Showing posts with label ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক. Show all posts
Showing posts with label ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক. Show all posts

Tuesday, July 17, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৫ - উইলিয়াম জোনস ভদ্রলোক চরিত্রের জন্ম - অমেট্রোপলিয় তথ্যসংগ্রহঃ একটি সামাজিক ইতিহাস



বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন পেশাদারদের কোম্পানির উপনিবেশে তথ্য সংগ্রহে আর প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত করতে স্কটল্যান্ডের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চোখ ফেরাতে হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের egalitarian Presbyterian পরম্পরায় বহু স্কটিশ, ব্রিটিশদের তুলনায় অনেক কম বয়সেই বেশি বেশি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। এছাড়াও স্কচ দেশের বিদ্যালয়ী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ইংলন্ডের তুলনায় অনেক বেশি ছড়ানো ছিল - যদিও পড়ানো হত ল্যাটিন আর গ্রিক ইতিহাস, কিন্তু এ ছারাও ছিল দেশিয় ইতিহাস, সমুদ্রযাত্রাবিদ্যা, ভুগোল, অঙ্ককষা আর প্রাকৃতিক আর নৈতিক দর্শন। কিন্তু স্কল্যান্ডের পক্ষে এই বিপুল পরিমান শিক্ষিত যুবাকে চাকরি দেওয়া সম্ভব হত না, ফলে তারা পাশের দেশ ইংলন্ড এবং অন্যান্য এলাকায় অভিবাসিত হত। বিপুল সংখ্যায় স্কচ পেশাদার কোম্পানির বাড়তে থাকা উপনিবেশের চাকরি যেমন প্রযুক্তিবিদ, সেনা, পশুচিকিতসক, রাজদূত, ডাক্তার এবং প্রকৃতিবাদী হিসেবে যোগদান করতেন। মনে রাখা দরকার কোম্পানির উপনিবেশগুলিতে অধিকাংশ স্কচ দেশিয়রাই উপমহাদেশের সফলতম সেনাঅভিযান, বৈজ্ঞানিক কর্ম এবং প্রাযুক্তিক সমাধান করতেন।
স্কটিশ ডাক্তার আমলারা উপমহাদেশে প্রথম আবহাওয়াবিদ্যার তথ্য নথিকরণ করেন। হাওড়ার বোটানিক গার্ডেন তৈরি করেন স্কট রবার্ট কিড, যেটি দৈর্ঘ আর প্রস্থে বাড়ান উইলিয়াম রক্সবরো উইলিয়াম হান্টার, জেমস এন্ডারসন এবং ফ্রান্সিস বুকাননের সহযোগিতায়। খনিজ উতপাদনের কাজে প্রথম সহায়তা করেন জন ম্যাকক্লিল্যান্ড(John McCleland), যিনি খনি বিকাশের কাজে তৈরি প্রথম কমিটির প্রধান ছিলেন। উপমহাদেশে বিপুল এলাকা জুড়ে ভৌগোলিক জরিপের কাজ সম্পন্ন করেন। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠায় হাতেকলমে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, যার নাম এক্সপেরিমেন্টার ফিলোজফি, প্রদর্শন করার কাজে ডেভিড রসকে ডাকা হয়। সেনাবাহিনীর বহু উচ্চপদস্থ স্কচ আমলা উপপমহাদেশিয় ভাষা শেখেন। বহু মানুষ মুঘল ভারতের দরবারি ভাষা ফার্সি এবং আরবিতে দক্ষ হন এবং দ্বিভাষিক ডিক্সনারি রচনা করেন এবং অনুবাদ করেন। দৌত্যের কাজেও তাদের ওপর নির্ভর করা হত মুঘল দরবারে Alexander Hannay এসেছিলেন, আর George Bogle, Alexander Hamilton, Samuel Turner তিব্বতে যান।
উপমহাদেশে কোম্পানির শাসন এবং নিজেদের ভাগ্যফেরাবার কাজ করেও বাকি সময়ে যে সব হাতেগোনা গ্রেট স্কুল বা অক্সোনিয়ান অভিজাত ব্রিটিশ যেমন হেস্টিংস ধ্রুপদী ভাবনা এবং শাস্ত্রে উৎসাহী ছিলেন। তাদের শিক্ষা মূলত প্রভাবিত ছিল গ্রিক এবং ল্যাটিন ধ্রুপদীত্বে। অষ্টাদশ শতক ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ভদ্রলোকিয় শিক্ষার পাঠ্যক্রমে নিবদ্ধ থাকত। ধ্রুপদী অতীতের প্রচ্ছায়া ইটালি তার আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ব্রেড বলছেন, impressed by the visible remains of the ancient world seen on their travels, young milords . . . easily saw themselves through the eyes of the Romans; their attitudes to politics and government, conduct, manners and style mirrored those of the world of Horace and Virgil and testify to the influence of the classical discipline in which they had been trained।
কপিল রাজের রিলোকেটিং মডার্ন সায়েন্স থেকে, ১১২ পাতা

