Showing posts with label দেশিয় চিকিৎসা ব্যবস্থা. Show all posts
Showing posts with label দেশিয় চিকিৎসা ব্যবস্থা. Show all posts

Monday, March 6, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩৪ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এবং ১৯১৯ সালের সংস্কারে আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণের মূল আন্দোলনটি দাঁড়িয়েছিল জাতিয়তাবাদী ধারার আন্দোলনের সাফল্যের ওপরে। পুনায় নতুন আয়ুর্বেদ কলেজের শুরুর সময়ের রাজনৈতিক ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে কিভাবে পুনর্জাগরণ আন্দলন একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। বলা দরকার আয়ুর্বেদ কলেজগুলিতেও ছাত্র আন্দোলন লেগেই থাকত। অসহযোগ এবং আইনঅমান্য আন্দোলন ছাত্রদের ডাক দিল সব সরকারি বিদ্যালয় এবং বিদেশি পণ্য বর্জন করতে। এর উত্তরে ছাত্ররা সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বর্জন করে। পুনায় রাজনৈতিক নেতারা লোকমান্য তিলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে সেখানে অন্যতম বিষয় হিসেবে আয়ুর্বেদের পাঠ্যক্রম শুরু করলেন। ১৯৩২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া হল এবং ১৯৩০-৩৪ সালের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে ছাত্রদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর উত্তরে জাতীয়তাবাদীরা ১৯৩৩ সালে পুনায় আরও একটি আয়ুর্বেদ কলেজের গোড়াপত্তন করেন, যা স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় মান্যতা পায়।

১৯২১ সালে বাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গৌড়িয় সর্ববিদ্যায়তন একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ুর্বেদ পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এর পাশাপাশি আয়ুর্বেদিয় চিকিতসকেদের উতসাহে বেশ কিছু আরও কলেজ স্থাপিত হয়। প্রখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য কবিরাজ শ্যামাদাস এই কাজে প্রভূত সাহায্য করেন। ১৯২২ সালে কাশিমবাজারের মহারাজার অনুপ্রেরনায় এবং সাহায্যে গোবিন্দ সুন্দরী আয়ুর্বেদ কলেজ স্থাপন করেন কবিরাজ রমেশচন্দ্র মল্লিক, ১৯৩২ সালে বিশ্বনাথ আয়ুর্বেদিয় কলেজ স্থাপিত হয় যার উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণ এবং প্রায় সব বিষয়ে ছাত্রদের প্রশিক্ষিত করা।
প্রত্যেকটি শিক্ষাকেন্দ্রে আয়ুর্বেদের পাশাপাশি পশ্চিমি চিকিৎসা বিদ্যাও পড়ানো হয়েছে।

১৯১৬ সালের বাংলায় সংবাদপত্রের দাবি ছিল সরকারের উচিত দেশিয় পদ্ধতির চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উতসাহিত করা... এদেশের সরকারের দায় হল আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে আধুনিক নীতি অনুসরণ করে গবেষণায় উৎসাহ দানকরা এবং রোগীদের সারিয়ে তোলার দায় গ্রহন করা।
১৯১৭ সালে প্রথমবার মাদ্রাজ প্রাদেশিক সরকার আয়ুর্বেদ নিয়ে উৎসাহ দেখিয়ে ড কোমানকে দায়িত্ব দিলেন রাজ্যের দেশিয় চিকিৎসা বিষয়ে সমীক্ষা চালাতে।৯৩ স্টেইনথাল বলছেন আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণীদের আন্দোলনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মাদ্রাজ সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়।

বাড়তে থাকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপে প্রাদেশিক সরকারগুলি দেশিয় চিকিৎসা বিদ্যা পুনর্জাগরণের বিষয়ে কিছু কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। ১৯১৯এর সংস্কারের পরে যেহেতু বহু ক্ষমতা, বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিষয়টি, প্রাদেশিক মন্ত্রীদের হাতে চলে আসে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও বাড়তে থাকে। দেশিয় চিকিৎসার অবস্থা সমীক্ষা করতে বেশ কয়েকটি প্রাদেশিক সরকার কমিটি তৈরি করে।

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দেশিয় পেশাদারদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রাদেশিক মেডিক্যাল দপ্তরের ওপর; তবে ক্ষেত্র বিশেষে নীতি পালটে যায়। প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে আয়ুর্বেদিক কংগ্রেস তৈরি করা হয়, যে সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল প্রাদেশিক সরকারের কাছে দেশজ চিকিতসকেদের দাবিদাওয়াগুলি পেশ করা। ১৯৩১এ বাংলা প্রদেশে চিকিৎসকেরা(মেডিক্যাল মেন) আয়ুর্বেদ চিকিতসায়, শিক্ষাদানের প্রমিতিকরণ এবং স্বীকৃত আয়ুর্বেদিক কলেজগুলিতে পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফিকেট এবং ডিপ্লোমা দেওয়ার জন্য জেনারেল কাউন্সিল এবং স্টেট ফ্যাকাল্টি তৈরি করে। হয়ত য়ুনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যও নিশ্চই এ ধরণের একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার বাস্তবে বেঁচে থাকার কোন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাদেশিক সরকারগুলি দেশিয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় এগিয়ে আসবে এমন একটা আশা দেখা গেল। ১৯৩৬ সালে এমসিআই তৈরি হলেও জাতীয়তাবাদীদের দাবি এবং প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেটি থেকে দেশিয় চিকিতসকেদের বাদ দেওয়া হল। এই সময় থেকে পশ্চিমি চিকিৎসকেদের সঙ্গে দেশিয় চিকিতসকেদের দূরত্ব যোজন প্রমান হয়ে গেল – স্পষ্ট বলা হল যদি পশ্চিমি চিকিৎসকেরা অতিন্দ্রিয়, পৌরানিক, আধা-ধার্মিক গল্পগাছার ঘোমোটাওয়ালা এই চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে জুড়ে থাকেন, তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া হবে৯৬।

সামগ্রিকভাবে ঔপনিবেশিক সরকার ১৯০০ সাল থেকে দেশে বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিতসকদের এবং পাঠ্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ জারি করতে থাকে। এই ধরণের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার উত্তরে দেশিয় এবং পশ্চিমি চিকিৎসকেরা নিজেদের সঙ্গঠিত করে সরকারের কাছে আরও স্বীকৃতি দাবি করলেন৯৭।

সিদ্ধান্ত
আমি মত প্রকাশ করেছিলাম যে ব্রিটিশ ভারতে বাংলা সরকার চিকিৎসা বিদ্যা প্রসারে পৃষ্ঠপোষণা করেছিল। এই কাজে আমরা দেখলাম বিভিন্ন চিকিৎসা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতিকে পরাজিত করে পেশাদারি স্বীকৃতি লাভ করার চেষ্টা করেছিল। এর থেকে প্রমানিত হল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটলেও পেশাদারিত্বের বিকাশ নাও ঘটতে পারে। বাংলা প্রদেশ এই ধরণের ব্যার্থতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

আমাদের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হল যে ভারতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিকিতসকেদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণার উদ্যম ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানে বিবাদের পরিবেশ তৈরি হয় ফলে আমাদের দেশে পেশাদারি মনোপলি অবস্থার বদলে পেশাদারি অলিগোপলি অবস্থা তৈরি হল। স্বাধীনতার সময়ে ভারতে চার ধরণের চিকিৎসক গোষ্ঠী ছিল, যারা তাদের গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থ পূরণ করার চেষ্টা করত। এরা হল

১) মেডিক্যাল কলেজগুলির ছাত্র যারা ধনী অভিজাত এবং সেনাবাহিনীর সেবা করত।
২) মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্ররা ব্রিটিশ টেরিটরির সেবা করত
৩) মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্ররা দেশিয় জনগনের সেবা করত।
৪) এর বাইরে ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া দেশিয় চিকিৎসকেরা যারা দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করত।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩৩ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

১৯৩৩ সালে চিকিতসার ডিগ্রি জারি, মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল কাউন্সিল তৈরির বিল এল। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া এক্ট প্রতিপালিত হওয়ার পরে সেই ডিগ্রিগুলি আবার নতুন করে স্বীকৃত হল। ভারত এবং ব্রিটেনে এই ডিগ্রিগুলি পারস্পরিকভাবে মান্যতা পাবে সেটাও স্থির হল।

পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশাসকেরা পুরোনো চিকিৎসা শিক্ষার বদল এনে বাংলায় এবং ভারতের অন্যান্য এলাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজার কাজ যখন করছেন, তখন দেশিয় চিকিৎসার সঙ্গে যুক্তরা নিজেদের স্বাধিকার বুঝে নিতে চাইলেন। বিংশ শতকের শুরুতে স্বদেশি আন্দোলনে এই চাহিদার পালে হাওয়া লাগে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রোগীরা পশ্চিমি চিকিতসকেদের কাছে না গিয়ে দেশিয় চিকিতসকেদের কাছে যান, তার জন্য আন্দোলনকারীরা দেশ জুড়ে আবেদন করলেন। ১৯১২ এবং ১৯১৪ সালের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন এক্টএ জাতীয়তাবাদীদের রোষ বাড়িয়ে দেয় এবং জাতীয়তাবাদীরা সরকারের ওপর প্রভূত চাপ তৈরি করে। যদিও এই আইনে দেশিয় চিকিতসকেদের নথিভূক্ত করা হয় নি এবং বলা হয়েছিল, শুধু মাত্র সরকারি নথিভুক্ত চিকিতসকেরাই সরকারি চাকরি এবং সরকারি কেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসা করার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে।

ভারতের ইতিহাসে আয়ুর্বেদ জাগরণের আন্দোলন বড় ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় সেএই আন্দোলন শিক্ষা কেন্দ্র খোলার জন্য দেশ জুড়ে আন্দোলন তৈরি করে। সরকার নিয়ন্ত্রণ নিরপেক্ষ সংস্থা তৈরি হল আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির চিকিতসকেদের জন্য – একদিকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন বৈদ্যদের এবং হেকিমদের নথিকরণের কাজ করতে থাকে, অন্যদিকে বাংলার মহামেডান লিটারারি সোসাইটি এবং ন্যাশলান মহামেডান এসোসিয়েসন হেকিমদের নথিকরণ করার কাজে এগিয়ে আসে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই কাজ সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করে৮৮।
বিংশ শতের শুরু থেকেই সারা দেশে দেশিয় এবং পশ্চিমি চিকিৎসা শিক্ষার একটা সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হতে থাকে। এই আন্দোলন আরও জোরদার রূপ পায় ১৯০৭ সালে দেশিয় চিকিতসকেদের উদ্যমে অল ইন্ডিয়া আয়ুর্বেদিক কংগ্রেস নামক একটি সংগঠন তৈরি হওয়ায়।

আয়ুর্বেদ পুনর্জাগরণের আন্দোলনের মূলস্বরগুলি ছিল, সরকারি স্তরে রাজনৈতিক সাম্য, স্বীকৃতি এবং সমর্থন। ব্রাস এই আন্দোলনকে এইভাবে দেখছেন, একটি শিক্ষা বিষয়ক গোষ্ঠী, যাদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক পদ্ধতিতে স্বীকৃতি এবং পেশাদারিত্ব আদায়।৮৯

