Showing posts with label Rila Mukherjee. Show all posts
Showing posts with label Rila Mukherjee. Show all posts

Tuesday, July 26, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

পূর্বে সিল্ক পিস গুডস বিষয়ে যে আলোচনা করেছি, যেমন ব্যান্ডানোজের সাধারণ এবং বহুমূল্য বৈচিত্রের রেশমের সিল্ক লুঙ্গি রুমালের ওপরে অগ্রিমের হার ৭৬ থেকে ৮০% পর্যন্ত ওঠাপড়া করত। সাধারণ এবং ডোরাকাটা টাফটের ওপরে দাদনের ওঠাপড়া হত ৬৯ থেকে ৭৫% এবং দানাদারে ৭১ থেকে ৭৭%। চাদরবাঁধনি ৮২% এবং জামদানির ওপর দাদন ছিল ৮৯%। গুরায় দাদন ৭০ থেকে ৮৫% এবং দোসুতির ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৭০%।

কোরা রেশম এবং সিল্ক পিস গুডস সব থেকে চাহিদাবন্ত লাভের পণ্য যেহেতু প্রায় প্রত্যেক ব্যবসায়ীই এই ধরণের পণ্য কিনতে চাইতেন। এই ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন বিনিয়োগের, বলা ভাল তাদের ব্যবসার রোজগারের দিকে দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করা যাক।

বিদেশি কোম্পানিগুলির তথ্যসাবুদ থেকে বুঝতে পারি যতক্ষণ তাদের লাভের হার না কমছে ততক্ষণ তারা ব্যবসায়ীদের ভাল কি হল না হল, বা বেশি হল কি না, সে সব বিষয়ে দৃষ্টি দিত না। অনেক খুঁজে পেতে আমরা ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে কাশিমবাজার রেশমের ব্যবসায়ে বোধহয় দাদনি বণিকদের লাভের হারটি বুঝতে পেরেছি।

দাদনি বণিকদের রোজগারের হার কি ছিল? ১৭৪১এর ২৯ এপ্রিল যে রেশম বস্ত্রের নমুনায় যা দেখানো হয়, শেষ পর্যন্ত কিন্তু সেই গুণমানের রেশম বস্ত্র সরবরাহ করা হয় নি। এবং কোম্পানি ঠিক করে তারা একজন ফ্যাক্টরকে কুমারুলি আড়ংএ পাঠাবেন এই বিষয়টি তদন্ত করার জন্য। তারা সেখানে গিয়ে যা বুঝলেন, ব্যবসায়ী দরকষাকষি করে যে দাম ঠিক করেছেন, পরে তিনি দেখেন তিনি সেই দামে সেই গুণমানের বস্ত্র সরবরাহ করতে অপারগ। এবং তার পরেও ব্রিটিশেরা কিন্তু নতুন করা দাম নিয়ে দরাদরি করে নি।

সেই বছরের ব্যবসায়ীরা রংপুর রেশমের দাম দাবি করে ৫.৭৫ টাকা প্রতি সের, যার মধ্যে ১.৯% দালালি এবং ৪.২ শতাংশ কোম্পানির বাটা। ৬ জানুয়ারি, ১৭৪২ সালে পরামর্শদারারা দেখেন যে রংপুরের রেশম তৈরি হয়ে কোম্পানির গুদামে যখন দামের জন্য ওঠে, তখন কোম্পানি দেখল সেটার প্রতিসেরের উতপাদন খরচই হয়েছে ৫.৭০ টাকা। এই দামটি নতুন করে ঠিক করা হল পিরোনো দামের সঙ্গে মিলিয়ে। শীতের (নভেম্বর) উতপাদনের প্রতি সেরের দাম হয়েছে ৫.৪০ টাকা, এবং ব্যবসায়ী ব্রিটিশদের থেকে ৫.৭৫ টাকা দাবি জানায়। কোম্পানি তথ্য অনুযায়ী আমরা দেখতে পেলাম বণিকের থাকত ১ থেকে ৬ শতাংশের আশেপাশে।

বাস্তবে উতপাদনের খরচের ওপর ব্যবসায়ীদের লাভ ২ থেকে ৪%র মধ্যে থাকত। ৬ এপ্রিল ১৭৩৭এ কোরা রেশমের জন্য ব্যবসায়ীদের রোজগার হয় চার আনা(২৫ পয়সা) প্রতি সের এবং প্রত্যেক সিল্ক পিস গুডসএর জন্য ১ থেকে ৩ আনা। আমরা যদি ধরে নিই ৪০ সেরে ১ মন হয় এবং এক একজন ব্যবসায়ী ২০০ মনের বরাত পায়, তাহলে রোজগার সম্বন্ধ্যে একটা মোটামুটি স্বচ্ছ ধারণা করা যেতেই পারে।

ফলে ব্যবসায়ীরা এ ক্ষেত্রে দালাল হিসেবেই কাজ করছে; শুধু কোম্পানিদের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও। ১৭৩০ থেকে বাংলায় কোম্পানি আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা কিছুটা হলেও কোম্পানির প্রতিযোগী হয়ে উঠতে থাকে, ফলে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ব্যবসার বেনিয়ান হিসেবে দাদনি বণিকদের রোজগারও খুব কম ছিল না।

১৭৩৩ সালে লন্ডনের কোম্পানির নির্দেশকেরা বুঝতে পারলেন, যেভাবে ব্যক্তিগত ব্যবসা বাড়ছে, তাতে প্রতিযোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে পণ্যগুলোর দাম বাড়ছে; সেই প্রবণতা আটকাতে কোম্পানি কাশিমবাজারে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই জয়েন্ট স্টক কোম্পানিটি কাশিমবাজারে চালু হয় ১৭৪৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

এই ব্যবসার শাখাটি বাড়বাড়ন্ত হয়, কেননা এই ব্যবসাটির মাঝেমধ্যেই উল্লেখ পাচ্ছি কোম্পানির নিজস্ব হিসাব রাখার বইতে বিভিন্ন ব্যক্তিগত দালাল এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের নামোল্লেখে। হারাণ বিশ্বাস ছিলেন স্যামুয়েল হিলচ্যাম্পের বানিয়ান, কিশোর বিশ্বাস, অতিরাম ওয়েন্ট বারোয়েলকে পণ্য সরবরাহ করতেন। ১৭৩৭ সালে হুটু কোটমার নাম উল্লিখিত হয়েছে একজন ব্যাঙ্কারের জুয়াচুরির সঙ্গে জুড়ে থাকার জন্য।

ব্যাংকারদের খুব কাছের দালাল ছিলেন কোটমারা। কাশিমবাজার গুদামে ১৭৩০ এবং ১৭৩৩এ বালি এবং হুতু কোটমা ছিল সেই ব্যাঙ্কারের বানিয়ান। অন্যান্যদের নাম হল উদয় কুশল, রঙ্গনাথ বিশ্বাস এবং কুশলচাঁদ। ১৭৪১এ দেখাযাচ্ছে একজন ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী আয়রের নিজস্ব দাদালের নাম ছিল নিমদাস।

কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহ করা ছাড়াও এই ব্যবসায়ীদের আরও একটা কাজ ছিল, বিভিন্ন ইওরোপিয় ফ্যাক্টরি কুঠি থেকে ইওরোপিয় পণ্যের ক্রেতা ছিল। এই পণ্যগুলি বিক্রি করে কোম্পানি বাংলায় তাদের ব্যবসার কিছুটা বিনিয়োগ জোগাড় করত। এই পণ্যগুলি তার পর বিভিন্ন জেলার দাদালদের বিক্রি করত ব্যবসায়ীরা।


এইসব কুঠীর বিভিন্ন ইওরোপিয় আগ্নেয়াস্ত্রের ভাল চাহিদা ছিল বাংলায়, এছাড়াও ইওরোপিয় পশমি বস্ত্রেরও চাহিদা ছিল। ১৭৪০ সালে হুটু কোটমা বিভিন্ন পশমের তৈরি বস্ত্র খরিদ করে, ১৭৪১এ কাশিমবাজার ফ্যাক্টরি পশমের বস্ত্র বিক্রি করে সাউতু কোটমা, এবং বিশ্বাস পরিবারের নরেন, কুলিয়ান, রঙ্গনাথ এবং হেমো পোদ্দার, ধর্মদত্ত, কুশলচাঁদ, আলুমচাঁদ এবং শর্মা গোষ্ঠীর মধ্যে মাউদেব(মহাদেব?), সবরাম এবং কেবলরাম। এছাড়াও ফতেচাঁদ জগতশেঠ এবং তার নাতি মতুবরায়কেও বিক্রি করে। শেষের দুজন ছাড়া প্রত্যেকে কিন্তু কোম্পানির খাতায় উল্লিখিত ব্যবসায়ী।

