Saturday, July 23, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

অকেশনাল পেপার – সেন্টার অব স্টাডিজ ইন সোসাল সায়েন্সেস, ১০, লেক টেরেস, কলকাতা – ৭০০০০২৯
জুলাই ১৯৮৮
----
এই প্রবন্ধের দুটি উদ্দেশ্য - প্রথমত অষ্টাদশ শতে কাশিমবাজারের রেশম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইওরোপিয় বিশেষ করে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি(সংক্ষেপে কোম্পানি)র তুলনা করা, দ্বিতীয়ত ১৭৫৪ সালে কোম্পানি বাংলার রেশম ব্যবসায় যে এজেন্সি পদ্ধতি প্রচলিত করেছিল তার অবস্থা খুঁজে বার করা।
এই গল্পটির মধ্যমণি একজন দাদনি বণিক। এই বণিকেরা সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতের দাদন(অগ্রিম) দিয়ে ব্যবসা করানোর পদ্ধতির স্রষ্টা। বাংলার এই বণিকেরা ছাড়াও এই পদ্ধতিতে সুরাট, মালাবার এবং করমন্ডল উপকূলের বণিকেরা নিজেরা উতপাদকেদের থেকে নানান দ্রব্য সংগ্রহ করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে ব্যবসা করতেন। এরা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাঙালি ব্যবসায়ীরা সাধারণত গদিতে বসেই(স্টে এট হোম ভ্যারাইটি) ব্যবসা করতেন।
বাঙ্গালির এই চরিত্রের বৈশিষ্টের কতগুলি কারণ থাকতে পারে। আমার মনে হয় এর তিনটি কারণ, ১) ১৫৭৬ পর্যন্ত যে দূরদেশিয় ব্যবসা চলেছিল তার কারণগুলির জন্য, ২) এই সালের পরে বাংলার অর্থনীতি মুঘল অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে যাওয়ায় বাঙালি ব্যবসায়িদের সামনে যে নতুন সুযোগ এসে পড়েছিল, তার জন্য, ৩) বাংলা এবং বাঙ্গালি ব্যবসায়িদের বাজার, দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয় দেশগুলিতে যেসব ঘটনা ঘটে চলছিল, তাতে তাদের সামনে সেই সব দেশের বন্দরগুলি বন্ধ হয়ে যায়।
১) ১৫৭৬এর মুঘল সাম্রাজ্যের বাংলা দখলের পূর্বে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শত পর্যন্ত মোটামুটি ৩১টি রাজা এবং ন্যুনতম চারটি রাজপরিবার বাংলায় রাজত্ব করেছে। এদের কামরূপ, ত্রিপুরা, কামতাপুরি(কোচবিহার) ইত্যাদি রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার মানসিকতায় বাংলার উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব ভারতের সীমান্ত সতত পরিবর্তনশীল হতে থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের ওডিসা রাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই এবং প্রায় একই সঙ্গে পশ্চিম সীমান্তে মিথিলা, জৌনপুর, চম্পারণের মত বাংলার সীমান্তবর্তী রাজ্যেও যুদ্ধের রেশ ছড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের পরিবেশ স্থলপথের ব্যবসার পরিবেশ রক্ষায় সমর্থ হয় নি। এছাড়াও বাংলার পূর্বতম প্রান্তের চট্টগ্রাম বন্দর বারবার হাত বদল হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাংলা, ত্রিপুরা এবং আরাকান এলাকা সংক্রান্ত ব্যবসা মার খেয়েছে। মধ্য ১৫৪০ নাগাদ চট্টগ্রাম এবং পূর্ববঙ্গের বেশকিছু এলাকা আরাকানদের দখলে চলে যায়। গিয়াসুদ্দিন মুহম্মদ পর্তুগিজেদের যে ধরণের সুযোগসুবিধে দেন, তাতে পুর্তুগিজেরা চট্টগ্রামের ওপর দীর্ঘদিন ধরে দখলদারি করতে পেরেছিল।
চট্টগ্রাম দখল করার পরে আরাকানদের রাজধানী এবং বন্দর-শহর মারাউকু(বানানাটা ঠিক লিখলাম তো!)চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসা নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়, ফলে ক্রমশ চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থনৈতিক অবনতি ঘটতে থাকে। মধ্য ষষ্ঠ শতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলার ব্যবসার অভিমুখ কিছুটা হলেও পশ্চিমপানে সরে আসার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। চট্টগ্রাম ছিল যেমন আরাকানদের দখলে, তেমনি ষষ্ঠ শতের শেষের দিকে পিপলি এবং সপ্তগ্রাম মুঘল নিয়ন্ত্রণে ছিল। সপ্তগ্রামের উত্থান এবং ১৫৭৯-৮০তে পেদ্রো তাভারেজকে হুগলি বন্দর তৈরি করতে দেওয়ার আকবরের সনদ দানকে দেখা দরকার উত্তরভারতীয় মুঘল ব্যবসার পরিমণ্ডলের সঙ্গে পূর্বের দিকের ব্যবসার একটা সঙ্গতি স্থাপনের চেষ্টারূপে।
(চলবে)
Post a Comment