Showing posts with label পলাশী চক্রান্ত. Show all posts
Showing posts with label পলাশী চক্রান্ত. Show all posts

Wednesday, December 27, 2017

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ১১ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - সিদ্ধান্ত

এছাড়াও বলা দরকার ইওরোপিয়রা বাংলার পরম্পরার ব্যবসার সংগঠনকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারে নি। তাদের এই পরম্পরার প্রথা, নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে, তাদের ব্যবসাকে বাংলার ব্যবসার প্রথার মত করে সাজিয়ে গুজিয়ে নিতে হয়েছে। তবে তারা এই ব্যবসা ক্ষেত্রে নতুন কিছু ধারণা দিতে পেরেছে, প্রধান সওদাগরের দপ্তর, অংশিদারি ব্যবস্থা, সোরা ব্যবসায়ীদের দিয়ে অংশিদারি ব্যবস্থার ভিত তৈরি করে দেওয়া যাতে তারা নিজেদের মত করে দাম নির্ণয়ে ভূমিকা পেশ করতে পারে। কিন্তু আধুনিকপূর্ব সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয় ব্যবসা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন খুব প্রভাবশালী কিছু ছিল না।
বাংলার ব্যবসা বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল যে বিভিন্ন জাতির, বিভিন্ন সমাজের খুব বড় আর খুব ছোট ব্যবসায়ীর যৌথ অবস্থান। এরা পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্র আর বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় ব্যবসা করত। বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে জগতশেঠ, উমিচাঁদ এবং খ্বাজা আহমেদ ছিলেন ত্রিরত্ন, এদের হাতেই বাংলার আর্থ এবং ব্যবসা ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি ধরা ছিল। তাদের কাজের ব্যপ্তি, তাদের বাণিজ্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং সাংগঠিত ব্যবসা কর্ম বিশ্লেষণ করে, এশিয় ব্যবসা যে কিছু হকারদের যৌথ সমষ্টি(ordinary entrepreneurial character of the Asian trade was a sum of peddling activities) এই তত্ত্বে উপনীত হওয়া যায় না। ব্যবসাদারদের সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে থাকা মানুষদের যে জোট, সেই জোট তাদের প্রাপ্ত ক্ষমতার বলে বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন এবং আর্থিক ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল তা এদের কাজকর্ম বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়।
অষ্টাদশ শতকের প্রথমের দিকে বাংলার সওদাগরেরা ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির আজ্ঞাবহ ছিল না। এশিয় আর ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমপর্ব পর্যন্ত অংশিদারিত্ব বা পরস্পর নির্ভরশীলতা, পরের দিকে যৌথ উদ্যম(subjugation)ছিল ব্যবসায়িক যোগাযোগকর্মের প্রণোদনা। বাংলা বা ভারতের অন্যান্য প্রান্তে ব্যবসা মূলত ছিল ব্যক্তি ব্যবসায়ীর ভূমিকা, সেখানে গোষ্ঠীর ভূমিকা খুব বেশি ছিল না। ব্যবসায়ীরা মূলত ব্যক্তি বা পারিবারিকভাবে কয়েকজন মিলে ব্যবসা করত। ইওরোপের ব্যবসায়িক সংগঠনে অব্যক্তিক (Impersonal) যে সম্পর্ক সংগঠন গড়ে উঠেছিল, তা এই বিশ্বে অজানা ছিল। এমনকি পরস্পরের মধ্যে হাতধরাধরি করে এগোনোর ভূমিকা ছিল না। তবে ব্যবসায়িক লেনদেন একটি জাতি বা সমাজের বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না – তার বাইরেও প্রভূত পরিমানে হত। মুসলিম ব্যবসায়ীর হিন্দু বানিয়া বা হিন্দু বা আর্মেনীয় ব্যবসায়ীর মুসলমান সঙ্গীর নির্দশনের অভাব ছিল না। শহরে প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়িক শ্রেণী একই জাতিতে সংগঠিত হত মোটামুটি।

