Tuesday, July 12, 2016

পরম বস্ত্র সংখ্যা, দ্বিতীয় মঞ্জুষের কিছু ঝাঁপি

বিশ্বায়ন বিরোধী চর্চা
একদা ভারতীয় বস্ত্রর প্রতিবিশ্বায়ন

একদা ইওরোপিয়রা লবঙ্গ, দারচনি এবং জায়ফল ব্যবসার জন্য জীবন ঝুঁকি নিয়ে ভারতে ব্যবসা করতে আসত। মশলার সঙ্গে অতুজ্জ্বল লাল রঙের পোষাকের ব্যবসার দখল নিয়ে লড়াই লাগে ব্রিটিশ আর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে। তার ফলে ১১ এপ্রিল ১৭৭৬ সালে দুই পক্ষের সন্ধিতে ঠিক হয় ডাচেরা ইন্দোনেশিয়ার বান্দা দ্বীপ দখলে রাখবে আর ব্রিটিশেরা ম্যানহাটান।

১৭৫০ পর্যন্ত ভারত সারা বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ বস্ত্র উতপাদন এবং রপ্তানি করত; আজ বলে বোঝান যাবে না, কয়েক হাজার বছর ধরে সে এশিয়া এবং আফ্রিকার জোড়া কি ব্যবসা করেছে। মনে রাখা দরকার চতুর্দশ শতে ব্রিটিশেরা মনে করত পশমের মতই তুলোও প্রাণীজ উতপাদন – তারা তুলো এবং সুতি কাপড় পরার মজাটাই জানত না। মধ্য অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত তাঁদের তুলোর গুণমান এতই খারাপ ছিল যে, তার সুতো কোন তাঁতেই তোলা যেত না – তা গাঁটরি বাঁধার জন্য ব্যবহৃত হত। মানে যতদিন না ইওরোপে ভারতীয় সুতো যায় নি – শুধু ইংলন্ড নয়, সারা ইওরপ বুঝতেই পারেনি, সুতিবস্ত্র পরার মজা কি।

মশলার রাণী গোলমরিচের সূত্রের সন্ধানে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছে ইওরোপ। সেই সূত্রে প্রথম ভারতীয়দের সাহায্যে(মালামো কানা নামক এক গুজরাটি মুসলামান নাবিক) ভাস্কোদাগামাকে ভারতে এসে পৌঁছয়। তার পর মালাক্কা দখল করে পর্তুগিজেরা দেখল, সেখানে ১০০০ গুজরাটি পরিবার দীর্ঘদিন বাস করে এশিয় বস্ত্র বাণিজ্যে রাজ করছে। তখনও পর্তুগিজেরা মশলাদ্বীপে প্রবেশের আগে তাদের ইওরপিয় উতপন্নের সঙ্গে ভারতীয় বস্ত্র বিনিময় করে ব্যবসা চালাত(মনে রাখতে হব এ ভারতে মুঘলদের আগে কিন্তু পর্তুগিজেরা প্রবেশ করেছে – তখন এমন কোন ইওরোপিয় উতপাদন ছিল না, যা এশিয় উতপাদনকে পাল্লা দিতে পারে এবং এশিয় বাজারে ছেয়ে যেতে পারে)। এর পর ভারতে আসে ডাচ আর ব্রিটিশ – শুরু হল ত্রিমুখী বাণিজ্য। কালিকটের রাজা ভাস্কোকে লিখলেন, ‘আপনি আমাদের থেকে মশলা চান? তার বদলে আমরা চাই সোনা, দামি রত্ন, বহুমূল্য পাথর আর ইওরোপিয় লাল কাপড়।’ তো ইওরোপে মশলা বস্তাবন্দি করতে রাজারা বস্ত্র উতপাদকেদের থেকে দাবি করলেন বিশেষ ধরণের ছাপাই কাপড়, যাদিয়ে তারা মশলা গাঁটরি বাঁধার কাজ করবেন’।