কিন্তু আয়ুর্বেদ আন্দোলন পেশাদারিত্ব অর্জনের রাজনৈতিক সমাধানে উস্থাপিত হওয়ার পদ্ধতিটাই তৈরি করে উঠতে পারল না। এই দুর্বার আন্দোলনেও পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থার স্পর্ধিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার পরিকাঠামোই তৈরি হল না ভারতে। শিক্ষার অভিন্ন পাঠ্যক্রম বা চিকিতসার পেশাদারি মাপদণ্ড তৈরিও করা গেল না। আয়ুর্বেদ নবজাগরণ আন্দোলনের এই ব্যার্থতার কয়েকটি কারণ ব্রাস তুলে ধরেছতসারদেশিয় চিকিৎসার নবজাগরণের পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে মৌলিক বিভেদ ছিল। কেউ কেউ শুদ্ধ আয়ুর্বেদের প্রচার চাইছিলেন, আবার পশ্চিমি চিকিতসা পদ্ধতির সঙ্গে আয়ুর্বেদের ধারনাকে জুড়ে, আয়ুর্বেদের বিকাশের তত্ত্বের মানুষও কম ছিলেন না। শুদ্ধতাবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য ছিল যে, ভারতের সেই সময়ের গণস্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় যে শূন্যতা রয়েছে, সেটি একা শুদ্ধ আয়ুর্বেদিয় চিকিৎসায় সমাধান করা যাবে না, এর সঙ্গে পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জুড়ে নিতে হবে। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখেছি এমনকি পশ্চিমি চিকিৎসা ব্যবস্থা মহামারীর সময় দেশিয় ব্যবস্থাকে সঙ্গে নিতে পিছপা হয় নি। পাঠ্যক্রমের মৌল বিষয় নিয়ে মতভেদ থাকায় পেশাদারিত্বে উপনীত হওয়ায় চেষ্টা, চেষ্টাই থেকেই গেল।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩২ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

বিংশ শতকের শুরুর দিকে ঘটনাক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে থাকে। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিবাদ শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনে বিজ্ঞানের পুনর্জাগরণের ধারণার সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নবজাগরণের ধারণাটি জুড়ে গেল। ১৯১২ এবং ১৯১৯এর মধ্যে মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন এক্ট চালু হওয়ায় বিরুদ্ধাচরণ করলেন দেশিয় চিকিৎসক গোষ্ঠী। এই সময়ে পশ্চিমি চিকিতসাবিদদের সঙ্গে দেশিয় চিকিতসকেদের বিবাদ প্রকাশ্যে এসে পড়ে। ১৯১৪ সালের বেঙ্গল মেডিক্যাল এক্ট বাংলায় একটি মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং চিকিতসকেদের নথিভূক্ত করার কাজ করে। এই ধরণের আইন বম্বে এবং মাদ্রাজে চালু হয়। দেশিয় চিকিৎসার ওপরে এই আইনটির প্রভাব এই ঘটনা ক্রমের প্রভাবে দেখা যেতে পারে-

পশ্চিমি চিকিৎসায় শিক্ষত মাদ্রাজের কৃষ্ণ স্বামী আইয়ার এবং পি পি বৈদ্যর নাম প্রাদেশিক নথিকরণের খাতা থেকে হঠিয়ে দেওয়া হয় ১৯১৫ সালে দেশিয় চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে। ড আইয়ারকে বলা হয় তিনি যদি নিজেকে ট্রিপলিকেনের কালাভালা কুন্নুম চেট্টিয়ার ফ্রি ডিস্পেনসারির প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে না নেন, তাহলে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি নথি থেকে তার নাম কাটা যাবে। বম্বের একই হুমকি দেওয়া হয় ড বৈদ্যকে। তিনি তার পিতার পিতার স্মৃতিতে চলা একটি আয়ুর্বেদিক পোপট প্রভুরাম কলেজে যুক্ত ছিলেন।
আন্দোলনকারীরা এবং সংবাদপত্র এবং দেশিয় চিকিৎসকেরা কাউন্সিলের এই নীতিকে নিন্দা করেন। দৈনিক ভাষ্কর মিত্র লিখল মাদ্রাজ কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত প্রতিহিংসাপরায়ন এবং অসন্তোষজনক। সঞ্জীবনী এবং হিতবাদী বলল এই ঘটনা আতঙ্ককর এবং দেশিয় চিকিৎসা পদ্ধতির পক্ষে অপমানজনক।

চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলি স্বীকৃতির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পশ্চিমি চিকিৎসা বিদ্যাকে স্বীকৃতি দিয়ে পশ্চিমি পদ্ধতিতে শিক্ষিত চিকিতসকেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে শুরু করল। বাংলার প্রাদেশিক সরকার ১৯০৬ সালে ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুলকে স্বীকৃতি দিয়ে বলল সেই বিদ্যালয় থেকে কৃতকার্য হয়ে শংসাপত্র নিয়ে বেরোনো ছাত্ররা নথিভুক্ত হবে। ১৯১৬ সালের ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল(বোগাস ডিগ্রি) এক্টএর প্রভাবে এই ধরণের বেসরকারি বিদ্যালয়ে ছাত্রদের ভর্তি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এই আইন অনুযায়ী ১৮৯৭-৯৮ সালে শুরু হওয়া বেলিগাছিয়ার কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সারজনসএর মত প্রত্যেকটি বেসরকারি কলেজের ডিপ্লোমা দেওয়া নিষিদ্ধ করে দিল। আইএমএসএর এক আধিকারিক রায় কালিদাস চন্দ্র বোসের তথ্য অনুযায়ী সে সময়ে কলকাতায় এরকম চারটি শিক্ষা কেন্দ্র ছিল, যারা সারা দেশের জন্য বিপুল সংখ্যক বোসের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী হাতুড়ে(বোগাস) ডাক্তার তৈরি করত।

১৯১৬ সালে বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার আগে তার বিধিনিষেধগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ কেউ৯ বিলে পশ্চিমি চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণের ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই আইনে আয়ুর্বেদ, য়ুনানি, হোমিওপ্যাথিকেও যুক্ত করার জোরালো দাবি তুললেন। এমন কি উপনিবেশিক সরকারের মধ্যেও বিলের উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত ছিল। সেখানে কেউ কেউ চিকিৎসার স্তরকে উচ্চে তুলতে পশ্চিমি চিকিৎসার সঙ্গে দেশিয় চিকিৎসা পদ্ধতির মিলন ঘটাতে চাইত আবার অন্যেরা দুটি পদ্ধতির স্বাতন্ত্রের পক্ষে ছিল।

১৯১৮-১৯ সালে মন্তেগু(সেক্রেটারি অব স্টেট) এবং চেমসফোর্ড(ভাইসরয়) উপনিবেশিক ভারতের রাষ্ট্র চরিত্রে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনেন। প্রশাসনিক সংস্কারে সৃষ্টি হল দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ নীতি - স্থানীয় সরকারের হাতে কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেওয়া হল এবং তার মাথায় রইল কেন্দ্রিয় সরকার। তারা বিষয়গুলি দুভাগে ভাগ করলেন - ট্রানসফার্ড এবং রিজার্ভড ক্ষেত্র। ট্রানসফার্ড ক্ষেত্রটির কয়েকটি বিষয় যেমন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তাদের মনোনীত মন্ত্রীদের হাতে থাকবে। অন্যদিকে রিজার্ভড ক্ষেত্রটিতে রইল অর্থ, রাজস্ব, পুলিশ এবং অন্যান্য কিছু যা নিয়ন্ত্রণ করবে কেন্দ্রিয় সরকার। যুদ্ধর সময়ে প্রশাসনিক সেবায় ভারতীয়দের ভুমিকা বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে চিকিৎসা জুড়ে গেল ট্রানসফার্ড বিষয়ে – চিকিৎসা সেবাতেও প্রচুর ভারতীয় প্রবেশ করতে লাগল। ১৯১২ সালের রয়্যাল কমিশন অব ইন্ডিয়ায় উপনিবেশের পূর্ত বিভাগে আরও বেশি ভারতীয়কে নেওয়ার সুপারিশ করে।৮১

গ। ১৯২০ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত
মন্তেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার স্থিতি পেলে ভারতীয় মন্ত্রীরা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ পেলেন। দ্রুত ভারতীয়করণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ এবং বিস্তারে মন্ত্রীদের হাতে বেশি বেশি ক্ষমতা আসায় যে পরিবর্তনটি ঘটল, তার ছোঁয়া লাগল চিকিৎসা ব্যবস্থায়। দেশজ মন্ত্রীরা হয়ত পশ্চিমি চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে দেশিয় চিকিতসা শিক্ষা ব্যবস্থা জুড়ে দিতে পারেন এই ভয়ে রেগুলেশন অব মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড নিজেদের হাতে রাখল সরকার। চিকিৎসা শিক্ষার প্রমিতকরণের কাজে জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল বা জিএমসির নিয়ন্ত্রণ থাকায় শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে অত্যধিক ছাত্র প্রবেশে বাধা ঘটল। ব্রিটেনের ১৮৮৬ সালের মেডিক্যাল এক্টএ মেডিসিন এবং সার্জারিতে দাই এবং সার্জারিতে পরীক্ষার সুপারিশ ছিল। এর ফলে পাঠ্যের সময় বাড়ল এবং পরীক্ষা বিধি আরও কঠোর হল। ১৮৯২ সালে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া ডিগ্রি জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল স্বীকার করল।
প্রাথমিকভাবে জিএমসি ব্রিটেনের মত ভারত উপ্নিবেশে চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্রগুলি পরিদর্শনের কাজ খুব একটা উৎসাহ দেখায় নি; তারা যে ছোট খাট পরিবর্তন প্রস্তাব করত সেগুলি সহজেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রূপায়ন করতে পারত। কিন্তু এই অবস্থা দীর্ঘ দিন চলল না। বাংলায় শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে চলার তথ্যের সুযোগ নিয়ে ১৯০৭ সালে জিএমসি দাইদের স্তর উন্নীত করতে তাদের শিক্ষার প্রস্তাব দিল।

ভারতীয় হাসপাতালগুলিতে জিএমসির পরিদর্শনের প্রতিবেদনে দাইদের প্রশিক্ষণের অভাবকে চিহ্নিত করা হল। কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জিএমসি প্রশাসকদের বিরোধ বাধল।

১৯২২ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া চিকিৎসা ডিগ্রির ওপরে কোন রকম নিষেধাজ্ঞা জিএমসি জারি করে নি। ১৯২৪ সালে আর এ নিডহ্যামের পরিদর্শন-সমীক্ষা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া কোন ডিগ্রিকে বাতিল না করার সিদ্ধান্ত নেয় জিএমসি। ইন্সপেক্টর জেনারেল অব মেডিক্যাল এডুকেশন, নিডহ্যামকে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ডিগ্রির যোগ্যতা অর্জনের শেষতম পরীক্ষাটি বিষয়ে মন্তব্য করতে বলা হয়। ১৯২২ এবং ১৯২৩এর দাইদের পরীক্ষা নিডহ্যামএর আনুকূল্য অর্জন করে নি। ১৯২৪এর পরীক্ষাতেও একই ঘটনা ঘটলে নিডহ্যাম লিখলেন, গর্ভপাত(লেবার) বিষয়ে ছাত্রদের যথেষ্ট শিক্ষায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ৮৪