বাংলার বস্ত্র বয়ন শিল্পের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্র ছিল It was basically a rural domestic handicraft industry with extraordinary diffusion and marked by extreme localization and high specialization। বহু ক্ষেত্রে চাষীরাই তাঁতে বসতেন। তাঁতি ছিলেন স্বনির্ভর কারিগর, স্ত্রী আর সন্তান তার সহায়ক ছিল। পরিবার এখানে সামগ্রিক উৎপাদন দেখত, তার বাড়িটাই ছিল কারখানা। The rudimentary character of the technique with emphasis on simple instruments and a low ratio of. fixed to working capital implied a minimal concentration of labour and capital in individual units of production.। পলাশীপূর্ব বাংলার তাঁতি-কারিগর বিপুল স্বাধীনতা ভোগ করত। উৎপাদনের কাঁচামালের স্বত্ত্ব ছিল তাঁতির নিজের, নিজেই নিজের সুতো কিনত এবং সে যা উতপাদন করত তাত্ত্বিকভাবে তার মালিকানাও তার ছিল। দাদনি ব্যবস্থা উৎপাদকের উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করত না - The dadni system at most promoted the control of merchant capital over the producer and not the process of production itself। পলাশীর পরে তাঁতিরা কোমপানির বেতনভূক কর্মচারী হয়ে পড়ে, এবং উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণ সে হারিয়ে ফেলে। 

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ১০ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - সিদ্ধান্ত

মধ্য অষ্টাদশ শতকে বাংলায় কোন অর্থনৈতিক দুর্যোগও ছিল না। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা(যদিও সাম্প্রতিক গবেষণায় সরাসরি কেউই ‘অর্থনৈতিক সঙ্কট’ শব্দবন্ধটা ব্যবহার করেন নি, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ইঙ্গিত সেই দিকেই ছিল) বলা চেষ্টা করেছেন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার পতন ঘটেছিল, ব্যবসা বাণিজ্য ঢালের দিকে এগোচ্ছিল, সওদাগরেরা অস্বচ্ছল হচ্ছিল, খোলা বাজারের পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছিল, এবং ব্রিটিশ কোম্পানির রপ্তানি কমছিল। আমার এই বইতে আমি প্রমান করে দিয়েছি যে এই ধারণাগুলি ধারনাই, এগুলোর কোন বাস্তবতা নেই। বিশেষ করে ইওরোপিয়দের মোট বাংলা পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কোন ঘাটতি দ্যাখা যায় নি। ১৭৪০এর শেষ থেকে ১৭৫০এর শুরু পর্যন্ত ব্রিটিশ রপ্তানি কমেছে কিন্তু বাংলার অর্থনীতির ধীরগতির জন্য নয়। বরং ব্রিটিশ অর্থনীতির গতিহীনতাকে পুষিয়ে দেওয়া গিয়েছে এশিয় বাজারে ডাচ(এবং ফরাসী) রপ্তানি বৃদ্ধিতে। এপ্রসঙ্গে বলা দরকার বাংলা থেকে এশিয় বণিকদের রপ্তানি, বিশেষ করে রেশম আর সুতি বস্ত্রে, মধ্য অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বাংলার অর্থনীতি জড়দার করতে বিপুল ভূমিকা পালন করে গিয়েছে।
এই সব উদাহরণে আমরা বলতে পারি না যে পলাশীপূর্ব সময়ে বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য এবং বাংলার বণিকেরা সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল। এছাড়াও সম্প্রতিকালে বলা হচ্ছে দাদনি বণিকদের যায়গায় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি গোমস্তা প্রথা শুরু করায় বাংলার মধ্যসত্ত্বভোগীরা দুর্দশায় পড়ে, এ তত্ত্বও গ্রহণযোগ্য নয়। ডাচেরা ১৭৪৭-৪৯ এই তিন বছর গোমস্তা প্রথা শুরু করেও ১৭৫০এ দাদনি ব্যবস্থায় ফিরে যায়। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের দাদনি প্রথা থেকে গোমস্তা প্রথায় যাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের ব্যবসার ঢালপথে দ্রুতগতিতে নেমে যাওয়ার প্রবণতা রোখা এবং আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাড়ানোর উদ্যম। আজ এই তথ্য পরিষ্কার যে গোমস্তারা মূল গন্ডগোলের উৎস ছিল। তাদের সক্রিয় সহযোগিতায় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা বাংলার নানান অগম্য স্থানে প্রবেশ করতে উদ্যমী হয়।
আরও বলা হচ্ছে যে মারাঠা আগ্রাসনে বাংলার অর্থনীতি বিপুল সঙ্কটের মধ্যে পড়ে কারণ সে সময় ইওরোপ থেকে আসা দামি ধাতু কমে যায় কারণ এই আক্রমনে বাংলার পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় এবং ব্রিটিশদের কেনার ক্ষমতা কমে যায়। এই তত্ত্বকেও আমরা খারিজ করেছি বাংলার নানান ধরণের বস্ত্র রপ্তানির তথ্য ধরে ধরে এবং সেগুলোর দামের সঙ্গে বাজারের অন্যান্য পণ্যের দামের তুলনা করে – দেখিয়েছি বাজারে পণ্যগুলির হঠাৎ বিপুল দামবৃদ্ধি তত্ত্বের কোন ভিত্তি নেই। বরং ১৭৩০ আর ১৭৪০এর দশকের তুলনায় ১৭৫০এর পরে কোম্পানির খাতা থেকে তথ্য তুলে দেখিয়েছি বাংলা থেকে রপ্তানি হওয়া তিনটি প্রধান পণ্য, মসলিনের খাসা আর মলমলের দাম কমেছে। চাল বা অন্যান্য খাদ্য শস্যের দামেরও লক্ষ্যণীয় বৃদ্ধি ঘটে নি। ফলে বাংলায় মধ্যঅষ্টাদশ শতে কোন রকম অর্থনৈতিক সঙ্কট ছিল, একথা বলা যাবে না।
এটাও বলা দরকার বাংলা বাণিজ্য ক্ষেত্রে ইওরোপিয়দে আনা দামি ধাতুর পরিমান দেখানোয় কিছুটা অতিকৃত চেষ্টা হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে বাংলা এশিয় এবং ইওরোপিয় উভয় ব্যবসার ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত অর্থনীতি ছিল – বাংলায় পণ্য কিনতে সব্বাইকে দামি ধাতু নিয়ে আসতে হত। পঞ্চদশ শতকে জনৈক চিনা ভ্রমনকারী মন্তব্য করেছেন যে, long-distance. merchants -in Bengal settled· their accounts