তো সিঙ্গাপুরের এশিয়ান সিভিলাইজেশন মিউজিয়মে ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতের এই ধরণের বেশ কিছু বস্ত্রের সংগ্রহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ভারতীয় শিল্পকৃতি কলমের সাহায্যে আর নাম এখন কলমকারী, আঁকা হয়েছে, তার ওপর রঙ করা হয়েছে mordant-dye এবং resist-dye পদ্ধতিতে। সুতি বস্ত্রে রঙ করার পদ্ধতি ইওরোপ আবিষ্কারের আগেই(মনে রাখতে হবে পশমে বা রেশমে রঙ সহজে ধরে কেননা তা পশুজাত দ্রব্য, কিন্তু সুতিতে রঙ সহজে ধরে না কেননা তা উদ্ভিজ্জ উতপাদন) ভারত ধাতু অক্সাইড(ফটকিরি (এলাম), এবং লোহা), সিরকা(ভিনিগার), নুন, এমন কি মুত্র(গাছ থেকে নীল রঙ বের করতে অনুঘটক হিসেবে কাজে লাগত) দিয়ে, একটা চৌবাচ্চাতেই ডুবিয়ে নানান কাপড়ে ভিন্ন ধরনের রঙ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিল(এটা আমরা পরমের প্রথম বস্ত্র সংখ্যায় বিশদে উল্লেখ করেছি)। তারপর ইওরোপে কাপড় আর ফ্যাশান বিপ্লব ঘটে গেল। এই কাপড়গুলির রঙ মুলত কালো, সুতির রঙের আর লাল বর্ণের। নবম শতের গুজরাটি কাপড় পাওয়া গিয়েছে আব্বাস(আব্বাসিদ) পরিবার শাসিত প্রাচীন মিশরের রাজধানী, ফুসতাতের একটা গুদাম থেকে।
তবে সব থেকে প্রখ্যাত বাণিজ্য বস্ত্র হল বাঁধনি পদ্ধতিতে রঙ করা – যার নাম ডাবল ইক্কত - পাটোলা, ইন্দোনেশিয়ার রাজবংশে এবং অভিজাতদের পরিবারে ব্যবহৃত হত। পূর্বএশিয়ার দেশগুলির অভিজাত পরিবারগুলোয় এক কাপড়গুলি যেমন সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল তেমনি ছিল, বিনিময়ের মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের উপহার দেওয়ার জন্য সর্বোত্তম।

অন্যদিকে করমন্ডল উপকুলে হাতে রঙের কাজ করা বা ব্লকে ছাপা কলমকারি কাপড় তৈরি হত। এগুলি যেত ভুমধ্যসাগরিয় দেশগুলিতে এবং থাইল্যান্ডে। এগুলিতে নানা বৌদ্ধ এবং আয়ুথয়া/ব্যাঙ্কক মোটিফ ছাপা হত, এ ছাড়া ছিল মুর্তি ব্যতীত জ্যামিতিক, লৈখিক এবং ফুলেল ছবি।

করমন্ডলে তৈরি হওয়া এক ধরণের বস্ত্র যেত সুলাওয়েসির শাসক তোরাজার পরিবারে এবং তাঁদের রাজত্বে, তারা এটার নাম দিয়েছিল মাআ বস্ত্র। জন গাই (ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন দ্য ইস্টএ) লিখছেন, ‘Ma'a cloths acquired a central place in Toraja beliefs, featuring in the local creation myths which centre around deified ancestors who are screened in heaven by a curtain of ma'a’।

১৭০১এ ভারতীয় বস্ত্র আর মশলা ইওরোপের বাজার এতই দখল করে নিতে শুরু করে যে, ইংলন্ড প্রথম তার নিজের শিল্প বাঁচাতে আইন প্রণয়ন করে। ১৭২১এ আবারও রঙ্গিন ভারতীয় সুতি, রেশম বস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর পর দীর্ঘ দিন ধরে তাতিদের ওপর অত্যাচার, প্রযুক্তি ধ্বংসের প্রভাব পড়ে ভারতীয় উতপাদনে এবং বাজারে। একদা যে দেশ যারা বিশ্বের ৩০ শতাংশ বস্ত্র উতপাদন করত, ১৯০০ সালে সে মাত্র ২ শতাংশ বস্ত্র রপ্তানি করেছে।
Post a Comment