১৯২৪ সালের নিডহ্যামের সমীক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝড় তুলল। বিশ্ববিদ্যালয় নিডহ্যামকে তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষণ করতে দিতে অস্বীকার করে এই যুক্তিতে যে তারা ছাত্রদের মেডিসিন, সার্জারি এবং মিডওয়াইফারিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিচ্ছে এবং তাদের ছাত্রদের অর্জিত দক্ষতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সন্তুষ্ট। ১৯২৪এর পর থেকে জিএমসি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত ডিগ্রিকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করে। ১৯২৭ সালের জুলাইতে জিএমসি নতুন করে এই বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া করে এবং ইন্সপেক্টর জেনারেল অব মেডিক্যাল কোয়ালিফিকেশনসকে নির্দেশ দেয় নতুন করে সমগ্র বিষয়টি নিরীক্ষণ এবং সমীক্ষা করতে। এর এক বছর পরে জিএমসি ভারতে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া তৈরির প্রস্তাব দেয়। কেন্দ্রিয় সরকার এমসিআই তৈরির প্রস্তাব নিয়ে খুব স্বচ্ছন্দ ছিল না, এবং প্রাদেশিক সরকারগুলি কেন্দ্রকে জানাল যে এই প্রস্তাবে কেন্দ্রিয় কাউন্সিল প্রাদেশিক স্বাধীনতার ওপর অবাঞ্ছিত আঘাত হানছে। প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে এই দৃষ্টিভঙ্গী উঠে এল৮৫। এই বিতর্কে জিএমসি ১৯৩০ সাল থেকে ভারতীয় সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা সংক্রান্ত ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল করে এই যুক্তিতে যে, হাতে একটা ডিগ্রি থাকা মানেই চিকিৎসকের চিকিৎসার ন্যুনতম জ্ঞান থাকার প্রমানপত্র নয়।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩১ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

বহু কবিরাজ বাংলার বাইরে হরিদ্বার, বেনারস এবং অন্যান্য শহরগুলিতে চিকিৎসা কেন্দ্র খুললেন। এই চিকিৎসকেরা দেশজ চিকিৎসাকে পুনর্জন্ম দেওয়ার ভগীরথ হলেন। কবিরাজ গঙ্গাধর রায়ের সমসাময়িক, পরম্পরার শ্রীখণ্ড বিদ্যালয়ের কবিরাজ চন্দ্রকিশোর সেন শস্তায় ওষুধ বিক্রির জন্য কলকাতায় একটি কেন্দ্র শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে এই কেন্দ্রটির সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে তিনি কলুটোলায় একটি ওষুধ তৈরির কারখানা খুললেন। আয়ুর্বেদের বৈজ্ঞানিক চরিত্র উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে তিনি শস্তায় প্রচুর পুস্তক রচনা করেন। এই সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে উঠে এন এম সেন এন্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা নাম দিয়ে গঙ্গাধর রায় আরও বড় আকারে ওষুধ তৈরির কোম্পানি শুরু করেন। অন্যান্যরাও আয়ুর্বেদিয় ওষুধ বাণিজ্যিকরণের কাজে লেগে পড়েন। ১৯০১ সালের ঢাকার শক্তি ঔষধালয়ের অসামান্য সাফল্যের পর সাধনা ঔষধালয় এবং কল্পতরু আয়ুর্বেদিক ওয়ার্ক্সও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়।

বাংলার দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাসে বোঝা যাচ্ছিল ১৮৮০ সালেও দেশজ চিকিতসার কোম্পানিগুলি জোরদার ব্যবসা করছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমি চিকিতসকেদেরও বাড়বাড়ন্ত হয়। শেষের দিকে ১৮৮৬ সালে ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুলে পশ্চিমি চিকিতসাবিদ্যার পাঠ দেওয়া শুরু করে। এইটি প্রথম ভারতীয়দের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি বিদ্যালয়। ১৯০৫ সালে বিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। এরা কারা এবং কি জন্য বিরোধ সে তথ্য আজ আর জানা যায় না। শুধু জানা যায় যে ব্যবস্থাপকেদের মধ্যে কয়েকজন আলাদা হয়ে গিয়ে ১৯০৭ সালে পৃথক একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সে সময় কলকাতায় তিনিটি বেসরকারি পশ্চিমি চিকিৎসা পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার বিদ্যালয় ছিল। এদের মধ্যে কিছু ছিল পয়সা ফেলে ডিপ্লোমা দেওয়ার কারবারি। এই ডিপ্লোমার সঙ্গে চিকিৎসার পাঠ্যসূচী অধ্যনের কোন যোগ ছিল না। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমি চিকিৎসকেদের সংগঠন ক্যালকাটা মেডিক্যাল সোসাইটি কলকাতায় চিকিতসকেদের নথিকরণের প্রস্তাব দেয়। সরকার এই প্রস্তাব গ্রহন করতে অস্বীকার করে কেননা তারা জানত তাদের পক্ষে বৈদ্য আর হেকিমদের বিরুদ্ধতা সহ্য করা সম্ভব হবে না।

উনবিংশ শতকের শেষে চিকিৎসা প্রশাসনে দেশজ চিকিতসাবিদ্যার প্রতি বিরুদ্ধতা প্রকাশ্যে এসে গেল। আইএমএসএর চিকিতসকেরা তাদের চিকিতসাবিদ্যাকে একমাত্র বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধরূপে দাবি করা শুরু করলেন। বাড়তে থাকা স্বীকৃত পশ্চিমি চিকিতসক স্নাতক জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ায় দেশজ চিকিতসকেদের ধারনা হল তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে গেল। ব্যবসায়িক এবং কৃষির সমৃদ্ধিতে দুই ধরণের চিকিতসকেদের হাতে সম্পদ জড়ো হতে শুরু করে।৬৬

ব্রিটিশ ভারতে দেশজ আয়ুর্বেদিয় চিকিৎসাব্যবস্থার সমর্থক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি উনবিংশ শতকের শেষের সিকে য়ুনানিতেও জোয়ার লাগল। প্রখ্যাত য়ুনানি চিকিৎসক হেকিম আজমল খান(১৮৬৩-১৯২৮) য়ুনানি চিকিৎসা শিক্ষার এবং তার পাঠ্যক্রমের বিধিবদ্ধভাবে সংঘবদ্ধ করেন। হেকিম আজমল খানের মূল অবদান হল, য়ুনানি চিকিৎসা(যা অন্যভাবে য়ুনানি-টিব নামে পরিচিত) মুসলমান রাজনৈতিক অস্মিতার অন্যতম চিহ্নরূপে প্রতিষ্ঠা করা৬৮।

আবারও য়ুনানি চিকিতসাবিদ্যার পুনর্জাগরণের মডেল হল পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যা। বাড়িতে বসে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা এবং শিক্ষার উদ্যমের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট কর্মী এবং মাস মাইনে ভিত্তি করে বিধিবদ্ধ বিদ্যালয় স্থাপন করার চেষ্টা হল। য়ুনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার অনেকটা আয়ুর্বেদিয় ব্যবস্থা সংস্কারের মত আন্দোলনের রূপ নিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় এইটি চরম রূপ গ্রহন করে।

দেশিয় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত এল পশ্চিমি পদ্ধতিতে শিক্ষিত ব্রিটিশ এবং ভারতীয় চিকিৎসকেরা প্রাদেশিক ভিত্তিতে চিকিতসকেদের নথিকরণের দাবি জানালেন যাতে কোন আইনি বিবাদে, পেশাদারদের রোগ সারিয়ে তুলতে এবং অন্যান্য আইনি ঝঞ্ঝাটে দেশিয় চিকিৎসকেদের শংসাপত্রের আইনি বৈধতা না থাকে। ৬৮

১৯০৭ সালে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্বের বিষয়টা নতুন করে উঠে এল সরকারের পক্ষে একমাত্র পশ্চিমি পদ্ধতিতে চিকিতসকেদের নথিবদ্ধ এবং স্বীকার করার উদ্যমের মধ্যে দিয়ে। সরকারি প্রস্তাবগুলি ছিল এই রকম –
ক। যাতে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে প্রয়োজনে গুণমানযুক্ত যথেষ্ট চিকিৎসক পাওয়া যায়
খ। খুলে দেওয়ার অর্থ হল, বাংলা প্রাদেশিক সরকারের এই বিরাট প্রেসিডেন্সির প্রচুর হাসপাতালে বিশাল সংখ্যক হাউস ফিজিসিয়ান এবং হাউস সার্জেন দরকার হয়, প্রত্যেক বছর সব থেকে মেধাবি ছাত্রদের সেই সুযোগ দেওয়া হবে,
গ। ব্যক্তিগতভাবে চিকিতসকেদের নিজেদের উতসাহে শিক্ষাকেন্দ্রকে উৎসাহ না দিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র স্বীকৃত বিদ্যালয়গুলিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা এবং বম্বেতে এই ধরণের পদক্ষেপ করা হয়েছে। ইত্যাদি...

শুধু পশ্চিমি পদ্ধতিতে শিক্ষিত চিকিতসকেদের জন্য নথিবদ্ধ করণের প্রক্রিয়া ধাক্কা খেল। এই বিষয়ে সরকারকে প্রচুর ঝামেলা সামলাতে হল, বিশেষ করে দেশের অধিকাংশ মানুষই দেশিয় চিকিতসকেদের চিকিৎসার সমর্থক। চিকিতসকেদের নথিকরণের প্রক্রিয়ায় বিরুদ্ধতা বাড়তে থাকল। সরকার সিদ্ধান্ত নিল, যতদিননা পশ্চিমি পদ্ধতিতে চিকিতকেরা গবেষণা এবং প্রভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন, ততদিন নথিকরণের প্রক্রিয়া থমকে থাকবে। স্বাধীন চিকিতসকেদের পসার বাড়াতে প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব নীতি গ্রহন করল। বাংলা সরকার লিখল, যখন কোন চিকিৎসক সরকারি সেবায় নিযুক্ত হন তখন তার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং সরকারের হয়ে কাজ করার দায় এবং সময় তার বহু সময় নিয়ে নেয়; ফলে প্রাথমিকভাবে সেই চিকিৎসক সরকারি চাকর তার পরে স্বাধীন চিকিতসক।৭২

ভারতে স্বাধীন চিকিৎসক তৈরি করা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ালে সে শুধু যে স্বাধীন চিকিতসকেদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল তাই নয়, সরকারি সেবার নীতিতে পরিবর্তন আনতে উদ্যমী হল। কিন্তু সরকারি সেবায় সংস্কারের পথে হাঁটা বিফল হল।
(চলবে)

