Tuesday, July 26, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৬৮৫ কাশিমবাজার ব্যবসাকেন্দ্র(ফ্যাক্টরি) থেকে রেশম বস্ত্রের ব্যবসায় জড়িত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাদনি বণিকের গোষ্ঠীর(কার্টেল) নামের তালিকা পাচ্ছি এবং রেশম কেনার জন্য ১৭৫৪ সালে কোম্পানি এজেন্সি(দাদালি) ব্যবস্থা চালু না করা পর্যন্ত, এই দাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রে এই বণিকেরা দৃঢভাবে অবস্থান করেছে। কোটমা, দত্ত, বিশ্বাস, সুরমা, চৌধুরী, সরকার, কোপ্পারিও, ঠাকুর এবং ঘোষেদের নাম ১৭৫০ পর্যন্ত কোম্পানির দাদনি বণিকের তালিকায় প্রত্যেক বছর ঘোরাফেরা করেছে। ১৬৮৪এর বিনিয়োগের খাতায় যে সব উপাধি(sornem) পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ৫ জন বিশ্বাস, ২ চৌধুরী, ১ জন গস(ঘোষ), ১ জন কপ(রি?), ১ জন সরকার এবং ১ জন দত্ত। ১৭০১ সালে একজন করে ঘোষ, সুরমি এবং কোটমা ব্যবসায়ী কাশিমবাজারে ব্রিটিশ কোম্পানিকে কোরা রেশম সরবরাহ করছে। ১৭৫৪ সালে দাদনি ব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশেরা বেরিয়ে এসে এজেন্সি ব্যবস্থা চালু করবে, সে সময় অন্তত কাশিমবাজারে যে ১৮৬ জন দাদনি বণিকের নাম ব্রিটশদের খাতায় উল্লিখিত হয়েছে, তাদের মধ্যে উপরোক্ত উপাধিগুলির বণিকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।

আমরা জানিনা এই দাদনি বণিকেরা নিজেদের ব্যক্তিগত খাতায় ব্যবসাকার্য চালাতেন কি না। তারা সাধারণত কোম্পানির খাতায় ‘আমাদের ব্যবসায়ী’রূপে প্রতিভাত ছিলেন, একই সঙ্গে ফরাসি, ডাচ এবং ডেন কোম্পানির খাতায় কিন্তু তাদেরই নাম জ্বলজ্বল করছে, এবং এই কোম্পানিগুলির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সূত্র হিসেবে দাদনি বণিকেরা, নিজেদের লাভের গুড় বাড়াতে ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে রেশমের দাম কড়ায়গণ্ডায় বাড়িয়ে নেওয়ার দরকষাকষির সুযোগ পেয়েছে। ব্রিটিশ কোম্পানির খাতায় পাচ্ছি, দাদনি বণিকেরা ব্রিটিশদের খাতায় কাজ করতে করতে, ডাচ, ডেন, সুইড, পর্তুগিজ ইত্যাদি কোম্পানির এমনকি উত্তরভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও ফাঁকতালে ব্যবসা করে নিয়েছে দুপয়সা অতিরিক্ত কামাবার জন্য, যা ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বেআইনি ছিল।

আশ্চর্যের কথা ১৭৫৪র দাদনি ব্যবস্থা চালু থাকা পর্যন্ত ব্রিটিশদের কাশিমবাজারের ব্যবসাকেন্দ্রের বণিকদের নাম লেখা খাতায় একজনও মুসলমান ব্যবসায়ীর নামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি। হয়ত কাশমবাজারের দাদনি বণিকদের মধ্যে একজনও মুসলমান ছিলেন না, হয়ত তারা হুগলি বা পরের দিকে গড়ে উঠতে থাকা কলকাতায় জাহাজে মাল বোঝাই বা খালাসের কাজ করতেন। কিন্তু বেশ কিছু অবাঙ্গালি নাম যেমন কুশলচাঁদ, রতনচাঁদ এবং অন্যান্য রয়েছে কিন্তু তাদের নিয়ে কোন বিশদ বিবরণ নেই, আমরা হয়ত আন্দাজ করতে পারি, ওরা ছিলেন উত্তরভারতের গুজরাট বা রাজস্থানী বণিক, যারা সপ্তদশ শতে বিপুল সংখ্যায় এসে বাংলায় বসবাস করতেন। স্বরূপচাঁদের নাম তালিকায় রয়েছে, তার নামের সঙ্গে বাংলার ব্যাঙ্কার জগতশেঠের নাতি ফতেচাঁদের মিল রয়েছে।
(চলবে)
Post a Comment