Tuesday, July 26, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

যাদের না্ম দেখলে মনে হয় যে তারা হয়ত অবাঙ্গালি কিন্তু তাদের প্রথম নামটি কিন্তু বাঙালিদের মতই, অর্থাৎ তারা বাংলায় থেকে থেকে বাঙালিদের সঙ্গে সামাজিকভাবে কিছুটা হলেও মিলেমিশে গিয়েছেন। কোটামা বা কাটমারা হলেন কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে রেশম ব্যবসায় কাজ করা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী। যতদূর সম্ভব তারা বাংলার বাইরে থেকেই এসেছিলেন। তাদের অনেকের প্রথম নাম বেরুফি, বুলচাঁদ বা কিসেনচাঁদ থাকলেও একজনের নাম ছিল পঞ্চু বা শচী।

আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে অষ্টাদশ শতে এসে কোটমারা বিভিন্ন যায়গায় ঘুরতে ঘুরতে বাংলার কাশিমবাজারের কাছের সৈদাবাদের কাঠনাপাড়ায় থিতু হন। উত্তরভারতীয় এই গোষ্ঠীর বাঙালি সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়ার তত্ত্ব তাদের বংশকুষ্ঠীর তারিখগুলিতেও পড়েছে। জগতশেঠদের উত্তরপুরুষেরা আজ নিজেদের বাঙালি বলেন। যাইহোক তখন যে সব নাম ব্রিটিশদের বিনিয়োগের খাতায় ছিল তাদের উত্তরপুরুষেরা আজও বাংলায় বাস করেন, এরা হলেন, আচার্য, বিশ্বাস, বোস, চৌধুরী, কেয়ট, কবিরাজ, দাস, দে, দত্ত, গৌতম, ঘোষ, মল্লিক, পোদ্দার, পণ্ডিত, সেন, সরকার, শর্মা, সাহু এবং ঠাকুর। আজ এই দাদনি বণিকদের জাতি পরিচয় খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন।

কোথাও কোথাও জাতিবাচক উপাধি সহজে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কোপরি, কোটমা, দে, দাস, গৌতম, মল্লিক, পোদ্দার, পণ্ডিত বা সেন সরাসরি ব্যবসায়িক বা পরম্পরার উতপাদক পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাধি। বোসেরা বোঝা যায় সহজেই কায়স্থা। কেয়ট(কৈবর্ত), চাষী বা জেলে সম্প্রদায়। কবিরাজ উপাধি হয়ত পরম্পরার উতপাদক পরিবারের সঙ্গে আর সেনেরা ব্যবসার সঙ্গে এবং অথবা উতপাদনের সঙ্গে সঙ্গে এই দুটি সম্প্রদায় তাদের প্রাথমিক কাজের সঙ্গে বৈদ্যত্ব ব্যবসাতেও জুড়ে থাকতে পারে। আচার্য, শর্মা এবং ঠাকুর ব্রাহ্মণ, পরম্পরার উতপাদক এবং বিতরক ব্যবসায়ী পরিবারও হতে পারে। বিশ্বাস, চৌধুরী এবং সরকার মুসলমান সময়ের উপাধি, যারা বাংলার ভূমিরাজস্ব আদায়ের কাজে নিযুক্ত থাকত।

ফরাসীরা চৌধুরীদের জমি কেনার কাজে নিযুক্ত করত, বিক্রির কাজে নয়। দিয়ারদানকোর্ট, মাজারাম চৌধুরীকে ১৭২০ সালে ব্যবহার করছেন বড়কুইচিনপুরের জমি কিনতে; গৌরালি কেনা হয় ফরাসি কোম্পানির দেওয়ান গয়াপ্রসাদ চৌধুরীর মার্ফত আর মণিপুর কেনা হয় ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৭৭৩এ বক্সীধর চৌধুরী মার্ফত ৪৫১ টাকায়। এই একই কাজে একই উপাধির মানুষকে ব্যবহারে মনে হয় তারা একই পারিবাক শাখাপ্রশাখার অন্তর্গত ছিলেন।
কোম্পানির দেওয়ান বা দালালের সে যুগে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। বিভিন্ন ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলার রীতিনীতিতে যেহেতু অনভিজ্ঞ, সেহেতু তারা একটি নীতি গ্রহন করে যে, স্থানীয়ভাবে কাজ চালাতে তারা নির্ভর করবে স্থানীয় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের মানুষের ওপর, যাদের স্থানীয় সমাজের নানান বিষয়ের ওপর পকড় অনস্বীকার্য ছিল। ব্রিটিশেরা কাশিমবাজারে কোটমা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল আর ফরাসীরা চৌধুরীদের।

তারা তাদের ব্যবসায়িক সমাজে খুবই প্রভাবশালী ছিল। এই পরিবারের সদস্যরা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িই হতেন, এবং কোম্পানিগুলি এদের ব্যবহার করত স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির প্রভাব খাটানোর বা দরকষাকষির জন্য। দালাল বা প্রধান ব্যবসায়ীকে মাইনে দিয়ে রাখা হত অন্যান্য ব্যবসায়ীর ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য। কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িকে এই কাজে নিযুক্ত করা হত না এই ভয়ে যে, সে হয়ত নিযুক্ত কোম্পানির প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।

দেওয়ান আর ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা রেশম ব্যবসায় তাদের তুঙ্গে থাকা পণ্য সংশ্লিষ্ট দক্ষতাকে ব্যবহার করে তাদের আর্থিক ভবিষ্যত নিশ্চিত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছে এই ব্যবসায়ীরা। ১৭৪৪ সালে ব্রিটিশেরা যখন পরম্পরার রেশম ব্যবসায়ীদের ছেড়ে অন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করা যায় কি না ভাবতে শুরু করেছে, সেই সময় কোম্পানিকে দেওয়া এক প্রায়হুমকিভরা দাবি সনদে এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দাবি করে, যে নতুন ধরণের ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে অনুকূল দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না(তাদের মত দক্ষভাবে), ‘আমরা বাল্যকাল থেকেই রেশম ব্যবসার মধ্যে বেড়ে উঠেছি, আমরা যত শস্তায় দিতে পারব অন্যরা সেই (নিম্নতম)দামে দিতে পারবে না’।

আমরা দেখলাম কাশিমবাজারে দাদনি বণিকদের পরিবেশটাই হল হিন্দু (এখনও অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায় নি), এবং বাঙালি জাতসত্ত্বা আর বাঙালি সমাজউদ্ভুত বণিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত। অধিকাংশ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর, কেউ পরম্পরার উতপাদক কেউবা আবার কুসীদজীবি এমন কি রাজস্ব আদায়েরও ব্যবসায় জড়িত। এখন ব্যবসায়ি এবং সরবরাহকারী হিসেবে আমরা তাদের কাজ বিস্তৃতভাবে নজর দেওয়ার চেষ্টা করব।
(চলবে)
Post a Comment