Sunday, March 5, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৯ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

১৮৬৪ সালে সরকারি নতুন এক নির্দেশে বাংলা শ্রেণীকে দুভাগে ভাগ করা হল – নেটিভ এপোথেকারি এবং দ্য ভার্নাকুলার লাইসেন্সিয়েট – যার ফলে বাজারে স্বাধীন চিকিতসকেদের সংখ্যা একটু বাড়ল। প্রথম শিক্ষাটিতে সরকারি চাকরি করানোর জন্য ছাত্র ভর্তি করানো হল, আর দ্বিতীয়টিতে সাধারণ মেডিসিন এবং সার্জারিতে শিক্ষা দেওয়ার জন্য যাতে দেশের গরীবদের জন্য চিকিতসকেদের সংখ্যা বাড়ানো যায়৫৩।

দ্য ভার্নাকুলার লাইসেন্সিয়েট শ্রেণীদের প্রথম দল পাঠ শুরু করে ১৮৬৬-৬৭ সালের শিক্ষাবর্ষে যেখানে মহিলা, শিশু, দাই এবং মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্সও পড়ানো হত। ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীতে উত্তোরণ ঘটল যখন চিকিৎসা পাঠের শ্রেণীগুলিকে শিক্ষা দেওয়ার আলাদা আলাদা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করে নির্দিষ্ট নীতি আর আইনের আওতায় নিয়ে আসা হল। ১৮৭৩ সালে বাংলা ভাষার নেটিভ এপোথেকারি এবং দ্য ভার্নাকুলার লাইসেন্সিয়েট শ্রেণীকে নতুন বিদ্যালয়ে পাঠানো হল ফলে সেখানে বহু ছাত্র ভর্তি হতে পারল। এই বিদ্যালয়ের নাম হল শিয়ালদা মেডিক্যাল স্কুল বা ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুল। শুরুতেই ৮৩২জন ছাত্র নিয়ে তার যাত্রা শুরু করল এই বিদ্যালয়। একই বছরে হিন্দুস্তানি শ্রেণীকে টেম্পল মেডিক্যাল স্কুলে পরিণত করা হল। জেলা সুপারিনটেন্ডেন্টের তত্ত্বাবধানে চলা এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল সেই সব ছাত্রদের শিক্ষিত করা হবে যারা গ্রামে চিকিৎসা করতে উতসাহী। এরা হেকিম আর বৈদ্যদের স্থান গ্রহণ করবে এবং তাদের মাধ্যমে সমাজে ইওরোপিয় চিকিতসাবিদ্যার সুফল পৌছে যাবে৫৫। এই প্রস্তাবটি নেওয়া হয়েছিল ১৮৭৯ সালের এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের বৈঠকে।

নতুন দুটি বিদ্যালয় স্থাপনে চিকিৎসা বিদ্যালয়(স্কুল) এবং মহাবিদ্যালয়ের(কলেজ) মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দিল। স্কুলগুলির কাজ হল ডিপ্লোমা এবং সার্টিফিকেট দিয়ে প্রচুর অধস্তন চিকিৎসক তৈরি করে বিভিন্ন সরকারি সেবায় শূন্যস্থান পূরণ করা এবং দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য হল নির্দিষ্ট সময়াবধির পাঠ্যক্রম অনুসরণ করিয়ে ডিগ্রি দেওয়া।

রাষ্ট্র দেশিয় চিকিতসক নিয়োগ করেছে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত। তার পরে ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের শর্ত আরোপ করেছে। এই বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য হয়ত ছিল সেনাবাহিনীর জন্য যথেষ্ট সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ করা। বাংলা শ্রেণীর চিকিৎসকেরা সরকারি চাকরির বদলে প্রেসিডেন্সির গরীব শ্রেণীর মানুষদের সেবা দিতেন।

১৮৫৭ সালে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি পাওয়ার পরে সিনেটের অনুমোদনক্রমে প্র্যাক্টিক্যাল কেমিস্ট্রি আলাদা পাঠ্য হিসেবে বা সাধারণ বক্তৃতা দেওয়ার চল শুরু হলেও বহুকাল পর্যন্ত চিকিৎসাবিদ্যা পড়া বা চিকিৎসা করার জন্য রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং প্রাণীবিদ্যা অধ্যয়ন জরুরি শর্ত ছিল না। এই বিদ্যাগুলির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ১৯০১-০২ সালে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বাইরে থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল তৈরি হল। চিকিৎসক হিসেবে ডিগ্রি পাওয়ার জন্য কোন বিদ্যালয় থেকে ন্যুনতম দুবছরের অবধিতে এনাটমি এবং ফিজিওলজি অধ্যয়ন এবং কোন স্বীকৃত হাসপাতাল থেকে মেডিসিন এবং সার্জারিতে প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা জরুরি ছিল। বাড়তে থাকা এনাটমি এবং সার্জারি বিদ্যার বিকাশের ফলে এই দুই বিদ্যা গুরুত্ব পেতে থাকে।

প্রেসিডেন্সির নানান এলাকার চিকিৎসা বিদ্যালয়ের চিকিতসাশিক্ষার গুণমান বাড়ানোর জন্য নতুন করে উদ্যম নেওয়া হল। ১৮৯৬ সালে চিকিতসাবিদ্যার পাঠটি তিন বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর এবং ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার স্তর বাড়িয়ে ম্যাট্রিকুলেশন করা হল। এরপর বিদ্যালয়গুলিকে দেশিয় থেকে ইংরেজিতে রূপান্তরিত করা হয়। এক দশক পর রাষ্ট্র বাংলায় স্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি স্থাপন করে বিদ্যালয়গুলি থেকে সফল ছাত্রদের বেঙ্গল কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশনে পঞ্জীকরণ করার কাজ শুরু করবে। চিকিতসাবিদ্যার বিদ্যালয়গুলি থেকে বেরিয়ে আসা সফল ছাত্র সাব-এসিস্ট্যান্ট সার্জন পদে সরকারি সেবায় প্রবেশ করত।

রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে চিকিৎসা নীতি অঙ্গীভূত হয়ে যাওয়ায় ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসা পাঠ্যক্রম সরকারের পক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া সহজ হয়ে যায়। ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি এক্টএ চিকিৎসা বিদ্যার পাঠ্যক্রম রদবদল ঘটানোর ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে ১৯০৪ সালে সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহন করে। লর্ড কার্জন ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি এক্টকে ফিরে দেখতে চেয়ে বললেন সরকার শুধু যে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যম নিতে পারে তাই নয়, সে যা কিছু অদলবদল করা, কোন কিছু যোগ বিয়োগ করার, এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহন করা যে কোন কিছু পরিবর্তনও করতে পারে।

সরকার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করল আবার সেটির প্রশাসন এবং পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পদক্ষেপও নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা পাঞ্জাব, মাদ্রাজ এবং লাহোরের চিকিৎসা কলেজগুলিতেও এই ধরণের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হল। বিংশ শতকের আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রক ছিল না, ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত চিকিৎসা পঠনপাঠন নিয়ন্ত্রণ করত ডায়রেক্টরেট অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন দপ্তর।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৯ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

১৮৫৮তে রাণি যখন কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার নিজের হাতে নিলেন তখন থেকে সাম্রাজ্যের ভারত সম্বন্ধীয় দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটল। এই সময়ে পশ্চিমি নবজাগরণের(নতুনভাবে তৈরি ব্রিটিশ পেশাদারদের) সুফল ভারতীয়দের কাছে পোঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সাম্রাজ্য। এই পরিবর্তনের বহু সীমাবদ্ধতা ছিল – তখনও ভারতীয় সাম্রাজ্যের মূল লক্ষ্য ছিল আইনের শাসন এবং রাজস্ব আদায়।

নতুন সরকারের নীতি পরিবর্তনের দুটি প্রভাব চিকিৎসা সেবায় পড়ল – মফস্বলে সিভিল সার্ভিসে চাকরি করা ইওরোপিয়দের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হল ব্রিটেনে শিক্ষিত ব্রিটিশ চিকিতসকেদের ওপর। ১৮৪০ এবং ৫০এর দশকে আইএমএস(১৯৪৭ পর্যন্ত মূলত সেনাবাহিনীর চিকিৎসা সেবা)এ উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসা স্নাতকদের রমরমা ছিল যাদের পশ্চিমি পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে তৈরি করা নির্দিষ্ট সুউচ্চ ধারণা ছিল। এরা এই সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করত সেই শতকের ৬০ এবং ৭০ দশকেও। হিউম বলছেন এই প্রজন্মের চিকিতসকেরা পাঞ্জাবে ১৮৬০ থেকে ১৮৮০ পর্যন্ত হেকিমদের দিয়ে টিকাকরণ এবং স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে এক্সটেন্সানের কর্ম প্রকল্প বন্ধ করে দেন।

নব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে প্রশাসনিক বিভাগগুলিরও বিস্তার ঘটল। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিস্তারের ফলে পাশ্চাত্যে শিক্ষিত চিকিতসকেদের প্রশাসনিক সেবায় চাহিদা বাড়ল। এই বিস্তারের আগে কোম্পানি আমলে চিকিতসকেরা সাম্রাজ্য জুড়ে কোম্পানির ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে মিশনারিরাও চিকিৎসা সেবা দিতেন, তার পরে শেষের দিকে স্থায়ী সরকারি চিকিৎসা সেবা ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবুও ১৯৩০ সাল নাগাদ ভারতে প্রচুর চার্চ হাসপাতালের অস্তিত্ব ছিল।

ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পাশাপাশি গঙ্গাধর রায় এবং গঙ্গাপ্রদাস সেনের মত প্রখ্যাত ভিষগের হাতে আয়ুর্বেদ চর্চিত হচ্ছিল। এই সময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে(অন্তত তিনটি প্রজন্ম) কবিরাজির পরম্পরা যে বয়ে চলেছে তার একটা উদাহরণ নিচে দেখতে পাব -

ক। গঙ্গাধর রায়(১৭৮৯-১৮৮৫) ছাত্রবৃন্দ
১। দ্বারকানাথ সেন(প্রথম প্রজন্ম ছাত্র), যোগীন্দ্রনাথ সেন, উমাচভরণ ভট্টাচার্য, রাজেন্দ্র নারায়ণ সেন, কুঞ্জলাল ভিষগরত্ন, জয়পুরের লক্ষ্মীনারায়ণ শর্মা, নাগপুরের গোবর্ধন শর্মা(দ্বিতীয় প্রজন্ম)
২। গয়ানাথ সেন(প্রথম প্রজন্ম ছাত্র), সীতানাথ সেন, রামনাথ সেন, বেনারসের সত্যনারায়ণ শাস্ত্রী এবং ধর্মদাস গুপ্ত এবং ত্র্যম্বক শাস্ত্রী, শ্যামাদাস বাচস্পতি(দ্বিতীয় প্রজন্ম)
৩। হারানচন্দ্র চক্রবর্তী(প্রথম প্রজন্মের ছাত্র), জ্যোতিষচন্দ্র সরস্বতী, রমেশ্চন্দ্র চক্রবর্তী, প্রভাকর চ্যাটার্জী(দ্বিতীয় প্রজন্ম), বিমলানন্দ তর্কতীর্থ, রামচন্দ্র মল্লিক, বিজয়কালী ভট্টাচার্য, নিলিনীরঞ্জন সেন(তৃতীয় প্রজন্মের)