এই নামগুলি থেকে আমরা বুঝতে পারি, কাশিমবাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীর তুলনায় এই ব্যবসায়ীরা একটু হলেও কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে সুবিধাভোগের অবস্থায় ছিলেনঃ এই তথ্য পাচ্ছি বিভিন্ন পরামর্শদানের উদ্ধৃতির সূত্রে। তবে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর রোজগারের হার ছিল প্রায় একই রকমের, যদিও মোট রোজগার সবার এক পরিমানে হত না, সেখানে তারতম্য থাকত, সেটাও পরামর্শ সূত্রে জানা যাচ্ছে। কাশিমবাজার ব্যবসায়ীদের মধ্যে পণ্য সরবরাহের বৈচিত্রের এবং ব্যক্তিগত ব্যবসার মোট ব্যবসা দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে, রোজগারের তারতম্য বেশ ভালই ছিল, এবনফ এর ফলে গোষ্ঠীর(কোর্টরি) উদ্ভব ঘটে।
{চতুর্থ খণ্ড সমাপ্ত}
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের জীবনের কথা মুখ ফুটে বলেন নি। নিজেদের স্মৃতি কথা বলার অভাব এবং প্রথাগত হিসেব বই রাখার অভাবে আমাদের বারবার বিদেশি কোম্পানিগুলির হিসেব খাতার তালিকায় উল্লিখিত নামগুলির ওপর সরাসরি নির্ভর করতে হচ্ছে। এই সূত্র যে সে সময়ের ব্যবসার পরিবেশ খুব ভালভাবে জানান দেয় তা বলা যাবে না কারণ আমরা শুধু নির্ভর করছি তাদের তালিকায় লিখিত নামগুলির ওপরেই। আর কোম্পানির খাতায় তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িদের যে দক্ষতার উল্লেখ পাই, তা যে শুধু ওপর ওপর শুধু নয়, তা পরোক্ষ সূত্রতো বটেই। তবে এই অপ্রতুলতম হাতের পাঁচ সূত্র ধরে কিন্তু আমরা এই অবয়বহীন বণিকদের অস্তিত্বে হাড় মাংস জুড়ে কাশিমবাজারের ব্যবসায়িদের একখণ্ড জীবন ও তাদের কাজকর্মের বয়ান তৈরি করতে সক্ষম হত। তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, যে নাম ধরে আমরা একজন একটি নামধারী মানুষের অবয়ব গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি, সে সময় এটাও মনে রাখা দরকার যে, হয়ত শুধু এই নামেই সে সময় কোন ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব ছিল না – কেননা সাধারণত ব্যবসায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নানান ধরণের কাল্পনিক নাম ব্যবহার করতেন।

এটা মনে রাখা দরকার যে ব্যবসায়ীর কথা আমরা আলোচনা করব এখানে, সেই ব্যবসায়ী কিন্তু তৃণমূলস্তরের পরম্পরার উতপাদক নন। বংশপরম্পরায় তার পরিবার দূরের গ্রামে বা আড়ং থেকে রেশমি বস্ত্র কিনে নিয়ে অবাঙ্গালি, অভারতীয় ব্যবসায়িদের সরবরাহ করার ব্যবসাটাই করছে মন দিয়ে, এবং আমাদের আলোচ্য সময়ে তারা তাদের এই ব্যবসায় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে জুড়ে নিয়েছে। ক্রেতা আর উতপাদকের মধ্যে সংযোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন এই বণিকেরা যাদের ইতিহাসে দাদনি বণিক নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের কাজ ছিল কোম্পানিগুলির সেই বছরের জন্য উদ্দিষ্ট পরিমান বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কিছু বৈচিত্রের নির্দিষ্ট পরিমানে রেশম কাপড় জোগাড়ের সিদ্ধান্তের ওপরে ব্যবসায়ীরা অগ্রিম নিতেন। বাঙ্গালির ব্যবসা পরিবেশে এটা বাংলার নিজস্ব ব্যবসা পদ্ধতি ছিল। সুরাটের বাজারের মত বাংলায় বাজারে গেলেই বিপুল পরিমান তৈরি করে রাখা বস্ত্র পাওয়া যেত না। যে বস্ত্র তৈরি করবে তাঁতি/উতপাদক, প্রত্যেকবার সেই বস্ত্রের দাম ঠিক করা হত অগ্রিমভাবে, দাদনি বণিকদের আনা নমুনা দেখে। এই তথ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে সুরাট যেভাবে ইওরোপিয় ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জুড়েছিল, বাংলা তখনও সেইভাবে জোড়ে নি(সে তার নিজের নিয়মেই ব্যবসা করে গিয়েছে, ব্যবসায়ীর দায় ছিল সে কিভাবে এই ব্যবস্থায় মানিয়ে নেবে তা ঠিক করা - অনুবাদক)।

প্রচুর কঠোর দরকষাকষির পর ঠিক হওয়া দামের অগ্রিম অর্থাৎ দাদন পেয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা সেই অর্থ তাদের অধীনে কাজ করা বিভিন্ন পাইকারদের মধ্যে বেঁটে দিত। পাইকারেরা বাংলার ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গ্রামে তাঁতিদের সেই অগ্রিম দিয়ে আসত। বাংলার উতপাদন এবং ব্যবসার চরিত্র যেহেতু ছিল যথেচ্ছ পয়সা ফেললেই চাহিদামত তৈরি বস্ত্র পাওয়া যেত না, ফলে তাঁতি না অন্যান্য পরম্পরার উতপাদকেরা সাধারণত সুরাটের মত বাংলায় বিন্দুমাত্র(কয়েকটি পেশা যেমন শাঁখারি – যাদের মূলত কাঁচামাল আসত বিদেশ থেকে - অনুবাদক) শহরমুখীন ছিল না, তারা তাদের উতপাদন কেন্দ্রে ডাঁট নিয়ে বসে থাকত, ব্যবসায়দের দায় থাকত তাদের কাছে উতপাদনের অগ্রিম পৌছে দেওয়া।

অগ্রিম পাওয়ার পর তাঁতিরা তাদের কাজ শুরু করত। তবে একটা বিষয় তাদের মানতে হত, সেটা হল, নির্দিষ্ট সময়ে(ইওরোপ থেকে আসা জাহাজ বন্দরে ভেড়ার আগেই) কোম্পানির কুঠিতে তাদের উতপন্ন দ্রব্য পৌঁছে দিয়ে আসতে হত, এবং ব্যবসায়ীরা হিসেবকরে তাদের বাকি অর্থ প্রদান করতেন। যে নমুনা ক্রেতাদের দেখানো হয়েছে, তার তুলনায় যদি গুণমানে কমা বস্ত্র সরবরাহ করত তাঁতিরা, তাহলে তার মূল্য সেই তুলনায় কমে যেত, বা আমরা খাতাপত্র দেখে বুঝতে পারছ কোম্পানি সেই চেষ্টাটাই করত। কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কোম্পানির খাতাপত্র ঘেঁটে রেশম ব্যবসার এই ধারণাটা আমরা পেয়েছি। আমাদের মনে করার কোন কারণ নেই যে, ডাচ বা ফরাসি অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি এই বাস্তবতার রীতিনীতির বাইরে কাজ করতে পারত।