Monday, July 16, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪ - উইলিয়াম জোনস ভদ্রলোক চরিত্রের জন্ম - অমেট্রোপলিয় তথ্যসংগ্রহঃ একটি সামাজিক ইতিহাস

ওয়ারেন হেস্টিংস লন্ডনের কোম্পানির কোর্টের কর্তাদের নির্দেশে বাংলার অসামরিক প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের বার্তা পেলেন। ঠিক সেই সময় রাষ্ট্র হয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে চলা ব্রিটেনও অসামরিক বিচার, জন শৃঙ্খলা, গতায়াত এবং যোগাযোগ ইত্যাদি বিকাশে উপনিবেশ থেকে আসা রাজস্বের ওপর নির্ভশীল। হেস্টিংসকে দেয় কোম্পানির কোর্টের নির্শনামাটি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল, গোটা কোম্পানি রাজস্ব ব্যবস্থা আদায়কে সাজাতে হবে ২০০ জন অসামরিক আমলা এবং ১০০০ জন সামরিক বাহিনীর মধ্যে থেকেই। হেস্টিংস বুঝলেন প্রশাসনকে সফল হতে গেলে কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে শেষ বিচারের বইএর মত কিছু একটা বানাতে হবে। তিনি লিখলেন, Every accumulation of knowledge and especially such as is obtained by social communication with people over whom we exercise a dominion founded on the right of conquest, is useful to the state . . .। রাজস্ব এবং আইনএর দিক থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কারদের সঙ্গে চুক্তি করা অথবা নতুন জয় করা এলাকায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন লাগু করার জন্যে আইন ইত্যাদি আগামী দশকগুলোয় প্রয়োজন হল বিশদ সঙ্খ্যাতত্ত্ব যা আসবে ভূমিপ্রকৃতি, প্রাকৃতিক ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, স্থানীয় নীতি ও প্রথা, খাদ্য অভ্যেস এবং সাধারণ জীবনযাত্রা বিষয়ে সমীক্ষার তথ্য থেকে।
দক্ষিণ এশিয় এলাকার ভাষা এবং অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানার্জনে উৎসাহী আমলাদের জন্যে হেস্টিংস বিপুল আর্থিক সুযোগ সুবিধের পরিকল্পনা ঘোষনা করলেন। কোম্পানির এই নীতি হেস্টিংসের আগের মূলত ইওরোপিয়দের – সাধারণত মিশনারিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে হত। উপমহাদেশের উদীয়মান শাসক হিসেবে প্রশাসন চালাতে দেশিয় মানুষদের বিষয়ে জ্ঞানার্জনের কাজে বিপুল বিশাল প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সূচনা ঘটল হেস্টিংসের সময়। এতদিন ধরে বন্দুক হাতে নিয়ে শাসন চালানো ব্রিটিশ প্রশাসন তাত্ত্বিকভাবে তথ্য নির্ভর করে প্রশাসন যন্ত্র চালাবার কাজে উদ্যমী হয়ে উঠল। রাজস্ব আদায়, বিচার বিভাগ চালানো এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দানের প্রশাসন চালাতে ব্রিটনদের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবিত্তস্থদের মধ্যে আদান-প্রদান বাড়ল। নানান স্তরের দেশিয় দক্ষিণ এশিয়র সঙ্গে যে মধ্যস্থতার ব্যবস্থা শুরু হল, তার মুল লক্ষ্য হল ব্রিটিশ আমলাদের অধীনে প্রশাসনিক কাঠামো চালানোর কর্মচারী নিয়োগ। বিগত মুঘল প্রশাসন এবং দেশিয় রাজাদের থেকে ধার করা পদগুলির যেমন তহশিলদার, কাজি, পরগনা সেরেস্তাদার/কানুনগো, পাটোয়ারি, আমিল, কাতিব, নাম বজায় রেখে ব্রিটিশ এবং দেশিয় মধ্যস্থদের মধ্যে বেঁটে দেওয়া হল।
তবে সব ধরণের কোম্পানি আমলার হেস্টিংসের ডাকে এবং উতসাহভাতায় সাড়া দেওয়ার মানসিক রেস্ত ছিল না। অধিকাংশ ব্রিটিশ আমলা ভারতে আসত চৌদ্দ থেকে আঠারো বছর বয়সে, এবং তাদের লক্ষ্য ছিল কত তাড়াতাড়ি ভাগ্য বদলে লন্ডনে ফিরে যাওয়া যায়। ঐতিহাসিকভাবে ইংলন্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি পেত মূলত সওদাগর, পেশাদার(মূলত লন্ডনভিত্তিক ব্যাঙ্কিং) আর জমিদারদের কনিষ্ঠ সন্তানটি। এরা বংশ পরম্পরায় বাংলায় কোম্পানির আমলা পদের অতিলাভজনক কেরিয়ার, সন্তানদের মধ্যে একটা আভিজাত্যিক শৃঙ্খলে আপসে বেঁটে নিতেন। কোম্পানি চাকরির উমদোরদের জন্যে চাইত শুধু সাধারণ the rule of three and merchants’ accounts শিক্ষা পাওয়ার শংসাপত্র। এই পরিবারগুলোর অতি খরুচে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্যে বরাদ্দ ছিল পরিবারের জৈষ্ঠ সন্তান, যাদেরা মেট্রোপলিটনের শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে পড়ানো বা উচ্চস্তরের করণিক হবার সাধ ছিল। ফলে এই চাকুরিজীবিরা নিজেদের ভাগ্য ফেরাবার স্বপ্নে এতই মশগুল হয়ে থাকত যে, দক্ষিণ এশিয় মানুষ বা তাদের কৃষ্টি বা জীবনযাত্রা নিয়ে মাথা ঘামাবার কোন অবসরই তাদের ছিল না।

