Showing posts with label শিল্পীক দর্শন. Show all posts
Showing posts with label শিল্পীক দর্শন. Show all posts

Saturday, February 16, 2013

শোরা-প্রস্তুত-করণের কথা

সম্প্রতি লোকফোকএ পুরোনো বাঙলার কিছু রচনা প্রকাশ করছি. 
প্রফুল্ল রায়, দীনেশ সেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীরা আমাদের যে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন তাঁদের নানান কাজের মধ্যে, এই লেখাগুলি পুনঃ প্রকাশ করে এই দেশপ্রেমিক মানুষদের প্রনাম জানাচ্ছি. 
নতুন করে জানছি তাঁদের কাজ কর্ম, তাঁদের দর্শন, তাঁদের ভালবাসা. 
আরও বেশি মানুষকে জানাতে পারছি, এটাও কম কথা নয়.
লোকফোকের পক্ষে, বিশ্বেন্দু

শিল্পীক দর্শন পুস্তক থেকে, লেখক রাজেন্দ্রলাল মিত্রমহাশয়

ভারতবর্ষে যে সকল বাণিজ্য দ্রব্য প্রস্তত হয়, তন্মধ্যে নীল আফিম চীনী এবং শোরাই প্রধান, ইহার এক২ পদার্থের ব্যবসায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা এতদ্দেশে উপার্জ্জিত হইয়া থাকে। ...প্রাচীন অট্টালিকায় লোণা ধরিতে পাঠকবর্গ সকলেই দেখিয়াছেন, কিন্তু তাহা কি প্রকারে ঘটে তাহার অনুসন্ধান অতি অল্প লোকে করিয়া থাকিবেন। অনেকে বিশ্বাস করেন যে তাহার আদিকারণ লবণ – লবণ বিশিষ্ট জল পৃথিবী হইতে ভিত্তিতে উঠিয়া প্রাচীরের ইষ্টকাদি জীর্ণ করিয়া ফেলে, এবং ঐ ঘটনার নাম লোণাধরা। কিন্তু লোণাধরিবার কারন কেবল লবণ নহে। ক্ষার হইতে যত লোণা ধরিয়া থাকে লবণ হইতে তত লোণা কদাপি ধরে না। অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন নামক দুই বিশেষ বায়ু মিশ্রিত হইয়া এক সামান্য বায়ু উত্পন্ন হয়, ঐ বায়ুদ্বয় বিশেষ পরিমাণে মিশ্রিত হইলে এক প্রকার অম্ল দ্রাবক জন্মে। ক্ষারের সহিত ঐ দ্রাবক মিশ্রিত হইয়া শোরা উত্পন্ন করে, তাহা চূর্ণের সহিত একত্র হইলে নাইট্রেট অফ লাইম নামক লবণবিশেষ জন্মে, এবং লবণের সহিত সিক্ত থাকিলে নাইট্রেট অফ সোডা উত্পন্ন হয়। ক্ষার এবং চূর্ণ আর্দ্র থাকিলে প্রস্তাবিত পদার্থ অতি সত্ত্বরে উত্পন্ন হইয়া থাকে। এই সকল ক্ষারজ চূর্ণজ পদার্থ  দেখিতে লবণের তুল্য, এবং তাহাহইতেই প্রাচীরে লোণা ধরিয়া থাকে। সমভূমির মৃত্তিকায় খার বা চূর্ণ থাকিলে তথায় লোণা ধরে, সুতরাং যে সকল স্থানের মৃত্তিকায় লোণা ধরিয়া থাকে তদ্বারা অনায়াসে শোরা প্রস্তুত হিতে পারে। তিব্বত-প্রদেশে লোকে মৃত্তিকার সহিত মেষ ও ছাগলের মল ও গো-ময় মিশ্রিত করিয়া অনেকে শোরা প্রস্তুত করিয়া থাকে। ত্রিহুত-প্রদেশের  মৃত্তিকায় এই প্রকারে শোরা প্রভৃতি পদার্থ প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে, এবং তত্প্রযুক্ত ঐ প্রদেশ শোরার আকর বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে।