খ। গঙ্গাপদ সেনের(১৮২৪-১৮৯৬) ছাত্র আর তাদের ছাত্রদের ছাত্র
১। নিশিকান্ত সেন, বিজয় রত্ন সেন(প্রথম প্রজন্ম), যামিনীভূষণ রায়, বিরাজচরব গুপ্ত, দুর্গাদাস ভট্ট(দ্বিতীয় প্রজন্মের)
২। রামচন্দ্র বিদ্যাবিনোদ
এই পর্বে অনুবাদের কাজও হয়েছে। বিজয়রত্ন সেন আয়ুর্বেদের পুনর্জাগরণে ভগট্টের অষ্টাঙ্গরদ্ধ অনুবাদ করেন। সে সময় শাসক রাজা বিজয়রত্নকে মহামহোপাধ্যায় উপাধি দান করেন। তিনি দুই চিকিৎসাব্যবস্থার মিলনের পক্ষে ছিলেন। তার এক ছাত্র যামিনীভূষণ রায়ের স্থাপন করা আয়ুর্বেদ কলেজে দুই ধরণের চিকিৎসাবিদ্যা অধিত হত।

খ। ১৮৬০ থেকে ১৯২০
এই পর্বে পেশাদারিত্বের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের অভিমুখেরও পরিবর্তন ঘটে। ভারতে ইংরেজী শিক্ষত শ্রেণী - যাদের অধিকাংশ সফল ব্যবসায়ী, জমিদার এবং নব্য শিল্পপতির - তাদের উদ্ভবে ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। এই পর্বে দেশজ এবং পশ্চিমি চিকিতসকেদের পেশাদারিত্বের দিকে যাওয়ার উতসাহ দেখা দেয়।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বিষয়ে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। সেই সময়ের চিকিতসা সংক্রান্ত নীতির একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে একদিকে চিকিতসকেদের ব্যক্তিগত পসার বাড়ানোর বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়, আর অন্যদিকে প্রশ্ন ওঠে কিভাবে রাষ্ট্রের দেওয়া চিকিৎসা সেবা বিপুল জনসংখ্যার কাছে পৌঁছবে। একদিকে রাষ্ট্র সরকারি চাকরিতে দেশিয় চিকিতসকেদের প্রবেশের বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে তারা বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ারও অঙ্গীকার করছে। ১৮৫৭র পরে রাষ্ট্রের ঘাড়ে উন্নয়নের বৃহত্তর জোয়াল পড়লেও এই বিপুল সংখ্যাকে সেবা দেওয়ার মত প্রয়োজনীয় চিকিৎসক তার হাতে ছিল না। ফলে বিপুল সংখ্যায় মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে রাষ্ট্র দেশিয় চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
আমাদের হাতে যে সব তথ্য রয়েছে তা নির্ভর করে বলতে পারি পাঞ্জাবে ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৮ পর্যন্ত বৈদ্য আর হেকিমদের লাহোর মেডিক্যাল কলেজে আয়ুর্বেদ এবং য়ুনানির প্রাথমিক বিষয়ে শিক্ষত করে তুলে বিভিন্ন এলাকায় তাদের চিকিতসক হিসেবে কাজে লাগাতে শুরু করে। এই ধরণের টলারেন্সের কারণ হল, স্টেট মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে উপযুক্ত সংখ্যায় চিকিৎসক তৈরি করা যাচ্ছিল না। রাষ্ট্রের সেবা যে সব অঞ্চলে পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছে সেই সব এলাকায় দেশিয় চিকিতসকেদের সেবা ব্যবহার করা হল নানান ত্রাণের কাজে। কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজ এবং লাহোরের মেডিক্যাল কলেজের চিকিতসক স্নাতকেরা বিপুলাকার প্রশাসনের সেনাবাহিনী, জেল, রেলে চাকরি পেয়েগেলেন। ১৮৭২ সালের বাংলার জনগননায় ৩৭৬৯জন ফিজিসিয়ান, সার্জেন এবং ডাক্তারের যেমন হদিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার তুলনায় দেশিয় চিকিৎসকের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে ২৩৭০০।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৮ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

নতুন শ্রেণীতে এনাটমি, মেটিরিয়া মেডিকা, মেডিসিন এবং সার্জারি হিন্দুস্তানি এবং উর্দুতে পড়ানোর ব্যবস্থা করা হল। ১৮৩৯ সালে মাথাপিছু ৫ টাকা বৃত্তিধারী ৫০ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হল। শব্যবচ্ছেদ এবং পাঠ্যসূচী ইওরোপিয় নীতি অনুসারী। ক্লিনিক্যাল শিক্ষার জন্য তাদের মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালে নিয়োগ করা হয়৩৮। হাসপাতাল শুরু হয় ১৮৩৮ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায়, যাতে তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে হাতে কলমে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব দিক শেখানো যায়। ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক, জনৈক ম্যাককোষের পদত্যাগে৩৯ পদটি তুলে দিয়ে যে বেতন বাঁচল, তা বরাদ্দ হল হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলি দেখাশোনার জন্য।

মোটামুটি শুরুর সময় থেকেই মিলিটারি বা হিন্দুস্থানি শ্রেণীটি ভারতীয়দের জন্য চিকিৎসা জ্ঞান আহরণের কাজে উন্মুক্ত করে দেওয়া হল চাকরির শর্ত জুড়ে দিয়ে। ঠিক হল প্রবেশাধিকার পাবে ১৫০ জন। যোগ্য দেশিয় ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরুর আগে তাদের কলেজের অধাপকেদের সামনে পরীক্ষা দিতে হবে৪০। যে সব ডাক্তার অসামরিক স্থানে কাজ করত, তাদের প্রতি আরও একটি শর্ত ছিল সরকারের চাহিদা ও নির্দেশ অনুযায়ী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেতে হতে পারে। যে সব ছাত্র সেনাবাহিনীতেও কাজ করবেন তাদের জন্যও একই নির্দেশ জারি হল।

মেডিক্যাল কলেজে মিলিটারি শ্রেণীতে দুধরণের বিষয় পড়ানো হত একটি তাত্ত্বিক অন্যটি প্রায়োগিক। প্রথমটি দুবছর এবং তৃতীয়টি শেষ বছরে। তাত্ত্বিক পাঠ্যক্রমে ছিল বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের পরিচয় এবং ব্যবচ্ছেদ ক্রিয়া জ্ঞাপন করিয়ে এনাটমি, মেটিরিয়া মেডিকা এবং প্রাক্টিক্যাল ফার্মেসির শিক্ষা৪১। তাত্ত্বিক পড়াশোনার দ্বিতীয় বছরের শেষে মেডিসিন এবং সার্জারিও পরানো হত। তৃতীয় বছরে হাতে কলমে ড্রেসার, ডিসপেনসার এবং কম্পাউন্ডারির শিক্ষা দেওয়া হত। যেসব হাসপাতালে ভারতীয় ছাত্ররা ভারতীয় শিক্ষকদের থেকে মেডিসিন এবং সার্জারির প্রায়োগিক শিক্ষা নিচ্ছে সেই সব হাসপাতালে এই শিক্ষা দেওয়া হত। হাসপাতালে ময়না তদন্ত ছিল ক্লিনিক্যাল ইন্সট্রাকশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৃতীয় বছরের শেষে মিলিটারি শ্রেণীর ভারতীয় ছাত্র ড্রেসার, কম্পাউন্ডার এবং ওষুধ খাওয়ানো এবং সাধারন হাসপাতালের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতে পারত। কিন্তু তাদের কাজের কেরিয়ার সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না।

শতাব্দ যত এগোতে থাকে বাংলায় দেশিয় চিকিতসকেদের চাহিদা বিপুল হারে বাড়তে থাকে বিশেষ করে অসামরিক কাজে। আগের বছরের কলেরা মহামারী এই চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এই চাহিদা পূরণ করতে রাষ্ট্র মেডিক্যাল কলেজে ১৮৫১ সাল থেকে আরও একটি শ্রেণী খুলতে বাধ্য হয়। দেশিয় মানুষদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষিত ছাত্ররা অধস্তন চিকিৎসা কর্মী হিসেবে কাজ করা শুরু করে।

নতুন শ্রেণীটার নাম হল দেশিয় বা বাঙ্গাল শ্রেণী, দুবছরের শিক্ষানবিশীর প্রশিক্ষণ। ১৮৫৩ সালে ২১ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হল এই পাঠ্যক্রম। সফল ছাত্রদের উপাধি হত হাসপাতাল এপ্রেন্টিস বা ভার্নাকুলার লাইসেন্সিয়েটস ইন মেডিক্যাল এবড সার্জারি। এই শ্রেণীতে ভর্তির জন্য বাংলা ভাষা সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান থাকা জরুরি ছিল। এই শ্রেণীর পাঠ্যসূচীর সঙ্গে হিন্দুস্তানি পাঠ্যসূচীর মিল ছিল। তৃতীয় বছরে সফল হয়ে বেরোবার পরে তারা দেশিয় ডাক্তার হিসেবে ডিপ্লোমা কাগজ এবং চাকরি পেতেন বিভিন্ন ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেটের দাতব্য চিকিৎসালয়ে আর জেল হাসপাতালে। এদের একাংশ টিকাকার হিসেবেও কাজ করেছেন৪৩। সেই সময়ে বাংলা জুড়ে কলেরা যে মহামারীর আকার নেয় তা রুখতে এই পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়। কয়েকজন বাংলা প্রেসিডেন্সির নানান সংস্থা বা হাসপাতাল বা এক্সটেন্ডেড কলোনিয়াল টেরিটরিতে চাকরি করেছেন৪৪।

যদিও চিকিৎসক তৈরির জন্য মেডিক্যাল কলেজে অতিরিক্ত শ্রেণী তৈরি হচ্ছিল যাতে সেনাবাহিনী বা অন্যান্য ক্ষেত্রের চাহিদা পূরণ করা যায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী মেডিক্যাল কলেজেও পরিবর্তন আসছিল। ১৮৫৬ সালে কলেজের বিশদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয়ের দায়িত্ব কলেজ কাউন্সিল এবং সেক্রেটারির হাত থেকে নিয়ে নেওয়া হয়, এ কাজে প্রিন্সিপ্যালকে সাহায্যের জন্য একটা কাউন্সিল অব প্রফেসর তৈরি করা হল, পরে প্রইন্সিপ্যাল ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের ফিজিশিয়ান এবং সার্জনের পদে বৃত হন৪৫।

চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দখলদারির নতুন ধারার প্রবর্তন ঘটল ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মধ্যে দিয়ে। এই শিক্ষার পাঠ্যসূচী তৈরি এবং পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব গিয়ে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার একটি স্বশাসিত বোর্ডের ওপর যেটি আবার সরাসরি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত।