কপিল রাজের রিলোকেটিং মডার্ন সায়েন্স থেকে, ১১০ পাতা

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩ - উইলিয়াম জোনস ভদ্রলোক চরিত্রের জন্ম - অমেট্রোপলিয় তথ্যসংগ্রহঃ একটি সামাজিক ইতিহাস

আমার বক্তব্য হল বিচার বিষয়ক জ্ঞানের বৌদ্ধিক আলোচনা এবং সেটির প্রাতিষ্ঠনিকীকরণের অন্যতম উদ্যোক্তা জোনস, এবং এই জ্ঞান প্রশাসনিক জ্ঞানচর্চায় আর ঔপনিবেশিক তথ্য শাসনে এবং তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে এই জ্ঞানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গীতে আমি নতুন করে philologer’s passageটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করব। এটি মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ভাষাতত্ত্ববিদ্যা এবং ভারততত্ত্ববিদ্যার অংশবিশেষ। আমি বলার চেষ্টা করব, জোনস, তার সমসাময়িকেরা এবং স্বয়ং কোম্পানি তারা ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনের আভ্যন্তরীণ মৌলকাঠামোর অংশ। জোনসও নিজেকে কোম্পানির সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবেই দেখতেন। তিনি উচ্চপদাধিকারিকদের জ্ঞানত তৈরি করে দেওয়া ভূমিকার অংশ হিসেবে সজ্ঞানে তার পদকে কাজে লাগিয়ে এশিয়ার তথ্যভাণ্ডার নথিকরণ করার উদ্যম নিয়েছিলেন।
বিশেষ করে আমি চেষ্টা করব ইন্দো-ব্রিটিশ ইতিহাসের বৃহত্তর সম্পর্ক প্রশ্নে জোনস এবং তার সমসাময়িকেরা দেশিয় মধ্যশ্রেণীকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরণের জ্ঞান উৎপাদন করছিলেন, এবং তাদের জ্ঞানচর্চাকে কাজ লাগিয়ে প্রশাসনের বৈধতা তৈরির কাজ করছিলেন তার বৃহত্তর প্রেক্ষিতটি। এই বৌদ্ধিক জ্ঞান উতপাদনের কাজটি আত্মিকভাবে জড়িয়েছিল কোম্পানির ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে। ফলে পাঠক, আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, স্পেসালাইজড জ্ঞান উৎপাদন এবং সেটি ব্যবহারে কোমপানির ভূমিকা কি ছিল।