অগ্রিম দেওয়া হত সাধারণভাবে ঠিক হওয়া দামের ৮০%, তবে তা নির্ভর করত কোম্পানির হাতে থাকা বিনিয়োগের পরিমান, রাজনৈতিক অবস্থা এবং আর কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর, এবং ব্রিটিশেরা এই রীতি উল্লঙ্ঘন বোধহয় করতে পারে নি বলেই আমাদের ধারণা। ১৭৩৩ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত কোরা রেশমের যে ব্রিটিশ বিনিয়োগের তালিকা রয়েছে তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি আগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৭৫ থেকে ৮৫% পর্যন্ত। ১৭৩৮এ এটা ছিল ৫৯%, শীতকালীন (নভেম্বরের) উতপাদনের ঠিক হওয়া মোট দামের ওপর। ১৭৫২ সালে এই হার প্রচুর কমে আসে, ব্যবসায়ীর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায়, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা আশংকা করে বেশি অর্থ দাদন দিলে তাদের বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দাদন নির্ভর করত যে সময়ে দরদাম করা হচ্ছে, সে সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর – যেমন হাতে কত বিনিয়োগ করার মত অর্থ রয়েছে, ব্যবসায়ীদের চাহিদা কি, মরশুমে কখন বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইত্যাদির ওপর। ১৭৪০ সালে শীতকালীন(নভেম্বর) উতপাদনে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৯৪-৯৫% পর্যন্ত।
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

যাদের না্ম দেখলে মনে হয় যে তারা হয়ত অবাঙ্গালি কিন্তু তাদের প্রথম নামটি কিন্তু বাঙালিদের মতই, অর্থাৎ তারা বাংলায় থেকে থেকে বাঙালিদের সঙ্গে সামাজিকভাবে কিছুটা হলেও মিলেমিশে গিয়েছেন। কোটামা বা কাটমারা হলেন কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে রেশম ব্যবসায় কাজ করা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী। যতদূর সম্ভব তারা বাংলার বাইরে থেকেই এসেছিলেন। তাদের অনেকের প্রথম নাম বেরুফি, বুলচাঁদ বা কিসেনচাঁদ থাকলেও একজনের নাম ছিল পঞ্চু বা শচী।

আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে অষ্টাদশ শতে এসে কোটমারা বিভিন্ন যায়গায় ঘুরতে ঘুরতে বাংলার কাশিমবাজারের কাছের সৈদাবাদের কাঠনাপাড়ায় থিতু হন। উত্তরভারতীয় এই গোষ্ঠীর বাঙালি সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়ার তত্ত্ব তাদের বংশকুষ্ঠীর তারিখগুলিতেও পড়েছে। জগতশেঠদের উত্তরপুরুষেরা আজ নিজেদের বাঙালি বলেন। যাইহোক তখন যে সব নাম ব্রিটিশদের বিনিয়োগের খাতায় ছিল তাদের উত্তরপুরুষেরা আজও বাংলায় বাস করেন, এরা হলেন, আচার্য, বিশ্বাস, বোস, চৌধুরী, কেয়ট, কবিরাজ, দাস, দে, দত্ত, গৌতম, ঘোষ, মল্লিক, পোদ্দার, পণ্ডিত, সেন, সরকার, শর্মা, সাহু এবং ঠাকুর। আজ এই দাদনি বণিকদের জাতি পরিচয় খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন।

কোথাও কোথাও জাতিবাচক উপাধি সহজে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কোপরি, কোটমা, দে, দাস, গৌতম, মল্লিক, পোদ্দার, পণ্ডিত বা সেন সরাসরি ব্যবসায়িক বা পরম্পরার উতপাদক পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাধি। বোসেরা বোঝা যায় সহজেই কায়স্থা। কেয়ট(কৈবর্ত), চাষী বা জেলে সম্প্রদায়। কবিরাজ উপাধি হয়ত পরম্পরার উতপাদক পরিবারের সঙ্গে আর সেনেরা ব্যবসার সঙ্গে এবং অথবা উতপাদনের সঙ্গে সঙ্গে এই দুটি সম্প্রদায় তাদের প্রাথমিক কাজের সঙ্গে বৈদ্যত্ব ব্যবসাতেও জুড়ে থাকতে পারে। আচার্য, শর্মা এবং ঠাকুর ব্রাহ্মণ, পরম্পরার উতপাদক এবং বিতরক ব্যবসায়ী পরিবারও হতে পারে। বিশ্বাস, চৌধুরী এবং সরকার মুসলমান সময়ের উপাধি, যারা বাংলার ভূমিরাজস্ব আদায়ের কাজে নিযুক্ত থাকত।

ফরাসীরা চৌধুরীদের জমি কেনার কাজে নিযুক্ত করত, বিক্রির কাজে নয়। দিয়ারদানকোর্ট, মাজারাম চৌধুরীকে ১৭২০ সালে ব্যবহার করছেন বড়কুইচিনপুরের জমি কিনতে; গৌরালি কেনা হয় ফরাসি কোম্পানির দেওয়ান গয়াপ্রসাদ চৌধুরীর মার্ফত আর মণিপুর কেনা হয় ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৭৭৩এ বক্সীধর চৌধুরী মার্ফত ৪৫১ টাকায়। এই একই কাজে একই উপাধির মানুষকে ব্যবহারে মনে হয় তারা একই পারিবাক শাখাপ্রশাখার অন্তর্গত ছিলেন।
কোম্পানির দেওয়ান বা দালালের সে যুগে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। বিভিন্ন ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলার রীতিনীতিতে যেহেতু অনভিজ্ঞ, সেহেতু তারা একটি নীতি গ্রহন করে যে, স্থানীয়ভাবে কাজ চালাতে তারা নির্ভর করবে স্থানীয় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের মানুষের ওপর, যাদের স্থানীয় সমাজের নানান বিষয়ের ওপর পকড় অনস্বীকার্য ছিল। ব্রিটিশেরা কাশিমবাজারে কোটমা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল আর ফরাসীরা চৌধুরীদের।

তারা তাদের ব্যবসায়িক সমাজে খুবই প্রভাবশালী ছিল। এই পরিবারের সদস্যরা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িই হতেন, এবং কোম্পানিগুলি এদের ব্যবহার করত স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির প্রভাব খাটানোর বা দরকষাকষির জন্য। দালাল বা প্রধান ব্যবসায়ীকে মাইনে দিয়ে রাখা হত অন্যান্য ব্যবসায়ীর ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য। কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িকে এই কাজে নিযুক্ত করা হত না এই ভয়ে যে, সে হয়ত নিযুক্ত কোম্পানির প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।

দেওয়ান আর ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা রেশম ব্যবসায় তাদের তুঙ্গে থাকা পণ্য সংশ্লিষ্ট দক্ষতাকে ব্যবহার করে তাদের আর্থিক ভবিষ্যত নিশ্চিত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছে এই ব্যবসায়ীরা। ১৭৪৪ সালে ব্রিটিশেরা যখন পরম্পরার রেশম ব্যবসায়ীদের ছেড়ে অন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করা যায় কি না ভাবতে শুরু করেছে, সেই সময় কোম্পানিকে দেওয়া এক প্রায়হুমকিভরা দাবি সনদে এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দাবি করে, যে নতুন ধরণের ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে অনুকূল দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না(তাদের মত দক্ষভাবে), ‘আমরা বাল্যকাল থেকেই রেশম ব্যবসার মধ্যে বেড়ে উঠেছি, আমরা যত শস্তায় দিতে পারব অন্যরা সেই (নিম্নতম)দামে দিতে পারবে না’।

আমরা দেখলাম কাশিমবাজারে দাদনি বণিকদের পরিবেশটাই হল হিন্দু (এখনও অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায় নি), এবং বাঙালি জাতসত্ত্বা আর বাঙালি সমাজউদ্ভুত বণিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত। অধিকাংশ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর, কেউ পরম্পরার উতপাদক কেউবা আবার কুসীদজীবি এমন কি রাজস্ব আদায়েরও ব্যবসায় জড়িত। এখন ব্যবসায়ি এবং সরবরাহকারী হিসেবে আমরা তাদের কাজ বিস্তৃতভাবে নজর দেওয়ার চেষ্টা করব।
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