১৮৫৭ সালের সিপাহী যুদ্ধ(পুনম এখানে মিউটিনি শব্দটা ব্যবহার করেছেন) ভারতের সামাজিক গঠন এবং সরকারি কাজকর্মে বিপুল পরিবর্তন ঘটাল। সিপাহি যুদ্ধের বহু কারণ – ডালহৌসির দেশিয় রাজ্য গিলে খাওয়ার নীতি – যার ফলে বহু দেশিয় সামন্ত রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে, নতুন রাজস্ব নীতি যাতে দেশিয় চাষীদের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয় এবং দেশিয় হস্তশিল্পের উতপাদনের বাজারকে বিদেশিয় কলের উতপাদনে প্রতিস্থাপিত করার ইত্যাদির জন্য সিপাহি যুদ্ধ ঘটে। ১৮৫৮র গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া এক্টএও পরিবর্তন ঘটল। সরকারের আর্থিক আয়ব্যয়ের হিসেব রাখার দায় পড়ল সরকারের ওপর এবং সেই সঙ্গে দেশের নৈতিক এবং জাগতিক উন্নতির কথাও বলা হল।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৭ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

যে চার ছাত্র শব ব্যববচ্ছেদ করে, তাদের নিয়ে মোট ১১ জন ৩০ অক্টোবর ১৮৩৮ সালে প্রথমতম চিকিৎসা পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়। তারাই বাংলার প্রথম পশ্চিমি পদ্ধতিতে শিক্ষিত চিকিৎসক, যারা শল্য এবং সাধারন চিকিৎসা করার অনুমতি পেল। এরাই ভারতীয় চিকিতসকেদের মধ্যে প্রথম, যারা মাসে ১০০ টাকা মাইনেয় ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা এবং চট্টগ্রামে সাব-এসিস্ট্যান্ট সার্জনের পদে অভিষিক্ত হয়২৮।

পশ্চিমি চিকিৎসাবিদ্যায় ভারতীয় ছাত্রদের সাফল্য এবং একই সঙ্গে তাদের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের দক্ষতায় উতসাহিত হয়ে তখনকার জেনারেল কমিটি অব পাব্লিক ইন্সট্রাকশনের সেক্রেটারি ড ওয়াইজ প্রস্তাব দিলেন, এদের মধ্যে ৮ জনকে ইওরোপে উচ্চতর শিক্ষার জন্য প্রেরণ করা হোক।

বিলয় হওয়া এনএমআইএর এবং পরে মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়া জনৈক দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৪৫ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য যখন ইওরোপে যাচ্ছিলেন, তিনি দুজনকে তার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। ৮ মার্চ ১৮৪৫ সালে যে ক’জন ইওরোপে উচ্চশিক্ষার জন্য যান তাদের মধ্যে ছিলেন ভোলানাথ বোস, সুর্যকান্ত চক্রবর্তী, গোপালচন্দ্র শীল, দ্বারকানাথ বোস। খরচ তোলা হয় ড গুডিভের উতসাহে ব্যক্তিগত দানে স্থানীয় অভিজাতদের থেকে যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলার নবাব নাজিম।

১৮৩৭ সালে মাউন্টফোর্ড জোসেফ ব্রামলির মৃত্যুর পর কমিটি অন পাবলিক ইস্ট্রাকশন প্রিন্সিপ্যালের পদ খারিজ করে একজন অচিকিতসক ডেভিড হেয়ারকে সেক্রেটারি পদে বসালেন। এই বছরেই সার্জারি, ক্লিনিক্যাল সার্জারি, বোটানি, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন এবং এনাটমিতে আরও অধ্যাপক নেওয়া হয়। ১৮৪১ থেকে ১৯১২র মধ্যে নিম্নোক্ত নীতিগুলো গ্রহন করা হয়,

অ। মেটিরিয়া মেডিকা থেকে কেমিস্ট্রি বিযুক্ত হয় ১৮৪২ সালের মার্চে,
আ। সার্জারি থেকে অপথ্যালমিক সার্জারি থেকে বাদ দেওয়া হয় ঐ সময়ে
ই। ধাত্রীবিদ্যা থেকে এনাটমি এবং সার্জারি বিযুক্ত করা হয় ১৮৫০এর ফেব্রুয়ারিতে
ঈ। মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স পড়ানো শুরু হয় ১৮৫০ সালে
উ। ডেসক্রিপটিভ এন্ড সার্জিক্যাল এনাটমি বিভাগ ১৮৩৭ থেকে লেকচারারশিপ থেকে পুরো সময়ের অধ্যাপনার পদ পেল ১৮৫৫ সালে
ঊ। ১৮৫১তে ডেন্টিস্ট্রি শুরু হল
ঋ। ১৮৬৪তে হাইজিন পাঠ্যক্রমে ঢুকল
৯। এনাটমি থেকে জুলজি এবং কম্পারেটিভ এনাটমি ভাগ হল ১৮৬৯ থেকে
এ। ১৮৭১ সালে প্যাথলজি পাঠ্য হল
ঐ। ১৯১২ সালে ক্লিনিক্যাল সার্জারি পড়ানো শুরু হল।
১৮৪২ সালে পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং জলপানি চালু করতে বাংলা ঔপনিবেশিক সরকার কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনকে বিলুপ্ত করে কাউন্সিল অব এডুকেশন তৈরি করে।

পাঠ্যসূচী তৈরি হল, ক্যালকাতা মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু হল পাঠ্যক্রমের দিকে নজর রেখেই এবং কালে কালে সেটিকে ব্রিটিশ মেডিক্যাল চিকিৎসা প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলির নিরিখে বদলে ফেলা হল। প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ প্রশাসকদের বক্তব্য ছিল প্রত্যেক বিষয়ে প্রয়োজনীয় সময় ধরে শিক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না এবং প্রত্যেক অধ্যাপককে বিপুল বৈচিত্রের বিষয় পড়াতে হচ্ছে। তাই এই স্বীকৃতির জন্য বিষয় ধরে ন্যুনতম ৭০ জন লেকচারারর এবং ডেমনস্ট্রেটর নিয়োগ করা হল যাতে একজন অধ্যাপককে একের বেশি বিষয় পড়াতে না হয়। এই পরিবর্তনে শিক্ষাক্রমকে চার বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হল – যে সংস্কার ব্রিটেনে এর ৪৫ বছর পরে প্রযুক্ত হবে৩৩।

১৮৪৪ সালে লন্ডনের রয়াল কলেজ অব সার্জনসের পরামর্শে পাঠ্যসূচী ঠিক করা হল এবং সেটি ১৮৪৬ সালেই তাদের অনুমতির সঙ্গে য়ুনিভার্সিটি অব লন্ডন, সোসাইটি অব এপোথিকারিজের মান্যতাও পেল।

পশ্চিমি চিকিতসাশিক্ষার ধারা অনুসরণ করে কলেজ সম্পূর্ণ রূপে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষণের পাশাপাশি অধস্তন চিকিতসাকর্মী তৈরির উদ্যম নেওয়া হল। ১৮৩৫ সালে এনএমআই বিলয়ের ফলে এই ধরণের কর্মী আর তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল, বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে তাদের গুরুত্ব অসীম ছিল৩৫। ফলে সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য অসামরিক ক্ষেত্রে নিয়োগের জন্য দেশিয় ডাক্তারদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকার ঠিক করল এডুকেশন কমিটির প্রস্তাবক্রমে দেশিয় ডাক্তারদের মেডিক্যাল কলেজেই পড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। ১৮৩৮সালে দেশিয় ডাক্তারদের অভাব চরমে গিয়ে পৌঁছল। ১৮৩৮-৩৯ সালে অতিরিক্তভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করে অবস্থা সামাল দেওয়া গেল। ১৯৩৯ সালের আগস্টে সরকারি নির্দেশনায় নতুন করে ১৮৩৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশিয় ভাষায় চিকিৎসা শিক্ষা দান আবার শুরু হল৩৭।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৬ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

বহুকাল ধরে ভারতের দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদেশি নতুন চিকিৎসাব্যবস্থাকে পাশাপাশি নিয়ে চলেছে। যেমন ইসলামের আগ্রাসনে এ দেশে য়ুনানি চিকিৎসাবিদ্যা ভারতে আসে এবং আয়ুর্বেদের সঙ্গে সে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে থাকে এবং য়ুনানি কিছুটা আয়ুর্বেদকে আত্তীকরণ করে নেয়। ভারতে পশ্চিমি চিকিতসাবিদ্যার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। বহু বছর অস্বস্তিকরভাবে পাশাপাশি কোন দ্বন্দ্ব ছাড়াই বসবাস করে গিয়েছে এই দুই চিকিৎসাবিদ্যা। এই পাশাপাশি চলায় ভেদ এল উনবিংশ শতকের শেষের দিকে, যখন লেসলির ভাষায় সর্বগুণান্বিত(ইকলেকটিক) চিকিৎসাবিদ্যা থেকে সংখ্যায় বাড়তে থাকা হাতুড়েদের বার করে দেওয়ার চাপ আসতে শুরু করল শিক্ষিত চিকিতসকেদের থেকে। ভারতের ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ চিকিৎসকেরা এই ধরণের ‘হাতুড়ে’ চিকিতসকেদের চিকিৎসা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানাল। অন্যভাষায় বললে, তারা পেশায় পেশাদারি নিয়ন্ত্রণের বিস্তৃতি বাড়াবার পক্ষে দাঁড়ালেন। দেশিয় চিকিৎসকেরা এই দাবিকে দেখলেন তাদের পেশার ওপর আঘাত হিসেবে। দুটি ব্যবস্থার চিকিতসকেরাই তাদের পেশায় চিকিতসকেদের অবাধ প্রবেশের বিরুদ্ধে ছিলেন। নতুন করে দুটি ব্যবস্থার মিটমাটের উদ্যমও নেওয়া হয়েছিল।

১৯২০ সাল নাগাদ ভারতে চিকিতসা ক্ষেত্রে পশ্চিমি মডেল নির্ভর হয়ে পেশাদারিত্ব রূপ পেতে থাকে। রাষ্ট্র চিকিতসকেদের ধর্মপিতা(স্পনসর) বা পৃষ্ঠপোষক হওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তা বাস্তবে রূপ পায় নি। ভারতে যখন ভারতীয় চিকিৎসকেরা তাদের পেশাকে পেশাদারিত্বে রূপান্তরিত করতে চাইলেন, তখন পশ্চিমি চিকিতকেরা দেখলেন তারা চিকিতসায় অলিগোপলি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা শিক্ষা এবং তার প্রবেশিকা পরীক্ষা, বা নতুন ধরণের চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র তৈরি, বিস্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকারী হল সরকার। জেফরির ভাষায় এটি অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত, যেখানে পশ্চিমি চিকৎসকেরা তাদের স্বাধীনতা, সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ হারিয়ে রাজনৈতিক হস্ত্যক্ষেপে ভালনারেবল হয়ে পড়লেন, যদিও তাদের ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্মান কিছুটা হলেও বজায় রইল১৯।

