারণ এই তথ্যটি আজও দেশজভাবনায় উদ্বুদ্ধ শিল্পী, রসিকদের দেশের মাটির গভীরে পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে প্রাণিত করে।
অদম্য বৃন্দাবন আজও বয়ে চলেছেন কয়েক হাজার বছরের বাঙলার প্রাচীণ শিল্পধারা, হয়ত স্বরস্বতী-মহেঞ্জোদাড়োর সভ্যতা রেশের অন্যতম শেষ প্রতিভূ তিনি। আর কত দিন পারবেন কে জানে। যে ব্যস্তানুপাতিক হারে অনুপানগুলির দাম বাড়ছে আর শিল্পদ্রব্যের দাম আর বাজারের ওপর শিল্পীর পকড় কমছে গুণোত্তর প্রগতিতে, তাতে শুধু বৃন্দাবনেদেরমত শিল্পনৈপুণ্যধারী পরিবারের বেঁচে থাকার আশংকা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। বাংলার ইতিহাস অথবা সংস্কৃতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা হাজারো পারম্পরিক কারু, বয়ন ও অভিকর শিল্পের সঙ্গে যাঁরা হাতেকলমে যুক্ত, তাঁদের প্রত্যেক পরিবারের সম্বন্ধে একই কথা বলা যায়। বৃন্দাবনেরমত শিল্পীরা আজও জীবন বাজিরেখে চেষ্টা করেচলেছেন, শিল্পীর অহং বজায় রেখে অসামান্য উদ্যমে নিজের পরিবারের উদ্যম বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করেচলেছেন। এই লড়াই কী শুধুই বৃন্দাবনের! বৃন্দাবনের সঙ্গে বাংলার পারম্পরিক শিল্প আজও বাঁচতে চায়। সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ করুক আজকের মধ্যবিত্ত। নতুন সহস্রাব্দে এইটুকুই চান বৃন্দাবনেরা। অলমিতি।