চতুর্থ খণ্ড

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৬৮৫ কাশিমবাজার ব্যবসাকেন্দ্র(ফ্যাক্টরি) থেকে রেশম বস্ত্রের ব্যবসায় জড়িত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাদনি বণিকের গোষ্ঠীর(কার্টেল) নামের তালিকা পাচ্ছি এবং রেশম কেনার জন্য ১৭৫৪ সালে কোম্পানি এজেন্সি(দাদালি) ব্যবস্থা চালু না করা পর্যন্ত, এই দাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রে এই বণিকেরা দৃঢভাবে অবস্থান করেছে। কোটমা, দত্ত, বিশ্বাস, সুরমা, চৌধুরী, সরকার, কোপ্পারিও, ঠাকুর এবং ঘোষেদের নাম ১৭৫০ পর্যন্ত কোম্পানির দাদনি বণিকের তালিকায় প্রত্যেক বছর ঘোরাফেরা করেছে। ১৬৮৪এর বিনিয়োগের খাতায় যে সব উপাধি(sornem) পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ৫ জন বিশ্বাস, ২ চৌধুরী, ১ জন গস(ঘোষ), ১ জন কপ(রি?), ১ জন সরকার এবং ১ জন দত্ত। ১৭০১ সালে একজন করে ঘোষ, সুরমি এবং কোটমা ব্যবসায়ী কাশিমবাজারে ব্রিটিশ কোম্পানিকে কোরা রেশম সরবরাহ করছে। ১৭৫৪ সালে দাদনি ব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশেরা বেরিয়ে এসে এজেন্সি ব্যবস্থা চালু করবে, সে সময় অন্তত কাশিমবাজারে যে ১৮৬ জন দাদনি বণিকের নাম ব্রিটশদের খাতায় উল্লিখিত হয়েছে, তাদের মধ্যে উপরোক্ত উপাধিগুলির বণিকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।

আমরা জানিনা এই দাদনি বণিকেরা নিজেদের ব্যক্তিগত খাতায় ব্যবসাকার্য চালাতেন কি না। তারা সাধারণত কোম্পানির খাতায় ‘আমাদের ব্যবসায়ী’রূপে প্রতিভাত ছিলেন, একই সঙ্গে ফরাসি, ডাচ এবং ডেন কোম্পানির খাতায় কিন্তু তাদেরই নাম জ্বলজ্বল করছে, এবং এই কোম্পানিগুলির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সূত্র হিসেবে দাদনি বণিকেরা, নিজেদের লাভের গুড় বাড়াতে ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে রেশমের দাম কড়ায়গণ্ডায় বাড়িয়ে নেওয়ার দরকষাকষির সুযোগ পেয়েছে। ব্রিটিশ কোম্পানির খাতায় পাচ্ছি, দাদনি বণিকেরা ব্রিটিশদের খাতায় কাজ করতে করতে, ডাচ, ডেন, সুইড, পর্তুগিজ ইত্যাদি কোম্পানির এমনকি উত্তরভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও ফাঁকতালে ব্যবসা করে নিয়েছে দুপয়সা অতিরিক্ত কামাবার জন্য, যা ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বেআইনি ছিল।

আশ্চর্যের কথা ১৭৫৪র দাদনি ব্যবস্থা চালু থাকা পর্যন্ত ব্রিটিশদের কাশিমবাজারের ব্যবসাকেন্দ্রের বণিকদের নাম লেখা খাতায় একজনও মুসলমান ব্যবসায়ীর নামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি। হয়ত কাশমবাজারের দাদনি বণিকদের মধ্যে একজনও মুসলমান ছিলেন না, হয়ত তারা হুগলি বা পরের দিকে গড়ে উঠতে থাকা কলকাতায় জাহাজে মাল বোঝাই বা খালাসের কাজ করতেন। কিন্তু বেশ কিছু অবাঙ্গালি নাম যেমন কুশলচাঁদ, রতনচাঁদ এবং অন্যান্য রয়েছে কিন্তু তাদের নিয়ে কোন বিশদ বিবরণ নেই, আমরা হয়ত আন্দাজ করতে পারি, ওরা ছিলেন উত্তরভারতের গুজরাট বা রাজস্থানী বণিক, যারা সপ্তদশ শতে বিপুল সংখ্যায় এসে বাংলায় বসবাস করতেন। স্বরূপচাঁদের নাম তালিকায় রয়েছে, তার নামের সঙ্গে বাংলার ব্যাঙ্কার জগতশেঠের নাতি ফতেচাঁদের মিল রয়েছে।
(চলবে)

Monday, July 25, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

তৃতীয় খণ্ড

যে সব ব্যবসায়ীরা কাশিমবাজারের রেশম ব্যবসায়ে নিয়মিত খরদ্দার ছিলেন তাদের নিজস্ব একটা স্তরবিভক্ত দালাল গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে রপ্তানি বাজারের জন্য রেশম বস্ত্র কিনে আনত। ১৬৮০তে যখন এই রপ্তানি ব্যবসাটা শৃঙ্গে উঠতে শুরু হয় এবং ১৭৪০এ প্রায় শেষ হয়ে যায়, এই ৬০ বছরের মধ্যে সব থেলে লাভ করেছে এই দালাল গোষ্ঠী। যদিও ব্যবসাটা খুব ভালই চলত, কিন্তু সপ্তদশ শতে মুঘল সুবাদার, খেমচাঁদ, মুথুরাদাস এবং শুকানন্দ শাহের মত বড় পুঁজির ব্যবসায়ী এবং শ্রফেরা ব্যবসায় বেশ বড়সড় একচেটিয়া প্রবণতা কিন্তু তার মধ্যেই গজিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। এবং সিল্ক পিস গুডসএর একটি বৈচিত্র ব্যান্ডানোজএর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে ১৭৩০ সালে উঠেপড়ে লেগেছিল কাশিমবাজারের ব্রিটিশদের সব থেকে কাছের দালাল বালি কোটমা।
রেশম ব্যবসার শীর্ষ সময়ে উত্তুঙ্গ উত্তেজনার মধ্যেও ১৭০০ সালের পরের দিকে রেশম ব্যবসা কিছুটা থিতু হয়ে আসার লক্ষ্মণ দেখা দেয়। রেশমের ব্যবসাটা যেহেতু খুব দামি পণ্যগুলির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট থাকা কিছু পণ্য সপ্তদশ শতের শেষের দিকে এই এলাকার কিছু খুব বড় ব্যাঙ্কিং কোম্পানিগুলি এসে জমতে থাকে এবং উত্তুঙ্গ সুদের হার গড় ১৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসে গোটা অষ্টাদশ শতক জুড়ে। এবং ইওরোপিয় ব্যবসা যত বাড়তে থাকে, কোম্পানি আমলারা ব্যবসায়ীদের থেকে পণ্যদ্রব্যগুলি নগদ অর্থ দিয়ে কেনার চেষ্টা করতে থাকে। অষ্টাদশ শতে কাশিমবাজারে যে রেশমের ব্যবসায় ইওরোপিয়রা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কিন্তু কিছুটা হলেও অগ্রিম দিয়ে রাখতে শুরু করে যাতে তারা সঠিক সময়ে তাদের চাহিদা মত দ্রব্য সরবরাহ করতে পারে। এইভাবেই কিন্তু দাদনি বণিকদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল।
{তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত}
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী



তৃতীয় খণ্ড

কাশিমবাজারে বিশাল বিশাল হর্ম্যের কল্যানে তার পথগুলিতে দিনের উজ্জ্বল আলোতেও কোন দিন সুর্যের রশ্মি ছুঁত না, ফলে বড় ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে কাশিমবাজারের পরিকাঠামো তৈরি হয়েই ছিল। একদিকে এটি বাংলার রেশম উতপাদন অঞ্চলগুলির কেন্দ্রে ছিল, অন্য দিকে অষ্টাদশ শতকে এটি ভাগীরথী, পদ্মা আর জলঙ্গীর তৈরি দ্বীপগুলির ত্রিভূজের মধ্যিখানে অবস্থান করছিল। বাংলার খ্যাতি ছিল তার নদীপথের জন্য, বোধহয় বিশ্বে এ বাবদে তার তুলনা কেউই ছিল না, এবং বাংলার নদীপথগুলির মধ্যিখানে ছিল আমাদের আলোচ্য কাশিমবাজার। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ছিল, অষ্টাদশ শতের বাংলার রাজধানীর ক্রোশ দূরেই নবাবের টাঁকশালের খুব কাছেই অবস্থান ছিল কাশিমবাজার রেশম শিল্প কেন্দ্রের। ফলে রাজধানী আর  রাজসভার দালালদের নৈকট্যের সুবিধে পেয়েছিল কাশিমবাজারের রেশম ব্যবসা।

