Saturday, July 23, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

দ্বিতীয় খণ্ড

বাংলার মূল বৈদেশিক বাণিজ্যিক পণ্য ছিল রেশম আর সুতি বস্ত্র এবং ইতিহাস প্রমান দাদনি বণিকেরা এই সব পণ্য নিজেরা সংগ্রহ করতেন। যদিও সুতি বস্ত্র এই উপমহাদেশের বহু স্থানে তৈরি হত, কিন্তু সেগুলির মধ্যে বাংলার তুলনায় করমণ্ডলের বস্ত্রের চাহিদা বেশি ছিল, কেননা সেগুলির দাম কম ছিল এবং সেগুলি ইন্দোনেশিয়া এবং মালয় দেশগুলিতে এবং আফ্রিকার উপকূলের দেশ সমূহে রপ্তানি করা হত। বাংলার সুতি বস্ত্রের মধ্যে মসলিন ছিল বিশ্ববিখ্যাত এবং সোনারগাঁও জেলার ঢাকায় এটি খুব গুণমানে ভাল তৈরি হত। এগুলি বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে উচ্চদামে বিক্রি হত। সপ্তদশ, অষ্টদশ শতে ইওরোপিয় কোম্পানিদের পক্ষে এই বিস্তৃত ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেই দ্রব্য এই উপমহাদেশের ধনীদের মধ্যে বিক্রি করা খুব একটা সহজসাধ্য কাজ ছিল না।

কিন্তু সারা বিশ্বে রেশম পণ্য হিসেবে উচ্চদামে বিক্রি হয়, দূরব্যবসার ক্ষেত্রে এটি খুব উপযোগী পণ্য। এশিয় স্থলপথ ব্যবসায় বহুকাল ধরে রেশম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, যেহেতু হাল্কা ফলে বয়ে নিয়ে যাওয়ার উপযোগী এবং দামি – প্রায় বিশ্বের সব এলাকায় দামও ব্যবসায়ীর চাহিদামত পাওয়া যায়। ১৬৫০ পর্যন্ত বাংলার রেশম একমাত্র ভারতের বাজারেই বিক্রি হত, একাংশ গুজরাটে রপ্তানি হয়ে সেখানে সূচী কর্ম করে সেগুলি দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বিক্রি হত – এবং তার কিছু নমুনা আজও ইওরোপের নানান জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে।

সপ্তদশ এবং অষ্টদশ শতে বাংলা থেকে ইওরোপে যাওয়া পণ্যগুলির মধ্যে রেশম মধ্যমণি ছিল। হয়ত কোন বিশেষ প্রয়োজনে কোম্পানিগুলি বাংলার রেশম বস্ত্র ইওরোপ এবং মধ্য এশিয়ার বাজারে পাঠিয়েছে।

সপ্তদশ শতের প্রথম দুই শতে ইওরোপের রেশম বস্ত্রর বড় বাজার ছিল ইতালি, ফ্রান্স এবং লিয়ঁ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ১৬১৯-২২এর সঙ্কট এবং ইতালিতে মন্বন্তর ঘটায় ১৬২০ থেকে ইতালিয় রেশম বস্ত্রের দাম বাড়তে থাকে এবং ১৬৬৪ সালে দেখা যায় এটি আর ব্যবসার কাজে লাভ জনক হচ্ছে না। ফলে রেশমের বাজার দেখার চেষ্টা চলল, সেই স্থান নিল পারস্য। এবং পারস্যের রেশম ১৬৫০ পর্যন্ত ইওরোপে ভাল ব্যবসা করেছে। কিন্তু তার পরের সময়ে পারস্যে রাজনৈতিক ডামাডোলে রেশমের ঘাটতি দেখা দেয় এবং তা চলে অষ্টাদশ শত পর্যন্ত। পূর্ব সমুদ্রে রাজ করা ডাচ ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা করল পারস্যের রেশমকে চৈনিক রেশম দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার, কিন্তু হঠাতই বাংলার পশ্চিমপ্রান্তে চিনের তুলনায় অনেক শস্তার রেশম বস্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেল, যার কেন্দ্র হল সে সময়ের বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার।
(চলবে)
Post a Comment