শেষোক্ত স্থানে শোরার মৃত্তিকা-সংঙ্গ্রহ-করকরা লুনিয়া নামে প্রসিদ্ধ। অগ্রহায়ণ মাসে তাহারা আপন ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইয়া প্রাচীণ মাটির ঢিপি, ভগ্ন-প্রাচীর, পড়া ভুঁই প্রভৃতির যে যে স্থান লোণা মৃত্তিকা পাওয়া যাইতে পারে, সেই২ স্থান চাঁচিয়া শোরার মৃত্তিকা সংঙ্গ্রহ করে। ঐ মৃত্তিকা-সঙ্গ্রহ-করণ-ক্রিয়া লবণের মৃত্তিকা-সঙ্গ্রহে সোরার মৃত্তিকা জন্মে। এই মৃত্তিকা সঙ্গৃহীত হইয়া শোরার কুঠীতে আনীত হইলে প্রথমতঃ তাহা ধৌত করিতে হয়। তদর্থে কুঠিতে ৪।৫ হস্ত পরিসর একটা মৃত্কুণ্ড থাকে। তাহার তলায় বাখারি ও শুষ্ক তৃণ দিয়া একপ্রকার ছাঁকনী প্রস্তুত করিতে হয়। ঐ ছাঁকনীর উপর এক প্রস্ত নীলবৃক্ষের ভস্ম ও তদুপরি ২০ মন লোণা মৃত্তিকা স্থাপন-পূর্ব্বক ঐ মৃত্তিকা পা দিয়া দাবিত হইলে তদুপরি এমত পরিমাণে ক্রমশঃ জল দেওয়া আবশ্যিক যাহাতে ঐ জল মৃত্তিকার উপর ৬ অঙ্গুলি পুরু হইয়া থাকে। ২৪ ঘন্টা কাল মধ্যে কুণ্ডের জল সমস্ত-লবণ-পদার্থকে দ্রব করিয়া ছাঁকনী ভেদ করত তাহার নিম্নে পড়িয়া যায়। বৃহত২ পাত্রে ঐ জল কিয়ত্কাল স্থির থাকিলে তাহা অনেক নির্ম্মল হয়, কিন্তু তাহার সহিত লৌহ ও বনজ পদার্থ অনেক মিশ্রিত থাকে। তাহা পৃথক করিবার নিমিত্ত ঐ জল পাক করা আবশ্যক। সদর্থে লুনিয়ারা পয়ঃপ্রণালীবত্ দীর্ঘ চুল্লী নির্ম্মিত করত তদুপরি শোরার জলপূর্ণ একসারি হাঁড়ি রাখিয়া চুল্লীর এক পার্শ্বে আম্রপত্রের জ্বাল দিতে থাকে। তাহাতে সকল পাত্রের জল ক্রমশঃ শুষ্ক হইয়া যায় দুই ঘন্টা কালমধ্যে পাত্রের দশআনা(সংকেত - বিশ্বেন্দু) অংশ জল শুষ্ক হইলে অবশিষ্টাংশ অগভীর মৃতপাত্রে শীতল করা কর্তব্য। ঐ শীতল-করণ-সময়ে জলহইতে সমস্ত শোরা দানা বান্ধিয়া পাত্রের নিম্নে জমিয়া থাকে। এই শোরার নাম ধোয়া শোরা। ইহাতে অনেক লবণ মৃত্তিকাদি মলা বর্ত্তমান থাকে। তাহা পৃথক করিতে হইলে ধোয়া শোরাকে পুনরায় জলে গুলিয়া পাক করত গাদ কাটিয়া দানা বান্ধিতে হয়, তাহা হইলেই কলমী শোরা প্রস্তুত হয়।
শোরার মৃত্তিকা ধৌত করলে পর ছাঁকনীর উপর যে পদার্থ অবশিষ্ট থাকে ও শোরা দানা বান্ধিলে পর যে জল অবশিষ্ট থাকে তাহা শোরা-প্রস্তুত করিতে বিশেষ প্রয়োজনীয়, শোরার ক্ষেত্রে তাহা নিক্ষেপ করিলে পরবত্সর ঐ ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমানে শোরা উত্পন্ন হয়।
কলমীশোরা পরিশুদ্ধ পদার্থ নহে, তাহাতে বালুকা, জল, লবণ, গ্লবার শাল্ট প্রভৃতি পদার্থ মিশ্রিত থাকে। বণিকেরা ঐ পদার্থের পরিমাণ নিরূপিত করিতে না পারিলে শোরার বাণিজ্য লাভ করিতে পারে না। অতএব তাহারা অনেক শোরা ক্রয় করবার পূর্ব্বে অর্থ-ব্যয় করত ক্রেতব্য শোরার কিয়দংশ রসায়ন-বিজ্ঞব্যক্তিদ্বারা পরীক্ষিত করিয়া লয়।