Showing posts with label মন্বন্তর. Show all posts
Showing posts with label মন্বন্তর. Show all posts

Wednesday, June 26, 2013

ব্রিটিশ সময়ে মন্বন্তর না গণহত্যা - একটি হিসেব

যে সব ব্রিটিশ আজ সাম্রাজ্যের ফলাফলে গর্বিত তাদের অবস্থান আমরা এই পোড়া উপনিবেশউত্তর-ভারতের সামান্য প্রজা হয়েও বুঝতে পারি। নানান কুকর্মে দুষ্কর্মে জড়িত দেশি পূর্বজদের পাশে দাঁড়াবার একটা স্বাভাবিক দেশি প্রণোদনা থাকে, সে বোঝার দায় বয়ে বেড়ানোর উত্সাহ অনেক ব্রিটেনবাসীরই হয়। কিন্তু স্বাধীণ দেশের ভারতীয়রা, যাদের আর ব্রিটেন থেকে সামান্য কিছু পাউন্ডের খুদকুঁড়ো আর কিছু সরকারি খেতাব ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই, তাদের আজও ঔপনিবেশিক ব্রিটেনের কুকর্মগুলির পাশে দাঁড়ানোর অর্থ সাধারণ যুক্তিবদ্ধ কারনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ব্রিটিশ ব্যতীত ভারতের উন্নতি হওয়া অসম্ভব ছিল যাদের মত, তাদের নতুন করে জানানোযাক, লুঠেরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উত্তরাধিকার সূত্রে মোগলদের তৈরি করা ভারতের সেচ ব্যবস্থাকে বিনিয়োগ না করে ধংস করেছে, ধংস করেছে ভারত সমাজের প্রাণ কেন্দ্র, একেরপরএক পুকুর, বিড়ম্বনাজনকশর্তে পুঁজি এনে আর ভারতের সাধারণ রায়তদের করের অর্থে বছরেরপরবছর ক্ষতিতে রেল চালিয়ে ভারতের কাঁচামাল আর টন টন ভারতীয় শষ্য ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষমারা রেলপথ তৈরি করেছে, রেল রাস্তার আশে পাশের অঞ্চলে মন্বন্তর ঘটেছে শয়ে শয়ে, আর রেলরাস্তা তৈরি করতে আর বাঁচাতে, সম্পদ লুঠ করতে রেলপথের পাশে বড়বড় বাঁধ আর রাস্তা তৈরি করে বাঙলা তথা ভারতের হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত স্বাভাবিক, অবশিষ্টতম সেচ ব্যবস্থাও ধংস হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর আত্মজবনী আত্মচরিতএ বলছেন, ১৯২২ সালের উত্তরবঙ্গ বন্যা সম্বন্ধে বলা যেতে পারে যে, যদি গ্রামবাসীর প্রর্থনা গ্রাহ্য করা হইত, তাহা হইলে এই বন্যা নিবারিত হইতে পারিত, ইন্ততঃপক্ষে ইহার প্রকোপ খুবই হ্রাস পাইত। ...বন্যা হইবার এক বত্সর পূর্বে গ্রামবাসীরা রেলওয়ে বাঁধ সম্পর্কে গবর্ণমেন্টের নিকট দরখাস্ত করিয়াছিল। দরখাস্তকারিগণ অজ্ঞ গ্রামবাসী, কিন্তু এ কথা তাহারা বেশ বুঝিতে পারিয়ছিল যে, যদি রেলওয়ে বাঁধের সঙ্কীর্ণ কলভার্টগুলির পরিবর্তে চওড়া সেতু করিবার ব্যবস্থা না হয়, তবে তাহাদিগকে সর্বদাই বন্যার বিপত্তি সহ্য করিতে হইবে। কিন্তু কার্যতঃ ঠিক ইহাই ঘটিয়াছিল। আসল কথা এই যে, বিদেশী অংশীদারদের স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া রেলওয়ে রাস্তা ও বাঁধগুলি তৈরী করা হয়। খরচা যত কম হইবে, অংশীদারদের লাভের অঙ্কও তত বেশী হইবে। এই কারনে রেলপথ নির্মাণ করিবার সময় বহু পরিসর এত কম করা হয় যাহাতে সঙ্কীর্ণ কালভার্ট দ্বারাই কাজ চলিতে পারে। আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯২২ সালের ২১শে নবেম্বর তারিখে রেলওয়ে বাঁধই যে দেশের সর্বনাশের কারন এই প্রসঙ্গে সম্পাদকীয় মন্তব্যে লিখিয়াছিলেনঃ- রেলওয়ে লাইনই যে উত্তরবঙ্গের লোকেদের অশেষ দুঃখ-দুর্দশর কারন এ বিষয়ে আমরা কয়েকটি প্রবন্ধ ইতিপূর্বে লিখিয়াছি। আমদীঘি ও নসরতপুর অঞ্চলের(সান্তাহারের উত্তরে দুইটি রেলওয়ে স্টেশন) গ্রামবাসীরা, বগুড়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মার্ফত্ রেলওয়ে এজেন্টের নিকট দরখাস্ত করে যে, পূর্বোক্ত দুইটি স্টেশনের মধ্যে রেলওয়ে লাইনে সঙ্কীর্ণ কলভার্টের পরিবর্তে চওড়া সেতু করা হোক, তাহা হইলে প্রবল বর্ষার পর উচ্চভূমি হইতে যে জলপ্রবাহ, তাহা বাহির হইবার পথ পাইবে। ইহার উত্তরে রেলওয়ে এজেন্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিম্নলিখিত পত্র লিখেনঃ- মহাশয়, আপনার ১৯২১ সালের ২৫শে এপ্রিল তারিখের পত্র পাইলাম। উহার সঙ্গে উমিরুদ্দীন জেদ্দার এবং আমদীঘি ও তন্নিকটবর্তী গ্রামসমূহের অধিবাসীগণের যে দরখাস্ত আপনি পাঠইয়ছেন, তাহাতে এই আবেদন করা হইয়াছে যে আমদীঘি ও নসরতপুর ষ্টেশনের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করা হউক। তদুত্তরে আমি জানাইতেছি যে, যথাযোগ্য তদন্তের পর আমরা এই সিদ্ধান্ত করিয়াছি যে, উক্ত স্থনে সেতু নির্মাণের কেন প্রয়োজন নাই। এবং স্বাধীণতার পর এ ধরণের অত্যাচার অনাচার রোখা যাবে এধরণের ভাবনা নিয়ে স্বাধীণতা আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন বহু মানুষ। স্বাধীণতার পর যে কী হয়েছে, কত মানুষ তথাকথিত উন্নয়ণের জোয়ারে উচ্ছেদ হয়েছেন, তা আজ আর নতুন করে বলার নেই।
একদা যখন ভারত আর রাশিয়া বিশ্বে খাদ্যশষ্য রপ্তানির প্রধানতম দেশ ছিল, সে সময় বাঙলা তথা ভারতে মন্বন্তরে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারাগিয়েছে- সহজ ভাষায় বললে ব্রিটিশদের লোভ লালসায় খুন হয়েছে। বাল মুকুন্দ ভাটিয়া, ফেমিন ইন ইন্ডিয়াতে বলছেন, ১৮০০র আগের মন্বন্তরে মারাগিয়েছে মেটামুটি তিরিশ লাখ(৭৬ ধরে কি?)। ১৮০০ থেকে ১৮২৫এর মধ্য পাঁচটিতে খুব কম (দশলাখ), ১৮৫০-৭৫এ ছয়টি কম(পঞ্চাশ লাখ), ১৮৭৬-১৯০০ পর্যন্ত মোটামুটি (সাড়ে ছকোটি) মানুষ মারা গিয়েছে, মারা গিয়েছে খুব আলতো শব্দ হল, বলা দরকার ছিল ব্রিটিশরা ঠান্ডামাথায় মন্বন্তর ঘটিয়ে গণত্যা ঘটিয়েছে। এত মানুষকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য খুন করার উত্তরে ম্যানচেস্টারের মিল মালিকদের আফসোস ছিল ভারতে তাদের বস্ত্র পণ্যের বাজার শেষ হয়ে যাওয়ার।
ব্রিটিশ শাসনের আগে যেসব মহামারী ঘটেছে তার বিশদ তালিকা
কবে                            স্থান                                         কারণ
একাদশ শতাব্দ(দুটি)       স্থানীয়                                      অনাবৃষ্টি
ত্রয়োদশ শতাব্দ(একটা)    দিল্লিতে                                     কারণ জানা য়ায় না  
চতুর্দশ শতকে(তিনটে)     স্থানীয়                                      যুদ্ধের জন্য শষ্যহানি
পঞ্চদ শতকে(দুটি)          ঐ                                           ঐ
ষোড়শ শতাব্দ(তিনটি)      ঐ                                           অনাবৃষ্টি
সপ্তদশ শতাব্দ(তিনটি)      সর্বত্র                                       অরাজকতা
অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথমার্ধ(চারটে)                                      স্থানীয়         অনাবৃষ্টি

এবার ব্রিটিশ শাসনে যে সব মন্বন্তর ঘটেছে তার বিশদ
১৭৬৯-৭০           ছিয়াত্তরের মন্বন্তর- বাঙলা সুবা         ইংরেজদের খাদ্যসশ্যের ব্যবসা, অনাবৃষ্টি, বাঙলায় এককোটি, বিহারে অন্ততঃ তিরিশ লক্ষেরও বেশি মানুষকে না খেতে দিয়ে মন্বন্তর ঘটিয়ে হত্যাকন্ড করেছে ব্রিটিশ রাজ
১৭৮৩                মাদ্রাজ, বোম্বাই                           মৃত কত আজও হিসেব চলছে
১৭৮৪                উত্তর ভারত                               ঐ
১৭৯২                মাদ্রাজ, হায়দারাবাদ, বোম্বাই           ঐ
                        দাক্ষিণাত্য, গুজরাট, মারোয়াড়
১৮০২                বোম্বাই                                     ঐ
১৮০৩-৪            উত্তরপশ্চিম সামান্ত প্রদেশ, রাজপুতানা ঐ
১৮০৫-০৭           মাদ্রাজ                                     ঐ
১৮১১-১৪           ঐ                                           সামান্য
১৮১২-১৩           রাজপুতানা পাঞ্জাব                       ২০ লক্ষ
১৮২৩                মাদ্রাজ                                     কত কেউ জানেনা
১৮২৪-২৫           বোম্বাই, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত           ঐ
১৮৩৩-৩৫          উত্তর মাদ্রাজ, বোম্বাই                    ঐ
১৮৩৭-৩৮          উত্তর ভারত                               ১০ লক্ষ
১৮৫৪                মাদ্রাজ                                     কত কেউ জানেনা
১৮৬০-৬১           উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পাঞ্জাব            ৫ লক্ষ
১৮৬৫-৬৬           ওড়িশার ৬টা জেলা, বিহার ও
                        উত্তরবঙ্গ, মাদ্রাজ                         ১,৩০,০০০ ১,৩৫,০০০, ৪,৫০,০০০,
১৮৬৮-৬৯          রাজপুতানা                                ১২ লক্ষ ৫০ হাজার
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ             ৬ লক্ষ
                        পাঞ্জাব                                      ৬ লক্ষ
                        মধ্যভারত                                 ২,৬০,০০০
                        মুম্বাই                                       কত কেউ জানেনা
১৮৭৩-৭৪          বাঙলা, বিহার, অযোধ্যা,
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত                      ঐ
১৮৭৬-৭৭           বেম্বাই                                      ৯ লক্ষ
                        হায়দারাবাদ                                ৭০ হাজার
                        মাদ্রাজ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত          
                        আর অযোধ্যা                              ৮২,৫০,০০০
                        মহীশূর                                     ১১,০০,০০০
১৮৮০                দাক্ষিণাত্য, দক্ষিণ বোম্বাই,
                        মধ্যপ্রদেশ, হায়দারাবাদ,
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত                      অজ্ঞাত
১৮৮৪                বাঙলা, বিহার, ছোটনাগপুর,
                        মাদ্রাজের কয়েকটি জেলা,              অজ্ঞাত
১৮৮৬-৮৭          মধ্যভারত                                 অজ্ঞাত
১৮৮৮-৮৯          বিহার, ওড়িশা, গঞ্জাম
                        মাদ্রাজ, কুমায়ুন, গাড়োয়াল            ১৫ লক্ষ
১৮৯১-৯২           মাদ্রাজ, বোম্বাই, দাক্ষিণাত্য, বাঙলা   ১৬ লক্ষ ২০ হাজার
১৮৯৫-৯৭           বুন্দেলখন্ড, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত      
                        বাঙলা, অযোধ্যা, মধ্যভারত            ৫৬,৫০,০০০
১৮৯৯-১৯০০       ভারতের সর্বত্র                            ২৫ লক্ষ
১৯০১                গুজরাট, দাক্ষিণাত্য, বোম্বাই
                        কর্ণাটক, মাদ্রাজ, পাঞ্জাবের দক্ষিণ    ৭,০৫,০০০
অমর্ত্য সেন বন্দিত গণতন্ত্রিক ব্রিটিশ সরকারের হিসেবে ১৮৫৪ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ভারতে দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮৮ লক্ষ ২৫ হাজার। এগুলি শুধুই সংখ্যামাত্র। এ আগে কত ঘটেছে শুধু অনুমান করাযায়মাত্র। ভারতে রেলপথ সৃষ্টির সঙ্গে দুর্ভিক্ষের সরাসরি সম্পর্কটি চোখে আঙুলদেওয়া। কিন্তু খুব একটা প্রকাশ্যে আসে নি আজও। বাল মুকুন্দ ভাতিয়া ছাড়া ঐতিহাসিকদের আজও নজর পড়েনি এই রেললাইন সৃষ্ট মন্বন্তরগুলিতে। ১৮০২ থেকে ১৮৫৪ পর্ষন্ত ভারতে মোট ১৩টি দুর্ভিক্ষ হয়েছে আর কোম্পানি সরকারের হিসেবে মৃত্যু ঘটেছে মাত্র ৫০ লক্ষের কাছাকাছি কোনও  একটা সংখ্যা। অথচ রেলপথ পাতার পরে, ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত ভারতে ঘটেছে ১৬টা বড় মন্বন্তর আর তাতে মারা গিয়েছেন ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। এটিও সদাশয় ব্রিটিশ সরকারের তৈরি হিসেব। আদত হিসেব কত কেউ জানেনা।

Wednesday, April 24, 2013

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা৩ - loot, railway, famine, genocide in colonial india3


অবাধ রপ্তানির ফলে দামও অবাধে বেড়েচলে। তার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।  টাকার দাম কমিয়ে দেওয়া হোল(অবমূল্যায়ন)। ব্রিটিশদের ভারতীয় শস্য কেনা আরও সস্তা হয়ে গেল। আরও পরিহাসের কথা, যে রেলপথটি তৈরিই হয়েছিল মন্বন্তর রোখার জন্য সেতো মন্বন্তর রুখলই না, বরং যে স্টেশনের নামে রেলপথ, সেই নাগপুরেই ১৮৯৬-৯৭র মাঝামাঝি নাগাদ খাদ্যশস্যর জন্য দাঙ্গা হল। পাশের রাজ্য ডুঙগারগঢ়ে শাস্তির হুমকি আর সেনা নামিয়ে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়। এই রেলপথেরই পাশে সাগর জেলায় ঊল্টো পুরাণ- ১৮৬৫-৯৫ পর্যন্ত জনসংখ্যা বাড়ল ১৮ শতাংশ, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ল ৪৮ শতাংশ, রেলযোগে গম রপ্তানির পরিমাণ, ১৮৮৭-৯৭, এই এক দশকে, ৪০,০০০ মণ থেকে ৭,৫৮,০০০ মণে গিয়ে পৌঁছল। 
মন্বন্তর ফান্ডের সুযোগ পাওয়া অন্য রেলপথটি কী করল দেখা যাক। ইন্ডিয়ান মিডলাণ্ড রেলওয়ে কোম্পানির ঘাড়ে চেপে বোম্বাইয়ের গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ে(জিআইপিআর) নিজেদের রেলপথ এলাকা আরও বিস্তারলাভ করাবার সুযোগ পেল।  দুটি রেল কোম্পানির পরিচালন ব্যব্যস্থা প্রায় সমান সমান। ফলে জিআইপিআর, মিডলাণ্ডকে দখলে নিল। ভারতে রেল ব্যবসার জিআইপিআরএর প্রধান প্রতিযোগী ইস্ট ইণ্ডিয়ান রেলওয়ে। কোম্পানিটি বেসরকারি কিন্তু সরকারি মদত পুষ্ট। সরকারের গ্যারান্টি তার রয়েছে। ১৮৭০এ রেলের জাতীয়করণ হাওয়ার সময় ইণ্ডিয়া অফিস জিআইপিআরএর শেয়ার কেনেনি। ফলে পরের ২৫ বছর রেলপথটির রোজগার, ভারত সরকারের সামনে, উপভোগ করেছে জিআইপিআরএর অংশিদারেরা। ফেমিন কমিশনের সামনে সাক্ষীরা বলেছেন, মন্বন্তরের সময় জিআইপিআর অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করেছে। তার জন্য কমিশন জিআইপিআরকে সমালোচনাও করেছে। এতদিন যে জিআইপিআরএর ডাইরেকটরেরা ৫ শতাংশ গ্যারান্টি ভোগ করে এসেছে, তারাই, মিডলাণ্ড কোম্পানির ঘাড়ে চেপে ফেমিণ ফাণ্ডএর সুযোগ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল।
অন্যদিকে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের জাতীয়করণএর গুনাগার দিল ভারতীয় করদাতারা। ইআইআরএর অংশীদারদের সরকারকে দিতে হল মূলের ওপর ৩০ শতাংশ বেশী এছাড়াও বছরে বছরে লভ্যাংশএর অংশীদারি।  ১৮৮০র ফেমীন কমিশনের প্রধান স্যর রিচার্ড স্ট্রাচি, রেল কোম্পানিটির প্রধান মনোনীত হয়ে বছরে বছরে বিশাল অংশ এন্যুইটি, বার্ষিক রোজগার অর্জন করেন। আমলা হিসেবে চাকরি করে যে পেনসনের খুদকুঁড়ো অর্জন করেছেন, তার তুলনায় এই এন্যুইটির পরিমান প্রায় পাহাড় প্রমাণ। স্ট্রাচির ইআইআরএর দায়িত্ব ছিল খাদ্যশস্য বিতরণের। বেঙ্গল নাগপুর রেলপথের সঙ্গে মিলে তারা খাদ্যশস্যএর সঙ্গে কয়লার ব্যবসা শুরু করে। তবে স্ট্রাচি বলেন, তার কোম্পানি, লন্ডনের ফেমিন রিলিফ চ্যারিটিতে বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ করে নি।
রেল কোম্পানিতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগও হয়েছে। আসামের বেশ কিছু অলাভজনক বেসরকারি রেল প্রকল্পে সরকারি গ্যারান্টি যোগাড় করেন স্ট্রাচি। আসাম বাঙলা রেলওয়ে তৈরি হয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যাবহার, আসামে খাদ্য বিতরণ আর বার্মায় সেনা পাঠানোর জন্য। রমেশ দত্ত একে সব থেকে খারাপ পুঁজিবাদী পরিকল্পনাগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে রাখার কথা বলেন। কার্জন একে মন্বন্তর, সামরিক পরিকল্পনা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সুচতুর ককটেল হিসেবে মন্তব্য করেন। এই প্রকল্পটিতে ভারতের করদাতাদের ৯ মিলিয়ন(তৈরির খরচ ৫ মিলিয়ন) ডলার খরচ হয়। এই রেলপথ তৈরিতে সবথেকে বেশি লাভ করেছেন ব্রিটেনের কারখানা মালিক আর ভারতের ফড়েরা। তিনি বলছেন ব্রিটেন থেকে যত পরিমাণ রেল যন্ত্রাংশ এসেছে, তার তুলনায় সেচের সরঞ্জাম এসেছে বিন্দুবৎ। এছাড়াও সাম্রাজ্যের পরিচালকরাও সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ভারত সচিব, পরে প্রধানমন্ত্রী, সলিসবেরি ব্রাডফোর্ডে ১৮৭৬-৭৮এর মন্বন্তরের সময়, এক সভায় বলেন, ভারতে সেচ ব্যবস্থা বিনিয়োগ করার অর্থ গরীব অর্থ করদাতাদের ওপর আরও বেশী কর আর খরচের বোঝা চাপানো। ফলে দারিদ্র আরও বৃদ্ধি পাবে। উল্টোদিকে তিনি এত কঠিন কথা রেল বাজেট তৈরির সময় বলেন নি। বরং তিনি ভারতের কৃষকদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তারা বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন না করে খাদ্য শস্য উৎপাদন করুক যাতে কৃষক মহাজনের শোষণের হাত থেকে মুক্তি পায়। এবং তিনি বলেন কৃষকের কাছে এটি একটি বীমাও বটে। অথচ মন্বন্তর রোখার নামে ভারতীয় রেল তৈরি করেছে ফড়ে, মহাজন, বাণিজ্য চাষ এবং শস্য বণিকদের। এমনকি ম্যানচেস্টারের মিলমালিক এবং কোয়েকার দর্শনে বিশ্বাসী জন ব্রাইট ১৮৭৭এ বলছেন মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেই, মন্বন্তরে ভোগা লাখো লাখো কৃষক উপকৃত হতে পারত। ঠিক এর আগের বছরে ব্রিটিশ উপনিবেশ রেলে ১৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও সেচে বিনিয়োগ হয়েছে ২০ মিলিয়ন ডলার।
রেলে বিনিয়োগ এই ধারণা থেকে করা হয়েছে যে, ভারতের মন্বন্তর খাদ্যশস্যের অপ্রতুলতার দরুন হয় নি, হয়েছে এলাকায় খাদ্য শস্য না পাওয়া যাওয়ার জন্য। ফলে ভারতে খাদ্যশস্যের চলাচল হওয়া ভীষণ জরুরী। তার জন্য রেল। ভারতীয় রেলের এক প্রাক্তন পরামর্শদাতা, হোরেশ বেল এই সাম্রাজ্য তত্ত্ব খারিজের জন্য কোমর বাঁধেন। তিনি ১৮৯৮এর ফেমিন কমিশনের তথ্য তুলে বলছেন, সাম্রাজ্যে ১৮৯৬-৯৭তে ১৮-১৯ মিলিয়ন টনের মতো খাদ্য শস্যের অভাব রয়েছে। মন দিয়ে খুঁজলে ১৮৯৮-১৯০০র মন্বন্তরে হয়ত আরও বেশী ঘাটতির খবর পাওয়া যেতেপারে।
মন্বন্তর রুখতে সরকারের প্রয়োজন ছিল আরও বেশী খাদ্য শস্য আমদানি করা। শুধু রেল তৈরি করে অথবা দাম নিয়ন্ত্রণ করে মন্বন্তর রোখা সম্ভব নয়। আর মন্বন্তরে দান শস্যর দাম বেশী হলেও স্থানীয় শস্য ব্যাবসায়ীরা এই শস্য নিয়ে ব্যবসা করতে পারেন নি, কেনোনা, প্রায় সবই বিদেশে চড়া দামে রপ্তানি হয়ে যাচ্ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একমাত্র বার্মাতেই মন্বন্তরে ভর্তুকির দামে খাবার দেওয়ার  সুযোগ ছিল। কিন্তু খাদ্যশস্যের দাম আর পরিবহন খরচের দরুন সেটা হয়ে ওঠে নি। বার্মার রেলে আকাশ ছোঁয়া ভর্তুকি দিয়েও খাদ্য দ্রব্যের দাম কমিয়ে রাখা যায় নি। অন্যভাবে বললে, মন্বন্তরে লাভ করে, ফুলে ফেঁপে উঠেছে রেল কোম্পানিগুলো। ১৮৯৬-৯৭ সালের মন্বন্তরে মেইকটিলা-মিনগিয়ান রেলপথ, বর্মার মন্বন্তর বরাদ্দের ৯৫ শতাংশ খাদ্যসশ্য রপ্তানি করে। বার্মার প্রশাসকেরা এই রেলজালের মাধ্যমে ইউরোপে আরও বেশি দামে গম পাঠাতে সুরু করেন। বার্মা রেলওয়ে কম্পানির জন্য সস্তার শ্রমিক, আরও লাভের গ্যারান্টি আর মন্বন্তর ভর্তুকি দিয়েও কোম্পানির লাভ বাড়লেও জনগণের মন্বন্তরের কবলে পড়ে।
সরকারি মদতে, করদাতাদের অর্থে তৈরি হয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা এই রেল কোম্পানিগুলো, মন্বন্তরের সময়, মন্বন্তর এলাকাগুলোয় সস্তার খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে ব্যার্থ হয়েছে। গম পরিবহনএর শুল্ক বেশ চড়া ছিল, বিশেষ করে আমেরিকারমত যেসব দেশে গম রপ্তানি হয়েছে, তার তুলনায়। রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কমিশন সস্তায়, প্রতি মাইলে ২৫ পেনি শুল্কে গম পরিবহনের জন্য আমেরিকার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানায়। ভারতের শুল্ক এর তুলনায় অনেক বেশি ছিল, বিশেষ করে জিআইপিআর অথবা ইআইআর রেলপথে। সরকারি প্রচেষ্টায় পরিবহন শুল্ক কমলেও তাও আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি। আর এই পরিবহন ব্যাবস্থায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের সংখ্যা বাড়ায় খরচও বেড়ে চলে।
 ১৮৭৫-১৯১৪ সময়ে ১ কোটি ৬০ লক্ষ ভারতীয় মন্বন্তরের কবলে পড়ে মারা যান। অন্যভাবে বললে তাদের খুন করা হয়, এটি আসলে গণহত্যাই। মন্বন্তর বলা আসলে ভাবের ঘরে চুরি। ব্রিটিশ অর্থ ব্যবস্থাকে মন্বন্তরের ছোঁয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল ইন্ডিয়া অফিস মারফৎ, যাতে তৃতীয় দুনিয়ার এসব খারাপ সারাপ ব্যাপারে তাদের নাম উঠে না আসে। ১৮৯৬-৯৭ এবং ১৮৯৯-১৯০০ অর্থবর্ষে ব্রিটেন, ইন্ডিয়া অফিসকে মন্বন্তরের জন্য দান দিতে চাইলেও ভারত সরকার সেই দান নিতে অস্বীকার করে। বিদেশী বা ভারতের কোনও মন্বন্তর সাহায্য নেওয়া হয় নি। অথচ, মন্বন্তর রোখার অর্থ বিনিয়োগ করে ভারত জুড়ে রেল সংযোগ বেড়ে চললেও, সেই কোম্পানিগুলো মন্বন্তর রোখার কাজে বিন্দুমাত্র সাহায্য করে নি, বরং প্রকোপ বাড়াবার কাজ করেছে। দ্বিতীয়বারের জন্য রেল কোম্পানিগুলোকে অর্থ সাহায্য করার সময়, ভারত সরকার রেল আমলাদের মন্বন্তর তৈরির জন্য বিন্দুমাত্র দায়ি করে নি, এবং যে তিনটি ফামিন কমিশন তৈরি হয়, তারাও রেল আমলাদের প্রশ্ন করে নি।
সাম্রাজ্য মনে করত ভারতএর জনগন নিজেদের দোষেই মারাযাচ্ছে। এই ঘটনায় ব্রিটেনএর বিন্দুমাত্র হাত নেই। ভারতের জনঘনত্ব এই মন্বন্তরগুলোর জন্য দায়ি, এরকম এক ধারনা ইউরোপ ছড়িয়ে ছিল। যেমন, ম্যালথাসবাদী ভাইসরয় লিটন। তিনি মনে করতেন ভারতই তার দুর্দশার জন্য দায়ি, The population of this country is still almost wholly dependent upon agriculture. It is a population which, in some parts of India, under the security for life which are the general consequence of British rule, has a tendency to increase more rapidly than the food it raises from the soil.
ভারতের বিশিল্পায়নের অন্যতম কারবারি, উপনিবেশিক রেল ভারতের জনগণকে আরও বেশি জমির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ১৮৯৮-১৯০০র পরে অনেক বেশি বিনিয়োগ সেচ ব্যাবস্থায় বরাদ্দ হয়। কিন্তু রেল কোম্পানিগুলোকে আরও সাহায্যের নীতি আরও বেশি আঁকড়ে ধরছিল, যার লাভ সুদে আসলে উসুল করেছে কোম্পানিগুলোর লন্ডনের বোর্ড সদস্য আর অংশিদারেরা। এ ছাড়াও লাভ করেছেন শস্য ব্যাবসায়ী, মজুতদার, মহাজনেরমত মধ্যসত্তভোগীরা। 

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা২ - loot, railway, famine, genocide in colonial india2


ব্রিটিশরা বরাবরই বোঝাবার চেষ্টা করেছে, মন্বন্তর রুখতে রেলপথ দাওয়াইয়ের জুড়ি নেই। দাদাভাই নৌরজী এই তত্ত্ব সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। জুল্যান্দ দানভারস, ভারত অফিসের পাব্লিক ওয়ার্কস দপ্তরের সদস্য, নৌরজিকে এক চিঠি লিখে বলেন, রেলের দরুন নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, দানা শস্যের দাম বাড়ছে। তিনি পরিসংখ্যানের হিসেব দেখিয়ে বলেন, এই বাড়তি দাম ভারতের জাতীয় আয় বাড়াতে সাহায্য করছে। এই পরিসংখ্যানের যাদুবিদ্যাকে নস্যাৎ করে নৌরোজী বলেন, if the mere movement of produce can add to the existing wealth, India can become rich in no time. All it would have to do is to go on moving its produce continually.. .the magic wheels of the train wealth will go on springing till the land will not suffice to hold it. বাজার অর্থনীতির সূত্রে জাতীয় আয় বাড়ার সংবাদের মরীচিকায় ক্ষমতার কাছে থাকা অর্থনীতিবিদের দেহে রক্ত চলাচল বাড়তে পারে, কিন্তু সাধারণের আয় আরও কমে, ফড়েদের আর শিল্পপতিদের ব্যাঙ্ক ব্যাল্যান্স বাড়ায় সেই তত্ত্ব সাধারণ মানুষ জানে।
তবুও রেলকথা শেষ হয় না। ভাইসরয়এর পাবলিক একাউন্টস কমিটির সদস্য স্যর থিওডর হোপ, ১৮৮০র দশকে ভারতীয় করদাতাদের অর্থকে আরও কাজে লাগাতে অতি উতসাহে রেলপথে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এলেন। তিনি রেলকে মন্বন্তর(না গণহত্যা)এর সমাধান আর সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে দেখলেন। হোপ, লুই ম্যালে(Louis Mallet), এবং হোপএর গুরু ইভিলিন বারিং(Evelyn Baring) মন্বন্তরের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের অর্থ সম্পদ, সরকারের দেওয়া আর্থিক নিরাপত্তার চাদরে মোড়া রেল কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগের কথা বলেন। কয়েকটি কেন্দ্রিয় প্রদেশ উনবিংশ শতকের শেষ দিকে মন্বন্তরে প্রায় উজাড় হয়ে যেতে বসে। ১৮৮৬তে লন্ডনের ষ্টক বাজারে দ্য বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের ষ্টক ছাড়া হয়। অংশিদেরেরা সরকারের গ্যারান্টি পেলেন এবং কর্তৃপক্ষ ভারতীয় করদাতাদের অর্থে তৈরি মন্বন্তর নিরোধের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের সাহায্য পেলেন। ১৮৭৮এ রক্ষণশীল ভাইসরয়, লর্ড লিটন, এই চ্যারিটেবল ফেমিন ফান্ড স্থাপন করেন। এর উদেশ্য ছিল যারা এই ফান্ড থেকে সাহায্য পেলেন তারা মন্বন্তরে সাহায্য করবেন। গরীব চাষিদের থেকে বাধ্যতামুলকভাবে খাজনা নেওয়া হয়।
১৮৮৫তে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বাবা, ভারত সচিব, রান্দলফ চার্চিল(ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার – গবেষকরা বলেন যারাই ভারত সচিব হয়েছেন তাদের অধিকাংশই বদমাশ কম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার, রথসচাইলড পরিবারের অনুগত, চার্চিলরা বংশপরম্পরায় ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার ছিলেন, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড ১৯৯৭তে পরিপুর্ণ সরকারি ব্যাঙ্ক হিসেবে গন্য হল), এই ফান্ড, বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে আর ইন্ডিয়ান মিডল্যাণ্ড রেলওয়ে কোম্পানিতে বন্ড আর ডিভিডেন্ডে বিনিয়োগ করেন। বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে রথসচাইলড পরিবারের(বকলমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবথেকে বড় অংশিদার। বিশ্বেন্দুর লেখা বদমাশ কোম্পানি দেখতে পারেন) উদ্যম। উনবিংশ শতকের প্রকল্পগুলি ধরলে, এই একটিমাত্র প্রকল্প, যেটিতে সবথেকে বেশী পরিমান সম্পদ বিনিয়োগ হয়েছে। এই প্রকল্পে বিভিন্ন রেল মালিক, প্রাক্তন সরকারি আমলা, পার্লামেন্টের সদস্য বিনিয়োগ করে। তবে মন্বন্তরএর জন্য সরিয়ে রাখা অর্থ ভুল ব্যাবহারের জন্য অন্য দুই প্রধান সাম্রাজ্য পুরুষ ভাইসরয় কার্জন এবং ভারত সচিব লর্ড হামিলতন চার্চিলএর সমালোচনা করেন।
১৮৯০তে রেলপথ তৈরি সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ধরে নেওয়া হোল এই কেন্দ্রিয় অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। আর সবথেকে বড় কথা মন্বন্তর রোখা যাবে। ব্যাবসার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল কিনা তা না বলা গেলেও, বিভিন্ন শুল্ক, কর আর খাজনার পরিমান যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, ১৮৯৮এর ফেমিন কমিশনের সাক্ষ্যতে বহু মানুষ উল্লেখ করেছেন। রেলওয়ে সবথেকে বড়ও যে কাজটি করেছিল সেটি হল এই অঞ্চলগুলো থেকে খাদ্যশস্যএর ব্যাপক হারে বিদেশে রপ্তানি হওয়া। খাদ্য শস্যর দাম ৫০ থেকে ১০০ গুণ বাড়ল। সম্বলপুরের মত এলাকায় এত দাম বাড়ে যে সাধারণ মানুষের চাল-গমও কেনার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু শস্য রপ্তানি বন্ধ হয় নি বরং মন্বন্তরের সময় সেই পরিমান বেড়েছে। অথচ বেঙ্গল নাগপুর লাইন তৈরি হয়েছিল মন্বন্তর রোধ করার জন্য। সেই লাইন অবলম্বন করে মন্বন্তর এলাকাগুলো থেকে শস্য রপ্তানি হচ্ছে অবাধে, মুক্ত বাণিজ্যের বন্ধু সরকার সেই চেষ্টায় বাধা দেয় নি।
যদিও গবেষকেদের আজও ধারনা রয়েছে ভারত সরকার ভারতের জনগণের জন্য কাজ করতে বাধ্য। কেন ধারনা করেছিলেন কে জানে! স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে(বা পরেও ঘোমটা পালটালেও চরিত্র যে পাল্টায় নি তাতো দেখাই যাচ্ছে) যে সরকার তাকে ভুলে ভারত সরকার বলা হত ঠিকই, কিন্তু তার সত্যিকারের কাজ ছিল ব্রিটেনের স্বার্থ দেখা। সে কেন ভারতের জনগণের স্বার্থ দেখবে? ভারত সরকারতো কথার কথামাত্র।

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা১ - loot, railway, famine, genocide in colonial india1

ভারতবর্ষে ১৯০বছরের রাজত্ব চালাতে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একটি পেনিও খরচ করে নি। সাম্রাজ্যের নীতি ছিল, শুধু ভারতের প্রশাসনএর খরচ তোলাই নয়, ব্রিটেনে হোয়াইটহল চালানো, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগএর খরচ, বিশাল সেনাবাহিনী পুষে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ চালানো, লুঠের সম্পদে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব এবং সেই দৈত্যসম কারখানাগুলোতে অপরিসীম পরিমানে কাঁচামাল সরবরাহ করা এবং সেই কাঁচামাল ব্যাবহার করে যে উতপন্ন দ্রব্য তৈরি হবে, তাকে আবার উপনিবেশের বাজারে এনে বিক্রি করার পরিকাঠামো তৈরির খরচ বহন করবে ভারতেরমত প্রধান উপনিবেশগুলি। এবং সেই জন্য ভারতে লুঠের ফলে অর্জিত বিপুল বিনিয়োগে বিস্তৃত রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা, ব্রিটিশের ধ্রুপদী উপনিবেশিক অর্থনীতির অন্যতম অঙ্গ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবথেকে বড়ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রকল্প।

১৯১৪ পর্যন্ত ভারতে রেল রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের অর্থ ১৭৫৭ থেকে ভারত লুঠের অর্থে সঞ্চিত হয়েছে। ১৮৬৯ পর্যন্ত ভারতেড় রেল প্রকল্পগুলোতে ব্রিটিশ গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার ব্যাবস্থা হয়েছে। ফলে ভারতে রেল তৈরির খরচ কমে যায়। ১৮৭০এ দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধ আর ভারতে একেরপর এক মন্বন্তর ঘটার ফলে সরকারি খরচ আকাশ ছোঁয়। ভারত সরকার রেলপথ তৈরিতে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় দুটো কারনে ১) সেনাচলাচল ২) কাঁচামাল ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া আর তৈরি দ্রব্য ভারতের বাজারে এনে সস্তায় বিক্রি করা।
কিন্তু আজও ভারতে ব্রিটিশ রেলপথ কুখ্যাত হয়ে থাকবে মন্বন্তর তৈরির কারন হিসেবে। তীর্থঙ্কর রায় বলছেন ১৮৭৬-৭৮, ১৮৯৬-৯৭ এবং ১৮৯৯-১৯০০ এই তিন সময়েড় মন্বন্তরে ভারতে খুব কম করে ১ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৬০ লক্ষ হতভাগ্য মানুষ মারাগিয়েছিল। আমরা বলছি তাদের খুন করা হয়েছিল। এইগুলিকে আজ গণহত্যা বলতে হবে। পার্লামেন্টের মন্বন্তর কমিশনের সামনে নানান সাক্ষ্য এবং তথ্য প্রদানের পরে, রেলপথ তৈরি হয়েছে ভারতের উন্নতির জন্য, সেই মিথ্যে-মিথটি প্রথম ভাঙল। সেই প্রথম বোঝাগেল, রেলপথ কিভাবে ব্রিটিশ কারখানাগুলির জন্য ভারতের কৃষি উৎপাদন নির্বিচারে ব্রিটেনের জন্য রপ্তানি করছে যাতে ৪০ বছর ব্রিটেনে মন্বন্তরের অবস্থা তৈরি না হয়। ভারতজুড়ে শস্যদানার কৃত্রিম অভাব তৈরি হয়েছে। এই অভাব এলাকায় শস্যদানার দাম বাড়িয়ে সাধারনের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছে। রেল পরিবহন আর রেলরাস্তার পাশে তৈরি টেলিগ্রাফ লাইনের দরুন কোথায় সস্তায় শস্যদানা পাওয়া যাচ্ছে আর কোথায় দাম বেশী, সেই খবর বিদ্যুৎ গতিতে পৌঁছে যাচ্ছে ফড়েদের কানে। ফলে নিত্যদিন নতুন নতুন মন্বন্তর এলাকা তৈরি হচ্ছে রেলপথের পাশের গ্রামগুলোয়। আর শস্যে মড়ক লাগলেতো কোথাই নেই। কমিশনের সামনে বহু ভারতীয় রেলপথের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা বলছেন রেল বিশ্বজুড়ে ভারতীয় ভাল আর গমের চাহিদা তৈরি করেছে, কিন্তু ভারতে উৎপাদন খুব একটা বাড়ে নি। ফড়েরা রেলপথ আর টেলিগ্রাফের মদতে, ভারতজুড়ে, কম দামের শস্য বেশি দামের অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার একটা অস্বাভাবিক দামী শস্যবাজার  তৈরি করে।
১৮৭৭এর মাদ্রাজ মন্বন্তরে দানাশস্যর দাম ৫ থেকে ৮ গুণ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য শস্য কেনার ক্ষমতা সাধারনের হাতের বাইরে চলেযায়। আরও অস্বাভাবিক কাণ্ড হল, তখনও কৃষি শ্রমিকদের কাজ ছিল। সেবছরও ভারত অফিস বলে গিয়েছে শস্য সরবরাহ স্বাভাবিক। অথচ ১৮৭৬-৭৮এর সময়ে বোম্বে আর মাদ্রাজ প্রদেশে ২৩টি তালুকে মন্বন্তর শুরু হয়ে গিয়েছে।  ১৮৮০র মন্বন্তর কমিশনার স্যর রিচার্ড স্ত্রাচি মন্বন্তর রুখতে আরও ১০,০০০ মাইলের রেলপথ তৈরি করার প্রস্তাব দেন। এত বড় কথা বলার পেছনে ছোট একটা সুতোর গিঁট রয়ে গিয়েছে। ১৮৭৭এ রিচার্ড স্ত্রাচি ভারতের সবথেক বড় রেল কোম্পানির প্রধান ছিলেন। এর পরে বহু কমিশন বলেছে কেন রেল, মন্বন্তর এলাকাগুলো থেকে তার শস্য পরিবহনের দায়িত্ব পালন করতে পারলনা।  
রমেশ দত্ত বলছেন, যেহেতু সাম্রাজ্যের নীতিই হল ভারতে রেলপথেই সমস্ত বিনিয়োগ করা, সেহেতু, সেচ বা অন্যান্য সামাজিক উদ্যমে বিনিয়োগের পরিমান যথেষ্ট ছিল না। তিনি বলছেন ফাটকা কারবারি আর মিলমালিকদের জন্য তৈরি ১৮৭৮এর পরে তৈরি  রেললাইনগুলো ফাটকা কারবারি আর পুঁজিপতিদের জন্য তৈরি হয়। দানাসশ্যর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় কৃষককে অনেক বেশি পরিমানে খাজনা দিতে হয়। ১৮৯৭র পর রমেশ দত্তর নিদান ছিল বিন্দুমাত্র রেলে বিনিয়োগ না করে মাঠে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। কেননা, রেল তৈরির অজুহাত দেখিয়ে জমির খাজনা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে, ফলে শস্য দানার দাম বেড়েছে। এমনকি গরীব কৃষককে অনেক বেশি কর দিতে হয়েছে। কৃষি উৎপাদন কমায় ছোট শিল্প উতপাদকেদের উৎপাদন কমেছে লক্ষণীয় হারে।

Saturday, April 20, 2013

উপনিবেশ, রেলপথ, মড়ক, মন্বন্তর কিংবা গণহত্যা - colonial india, railways, famine, british genocide

রেল আর রোগ
সালটা ১৮৫৯। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের এক স্থানীয় এনজিনিয়ার কাজের জায়গায় মড়ক লাগা নিয়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে জানান, বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের অধিকাংশ কলেরা মড়কে মারা গিয়েছে - Large masses continued to arrive almost daily, the utmost exertions of the Engineers failed to get together materials for at once hutting them, and a large proportion had no shelter for many days after their arrival and when cholera was raging among them. Kerr, , p 98। সেই সময়ের হিসেব বলছে সেই মড়কে মারাগিয়েছিল হতভাগ্য ৪০০০ কুলি। শুধু কলেরাই নয়, ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, নিউমোনিয়া, পেটখারাপ, ডায়রিয়া, আলসার ইত্যাদিতেও বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। যে সব অঞ্চলে বেশিদিন কাজ হত, সেখানে ৩০ শতাংশের বেশী কুলি মারা গিয়েছে। ১৮৮৮ বেঙ্গাল-নাগপুর রাস্তায় কোনও একটা সময় কোনও একটি ট্রেঞ্চে ২০০০-৩০০০ কুলি মড়কে মারা গিয়েছে। তাদের দেহ চাইতে কেউ আসেনি। রেল রাস্তায় ট্রেঞ্চের ধারেই দেহগুলো গাদা করে ফেলে রেখে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। 
কার তার বই Building the Railways of the Rajএ বলছেন, কুলিদের থাকার ব্যাবস্থা এতই অস্বাস্থ্যকরভাবে করা হত যে এই মৃত্যু খুব একটা আশ্চর্যজনক ছিল না। ঠিকমত থাকার জায়গার অভাব, প্রাতকৃত্য করার অসুবিধে, পানিয় জলের সমস্যার সঙ্গে জুড়ত বৃষ্টি, গরম, ঠাণ্ডার প্রকোপ। ঠিকেদাররা এক লপ্তে কুলিদের বয়ে নিয়ে যেত কাজের এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায়। ফলে মড়ক খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ত। তার আঁচ লাগত স্থানীয় গ্রামগুলোয়। যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেলপথ তৈরি করা হত, তাতে ম্যালেরিয়া হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। ১৯২৭ সালে জনৈক চিকিতসককে ম্যালেরিয়ার উৎস খোঁজার কাজ দেওয়া হয় তিনি ঠিক এই কথাই জানিয়ে ছিলেন(Cutting down hundreds of trees for every mile of railway ties for every mile of trackage laid, left poorly rooted trees nearby open to buffeting by winds which soon toppled them over. These collapses greatly increased the area of thin soil exposed. Blasted during the dry season by the rays of the sun and by torrential downpours during the rains, these laterite-based soils were soon leeched out, forming water-filled cracks and potholes which female mosquitoes intent on laying eggs found irresistible. Watts, Epidemics and History: Disease, Power and Imperialism, p 171.)। আর যেহেতু কাজের ধরণটাই ছিল  যাযাবরী ধরনের, সেহেতু রোগের চলনশীলতাও ছিল বেশ ভালরকমের।
ম্যালেরিয়ায় সব থেকে বেশি মৃত্যু ঘটেছে। রেল পাতার সময় মোটামুটি একটা স্লিপার পিছু একটা মৃত্যু ধরে নেওয়া হত। গ্রেট পেনিন্সুলার রেলওয়ের ঘাট সেকসানে, প্রত্যেক মাইল রেলপথ পাততে প্রয়োজন ছিল ১৭০০ স্লিপারের। ফলে প্রত্যেক মাইল রেল পথ পাততে মৃত্যু হত ১৭০০ শ্রমিকের। এবং এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানর চেস্টাও হয় নি। পরবর্তী কালে ১৮৯৭(২৭৩২ মাইল), ১৮৯৮(২৯৬৩ মাইল) রেল লাইন পাততে আরও সস্তা মন্বন্তরে ভোগা মানুষকে যুতে দেওয়া হয়। মনেরাখতে হবে, সরস্বতী-সিন্ধু সভ্যতা থেকেই কলেরা ছিল। কিন্তু এত ব্যাপক নয়। এবং যদিও কোনও মড়ক লাগত তাও সীমাবদ্ধ ছিল ছোট অঞ্চলে। ঔপনবেশিক সময়ে যেখানেই রেলপথ গিয়েছে তার পেছনে পেছনে ম্যালেরিয়া আর কলেরা গিয়েছে। রেলএর জলাধারে বহুদিন কলেরার জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে। সেই জলেই এলাকা থেকে এলাকায় ছড়িয়ে যেত মড়ক। এই প্রসঙ্গে দুজন লেখকের দুটি উধৃতি তুলে দেওয়া গেল। “Modernising works created serious ‘obstacles’ to water flows, caused river systems to become ‘silted up’ and ‘moribund,’ deprived soils of enriching nutrients and damaged crop yields, drainage and sanitation. Klein, ‘Imperialism, Ecology and Disease: Cholera in India, 1850-1950’, p 512।  While cholera slaughtered millions thus, the British government continued to invest heavily in railways and not much in public health. Watts, Epidemics and History: Disease, Power and Imperialism, 168।

রেলপথ মন্বন্তর বা গণহত্যা
ব্যবসায়ী কৃষি আর রেলরাস্তা পরস্পরের হাট ধরাধরি করে চলেছে। ব্যবসা নির্ভর কৃষি পশুচারনভুমি দখল করে ফলে গ্রামে পশুদের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ফলে ঘাসের দাম বাড়ে। জ্বালানি জোগাড় করতে পশু বেছেদিতে হয়। পশু গোবরের পরিমান হ্রাস পাওয়ায় জমির উরবরাশক্তি হ্রাস ঘটে এবং ভুমিক্ষয় হয়। পুরনো বাঁধ বা ছোট নালায় খরা রুখে দেওয়া যায়। কিন্তু ঔপনিবেশিক সরকার সব বিনিয়োগই রেলপথে করলেন। এই স্বাভাবিক কাণ্ডের ফল মন্বন্তর। এবং কোথাও সরাসরি কোথাও পরোক্ষে রেলরাস্তা এর জন্য দায়ী হয়ে রইল। মুক্ত বানিজ্যের অন্যতম প্রবক্তা ভারত সারকার মন্বন্তরে পড়া মানুষদের সাহায্য করতে অস্বীকার করল। রেলকে ব্যাবহার করে ফড়েদের দানা শস্যের ফাটকা বানিজ্য করার চেস্টা রোখা হল না। কমদামেড় এলাকা থেকে শস্য কিনে বেশি দামের এলাকায় বিক্রি করার চেষ্টায় মদত দিল রেল রাস্তার পাশে টেলিগ্রাফ লাইন। আধুনিক প্রযুক্তি ভারতে গণহত্যা বহন করে এনেছে। অত্যধিক করের হারে ন্যুব্জ কৃষক রেল রাস্তা আর টেলিগ্রাফের জুগলবন্দীতে মন্বন্তরের মুখে এসে পড়ল।
খাদ্য এবং অন্যান্য কৃষি উতপাদন রেলরাস্তা ধরে রপ্তানি হয়ে যেত ব্রিটেনে। ভারতের ১৩ শতাংশ গম ব্রিটেনে রপ্তানি হত। ইংল্যান্ডের আগের বছরের খারাপ চাষের জন্য১৮৯৬তে ব্যাপক হারে কৃষি দ্রব্য রপ্তানি হল। ফলে আবার মন্বন্তর।  ১৮৮৬তে ভারত ব্রিটেনের গম আমদানির ২৩ শতাংশ সরবরাহ করত। হায়দারাবাদের পুতুল রাজন্যকে প্রভাবিত করে জঙ্গলে বা অন্য এলাকায় গমের বদলে ব্যাপকভাবে তুলোর চাষ শুরু হয়, ফলে খাদ্য নিরাপত্তার হানি ঘটল। ধান এবং গমের অধিকাংশ লন্ডনে রপ্তানি হত(The idea that Berar enjoyed immunity from famine was dispelled by the experiences of 1896-97 and 1899-1900. The former year was one of scarcity, amounting to famine in parts of the province, in the latter year the famine was severe, and affected the whole of Berar - Report on the Administration of the Hyderabad Assigned Districts for the Year 1901-02, Residency Government Press, Hyderabad, 1902, para 13.)। বেরার ব্রিটিশের ঘটান মন্বন্তরের একটা ছোট উদাহরণ মাত্র।
আজও শুধু ব্রিটনরাই নয় বহু ভারতীয়ও বিশ্বাস করে নতুন প্রযুক্তি আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের মাহাত্ম্যে। এই সব উপকথা আজ নতুন করে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। 

সুত্রঃ British Imperial Railways in Nineteenth Century South Asia
Laxman D Satya (lsatya_99@yahoo.com) is at the  Department of History, Lock Haven University of Pennsylvania, US.
November 22, 2008, Economic & Political Weekly

Sunday, February 24, 2013

How Noble British Are!!! ক্যামেরনরাজ দয়ালু, তাঁর দয়াতেই খাই শাঁকালু


১৭৬৭ থেকে ১৭৭০ পর্যন্ত প্রায় সেনা নামিয়ে নাটোর থেকে গড় বার্ষিক ২৭ লক্ষ আদায় হয়েছিল। ৭০-৭২এ সাড়ে একুশ লক্ষের বেশি আদায় হল না। নাজিম রেজা খাঁ আর মহারাজ সিতাব রায় রায়তদের ওপর চাপ কমাবার জন্য কোম্পানির কাছে আবেদন করলেন। খাজনাতো কমলই না, বরং আগামী বছরের খাজনা বেড়ে গেল। ১১৭২এ খুনি দেবী সিংহের ইজারা শুরু হয় কয়েক বছর আগে। দেবী সিংহের দারোগারা রায়তদের খাজনা আদায়ের জন্য অসম্ভব অত্যাচার করত। তার অত্যাচারে জমিদারদেরও রক্ষা ছিলনা। অন্তত আটজন জমিদারের জমিদারি খাজনা অনাদাযের অজুহাতে জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। টেপা, মন্থনা আর বামনডাঙার জমিদার মহিলা ছিলেন। জমিদারেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে রাণী ভবানীর অশ্রয়ে আশ্রয় নেন।
সারা ছিয়াত্তর সন ধরে এই দুর্ভিক্ষের প্রকোপ চলেছিল। একবছর ধরে চললেও আদতে এর ভয়াবহতা আর ব্যাপকতা অন্যসব দুর্ভক্ষের ব্যপকতাকে ছাড়িয়ে যায়। দুভিক্ষের সময় ব্যাপক মহামারী দেখা দেয়। রাজধানী মুর্শিদাবাদে মারাত্মক গুটিবসন্ত। অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ পুড়ে মারা যান। দিনাজপুর, পুর্ণিয়ায় শষ্যগোলাও পুড়ে খাক হয়ে যায়। আগুণ লাগলে আগুণ নেভাবার জল পাওয়া যেত না।
কাজের অভাবে আর আয়ের অন্যপথ খোলা না থাকায়, সাধারণ মানুষের খাওয়ার চরিত্র বদলেগেল। চালের বদলে ঘাস আর ফসলের বদলে শেকড় খেত। জেমস স্টুয়ার্ট মিল আর ওয়ারেন হেস্টিংসেরমতে সে সময় বাঙলার এক তৃতীয়াংশ জনগণ, প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যান। এই দুর্ভিক্ষে বাঙলার চিরাচরিত কৃষক সমাজের শিরদাঁড়া বরাবরের জন্য ভেঙে যায়। উইলিয়ম হান্টার বলছেন বাঙলা বিহারের প্রতি ষোলজনের ছজন প্রাণ হারান। কোম্পানির আর্থিক নীতি আমলাদের দুর্ণীতিপরায়ণতাই এই মন্বন্তরের জন্য দায়ি- মুর্শিদাবাদের ফ্রান্সিস সাইকস আর রিচার্ড বিচারের সঙ্গে ক্লাইভের প্রতিষ্ঠিত সোসাইটি ফর ট্রেড বাঙলার দুর্ভিক্ষের জন্য দায় এড়াতে পারে না। রেজা খাঁ দুর্ভক্ষের বছরে মুর্শিদাবাদের শষ্যবোঝাই নৌকো আটক করে কম দামে সেই শষ্য কিনে অসম্ভব বেশি দামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা লাভ করেন। মুর্শিদাবাদ ছাড়া আন্তঃজেলা শস্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।
কোম্পানি সরকার দুর্ভিক্ষের শুরুতে চাল মজুদ করা শুরু করে দেয়। চার্লস গ্রান্টের হিসেবে, সরকার সেনাবাহিনীর জন্য ৬০ হাজারমণ চাল মজুদ করে। কলকাতায় খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে গিয়ে গ্রামীণ বাঙলা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। রাজমহল আর ভাগলপুর সব খাদ্যশস্য মুঙ্গেরের সেনা নিবাসের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এছাড়াও দুর্ভক্ষের বছরে রাজস্ব আরও কড়াকড়ি করে আদায় হয়। সুপারভাইজারেরা আর গোমস্তারা নিজ আর কোম্পানি লাভের জন্য বলপ্রয়োগ করতে শুরু করেন। দুর্ভিক্ষের সময় বাঙলার জনগণ একতৃতীয়াংশ হয়ে পড়ায় সাধারণ রাজস্ব আদায় কম হওয়ার বদলে বেশি আদায়ি হয়। সরকার এই দুর্ভক্ষ রোধে বাঙলা বিহারের তিন কোটি মানুষের জন্য নব্বই হাজার টাকা ব্যয় করে। রেজা খান মুর্শিদাবাদে এক তহবিল তৈরি করেন, কোম্পানি ৪০ হাজার, মুবারক উদদৌল্লা ২৬,৮৯৩ আর রেজা খাঁ দেন ১৯,৬০৭ টাকা। এ তহবিল অপ্রতুল হওয়ায়, আরও ৬৫,১৯৩ টাকা দুর্ভক্ষের জন্য ব্যয় হয়। রেজা খাঁ সাতটি লঙ্গর খোলেন। রাজধানীতে রোজ সাত হাজার লোক লঙ্গরে প্রসাদ পেত। তবুও দুর্ভিক্ষেতে অর্তের পরিত্রাতা হিসাবে যে দুজনকে গ্রামীণ বাঙলা আজও মনে রেখেছে তারা দুজন কেনো রাজপুরুষ নন, একজন মহিলা জমিদার রাণী ভবানী আর অন্যজন অকৃতদার দাতা হাজি মহসিন।