যে নীতি আর ব্যবস্থায় ব্রিটেনে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটেছে, ঠিক সেই নীতিতেই ভারতে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটল। ব্রিটেনে পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটেছে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং একচেটিয়া ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বৈধতায়। ভারতীয় অবস্থায় চিকিতসকেদের নিয়ন্ত্রণ বিফল হল কেননা ভারতে তাদের প্রতিযোগিতায় ফেলার মত প্রতিদ্বন্দ্বী চিকিৎসাব্যবস্থার চিকিৎসকেরা ছিলেন বহু পরিমানে। ফলে সামাজিকভাবে সব চিকিৎসকের চিকিৎসা করার সামগ্রিক বা আংশিক নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়োগ করা সম্ভব হল না।

কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য সংগঠনেতে আইএমএস(ব্রিটেনের চিকিতসক আধিকারিকদের সংগঠন)এর স্তরের অধস্তন চাকরিতে চিকিতসকেদের চাকরি পাওয়ার অধিকার নিজেদের হাতে রেখেছিল। এই চাকরিগুলিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য পেশাদারদের ওপরে নৈতিক কিছু শর্ত আরেপ করতে থাকে, যাকে হাতিয়ার করে ভারত উপনিবেশ চিকিতসকেদের চিকিৎসাকে নিয়ন্ত্রণ করার দিকে এগোতে থাকে। এই কাজে সহায়ক হলেন ব্রিটেন থেকে ভারত সাম্রাজ্যে কাজ করতে আসা আমলারা। জনসন বলছেন, (ভারতে)ব্রিটিশ পেশাদারদের সঙ্গে উপনিবেশে চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ খুঁজে পেশাদার হতে চাওয়া কিছু মানুষ জুটে গেলেন২০।

ব্রিটেনে যে ধরণের চিকিৎসক নিয়োগ নীতি এবং বিধান ঠিক হয়েছিল ভারত উপনিবেশ ঠিক সেই ধরণের নীতিমালা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে লাগল। দক্ষতার মাপকাঠি হল নথিভুক্তকরণ। দুর্ভাগ্যক্রমে ব্রিটেনে যেভাবে চিকিতসকেদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণা সফল হয়েছে, ভারতে সেটি ঘটল না। ব্রিটেনে ব্যক্তিগত পসার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ঠিক উলটো কাণ্ড ঘটল ভারতে - চিকিৎসকেরা সরকারি চাকর হলেন।

পরের আলোচনায় আমি দেখাতে চেষ্টা করব, ঔপনিবেশিক উনবিংশ এবং বিংশ শতকের ভারতে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্বের দিকে নিয়ে যাবার রাষ্ট্রীয় উদ্যম বিফল হয়েছিল দুটি কারণে, প্রাথমিকভাবে বহু ধরণের চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু ছিল সেই সময় এবং একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক সরকারের চরিত্রও বদল ঘটছিল দ্রুত।
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চরিত্র এবং চিকিৎসা নীতি পরিবর্তনের ইতিহাসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় -
ক। ১৮৬০এর আগের সময়
খ। ১৮৬০ থেকে ১৯২০
গ। ১৯২০ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত

ক। অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ কাছারির(কোর্ট) সঙ্গে ভারতের অন্যান্য এলাকার নীতির কোন পার্থক্য ছিল না। তাদের কাছারিতে নিজেদের দেশের চিকিৎসকই ছিলেন না, বরং কিছু ব্রিটিশ চিকিৎসক নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যতের লক্ষ্যে মুঘল রাজদরবারে চাকরি গ্রহন করেন২১। ব্রিটিশ রাষ্ট্র ছিল ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক এবং সামরিক বাহিনীর সমাবেশ মাত্র২২।

এনএমআইএর বিলয় এবং পশ্চিমি পদ্ধতিতে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ানোর উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের গোড়াপত্তনে পরস্পরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগোনোর যে চেষ্টা এর আগে চলছিল দুই চিকিৎসা ব্যবস্থার, সেটির শেকড় উপড়ে পড়ল। ১৪ থেকে ২০ বছর বয়স্ক ৫০ জন ছাত্র নিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু। ছাত্রদের ভাগ করা জল জলপানির অঙ্কের তারতম্যে। ইংরেজির সঙ্গে বাংলা এবং হিন্দুস্তানি ভাষায় দখল, শিক্ষা অর্জনের আবশ্যিক দক্ষতা হিসেবে গণ্য করা হত। ৫০ জনের মধ্যে অধিকাংশ হিন্দু কলেজের ছাত্র(যদিও সংখ্যা জানা যায় না), যাদের উন্মুক্ত(মানে পশ্চিম প্রভাবিত) পাঠ্যক্রমে চিকিতসা একতা বিষয় ছিল।
১ জুন ১৮৩৫ সালে প্রথম বক্তৃতা ছিল অস্থিবিদ্যা। এটি সপ্তাহে তিনবার ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পড়ানো হয়েছিল। শারীরবিদ্যা সেই বছরেই পড়ানো শুরু হয়। হিন্দুদের স্পর্শকাতরতার কথা চিন্তা করে শব ব্যবচ্ছেদ করা হত না।

১৮৩৬ সালে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে চারজন যুবা শবব্যবচ্ছেদ করার সিদ্ধান্তে২৬। কলেজের প্রায় সব অধ্যাপকের উপস্থিতিতে তারা সূক্ষ্ম, সঠিক এবং নির্দেশিতভাবে মৃতদেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যবচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়।
(চলবে)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৫ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

দেশিয় চিকিৎসায় বিরুদ্ধতা আসে নি পশ্চিমি ব্যক্তিগত চিকিতসকেদের থেকে বরং সেটি এসেছিল সরকারি চাকরি করা পশ্চিমি চিকিতসকেদের থেকে। উনবিংশ শতকের ভারতে চিকিতসকেদের স্বাতন্ত্র ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণটাই হল সরকারি চাকরি করা। এই সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাকরিদাতা হিসেবে পেশাদারদের থেকে তার শ্রমটা কিনছে।

সে সময়ের ভারতের চিকিৎসাপরিকাঠামো সে সময়ের ব্রিটেনে অনুসৃত নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল এবং খুব জোরদার রূপে ছিল। উনবিংশ শতকে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পা রাখছে, সেই সময় ব্রিটেনে পেশাদারিত্বের সূচনা এবং বৃদ্ধি ঘটছে। এই সময়ে চিকিৎসক, আইন ব্যবসায়ী, স্থপতি, হিসাবরক্ষা এবং যন্ত্রবিদদের মত পেশায় পরিবর্তন ঘটছিল মারাত্মক রকমের। ভারতে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্ব ছিল ঔপনিবেশিক চরিত্রানুযায়ী প্রকল্প, এবং ব্রিটেন নিজেদের শিল্পসমাজের নীতিগুলি উন্নতিশীল সমাজে চাপিয়ে দিল জোর করে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি মধ্যযুগে চিকিৎসা ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা স্থায়ী এবং পেশাদার ছিলেন সেটি নানান পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় দ্রুত বিকাশ ঘটছিল। এই সময়ে ব্রিটেনে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে, ব্রিটেনের চার্চ দেশের সম্পদ আর বিত্ত আর ব্যক্তিগত উদ্যমের বিপুল অংশ দখল নেয়। মধ্যযুগের শেষে চার্চের চিকিৎসক, যাদের নাম ছিল ফ্রায়ার্স, চার্চের বাইরেও অসুস্থদের চিকিতসা করা শুরু করেন। তবে মধ্যযুগের শেষের দিকে যাজকদের প্রতি ঘৃণায় মঠ সম্বন্ধীয় আচার আচরণ ভেঙ্গে পড়তে থাকে। ১৫৩৬ থেকে ১৫৩৯ এর মধ্যে অষ্টম হেনরি মঠগুলি তুলে দেন। তবে চার্চের সঙ্গে চিকিৎসক, আইনজীবি, স্থপতি, সচিব, রাষ্ট্রদূত আর শিক্ষকদের জোরদার সম্পর্ক তৈরি হয়। দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতের মধ্যের সময়ে যাজকদের চিকিৎসা এবং আইন ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ধর্মের বহিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক, শল্যচিকিতসক, এবং ওষুধ তৈরির প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে পার্থক্য টানা শুরু হয়ে গেল এবং এগুলিকে নতুন করে ব্যবস্থাপনা করা করার উদ্যম নেওয়া হল। ওয়েস্টমিনিস্টারে প্রথম ধর্ম বিযুক্ত পেশা স্বীকৃত হল আইন ব্যবস্থাটি১৫। চার্চ এবং যাজক নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষাদান তখনও পর্যন্ত চার্চের নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে পারে নি।

ষোড়শ শতে ব্রিটেনে কোম্পানি অব বার্বার সার্জেন এবং রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসাবিদ্যায় পেশাদারি ব্যবস্থা চালু করা যায় নি। প্রথমটির ১৭৪৫ সালে নতুন নামকরণ হয় কোম্পানি অব সার্জেন। নরসুন্দর পেশা থেকে শল্য চিকিতসকেদের পেশা আলাদা করা হল। ওষুধ তৈরি করা প্রযুক্তিবিদেরা নিজেদের ফসল বিক্রি করার মানুষদের থেকে আলাদা করে নিজেদের চিকিৎক হিসেবে দাবি জানালেন দুটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার চরিত্র থেকে এবং কিছুটা চিকিৎসেকেদের সঙ্গে জুড়ে সহকারী হয়ে থাকার জন্য। লন্ডনের সোসাইটি অব এপোথেকারি চিকিতসাশিক্ষায় নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার এবং শিক্ষা দানের ব্যবস্থা গড়ে তুলল। অষ্টাদশ শতের শেষের দিকে ওষুধ তৈরি করার প্রযুক্তিবিদেরা ড্রাগিস্ট তকমা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের ফার্মেসির সঙ্গে যুক্ত রাখবে ঠিক করল।

ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের শুরু থেকে জমিদারদের পুত্ররা চার্চ বা সেনাবাহিনীকে জীবিকা হিসেবে খুব একটা পছন্দ করত না। এছাড়াও তিনটি উন্মুক্ত(লিবারেল) পেশা ছিল – ডিভিনিটি, ফিজিক্স এবং ল। এই যে কোন পেশায় প্রবেশের একমাত্র ছাড়পত্র ছিল জ্ঞানী(লার্নেড) মানুষ হওয়া, উন্মুক্ত শিক্ষা। বলা হল ভদ্রলোকের (জেন্টলমেন) শিক্ষা, ব্যবসায়ী বা আর্টিজানদের নয়১৭।

তখনও এই পেশাগুলির ধাত্রী চার্চ। চার্চ দান দেওয়া বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করত। পেশাদারদের জলপানি মিলত চার্চের মাধ্যমেই। ডিভিনিটি, ফিজিক্স এবং ল – এই তিন পেশা ভিত্তি করে উনবিংশ শতকে পেশার পরিবর্তন ঘটতে থাকল। ভারতে চিকিৎসাবিদ্যাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আর্মি মেডিক্যাল সার্ভিসেসের মাধ্যমে জুড়ে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা সেনাবাহিনীতেই চাকরি পেতেন।

