Tuesday, July 26, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের জীবনের কথা মুখ ফুটে বলেন নি। নিজেদের স্মৃতি কথা বলার অভাব এবং প্রথাগত হিসেব বই রাখার অভাবে আমাদের বারবার বিদেশি কোম্পানিগুলির হিসেব খাতার তালিকায় উল্লিখিত নামগুলির ওপর সরাসরি নির্ভর করতে হচ্ছে। এই সূত্র যে সে সময়ের ব্যবসার পরিবেশ খুব ভালভাবে জানান দেয় তা বলা যাবে না কারণ আমরা শুধু নির্ভর করছি তাদের তালিকায় লিখিত নামগুলির ওপরেই। আর কোম্পানির খাতায় তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িদের যে দক্ষতার উল্লেখ পাই, তা যে শুধু ওপর ওপর শুধু নয়, তা পরোক্ষ সূত্রতো বটেই। তবে এই অপ্রতুলতম হাতের পাঁচ সূত্র ধরে কিন্তু আমরা এই অবয়বহীন বণিকদের অস্তিত্বে হাড় মাংস জুড়ে কাশিমবাজারের ব্যবসায়িদের একখণ্ড জীবন ও তাদের কাজকর্মের বয়ান তৈরি করতে সক্ষম হত। তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, যে নাম ধরে আমরা একজন একটি নামধারী মানুষের অবয়ব গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি, সে সময় এটাও মনে রাখা দরকার যে, হয়ত শুধু এই নামেই সে সময় কোন ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব ছিল না – কেননা সাধারণত ব্যবসায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নানান ধরণের কাল্পনিক নাম ব্যবহার করতেন।

এটা মনে রাখা দরকার যে ব্যবসায়ীর কথা আমরা আলোচনা করব এখানে, সেই ব্যবসায়ী কিন্তু তৃণমূলস্তরের পরম্পরার উতপাদক নন। বংশপরম্পরায় তার পরিবার দূরের গ্রামে বা আড়ং থেকে রেশমি বস্ত্র কিনে নিয়ে অবাঙ্গালি, অভারতীয় ব্যবসায়িদের সরবরাহ করার ব্যবসাটাই করছে মন দিয়ে, এবং আমাদের আলোচ্য সময়ে তারা তাদের এই ব্যবসায় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে জুড়ে নিয়েছে। ক্রেতা আর উতপাদকের মধ্যে সংযোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন এই বণিকেরা যাদের ইতিহাসে দাদনি বণিক নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের কাজ ছিল কোম্পানিগুলির সেই বছরের জন্য উদ্দিষ্ট পরিমান বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কিছু বৈচিত্রের নির্দিষ্ট পরিমানে রেশম কাপড় জোগাড়ের সিদ্ধান্তের ওপরে ব্যবসায়ীরা অগ্রিম নিতেন। বাঙ্গালির ব্যবসা পরিবেশে এটা বাংলার নিজস্ব ব্যবসা পদ্ধতি ছিল। সুরাটের বাজারের মত বাংলায় বাজারে গেলেই বিপুল পরিমান তৈরি করে রাখা বস্ত্র পাওয়া যেত না। যে বস্ত্র তৈরি করবে তাঁতি/উতপাদক, প্রত্যেকবার সেই বস্ত্রের দাম ঠিক করা হত অগ্রিমভাবে, দাদনি বণিকদের আনা নমুনা দেখে। এই তথ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে সুরাট যেভাবে ইওরোপিয় ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জুড়েছিল, বাংলা তখনও সেইভাবে জোড়ে নি(সে তার নিজের নিয়মেই ব্যবসা করে গিয়েছে, ব্যবসায়ীর দায় ছিল সে কিভাবে এই ব্যবস্থায় মানিয়ে নেবে তা ঠিক করা - অনুবাদক)।