with tankas (silver coins)( W.W.Rockhill, 'Notes on the Relations and Trade of China with the Eastern Archipelago and the Coast of the Indian Ocefln during the Fourteenth Century', Toung Pao, 16, pt.2 (1915), p. 144, quoted in Richard M. Eaton, The Rise of Islam, p. 96.)। ফলে বাংলায় দামি ধাতু আসা খুব নতুন ব্যাপার ছিল না। এবং এই কাজে ইওরোপিয়দের ভূমিকা একমাত্র ছিল না এটাও বলা দরকার, একাজে এশিয় বণিকদেরও বড় ভূমিকা ছিল হয়ত ইওরোপিয়দের থেকেও বেশি। তবে ইওরোপিয়রা যে ভাল পরিমানে দামি ধাতু আনত এটা অস্বীকার করা যাবে না – কিন্তু অর্থনীতির ওপরে এর প্রাভব খুব সামান্য ছিল, অর্থনীতির প্রান্তিক ক্ষেত্রটি শুধু এটি ছুঁতে পেরেছিল মাত্র। এই বিপুল সংখ্যায় দামি ধাতু বাংলায় আসত সেটি ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে সওদাগর মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ভোগে লাগত। 

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৯ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - সিদ্ধান্ত

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে গোটা মুঘল সাম্রাজ্য জুড়ে পতনের, ক্ষয়, অব্যবস্থা এবং অস্থিরতার পরিবেশের মধ্যে বাংলার নবাবি প্রশাসন একমাত্র ব্যতিক্রমিক ভৌগোলিক এলাকা। শুধুমাত্র করদ-রাজ্য হিসেবে বাংলার দিল্লির সঙ্গে একটা প্রায়-ছিঁড়ে যাওয়ার মত সূক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা থাকা হলেও বাস্তবিকভাবে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত বাংলার নবাবেরা বাংলাকে স্বাধীন ভৌগোলিক এলাকায় পরিণত করে। নবাবের ব্যক্তিগত কৃপাদৃষ্টির পথে পড়ে শুধু কিছু জমিদার, ব্যাঙ্কার এবং অভিজাত সামরিক ব্যবসায়ীরা ক্ষমতার কাছাকাছি এসে একটা যৌথ জোটবন্ধন তৈরি করে। এটা কোনভাবেই শ্রেণীবদ্ধতা(class alliance) নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে জোটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের ব্যক্তিগতস্তরের স্বার্থ রক্ষা। এই অবস্থা বাংলাদেশে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং একটি জোরালো নিজামতের ভিত্তি তৈরি হয়। এর ফলে আর্থিক ব্যবস্থায়, উৎপাদনে এবং লাভের পরিবেশ তৈরিতে নতুন উদ্যম গৃহীত হয়, ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি আর বাজারের বিস্তার ঘটে। বাংলায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে ব্যবসার সমৃদ্ধি এবং শান্তি শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বণিককে টেনে আনে।
