Thursday, July 14, 2016

দেশিয় শিল্প চর্চা প্রবাহ - গৌরব, গুরুকিঙ্কর, মধুমঙ্গল মালাকার


এই মানুষদের কাজকে কোন দিন ঔপনিবেশিক শহুরে শিল্পকলার জ্ঞানচর্চা খুব বেশি গুরুত্ব দেয় তো নিই, বরং ইওরোপের আদলে ফোক বা লৌকিক শিল্পচর্চা করতে গিয়ে এদের শহুরে জ্ঞানে গরীমায় আন্তর্জাতিক ইংরেজিশিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঠেলে দিয়েছে বেড়ার ওপারে।
ঠিক, তাতে এই মানুষদের কিস্যু আসে যায় নি হাজার হাজার ধরে যেমন, তেমনি আজও। এরা কোন দিন শহুরে শিল্পী, নাটুকে বা সিনেমা করিয়েদের মত সরকারি দাক্ষিণ্য দাবি করেন নি, কোনদিন অভিমানভরা ফোলানো ঠোঁট নিয়ে বলেন নি কেন তাঁদের তথাকথিতভাবে শিল্পীরূপে গণ্য করে এই কমিটি ঐ কমিটিতে নেওয়া হচ্ছে না, বা নাটক করিয়েদের মত দাবি তোলেন নি কেন তথাকথিত জাতীয় শিল্প করার জন্য জমি, কম পয়সায় হল, নাট তৈরির জন্য দান বা নিদেনপক্ষে কিছু হাবিজাবিমার্কা উপাধি দেওয়া হচ্ছে না, বা সমাজপাল্টাতে মন প্রাণ ঢেলে দেওয়া বড় পুঁজির এই যোগ্য সন্তানকে বাংলার মাটিতে শেকড় গজিয়ে ফেলতে ব্যস্ত সিনেমা করিয়েদের মত দাবি করেন নি, কেন তাঁদের বিপ্লবাত্মক সমাজপরিবর্তনের জন্য সিনেমা করার কাজে সরকার কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালছে না।
না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১৪১৭ সালে লোকপ্রসার প্রকল্প নেওয়ার আগে, কিছু গবেষক, কিছু সরকারি আমলা, কিছু প্রগতিশীল রাজনীতির কারবারি এদের নিয়ে দাবা খেলাখেলি করা ছাড়া, কেউ এদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করে নি - স্থায়ীভাবে এদের পিঠে 'লুপ্তপ্রায়' শব্দবন্ধটি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোন শহুরে কোনদিন এই শিল্পগুলিকে সাহস করে বোঝার চেষ্টা না করেন- তাঁদের মাথায় গুঁজে দেওয়া পড়েপাওয়া চৌদ্দআনা ইওরোপিয় সংস্কৃতির চৌহদ্দির বাইরে এসে।
----
আমার ভাগ্যভাল, বঙ্গীয় পারম্পতিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সঙ্ঘে এই মানুষজন জুড়ে নেওয়ার যোগ্য মনে করেছিলেন। গত কাল তাই দেখছিলাম, কি করে কয়েকশ বছরের বাংলার, হ্যাঁ খুব বড়ভাবে বলছি, গ্রাম-বাংলার শেকড়ের মুখে বসে থাকা একটা পরম্পরার পরিবার শিল্প সৃষ্টি করে।
দেখলাম, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, দেখলাম সেই পরিবারের এক প্রজন্ম কি করে এই ভেঙ্গে পড়া হাহুতাশি সময়ে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা, পরম্পরা, তাঁদের মূল্যবোধ, তাঁদের শিল্প ভাবনা চারিয়ে দিয়ে যান পরের প্রজন্মের মধ্যে। দেখলাম আর ঋদ্ধ হয়ে বুঝলাম, গ্রামবাংলা শত ধ্বংস, শত লুঠ, শত ব্যভিচারী তত্ত্বের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে গেলেও কি করে তার মৌলিকতার কুড়টি টিকিয়ে রাখে নিজের মত করে।
ঘটনাটা হল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার একটি দেশ থেকে গরুর মূর্তি তৈরি করে দেখানোর আহ্বান পেয়েছেন মুষ্কিপুরের মালাকার পরিবার। শর্ত, প্রবীন মধুমঙ্গল মালাকার যাবেন - তিনি অর্থ পাবেন। কিন্তু সামান্য মধুদার শর্ত হল, তার অর্থের প্রয়োজন নেই, তার সঙ্গে যেতে দিতে হবে, না তার একমাত্র শিল্পী সন্তান নয়, তার ভাই, গুরুকিঙ্করের সন্তান গৌরবকে।
নিজের চোখে দেখলাম কি করে একটা প্রজন্ম অন্য প্রজন্মকে হাতে ধরে তৈরি করান, পাশে দাঁড়িয়ে নয়, সাধারণ কিছু নির্দেশ দিয়ে। মধুদা তখন তার দোকানে, গৌরব বাড়িতে গরুটি তৈরি করছে - কিন্তু গলাটা ঠিক মত যা সে চাইছে হচ্ছে না - মধুদা দুপুরে এলেন - নিজের হাতে ঐটুকু অংশ দেখিয়ে দিলেন।
এই ঘটনাগুলোর কিছু ছবি তুলে নিয়ে এসেছি - আমার নিশ্চিন্তিভাবটা কিছুটা চারিয়ে দিতে চাইছি কিছু বন্ধুর মধ্যতে যারা আম ইংরেজি শিক্ষিত ইওরোপনম্য শহুরে মানসিকতার বাইরে এসে না দেখা, না জানা, না বোঝা, না পড়া নিজের দেশ, গ্রাম, মানুষ, শিল্পকে বুঝতে চান তাঁদের জন্য।
আবারও বলি আমার ভাগ্য ভাল এই অসামান্য মানুষদের সঙ্গ করতে পেরেছি, তারা কোন বাধা ছাড়াই সযত্নে অশিক্ষিত এই মানুষটিকে তাঁদের কর্মতত্ত্ব বোঝার সুযোগ করে দিয়েছেন।
সেই দীর্ঘদিনধরে সঞ্চিত অমৃতের কিছু ফোঁটা আপনাদের সক্কলের জন্য বেঁটে দেওয়া গেল, গ্রামশিল্পে কোথাও কোন বাধাবন্ধ নেই - সব কিছু বাতাসের মত সূর্যের আলোর মত উন্মুক্ত।
জয় বাংলা!
জয় বাংলার দক্ষতার!
জয় বাংলার জ্ঞান, প্রযুক্তির!
জয় বাংলার পরম্পরার পরিবারগুলোর!
বঙ্গমাতরম!


















Post a Comment