প্রচুর কঠোর দরকষাকষির পর ঠিক হওয়া দামের অগ্রিম অর্থাৎ দাদন পেয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা সেই অর্থ তাদের অধীনে কাজ করা বিভিন্ন পাইকারদের মধ্যে বেঁটে দিত। পাইকারেরা বাংলার ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গ্রামে তাঁতিদের সেই অগ্রিম দিয়ে আসত। বাংলার উতপাদন এবং ব্যবসার চরিত্র যেহেতু ছিল যথেচ্ছ পয়সা ফেললেই চাহিদামত তৈরি বস্ত্র পাওয়া যেত না, ফলে তাঁতি না অন্যান্য পরম্পরার উতপাদকেরা সাধারণত সুরাটের মত বাংলায় বিন্দুমাত্র(কয়েকটি পেশা যেমন শাঁখারি – যাদের মূলত কাঁচামাল আসত বিদেশ থেকে - অনুবাদক) শহরমুখীন ছিল না, তারা তাদের উতপাদন কেন্দ্রে ডাঁট নিয়ে বসে থাকত, ব্যবসায়দের দায় থাকত তাদের কাছে উতপাদনের অগ্রিম পৌছে দেওয়া।

অগ্রিম পাওয়ার পর তাঁতিরা তাদের কাজ শুরু করত। তবে একটা বিষয় তাদের মানতে হত, সেটা হল, নির্দিষ্ট সময়ে(ইওরোপ থেকে আসা জাহাজ বন্দরে ভেড়ার আগেই) কোম্পানির কুঠিতে তাদের উতপন্ন দ্রব্য পৌঁছে দিয়ে আসতে হত, এবং ব্যবসায়ীরা হিসেবকরে তাদের বাকি অর্থ প্রদান করতেন। যে নমুনা ক্রেতাদের দেখানো হয়েছে, তার তুলনায় যদি গুণমানে কমা বস্ত্র সরবরাহ করত তাঁতিরা, তাহলে তার মূল্য সেই তুলনায় কমে যেত, বা আমরা খাতাপত্র দেখে বুঝতে পারছ কোম্পানি সেই চেষ্টাটাই করত। কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কোম্পানির খাতাপত্র ঘেঁটে রেশম ব্যবসার এই ধারণাটা আমরা পেয়েছি। আমাদের মনে করার কোন কারণ নেই যে, ডাচ বা ফরাসি অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি এই বাস্তবতার রীতিনীতির বাইরে কাজ করতে পারত।

অগ্রিম দেওয়া হত সাধারণভাবে ঠিক হওয়া দামের ৮০%, তবে তা নির্ভর করত কোম্পানির হাতে থাকা বিনিয়োগের পরিমান, রাজনৈতিক অবস্থা এবং আর কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর, এবং ব্রিটিশেরা এই রীতি উল্লঙ্ঘন বোধহয় করতে পারে নি বলেই আমাদের ধারণা। ১৭৩৩ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত কোরা রেশমের যে ব্রিটিশ বিনিয়োগের তালিকা রয়েছে তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি আগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৭৫ থেকে ৮৫% পর্যন্ত। ১৭৩৮এ এটা ছিল ৫৯%, শীতকালীন (নভেম্বরের) উতপাদনের ঠিক হওয়া মোট দামের ওপর। ১৭৫২ সালে এই হার প্রচুর কমে আসে, ব্যবসায়ীর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায়, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা আশংকা করে বেশি অর্থ দাদন দিলে তাদের বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দাদন নির্ভর করত যে সময়ে দরদাম করা হচ্ছে, সে সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর – যেমন হাতে কত বিনিয়োগ করার মত অর্থ রয়েছে, ব্যবসায়ীদের চাহিদা কি, মরশুমে কখন বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইত্যাদির ওপর। ১৭৪০ সালে শীতকালীন(নভেম্বর) উতপাদনে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৯৪-৯৫% পর্যন্ত।
(চলবে)
Post a Comment