উনবিংশ শতকে প্রযুক্তি ভিত্তি করে পেশাদারদের সংখ্যা, দক্ষতা এবং সংগঠনের বিকাশ ঘটল। এই বিকশিত পেশাদারদের জন্য শিক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষণ সাফল্য জরুরি শর্ত হয়ে দাঁড়াল। এই পেশাদারেরা নিজেদের সংঘবদ্ধ করে তাদের অর্জিত গুণগত দক্ষতা বিক্রি করতে শুরু করলেন। এদের বাজার হল অভিজাত জমিদার এবং শিল্পোদ্যোগীরা। উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ সমাজে চিকিৎসক এবং যন্ত্রবিদেরা কর্তৃত্ব করতেন। তারা দক্ষ অদক্ষ, পেশাদার এবং হাতুড়ের মধ্যে লক্ষ্মণরেখা টেনে দিলেন। ১৮৫৮ সালের মেডিক্যাল এক্ট অনুসারে চিকিৎসকেরা পেশাদারিত্বে প্রবেশ করলেন, এর আগে এই স্বাধীকার ভোগ করতেন একমাত্র আইনবিদেরা। ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাবিদ্যা পেশা হিসেবে নেওয়া প্রশিক্ষিত চিকিতসকেদের পঞ্জীকরণের জন্য জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল(জিএমসি) তৈরি হল।
(চলবে)

Saturday, March 4, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৪- উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

চতুর্থ অধ্যায়
বাংলায় সাম্রাজ্যবাদ এবং চিকিৎসা - পেশাদারিত্বের উদ্যোগ
অনুন্নত দেশগুলিতে পেশাগুলির সামাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয়ই না বলা চলে। অধিকাংশ সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত পুস্তক মূলত উন্নত দেশগুলির বাস্তবতা অনুসারী এবং সেগুলিকে কোনভাবেই অনুন্নত দেশের প্রেক্ষিতে ফেলা যায় না। সাধারণভাবে পেশাদার বলতে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে বোঝা হয় যে এইটি গণতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছল ভবিষ্যতের অন্যতম পাথেয়১। এই তত্ত্ব অনুন্নত দেশেও প্রযোজ্য হচ্ছে – উদাহরণস্বরূপ ভারতবর্ষেও, যেখানে পেশাদারিত্বে উন্নতিরই সুযোগ নেই। এই অবস্থার দুটি কারন জেফ্রি২ নির্দেশ করেছেন – ভারতে রাষ্ট্রের সর্ব্যব্যাপী হাত এবং সাম্রাজ্যবাদী ভারতে সামাজিকভাবে নিশ্চুপ থাকা।
পেশাকে আমরা কাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি, পেশার সঙ্গে জুড়ে থাকা কর্মক্ষেত্রের স্বায়ত্ত্ববোধ, রাষ্ট্রের মদতে পেশাদারদের কাজের একচেটিয়াকরণ, গোষ্ঠীবদ্ধতার নীতিমালা, শিক্ষণের সময়াবধি এবং উন্নততর সম্মান এবং স্তরে যাওয়ার ধারণা এবং বাস্তব অবস্থাগুলি। যে দুটি তত্ত্ব থেকে আমরা পেশাদারিত্বের এই সংজ্ঞায় পৌছেছি, সেগুলি হল প্রথমত কারসান্ডার্স, উইলসন এবং পার্সনস পেশাদারিত্ব মূলভাব খুঁজতে নানান ধরণের রেণু(ট্রেট) বর্ণনা করেছেন৪। জনসন একে বলছেন পেশাদারিত্বের রেণু তত্ত্ব(মডেল)।

গায়ারমাতি৬, জনসন৭, ফ্রিডসন অন্যভাবে বিষয়টাকে দেখেছেন। তারা বলছেন এটি বিশেষাধিকারের স্তর – যা পেশাদারেরা অর্জন করার চেষ্টা করছেন বা ইতোমধ্যে করে ফেলেছেন – সেটির জন্য প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য জীবিকার উপাদান ব্যবহার করা। দুটি তত্ত্বের মধ্যে বৈসাদৃশ্য নজরে পড়ার মত। জেফ্রি বলছেন প্রথম তত্ত্বটিতে একচেটিয়াকরণ এবং স্বায়ত্ত্বশাসনের বোধ মোটামুটি নির্ভর করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ এবং গোষ্ঠীগত দৃষ্টিভঙ্গীতে, আর দ্বিতীয়টিতে এগুলিকে ব্যবহার করা হয় পেশার একচেটিয়াকরণের উদ্দেশ্যে। অন্যভাবে বলতে গেলে, দ্বিতীয়টিতে একচেটিয়া করণের উদ্দেশ্যে নানান ধরণের কেরামতির পথ বার করা হয় আর প্রথম তত্ত্বে একচেটিয়া এবং গোষ্ঠীবদ্ধতা লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়, ধরে নেওয়া হয়, তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই জুড়ে রয়েছে।
পারসনস পেশাকে সংজ্ঞায়িত করছেন কিছু কাজের সমষ্টি হিসেবে, যেগুলি সেই পেশাদার ব্যবহার ক’রে সাধারণভাবে সমাজে মূল্য যোগ করে এবং এই কর্মগুলি সম্পাদনা করে সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে জীবন নির্বাহ করে। কোন এক পেশার সদস্য, সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিবেদিত হয়ে, বেশ কিছু নীতিমালা অবলম্বন করে প্রচুর সংখ্যক মানুষের কাছে তার পেশার দক্ষতা বিক্রি করে। এর অর্থ হল, কোন এক পেশার এক সাধারণ পেশাদার বিধিবদ্ধভাবে পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনার শর্তে মনে হয়, যারা এই পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে একমাত্র তারাই এই পেশায় প্রবেশলাভের সুযোগ অর্জন করবে১০। পারসন ব্যবসা এবং পেশার মধ্যে একটা লক্ষ্মণরেখা টেনেছেন, শিল্পনির্ভর সমাজে ব্যবসা এবং পেশা প্রায় একই ধরণের, কিন্তু পেশাদারেরা সাধারণত ব্যক্তি কেন্দ্রিক না হয়ে সমষ্টিগতরূপ ধারণ করে। এই রূপ নিশ্চিত করে যে, সে বিজ্ঞান নির্ভর হয়ে মানব সভ্যতায় সেবা দান করবে১১।

পশ্চিমি সমাজে স্বনিযুক্ত পেশাদারদের সংঘ তৈরি করা পেশাদারির একমাত্র শর্ত বা এই ধরণের প্রবণতা কোন কালেই ছিল না। উনবিংশ শতকের পূর্বে এই শব্দ দ্বারা চার্চ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের বোঝাত। বিংশ শতকে পেশাদার বলতে বোঝাত সমাজ-কর্মী নয়ত বা শহর পরিকল্পক। এরই সঙ্গে পরম্পরার পেশায় চাকরির পদমর্যাদা অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল।

প্রাণ্ডি এবং অন্যান্যরা উনবিংশ শতকে পেশাদারদের বাড়বৃদ্ধি এবং পেশাদারিত্বের শর্তের পরিবর্তনের প্রসঙ্গে বলছেন, বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে নিজের দক্ষতাকে বিক্রি করার চরিত্র পেশাদারিত্বের একমাত্র শর্ত হয়ে দাঁড়াল না। তারা বলছেন উনবিংশ এবং বিংশ শতকে ব্রিটেনে পেশাদারদের সংঘ তৈরি করা, স্বধিকার বা ব্যক্তিগতভাবে পেশার দক্ষতা পসার(বা বিক্রি) পেশাদারিত্বের একমাত্র চরিত্র হয়ে রইল না, বরং রাষ্ট্রের সবলহাত অবলম্বন করে এবং রাষ্ট্রের অনুজ্ঞায় একচেটিয়া পসার তৈরি করাই পেশাদারদের একমাত্র চেষ্টা হয়ে দাঁড়াল১৩।

উনিবিংশ শতকের শুরুর দিকে পেশাদারিত্বের দিক থেকে দেখতে গেলে দেশজ চিকিৎসা চরম পেশাদারিত্বের রূপ পেয়েছিল। কাজের পরিস্থিতি স্বাধিকারপূর্ণ ছিল, সে সময়ের যাজক এবং শাসকদের দেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা ছিল, এবং চিকিৎসায় তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সেবা করা। একই সঙ্গে টোলে দু বছর ধরে যে সব চিকিতসা বিষয়ক পাঠ পড়াশোনা হত, সেগুলি সফলভাবে শেষ করে ছাত্ররা চিকিৎসক রূপে কাজ করতে পারতেন। শেষ কথা হল অন্যান্য সমপেশাদারদের তুলনায় সমাজে চিকিতকদের বিপুল সম্মান ছিল এবং এটি চরম পেশাদারিত্বের মোড়কে আচ্ছাদিত ছিল।
(চলবে)

Friday, March 3, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৩ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

তৃতীয় অধ্যায়ের পাঠসূত্র
বি ডি বসু, হিস্ট্রি অব এডুকেশন আন্ডার দ্য রুল অব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
ডি জি ক্রফোর্ড, আ হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসঃ ১৬০০-১৯১৩
আর জেফ্রি, হেলথ আন্ড দ্য স্টেটস ইন ইন্ডিয়া
সেন্টিনারি ভলিউম অব মেডিক্যাল কলেজ
ডবলিউ সি বি ইটওয়েল, অন দ্য রাইজ এন্ড প্রোগ্রেস অব র্র‍্যাশনাল মেডিক্যাল এডুকেশন ইন বেঙ্গল
কে সি সর্বাধিকারী, দ্য আর্লি ডেজ অব ফার্স্ট মেডিক্যাল কলেজ ইন ইন্ডিয়া
ঐ, ওয়েস্টার্ন মেডিক্যাল এডুকেশন ডিউরিং দ্য আর্লি ডেজ অব ব্রিটিশ অকুপেশন
ডি আর্নল্ড, মেডিক্যাল প্রায়োরিটিজ এন্ড প্রাক্টিশ ইন নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
বি জ্যাকসন, ফ্রম পাপিরি টু ফার্মাকোপিয়া
এল জি ম্যাথিউস, হিস্ট্রি অব ফার্মাসি ইন ব্রিটেন
আর এন চোপরা, ইন্ডিজেনাস ড্রাগ অব ইন্ডিয়া – দেয়ার মেডিক্যাল অ্যান্ড ইকনমিক্যাল আস্পেক্টস
ইউ সি দত্ত, দ্য মেটিরিয়া মেডিকা অব দ্য হিন্দুজ
এম সি কোমান, রিপোর্ট অন দ্য ইনভেস্টিগেশন অব ইন্ডিজেনাস ড্রাগস
বি গুপ্ত, ইন্ডিজেনাস মেডিসিন ইন নাইন্টিন্থ এন্ড টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল
ডবলিউ ব্রিকন, দ্য ড্রাগ মেকার্স
জে সি ঘোষ, ইন্ডিজেনাস ড্রাগস অব ইন্ডিয়াঃ দেয়ার কাল্টিভেশন এন্ড ম্যানুফ্যাকচার
(চলবে)