ইওরোপিয়দের মধ্যে ডাচ আর ব্রিটিশ ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলার ব্যবসা জগতে বেশ সক্রিয় ছিল। একসময় কোম্পানিগুলো ইওরোপ আর মশলাদ্বীপপুঞ্জের মধ্যে যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা শুরু করেছিল, সেটি বদলে গেল ত্রিপাক্ষিকতায় এই ব্যবসায় ভারত নামক একটি ভূখণ্ড তার দেশের নানান এলাকায় প্রস্তুত নানান ধরণের শস্তা উৎপাদন নিয়ে ঢুকে পড়ায় – যে ভূখণ্ডের বস্ত্র নিয়ে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি মশলা কিনে ইওরোপে চালান দিত। পরের দিকে এটি ইওরোপ এবং বাংলার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে ১৬৮০র পর থেকে বাংলা এই কোমপানিগুলির এশিয় ব্যবসার অক্ষদণ্ড এবং উত্তমর্ণ রূপে উঠে আসে অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত। অষ্টাদশ শতকে ডাচেরা যদিও বাংলার মোট ব্যবসায় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির থেকে অনেকটা এগিয়েছিল, ১৭৩০ এবং ১৭৪০এ ব্রিটিশেরা এশিয় ব্যবসায় তাদের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে থাকে, মনে রাখতে হবে বাংলার ঘাঁটি ডাচ ব্যবসা পরিকল্পনায় আন্তঃএশিয় খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বাংলায় ব্যবসা করতে গেলে দামি ধাতু বয়ে নিয়ে আসতে হত। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি বাংলার পণ্য কিনতে যে সব পণ্য আমদানি করত তার মধ্যে ৭৪ থেকে ৯৪ শতাংশ পণ্যই ছিল দামি ধাতু।

এই উদ্বৃত্ত ব্যবসাটা বাংলার সব থেকে বড় জোর ছিল। এবং এই জন্য বাংলার দখল ইওরোপিয়দের কাছে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। বহুকাল ধরে একটা ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে পলাশীপূর্ব বাংলার রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার জন্যে বাংলা দখলে ব্রিটিশেরা নাক গলাতে পেরতেছিল। কিন্তু এই তত্ত্ব মেনে নেওয়া যায় না। এটাও বলার চেষ্টা হয়েছে সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায়, পলাশীর অব্যবহিত পূর্বে নতুন নবাব সিরাজের নানান কাজে বাংলার অভিজাতদের শ্রেণীদের যুথবদ্ধ শ্রেণীগোষ্ঠীস্বার্থে আঘাত লাগে ফলে তারা ব্রিটিশদের সাহায্যে প্রত্যাঘাত করে। বলা দরকার অখণ্ড শ্রেণী স্বার্থ বলে কোনদিন বাংলায় কিছু ছিল না, সে অখণ্ড মঞ্চও বাংলায় গড়ে ওঠেনি, যাছিল তা হল ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ মানুষটির প্রতি একজন বা কয়েকজনের ব্যক্তিস্বার্থপূরণের প্রতিযোগিতা। মধ্যঅষ্টাদশ শতকে রাজনৈতিক পটভূমিতে কোন কিছুই ঘটা অস্বাভাবিক ছিল না। মুর্শিদকুলিখাঁর মৃত্যুর পরে প্রত্যেকটি সিংহাসন আরোহনের প্রশ্নে দেশের ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অভিজাতরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ত, এই ঘটনাটা পলাশীর সময়েও ঘটেছিল। পলাশীতে ব্রিটিশদের পাশে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী সিরাজের ক্ষমতা আরোহনের বিরোধিতা করে। আবার অন্যদিকে বহু জমিদার, ব্যবসায়ী এবং সামরিক অভিজাত সিরাজেরপাশে ছিল। মুর্শিদকুলির মৃত্যুর (১৭২৮/২৯) সময়েও একই বয়ান ছিল আবার সিরাজের সিংহাসনে ওঠার সময়েও একই বয়ান লক্ষ্য করা যায়। ফলে পলাশীকে কোনভাবেই বাংলার অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যাবে না।