সপ্তদশ শতের পূর্বের কোন ঐতিহাসিক তথ্যে কাশিমবাজারের উল্লেখ পাওয়া যায় না। কয়েকটি পরস্পর সংযোগী কাকতালীয় ঘটনার ফলাফলের প্রেক্ষিতেই বিশ্ববাজারে ব্যবসায়িক কাশিমবাজারের উত্থান। ষোড়শ শতে পূর্ব ভারতের প্রধান বন্দর সাতগাঁয় পলি পরে মজে যাওয়া, সপ্তদশ শতে হুগলি বন্দরের মৃত্যু এবং অষ্টাদশ শতে কলকাতা তখনও কোম্পানির হাতে কলকাতা বন্দর না হয়ে ওঠার মাঝামাঝি ধূসর সময়েই কাশিমবাজার তার বাণিজ্য স্বাক্ষর পেশ করে। সেই সময়ে বাংলার ব্যবসাবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছে কাশিমবাজার। মুর্শিদাবাদ যখন বাংলার রাজধানী হয়ে উঠেছে, তার ব্যবসায়িক বন্দর হিসেবে বিপুল ব্যবসা দেওয়ার কাজ করে গিয়েছে কাশিমবাজার। 

সপ্তদশীবং অষ্টদশ শতে কাশিমবাজারে বিপুল ব্যবসাবাণিজ্যের উত্থান ঘটেছে। ভারতের এনং বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তের ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ব্যবসায়ির সঙ্গম হত কাশিমবাজারে – কাশ্মীরি, থেকে গুজরাটি থেকে পারসি থেকে তুর্কি ব্যবসায়িদের ভিড় লেগেই থাকত এই শহরে। নদীর ধারের অসম্ভব কারুকার্যময় হর্ম্যগুলি এই বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যর অন্যতম সাক্ষ্য ছিল।

কাশিমবাজারের এবং তার পরিবেশ সারা বছর ধরে বিপুল পরিমান রেশম উতপাদন করতে পারত। কাশিমবাজারের রেশম বস্ত্রের উতপাদন ক্ষমতা নিয়ে তাভার্নিয়ের মন্তব্য যদিও কিছুটা অতিরঞ্জিত, এবং আমাদের সক্কলের জানা, তাই আর এখানে সেটি নিয়ে বাক্যব্যয় করছি না(ডারমিগনি বলছেন তাভার্নিয়ে বাংলায় এসে দেখেন কাশিমবাজার ২২ হাজার বেল রেশম বস্ত্র উতপাদন করছে। প্রত্যেক বেলের ওজন ১০০ পাউন্ডের কাছাকাছি। মোট উতপাদন হয়ত ৩১ লক্ষ পাউণ্ড যার মধ্যে ৩ থেকে চার লক্ষ পাউণ্ড ক্রয় করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি। ইওরোপিয় ইন্সট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলির মধ্যে ডাচেরাই সব থেকে বেশি রেশম ক্রয় করত এবং মোট উতপাদনের একতৃতীয়াংশ ৬০০০ থেকে ৭০০০ বেল কিনে নিত ভিওসি। তাদের ইচ্ছে থাকত আরও আরও বেশি কেনার কিন্তু ভারতীয় এবং অন্যান্য এশিয় ব্যাপারীদের সঙ্গে তারা খুব বেশি পেরে উঠত না। মনে রাখতে হবে ব্রিটিশেরা কোরা রেশমকে ওজন করেছে ১৬ আওন্সের বদলে ২৪ আউন্সে)। কোরা রেশমকে কয়েকটি মরশুমি উতপাদনে ভাগ করা যেত নভেম্বরের উতপাদন(সবথেকে ভাল), মার্চেরটি, তার পর জুন জুলাইএর(সব থেকে খারাপ)। এছাড়াও গুজরাট নামে এক প্রকার বস্ত্র উতপাদন করত, ব্যবসায়িকভাবে গুজরাটে যেত, আর ছিল কুমারকুলি রেশম, তৈরি হত কুমারখালিতে আর সব থেকে দামিটির নাম ছিল পাঞ্জিপুর রেশম, এই শেষতম উতপাদনটি মাঝেমধ্যেই ইওরোপিয়রা কিনত(কেউ কেউ একে গুজরাটও বলেছেন, কিন্তু এই দুটি বৈচিত্রকে কোম্পানিগুলির বার্ষিক ইনভেস্টমেন্ট তালিকায় আলাদা শীর্ষক করে দেখানো হয়েছে)। এছাড়াও ছিল রেশমসুতি মিলেমিশে কটন সিল্ক গুডস, এবং বেশ মোটা কোরা আর দোসুতি। বিনিয়োগ হত কোরা রেশম শীর্ষকে, সিল্ক পিস গুডস, কোরা আর দোসুতি, শেষ দুটিকে একসঙ্গেই ধরা হত। এই সবগুলিই চাহিদাবন্ত রেশম পণ্য ছিল, বিশেষ করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির কাছে। এতা পরিষ্কার কাশিমবাজারের যে সব থেকে দামি রেশমটি ব্রিটিশ কোম্পানির বিক্রিতে দাম পেত না, বরং সেটি যে শেষ দুটি বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করা গিয়েছে একটু আগে তার ৩০% থেকেও কম দামে বিক্রি হয়েছে লন্ডনের বাজারে। ব্রিটিশদের চাহিদা অনুযায়ী যে ধরণের প্রক্রিয়া করা হত সব থেকে ভাল রেশম বস্ত্রটি, তার জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রিতার জন্যই পণ্যটি অন্যান্য পণ্য বৈচিত্র্যে দামের প্রতিযোগিতার সঙ্গে পেরে উঠত না। ফলে বাজারে খুব সহজে বিক্রি হত মাঝারি ধরণের দামের কোরা রেশম। এই তথ্যটা আমরা হয়ত সবাই জানি যে পূর্ব-দেশিয় বাজারে চিনের পরে যে ভৌগোলিক অঞ্চলটি সব থেকে বেশি বৈচিত্রের এবং দামের রেশম উতপাদন করত তার নাম কাশিমবাজার। 
(চলবে)

Sunday, July 24, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

দ্বিতীয় খণ্ড

ইওরোপিয়দের কাছে রেশম ছিল নতুনতর পণ্য। এই নতুন পণ্যের ব্যবসার প্রথম দিকে ডাচেরা ছিল একমাত্র বিদেশি। এবং রেশম ব্যবসাই ডাচ কোম্পানির লাভের ভাগ্য ফেরানোর অন্যতম কারিগর। ১৬২০ সালে তারা বাংলার উপকূলে একটি বাহিনী পাঠিয়ে সেখানে একটি বাণিজ্য কুঠি তৈরি করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করল। বাংলায় তার রেশমের ব্যবসাই শুরু হল বছরে ১৫০০০-২০০০০ পাউণ্ডের রেশম বস্ত্র দিয়ে। ১৬৩৫-৪০ সালে দাঁড়াল বছরে ৫০০০০ পাউন্ড, ১৬৫০ সালে ২ লক্ষ পাউণ্ড। ১৬৫৪ সালের পর কেনার গড় থিতু হল বছরে ১ লক্ষ পাউন্ডে। সেই শতের সাতের এবং আটের দশকে কিছুটা কমতে শুরু করল ডাচেদের রেশম কেনার ধুম। যখন তারা নতুন করে ফিরে এল, তখন কিন্তু তারা এই পণ্যটি ব্রিটিশদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে কিনেছে। এই সময়ে ডাচেরা বাংলার রেশম জাপান থেকে হলন্ডে রপ্তানি করেছে। ১৬৯৩-৯৪ সালে ডাচেদের ভারত থেকে রপ্তানি করা পণ্যগুলির মধ্যে বাংলা থেকে কেনা পণ্যই সব থেকে বেশি ছিল ৫৭.৮শতাংশ(যার মধ্যে বাংলা সুবার পাটনার সরকার সারণের সোরাও একটা বড় পণ্য ছিল - অনুবাদক) এবং জাপানে পাঠানো পণ্যের মধ্যে বাংলার পণ্যের অংশিদারি ছিল ৩৭.৩ শতাংশ।

ব্রিটিশ কোম্পানিও ডাচেদের খুব বেশি পিছনে ছিল না। ১৬২০ সাল নাগাদ সুরাট পণ্যের ওপরে নিজেদের নির্ভরতা কমাতে হুঘি আর পার্কারের নেতৃত্বে বাংলায় একটা বাণিজ্য মিশন পাঠায় তারা। তাদের কাজ ছিল বাংলা-বিহারের পণ্যগুলির মূল্যমান নির্ধারণ করা।

