Sunday, March 5, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৫ - উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

দেশিয় চিকিৎসায় বিরুদ্ধতা আসে নি পশ্চিমি ব্যক্তিগত চিকিতসকেদের থেকে বরং সেটি এসেছিল সরকারি চাকরি করা পশ্চিমি চিকিতসকেদের থেকে। উনবিংশ শতকের ভারতে চিকিতসকেদের স্বাতন্ত্র ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণটাই হল সরকারি চাকরি করা। এই সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাকরিদাতা হিসেবে পেশাদারদের থেকে তার শ্রমটা কিনছে।

সে সময়ের ভারতের চিকিৎসাপরিকাঠামো সে সময়ের ব্রিটেনে অনুসৃত নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল এবং খুব জোরদার রূপে ছিল। উনবিংশ শতকে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পা রাখছে, সেই সময় ব্রিটেনে পেশাদারিত্বের সূচনা এবং বৃদ্ধি ঘটছে। এই সময়ে চিকিৎসক, আইন ব্যবসায়ী, স্থপতি, হিসাবরক্ষা এবং যন্ত্রবিদদের মত পেশায় পরিবর্তন ঘটছিল মারাত্মক রকমের। ভারতে চিকিতসকেদের পেশাদারিত্ব ছিল ঔপনিবেশিক চরিত্রানুযায়ী প্রকল্প, এবং ব্রিটেন নিজেদের শিল্পসমাজের নীতিগুলি উন্নতিশীল সমাজে চাপিয়ে দিল জোর করে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি মধ্যযুগে চিকিৎসা ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা স্থায়ী এবং পেশাদার ছিলেন সেটি নানান পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় দ্রুত বিকাশ ঘটছিল। এই সময়ে ব্রিটেনে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে, ব্রিটেনের চার্চ দেশের সম্পদ আর বিত্ত আর ব্যক্তিগত উদ্যমের বিপুল অংশ দখল নেয়। মধ্যযুগের শেষে চার্চের চিকিৎসক, যাদের নাম ছিল ফ্রায়ার্স, চার্চের বাইরেও অসুস্থদের চিকিতসা করা শুরু করেন। তবে মধ্যযুগের শেষের দিকে যাজকদের প্রতি ঘৃণায় মঠ সম্বন্ধীয় আচার আচরণ ভেঙ্গে পড়তে থাকে। ১৫৩৬ থেকে ১৫৩৯ এর মধ্যে অষ্টম হেনরি মঠগুলি তুলে দেন। তবে চার্চের সঙ্গে চিকিৎসক, আইনজীবি, স্থপতি, সচিব, রাষ্ট্রদূত আর শিক্ষকদের জোরদার সম্পর্ক তৈরি হয়। দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতের মধ্যের সময়ে যাজকদের চিকিৎসা এবং আইন ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ধর্মের বহিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক, শল্যচিকিতসক, এবং ওষুধ তৈরির প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে পার্থক্য টানা শুরু হয়ে গেল এবং এগুলিকে নতুন করে ব্যবস্থাপনা করা করার উদ্যম নেওয়া হল। ওয়েস্টমিনিস্টারে প্রথম ধর্ম বিযুক্ত পেশা স্বীকৃত হল আইন ব্যবস্থাটি১৫। চার্চ এবং যাজক নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষাদান তখনও পর্যন্ত চার্চের নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে পারে নি।

ষোড়শ শতে ব্রিটেনে কোম্পানি অব বার্বার সার্জেন এবং রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসাবিদ্যায় পেশাদারি ব্যবস্থা চালু করা যায় নি। প্রথমটির ১৭৪৫ সালে নতুন নামকরণ হয় কোম্পানি অব সার্জেন। নরসুন্দর পেশা থেকে শল্য চিকিতসকেদের পেশা আলাদা করা হল। ওষুধ তৈরি করা প্রযুক্তিবিদেরা নিজেদের ফসল বিক্রি করার মানুষদের থেকে আলাদা করে নিজেদের চিকিৎক হিসেবে দাবি জানালেন দুটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার চরিত্র থেকে এবং কিছুটা চিকিৎসেকেদের সঙ্গে জুড়ে সহকারী হয়ে থাকার জন্য। লন্ডনের সোসাইটি অব এপোথেকারি চিকিতসাশিক্ষায় নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার এবং শিক্ষা দানের ব্যবস্থা গড়ে তুলল। অষ্টাদশ শতের শেষের দিকে ওষুধ তৈরি করার প্রযুক্তিবিদেরা ড্রাগিস্ট তকমা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের ফার্মেসির সঙ্গে যুক্ত রাখবে ঠিক করল।

ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের শুরু থেকে জমিদারদের পুত্ররা চার্চ বা সেনাবাহিনীকে জীবিকা হিসেবে খুব একটা পছন্দ করত না। এছাড়াও তিনটি উন্মুক্ত(লিবারেল) পেশা ছিল – ডিভিনিটি, ফিজিক্স এবং ল। এই যে কোন পেশায় প্রবেশের একমাত্র ছাড়পত্র ছিল জ্ঞানী(লার্নেড) মানুষ হওয়া, উন্মুক্ত শিক্ষা। বলা হল ভদ্রলোকের (জেন্টলমেন) শিক্ষা, ব্যবসায়ী বা আর্টিজানদের নয়১৭।

তখনও এই পেশাগুলির ধাত্রী চার্চ। চার্চ দান দেওয়া বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করত। পেশাদারদের জলপানি মিলত চার্চের মাধ্যমেই। ডিভিনিটি, ফিজিক্স এবং ল – এই তিন পেশা ভিত্তি করে উনবিংশ শতকে পেশার পরিবর্তন ঘটতে থাকল। ভারতে চিকিৎসাবিদ্যাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আর্মি মেডিক্যাল সার্ভিসেসের মাধ্যমে জুড়ে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা সেনাবাহিনীতেই চাকরি পেতেন।

উনবিংশ শতকে প্রযুক্তি ভিত্তি করে পেশাদারদের সংখ্যা, দক্ষতা এবং সংগঠনের বিকাশ ঘটল। এই বিকশিত পেশাদারদের জন্য শিক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষণ সাফল্য জরুরি শর্ত হয়ে দাঁড়াল। এই পেশাদারেরা নিজেদের সংঘবদ্ধ করে তাদের অর্জিত গুণগত দক্ষতা বিক্রি করতে শুরু করলেন। এদের বাজার হল অভিজাত জমিদার এবং শিল্পোদ্যোগীরা। উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ সমাজে চিকিৎসক এবং যন্ত্রবিদেরা কর্তৃত্ব করতেন। তারা দক্ষ অদক্ষ, পেশাদার এবং হাতুড়ের মধ্যে লক্ষ্মণরেখা টেনে দিলেন। ১৮৫৮ সালের মেডিক্যাল এক্ট অনুসারে চিকিৎসকেরা পেশাদারিত্বে প্রবেশ করলেন, এর আগে এই স্বাধীকার ভোগ করতেন একমাত্র আইনবিদেরা। ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাবিদ্যা পেশা হিসেবে নেওয়া প্রশিক্ষিত চিকিতসকেদের পঞ্জীকরণের জন্য জেনারেল মেডিক্যাল কাউন্সিল(জিএমসি) তৈরি হল।
(চলবে)

No comments: