Wednesday, April 24, 2013

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা২ - loot, railway, famine, genocide in colonial india2


ব্রিটিশরা বরাবরই বোঝাবার চেষ্টা করেছে, মন্বন্তর রুখতে রেলপথ দাওয়াইয়ের জুড়ি নেই। দাদাভাই নৌরজী এই তত্ত্ব সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। জুল্যান্দ দানভারস, ভারত অফিসের পাব্লিক ওয়ার্কস দপ্তরের সদস্য, নৌরজিকে এক চিঠি লিখে বলেন, রেলের দরুন নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, দানা শস্যের দাম বাড়ছে। তিনি পরিসংখ্যানের হিসেব দেখিয়ে বলেন, এই বাড়তি দাম ভারতের জাতীয় আয় বাড়াতে সাহায্য করছে। এই পরিসংখ্যানের যাদুবিদ্যাকে নস্যাৎ করে নৌরোজী বলেন, if the mere movement of produce can add to the existing wealth, India can become rich in no time. All it would have to do is to go on moving its produce continually.. .the magic wheels of the train wealth will go on springing till the land will not suffice to hold it. বাজার অর্থনীতির সূত্রে জাতীয় আয় বাড়ার সংবাদের মরীচিকায় ক্ষমতার কাছে থাকা অর্থনীতিবিদের দেহে রক্ত চলাচল বাড়তে পারে, কিন্তু সাধারণের আয় আরও কমে, ফড়েদের আর শিল্পপতিদের ব্যাঙ্ক ব্যাল্যান্স বাড়ায় সেই তত্ত্ব সাধারণ মানুষ জানে।
তবুও রেলকথা শেষ হয় না। ভাইসরয়এর পাবলিক একাউন্টস কমিটির সদস্য স্যর থিওডর হোপ, ১৮৮০র দশকে ভারতীয় করদাতাদের অর্থকে আরও কাজে লাগাতে অতি উতসাহে রেলপথে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এলেন। তিনি রেলকে মন্বন্তর(না গণহত্যা)এর সমাধান আর সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে দেখলেন। হোপ, লুই ম্যালে(Louis Mallet), এবং হোপএর গুরু ইভিলিন বারিং(Evelyn Baring) মন্বন্তরের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের অর্থ সম্পদ, সরকারের দেওয়া আর্থিক নিরাপত্তার চাদরে মোড়া রেল কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগের কথা বলেন। কয়েকটি কেন্দ্রিয় প্রদেশ উনবিংশ শতকের শেষ দিকে মন্বন্তরে প্রায় উজাড় হয়ে যেতে বসে। ১৮৮৬তে লন্ডনের ষ্টক বাজারে দ্য বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের ষ্টক ছাড়া হয়। অংশিদেরেরা সরকারের গ্যারান্টি পেলেন এবং কর্তৃপক্ষ ভারতীয় করদাতাদের অর্থে তৈরি মন্বন্তর নিরোধের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের সাহায্য পেলেন। ১৮৭৮এ রক্ষণশীল ভাইসরয়, লর্ড লিটন, এই চ্যারিটেবল ফেমিন ফান্ড স্থাপন করেন। এর উদেশ্য ছিল যারা এই ফান্ড থেকে সাহায্য পেলেন তারা মন্বন্তরে সাহায্য করবেন। গরীব চাষিদের থেকে বাধ্যতামুলকভাবে খাজনা নেওয়া হয়।
১৮৮৫তে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বাবা, ভারত সচিব, রান্দলফ চার্চিল(ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার – গবেষকরা বলেন যারাই ভারত সচিব হয়েছেন তাদের অধিকাংশই বদমাশ কম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার, রথসচাইলড পরিবারের অনুগত, চার্চিলরা বংশপরম্পরায় ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার ছিলেন, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড ১৯৯৭তে পরিপুর্ণ সরকারি ব্যাঙ্ক হিসেবে গন্য হল), এই ফান্ড, বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে আর ইন্ডিয়ান মিডল্যাণ্ড রেলওয়ে কোম্পানিতে বন্ড আর ডিভিডেন্ডে বিনিয়োগ করেন। বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে রথসচাইলড পরিবারের(বকলমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবথেকে বড় অংশিদার। বিশ্বেন্দুর লেখা বদমাশ কোম্পানি দেখতে পারেন) উদ্যম। উনবিংশ শতকের প্রকল্পগুলি ধরলে, এই একটিমাত্র প্রকল্প, যেটিতে সবথেকে বেশী পরিমান সম্পদ বিনিয়োগ হয়েছে। এই প্রকল্পে বিভিন্ন রেল মালিক, প্রাক্তন সরকারি আমলা, পার্লামেন্টের সদস্য বিনিয়োগ করে। তবে মন্বন্তরএর জন্য সরিয়ে রাখা অর্থ ভুল ব্যাবহারের জন্য অন্য দুই প্রধান সাম্রাজ্য পুরুষ ভাইসরয় কার্জন এবং ভারত সচিব লর্ড হামিলতন চার্চিলএর সমালোচনা করেন।
১৮৯০তে রেলপথ তৈরি সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ধরে নেওয়া হোল এই কেন্দ্রিয় অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে আর সবথেকে বড় কথা মন্বন্তর রোখা যাবে। ব্যাবসার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল কিনা তা না বলা গেলেও, বিভিন্ন শুল্ক, কর আর খাজনার পরিমান যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, ১৮৯৮এর ফেমিন কমিশনের সাক্ষ্যতে বহু মানুষ উল্লেখ করেছেন। রেলওয়ে সবথেকে বড়ও যে কাজটি করেছিল সেটি হল এই অঞ্চলগুলো থেকে খাদ্যশস্যএর ব্যাপক হারে বিদেশে রপ্তানি হওয়া। খাদ্য শস্যর দাম ৫০ থেকে ১০০ গুণ বাড়ল। সম্বলপুরের মত এলাকায় এত দাম বাড়ে যে সাধারণ মানুষের চাল-গমও কেনার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু শস্য রপ্তানি বন্ধ হয় নি বরং মন্বন্তরের সময় সেই পরিমান বেড়েছে। অথচ বেঙ্গল নাগপুর লাইন তৈরি হয়েছিল মন্বন্তর রোধ করার জন্য সেই লাইন অবলম্বন করে মন্বন্তর এলাকাগুলো থেকে শস্য রপ্তানি হচ্ছে অবাধে, মুক্ত বাণিজ্যের বন্ধু সরকার সেই চেষ্টায় বাধা দেয় নি
যদিও গবেষকেদের আজও ধারনা রয়েছে ভারত সরকার ভারতের জনগণের জন্য কাজ করতে বাধ্য। কেন ধারনা করেছিলেন কে জানে! স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে(বা পরেও ঘোমটা পালটালেও চরিত্র যে পাল্টায় নি তাতো দেখাই যাচ্ছে) যে সরকার তাকে ভুলে ভারত সরকার বলা হত ঠিকই, কিন্তু তার সত্যিকারের কাজ ছিল ব্রিটেনের স্বার্থ দেখা। সে কেন ভারতের জনগণের স্বার্থ দেখবে? ভারত সরকারতো কথার কথামাত্র।
Post a Comment