এই মিশনটি খুব সফল হয় নি, কেন না তাদের অধিকাংশ সুপারিশই সুরাটের উচ্চ আধিকারিকেরা বাতিল করে দিয়েছিলেন। অথচ ব্যবসায়িকভাবে কিন্তু হুঘি আর পার্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্য আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন – সেগুলির মধ্যে অবশ্যই রেশম ছিল। তাদের সুপারিশ ছিল বাংলার মুর্শিদাবাদের পরিবেশে খুব ভাল রেশম তৈরি হয় এবং সর্বভারতীয় দামের তুলনায় এখানে কম করে ২০% কম দামে রেশম বস্ত্র কেনা যায়। তাদের এই সুপারিশে পরের ৩০ বছর ধরে ধুলো জমবে, যতক্ষণনা ১৬৫৮ সালে ডাচেদের পিছন পিছন ব্রিটিশেরা কাশিমবাজারে তাদের গুদাম খুলছে।(১৬৬৪-১৬৮৫ পর্যন্ত এই নব্য পণ্যে ব্রিটিশ বিনিয়োগের নানান ওঠানামা হয়েছে। ১৬৮০তে কোর্ট অব দ্য কমিটি তাদের কর্মচারীদের নির্দেশ দেয় বাংলায় রেশম ব্যবসায় বিনিয়গের পরিমান বাড়াতে। তারা জানায় কোম্পানির সবথেকে বড় দুটি-তিনিটি রপ্তানি জাহাজ ভর্তি করে যদি রেশম ইওরোপে পাঠানো যায় তাহলে কোম্পানির লাভের ওপর কোন চাপ পড়বে না)।

১৬৮১ সালে বাংলায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার স্টার্লিং বাংলায় বিনিয়োগ(পণ্য কেনার পরিমানটাকে ইওরোপিয়রা বিনিয়োগ বলতেন) করে ব্রিটিশরা, যার মধ্যে ১ লক্ষ ৪০ হাজার পাউণ্ড বিনিয়োগ ছিল শুধু কাশিমবাজারের ব্যবসায়। ১৬৯৮তে ইতালি এবং ফ্রান্সের রেশম উতপাদন ব্যহত হওয়ায় লন্ডনে বাংলার রেশম সর্বোচ্চ দামে বিকোল। ১৭০০ থেকে ১৭৬০ পর্যন্ত মোটামুটি বার্ষিক একই গড় হারে বাংলার রেশমই ইওরোপে আমদানি করেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রেশমের উতপাদন সত্ত্বেও ১৭৩০ সাল নাগাদ কাশিমবাজার থেকে সব থেকে বেশি পরিমান রেশম বস্ত্র কিনতে শুরু করে ব্রিটিশরা। ১৭৩৯ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের০ দাদনি বণিকদের মোট অগ্রিম দেওয়ার পরিমান ছিল ১৯১৭৫০ পাউণ্ড, অন্যদিকে ঢাকার ব্যবসায়ীদেরকে অগ্রিম দেয় ১২২৫২৬ পাউন্ড। একশ বছর আগে লিযঁ ইওরোপের সব থেকে বড় রেশমের বাজার ছিল, ডাচেদের বাংলা রেশম ক্রয়ের বিপুল উদ্যমে সেই ব্যবসার কেন্দ্রস্থল লিয়ঁ থেকে সরে গিয়েছিল আমস্টার্ডামে; কিন্তু বাংলায় আস্তে আস্তে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ডাচে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি সাফল্য পেতে শুরু করায় ক্রমশ ডাচেদের রেশম ব্যবসায় ইওরোপিয় আধিপত্য মার খেতে শুরু করে, শেষমেশ ১৭৩০-৪০এর দশকে আমস্টার্ডাম থেকে ইওরোপের রেশম ব্যবসার কেন্দ্রস্থল সরে এল লন্ডনে।

ফরাসি কোম্পানিও বাংলার রেশম ব্যবসায় পিছনে পড়ে থাকল না। ১৬৬০ সালে বার্নিয়ে ফরাসি কোম্পানিকে বাংলার রেশম ব্যবসায় আর বেশি মন দিতে বলছেন, তার মতে বাংলার রেশম লন্ডনে বিক্রি হওয়া ইওরোপিয় রেশমের তুলনায় বেশ উত্তম, কিন্তু সিরিয়ার রেশম থেকে একটু কমা। ১৬৮০ সাল নাগাদ সব কটি কোম্পানিই কাশিমবাজারের তাদের ব্যবসায়িক দপ্তর খোলে – খোদ কাশিমবাজারে যায়গা নেয় ব্রিটিশেরা, কালকাপুরে ঘাঁটি স্থাপন করে ডাচেরা আর আর্মেনিয়দের দেখাদেখি ফরাসিরা সৈদাবাদে বিশাল একটা বাগান সহ ভিলা স্থাপন করে।
{দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত}
(চলবে)

Saturday, July 23, 2016

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

দ্বিতীয় খণ্ড

বাংলার মূল বৈদেশিক বাণিজ্যিক পণ্য ছিল রেশম আর সুতি বস্ত্র এবং ইতিহাস প্রমান দাদনি বণিকেরা এই সব পণ্য নিজেরা সংগ্রহ করতেন। যদিও সুতি বস্ত্র এই উপমহাদেশের বহু স্থানে তৈরি হত, কিন্তু সেগুলির মধ্যে বাংলার তুলনায় করমণ্ডলের বস্ত্রের চাহিদা বেশি ছিল, কেননা সেগুলির দাম কম ছিল এবং সেগুলি ইন্দোনেশিয়া এবং মালয় দেশগুলিতে এবং আফ্রিকার উপকূলের দেশ সমূহে রপ্তানি করা হত। বাংলার সুতি বস্ত্রের মধ্যে মসলিন ছিল বিশ্ববিখ্যাত এবং সোনারগাঁও জেলার ঢাকায় এটি খুব গুণমানে ভাল তৈরি হত। এগুলি বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে উচ্চদামে বিক্রি হত। সপ্তদশ, অষ্টদশ শতে ইওরোপিয় কোম্পানিদের পক্ষে এই বিস্তৃত ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেই দ্রব্য এই উপমহাদেশের ধনীদের মধ্যে বিক্রি করা খুব একটা সহজসাধ্য কাজ ছিল না।

কিন্তু সারা বিশ্বে রেশম পণ্য হিসেবে উচ্চদামে বিক্রি হয়, দূরব্যবসার ক্ষেত্রে এটি খুব উপযোগী পণ্য। এশিয় স্থলপথ ব্যবসায় বহুকাল ধরে রেশম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, যেহেতু হাল্কা ফলে বয়ে নিয়ে যাওয়ার উপযোগী এবং দামি – প্রায় বিশ্বের সব এলাকায় দামও ব্যবসায়ীর চাহিদামত পাওয়া যায়। ১৬৫০ পর্যন্ত বাংলার রেশম একমাত্র ভারতের বাজারেই বিক্রি হত, একাংশ গুজরাটে রপ্তানি হয়ে সেখানে সূচী কর্ম করে সেগুলি দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বিক্রি হত – এবং তার কিছু নমুনা আজও ইওরোপের নানান জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে।

সপ্তদশ এবং অষ্টদশ শতে বাংলা থেকে ইওরোপে যাওয়া পণ্যগুলির মধ্যে রেশম মধ্যমণি ছিল। হয়ত কোন বিশেষ প্রয়োজনে কোম্পানিগুলি বাংলার রেশম বস্ত্র ইওরোপ এবং মধ্য এশিয়ার বাজারে পাঠিয়েছে।

সপ্তদশ শতের প্রথম দুই শতে ইওরোপের রেশম বস্ত্রর বড় বাজার ছিল ইতালি, ফ্রান্স এবং লিয়ঁ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ১৬১৯-২২এর সঙ্কট এবং ইতালিতে মন্বন্তর ঘটায় ১৬২০ থেকে ইতালিয় রেশম বস্ত্রের দাম বাড়তে থাকে এবং ১৬৬৪ সালে দেখা যায় এটি আর ব্যবসার কাজে লাভ জনক হচ্ছে না। ফলে রেশমের বাজার দেখার চেষ্টা চলল, সেই স্থান নিল পারস্য। এবং পারস্যের রেশম ১৬৫০ পর্যন্ত ইওরোপে ভাল ব্যবসা করেছে। কিন্তু তার পরের সময়ে পারস্যে রাজনৈতিক ডামাডোলে রেশমের ঘাটতি দেখা দেয় এবং তা চলে অষ্টাদশ শত পর্যন্ত। পূর্ব সমুদ্রে রাজ করা ডাচ ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা করল পারস্যের রেশমকে চৈনিক রেশম দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার, কিন্তু হঠাতই বাংলার পশ্চিমপ্রান্তে চিনের তুলনায় অনেক শস্তার রেশম বস্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেল, যার কেন্দ্র হল সে সময়ের বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার।
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা

রীলা মুখার্জী

এমনকি সমুদ্রে এবং স্থলপথের বহু বাজারও ক্রমশ ব্যবসায়ীদের হাতের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতের প্রথম দিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পূর্ব উপকূলের করমণ্ডলগামী বাংলার ব্যবসায়ীদের টক্কর দিতে শুরু করে। পশ্চিম উপকূল কিছুটা হলেও উন্মুক্ত এলাকা ছিল, কলকাতার নৌবহর মাদ্রাজ, ডাচ, পর্তুগিজ এবং বাংলার বাণিজ্যিক নৌবহরগুলির সঙ্গে ব্যবসায়িক পাল্লা দিত। মালদ্বীপের দিকের বাণিজ্যপথেই একমাত্র ইওরোপিয়রা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত না।
১৭৪০ নাগাদ সিয়াম এবং মালয়ের খুব পুরোনো বাজার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে, এবং পরের শতের দিকে ব্যবসার জোরটা পশ্চিমের থেকে পূর্বের দিকে সরে আসছে নতুন বাজারের দিকে, নতুন পণ্য সম্ভার সম্বল করে, নতুন ব্যবসায়িক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সম্পর্কে একটাই কথা বলা যায় বার বার তারা একের পর এক সুযোগের অপচয় ঘটিয়েছে। শত শত বছরের অস্থির রাজনৈতিক অব্যবস্থা এবং ভিন্ন ধর্মের শত্রু রাজশক্তি তাঁকে শিখিয়েছিল খুব বেশি ঝুঁকি না নেওয়ার কথা। সুলতানি আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাণিজ্যিক নানান সুযোগ সুবিধে এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে নির্বাসিত মুসলমান ব্যবসায়ীরা। তাদের পরে নানান বাণিজ্যকর্মের যায়গাটি দখল করেছে বড় পুঁজির পর্তুগিজ, গুজরাটি, ডাচ এবং ব্রিটিশ ব্যবসায়ী। অবাঙ্গালি ব্যবসায়ীদের তুলনায় বাঙালি ব্যবসায়িদের একটা বড় সুবিধে ছিল, পশ্চিম এবং উত্তরভারতের তুলনায় বাংলা ছিল বিপুল বড় গ্রামীন এলাকা, বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক কারণের জন্য শহর ছিল ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের ভূখণ্ড, এবং পরম্পরার উতপাদকেরা শহরে প্রায় বসবাসই করত না। উতপাদন এবং বস্ত্রশিল্পীরা বাংলার গ্রামীন ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়েছিল এবং এই ব্যবসায়ীরা তাদের প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সেই সব উতপাদকেদের তৈরি পণ্য নিয়ে আসার কাজ করত। যেহেতু সারা বিশ্ব বাংলার ব্যবসায়ীদের সংগৃহীত পণ্যের জন্য উন্মুখ ছিল, তাই তাকে কষ্ট করে আর বাণিজ্যের জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে হয় নি, সে গদিতে বসে বসেই ব্যবসা করতে পারত। গড় ব্যবসায়ী বৈদেশিক বাণিজ্য, পণ্য আনা-নেওয়া এবং দূরদেশের বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজ অন্যদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজের দেশের পণ্য সংগ্রহের কাজটি নদীমাতৃক দেশের মানুষ হয়ে নদীতে বহন করে সংগৃহীত করতে পারত। বাংলার বণিক করমণ্ডল উপকূলের বণিকদের মত মূলত ছিলেন সংগ্রাহক, সরবরাহকারী – যাদের ব্রিটিশ বণিকেরা কলতেন ‘দাদনি’ বণিক।
(প্রথম খণ্ড শেষ)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা

রীলা মুখার্জী

৩) আর দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয় দেশগুলির বাণিজ্য বিষয়ে কথা বলতে গেলে বলা যায়, বাংলা এমন সময়ে মোগল সুবার অন্তর্গত হয়ে গেল, যখন এই সব দেশগুলির একের পর এক সমুদ্র বন্দর তাদের সামনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
১৫১১য় মালাক্কা পর্তুগিজেরা দখল করায় বাংলা থেকে টম পিরেস আচে এবং পাসেতে ব্যবসা করার জন্য বাংলার ব্যবসায়ী মনোনীত করতে থাকলেন। মালাবার, ক্যাম্বে, পোগু, টেনাসরিন, আচে, সিংহল, এমন কি মালাক্কাতে যে সব বাংলার ব্যবসায়ী ব্যবসা করতেন তাদের বলা হর বার্বোসা। পর্তুগিজেরা তাদের আগের নীতি মুসলমান ব্যবসায়ীদের আক্রমন করার যে নীতি নিয়েছিল, সেটা বাতিল করায় ১৫৯৯ সালে আচেতে বাঙ্গালি ব্যবসায়ীদের বসতি গড়ে উঠল।
১৬৪০এ পর্তুগিজেরা আরাকান দখল করায় বাংলার ব্যবসায়ের পালে আর বেশি হাওয়া বইতে শুরু করল। কিন্তু বাংলায় পর্তুগিজেদের ছেড়ে যাওয়া ব্যবসা দখলের ডাচেদের চেষ্টা আঘাত পেতে থাকে বিশাল সংখ্যায় মুসলমান ব্যবসায়ী এবং জাহাজ মালিকদের ব্যবসার ব্যপ্তিতে।

এই সময়ে পিয়েত্রো দেলা ভালা বলছেন বাঙালি ব্যবসায়ীরা মালদ্বীপে ব্যবসা করছে। মধ্য সপ্তদশ শতে বাঙালি ব্যবসায়ীরা বর্মা এবং থাই বাজারে ঢুকছেন মার্গনি এবং টেনাসেরিন হয়ে, এবং সেই শতের শেষের দিকে টামাস বাউরি বলছেন হুগলিতে বিশাল সংখ্যক নৌবাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কথা।
চিন্তানন, খেমচাঁদ বা মথুরদাসের মত বাঙালি ব্যবসায়ীদের কথা বলেছেন সুশীল চৌধুরী, কিন্তু ১৬৮০ নাগাদ বাংলার নৌবাণিজ্যের পতন শুরু হয়ে গিয়েছে। সুবাদারেরা নিজেদেরকে নৌব্যবসার অংশিদারি থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন, বাংলার নবাব নৌউদ্যমে বিন্দুমাত্র উতসাহ দেখাচ্ছেন না। ফলে বাঙালি ব্যবসায়ীরা রাজসিক নৌবহরগুলি হারালেন, উপরন্তু সুরাটি ব্যবসায় একটাও বহর বানাতে পারলেন না। ফলে সপ্তদশ শতকে তার একটাই উদ্দেশ্য বিভিন্ন কোম্পানির জাহাজে মাল পাঠাবার উদ্যম নেওয়া। বিশাল সুবাদারি জাহাজগুলি ব্যবসা থেকে নিজেদের তুলে নেওয়ায় কলকাতার জাহাজগুলি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে এল।

নৌবাণিজ্যের পতন যে শুধু বাংলায় হয়েছে, এমন মন্তব্য করা ঠিক হবে না, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে নৌবাণিজ্যের পতনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ১৫১১র পর্তুগিজদের মালাক্কা দখল মালয় বাণিজ্যে নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করল, এশিয়ার সামগ্রিক আন্তর্জাতিক নৌবন্দরের একতা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পাসে, আচে, জোহর, ব্যান্টাম, ব্রুনেই এবং মাকাসসারের মত ছোট ছোট বন্দরগুলি নিজের মত করে পূর্বের সামগ্রিক মালাক্কা ব্যবসার রীতি টানার চেষ্টা করতে লাগল। ষোড়শ শতে যখন পর্তুগিজেরা নতুন করে মুসলমান মালাক্কায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, বহু নতুন বাণিজ্য পথ খুলে গিয়েছেঃ একমাত্র মার্গুই, টেনাসেরিম, পাটানি, ব্যান্টাম এবং আচে এই উথালপাথালে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারল।
 
এইকটি বন্দর কিন্তু সপ্তদশ শতে মালাক্কা ব্যবসায় যে স্থান হারিয়েছিল, সেই স্থান পূরণের চেষ্টা করতে লাগল। ইস্কান্দার মুদার নেতৃত্ব আচে গড়ে উঠল বিপুল ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে। ১৬৩৬এ মৃত্যুর পর ডাচেদের বিরোধিতা সত্ত্বেও আচের রাণী চেষ্টা করে গিয়েছেন আচে বন্দরকে মুক্ত বন্দর হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখার। ১৬৩২ সালে বাংলা থেকে পর্তুগিজেদের বার করে দেওয়ার পরে বাংলার বহির্বাণিজ্যে যে উতসাহ দেখা দিল, ১৮৩৬সালে আচের পতনের পরে সেই বাণিজ্য বৃদ্ধি সম্ভাবনা বাধাপ্রাপ্ত হল।

সপ্তদশ শতে ডাচেদের এই অঞ্চল - ১৬৪১এ মালাক্কা, ১৬৬৩তে মলুকাস, ১৬৬৭তে টিডোর, ১৬৬৯তে গৌয়া এবং ১৬৮২-৮৪তে ব্যান্টাম দখল করায় এই অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার নৌ বাণিজ্য সম্পর্ক প্রায় চ্ছিন্ন হতে বসে। এই সময়ে জোহর, খেদা এবং পেরাকের মত ছোট ছোট বন্দরের উত্থান ঘটে, এবং মালাক্কা, আচে এবং বান্টামের মত বড় বন্দর হাতের বাইরে গেলেও পূর্বেরগুলি সান্ত্বনা পুরস্কারের মত থেকেই যায়।

ফলে সপ্তদশ শতের দ্বিতীয় পর্বে বাংলার সঙ্গে নৌবাণিজ্য কর্ম ইন্দোনেশিয়া এবং মালয় অঞ্চল বাদ দিয়ে সংহত হয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বার্মা এবং থাইল্যান্ড অঞ্চলে। এই অঞ্চলগুলির মধ্যে বাংলার নৌবণিকেরা আচে, কেডা, জোহর, আরাকান, পেগু, টেনাসেরিম এবং আয়ুথিয়ার সঙ্গে করমণ্ডল, মালাবার, মালদ্বীপ এবং সিংহলেও ব্যবসা করত।
(চলবে)

কাশিমবাজারের ইতিহাসঃ রেশম ব্যবসায়ী এবং অষ্টাদশ শতের ব্যবসা - রীলা মুখার্জী



২) ফলে সপ্তদশ শতকে বাংলার অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে মুঘল অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়ল। স্থায়ী সরকার এবং যোগাযোগের সুবন্দোবস্ত ব্যবসায় গতি আনল। মুঘল সাম্রাজ্য বাংলার প্রান্ত এলাকাগুলি দখল করায় চেষ্টায় চট্টগ্রাম তাদের অধিকারে এল।
Le Chine l'Occident. Le Commerce a Canton নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বইতে LOUIS DERMIGNY  অসাধারণভাবে দেখিয়েছেন বিষুবরেখা ধরে মগ-আরাকান-পর্তুগিজদের যে হার্মাদি চলছিল, সেটি আদতে ক্যারিবিয় এলাকা থেকে পূর্বপ্রান্তের সমুদ্র(ফার ইস্টার্ন সি’জ) পর্যন্ত হার্মাদির একটি অংশমাত্র। পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম মুঘল অধিকারে যাওয়ায় বাংলায় সেই দীর্ঘ হার্মাদি পরিবেশের অবসান ঘটল। আমরা দেখতে পেলাম আরাকান সমুদ্র বাণিজ্য বাংলার বাণিজ্য কর্মে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
কিন্তু সপ্তদশ শতের শুরুতে পর্তুগিজদের রমরমার কারণে বাংলার বাণিজ্যের রাশ বাঙ্গালি এবং অন্যান্য ভারতীয় বণিকের হাত থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আরাসারত্নম আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন(৩-৪ পাতা পড়া যাচ্ছে না)
১৬৩২ সালে মুঘল সেনা পর্তুগিজদের হুগলি থেকে নির্বাসিত করায় বাংলায় পর্তুগিজ অর্থনীতিতে বিপুল আঘাত আসে। হুগলি, পিপলি এবং বালেশ্বর বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুরু করে।
বাংলার বেশ কিছু বন্দরেই বড় বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে, এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী বন্দর প্রশাসনও গড়ে ওঠে। বাংলার চিনি গেল পশ্চিম এশিয়া্য, কোরা রেশম(র’ সিল্ক) গেল জাপানে এবং বিভিন্ন খাদ্যশস্য আর ভোজ্য তেল গেল ভারতীয় বিভিন্ন উপকূল এলাকায়, যেখানে এগুলির ঘাটতি প্রকট ছিল।
কিন্তু বাংলার বাঙালি ব্যবসায়ীরা নতুন খুলে যাওয়া এই বাণিজ্যে অংশগ্রহন করতে খুব একটা উতসাহী হলেন না। ফলে বাংলায় গুজরাটি ব্যবসায়ীদের ঐতিহাসিক আগমন আরো তীব্র হল। করমণ্ডল বন্দরকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি বাংলা-সুরাট ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করল। এই ব্যবসাটাও সরাসরি আর বাঙালির হাতে থাকল না, গুজরাটি ব্যবসায়ীদের দালাল হিসেবে কাজ করতে শুরু করল বাঙালি ব্যবসায়ীরা। ১৬৮০ সালে মুঘল সাম্রাজ্য গোলকুণ্ডা দখল করায় যতদূরসম্ভব অধিকাংশ পার্সি-আরব ব্যবসায়ী বাংলায় পালিয়ে এলেন। সপ্তদশ শতের মাঝখান থেকে আমরা দেখব যে, অধিকাংশ বাণিজ্যের আর জাহাজের অংশিদারির একাংশ ছিল বাংলার সুবাদার আর তাদের দালাল(সাইডকিক)দের নিয়ন্ত্রণে। ইওরোপিয়দের কথা বলতে গেলে, ১৬৩০ সাল থেকে পর্তুগিজদের বাংলার ব্যবসা থেকে হাঠিয়ে দেওয়ার পর থেকে, পর্তুগিজেরা বাংলার ব্যবসা যেখানে ছেড়ে গিয়েছিল, ডাচেরা সেই শূন্যাস্থান পূরণের চেষ্টা করতে থাকে।
অষ্টাদশ শতকে ব্যবসার পরিবেশ পাল্টাতে থাকে দ্রুত। মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে মুর্শিদকুলি খাঁ দেখতে পেলেন পশ্চিমের দিকের বিপুল বাণিজ্য সম্ভাবনা। ফলে বাংলার রাজধানী পূর্বের ঢাকা থেকে মুকসুদাবাদে সরে আসায় মধ্য সপ্তদশ শত থেকে পূর্ব দিকে বাণিজ্যর দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। বড় পুঁজির ব্যাঙ্কার জগত শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মাণিকচাঁদ বাংলায় কুঠী তৈরি করলেন এবং তার পর থেকে বাংলার রাজনীতি এবং ব্যবসায়ে জগত শেঠেদের আধিপত্য প্রশ্নাতীতভাবে শুরু হল। মুঘলদের বাংলা দখল করার পর এই প্রথমবার বাংলায় নতুন ধরণের রাজসভার রীতিনীতি গড়ে উঠল। সপ্তদশ শতের শেষের দিকে করমণ্ডল উপকূলের ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ আর ইয়েমেন আর পারস্যের পতনের পরে সুরাটের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতির ঘটার সুযোগ গ্রহণ করে বাংলার বাণিজ্য। ???(১৭ টা পড়া যাচ্ছে না)
কোন এক অজ্ঞাত কারণে অষ্টাদশ শতকে মুঘল নৌপোতগুলি বঙ্গোপসাগর থেকে তুলে নেওয়া হল। ফলে যে শূন্যস্থানটি তৈরি হল, সেটি দখল করল ব্রিটিশ শক্তি ডাচেদের ওপরে টেক্কা দিয়েই।
(চলবে)