বিজ্ঞান এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি
কোম্পানি যে বৈদেশিক বাণিজ্য চালানো এবং তার এক্সপানসানে অঙ্কবিদ, প্রায়োগিক জ্যোতির্বিদ, হাইড্রোগ্রাফার, শল্য চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর মত বিশেষ পেশাদারদের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অধিকাংশ প্রখ্যাত বিজ্ঞানী হয় কোম্পানির ডায়রেক্টর বোর্ডে, অথবা তার অংশিদার ছিলেন। এ ছাড়াও সমগ্র অষ্টাদশ শতাব্দ জুড়ে দ্রুত গজিয়ে উঠতে থাকা ইওরোপিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি খোঁজা পড়ুয়ারা বাড়তে থাকা কোম্পানির সেবা ক্ষেত্রের উচ্চ প্রযুক্তিবিদের পদ ভরাট করছিলেন। প্রযুক্তিবিদ, মিলিটারি কমাণ্ডার, পশু চিকিৎসক, রাজদূত, ডাক্তার, প্রকৃতিবিদ এবং ভূগোলবিদেরা প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক এবং গাছগাছড়া সংগ্রহ করতেন এবং দেশে ফিরে ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে, মেট্রোপলিসের কোম্পানি আর বিভিন্ন পণ্ডিতি সমাজের মধ্যে মধ্যস্থতা করতেন।
কিন্তু কোম্পানি কোন public space ছিল না, যার মাধ্যমে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্রিটিশরা তাদের স্বপ্ন পূরন করতে পারে। এই উচ্চাকাঙ্খা এমন একটা public space তৈরি করল যার চাপে কোম্পানির প্রশাসন কিছুটা হাতড়ে হাতড়ে জ্ঞান বিকাশের কাজে লাগল যাকে আমরা আজ প্রাচ্যবিদ্যা বলে চিনি। এটাও মনে রাখা দরকার বিদেশে বিশেষজ্ঞতার কাজে যাওয়া মানুষের সংখ্যা এত কম ছিল যে অধিকাংশ সময়ে কোম্পানিকে ভীষণভাবে দেশিয় মধ্যস্থর ওপর নির্ভর করতে হত।

পলাশী, কোম্পানিকে ভারতের ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারে সাহায্য করল। শাসক হিসেবে মানিয়ে নিতে কোম্পানির আধিকারিকদের প্রচুর সময় লেগেছিল। শাসকেরা চোখের পাতা না ফেলে বাংলাকে লুঠ আর ধ্বংস করার কাজে মন দিল। তিন বছরের মধ্যে বাংলার ১কোটি মানুষের প্রাণ নিয়ে, সে সময়ের বাংলার জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ, অধিকাংশ চাষী আর কারিগর – কোম্পানির প্রশাসনকে বাঁধার উদ্যম দেখা দিল। পার্লামেন্টের চাপে ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং আইন করে কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত লুঠের রাজত্ব, তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে সুবিন্যস্ত স্থায়ী সরকারি প্রশাসনিক লুঠে পর্যবসিত হল।  


কপিল রাজের রিলোকেটিং মডার্ন সায়েন্স থেকে

Saturday, July 14, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - পশ্চিমিজ্ঞান ও ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক

ইংরেজি শিক্ষায় ঔপনিবেশিক স্বচ্ছল অভিজাতদের মনে যে অমিত অর্থরোজগারের প্রণোদনা তৈরি হচ্ছিল, সেটা কিন্তু উপনিবেশের কাঠামোর সঙ্গে খুব একটা সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এখানে আমরা হাতেগোণা আর্থ দিয়ে তৈরি হিন্দু কলেজের সঙ্গে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দ্বারা মান্যতাপ্রাপ্ত বিশ্বের ধনীতম জয়েন্ট স্টক কর্পোরেট শাসকের অমিত অর্থে চালিত ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের তুলনা করে বলতে পারি। এই নবতম কলেজের উদ্যমের সঙ্গে জড়িয়েছিল বাংলার নব্য অভিজাতদের মধ্যে নবতম পরিচয়, প্রতিষ্ঠা এবং মান্যতা পাওয়ার উদগ্র ইচ্ছা।
বহুবছর ধরে নব্য স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের চরিত্র তৈরির চেষ্টা নিয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছে, আমার বক্তব্য, এই বৌদ্ধিক অভিজাতদের পরিচয় তৈরির পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জ্ঞানের রূপতাত্ত্বিক ধারণা। আমি এই ধারণাকে ইমেজ অব নলেজ দিয়ে চিহ্নিত করি, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক দলের জ্ঞানচর্চার মধ্যে নৈতিকতার ধারণাটিকে উপস্থাপন করা। কোন এক দলের ইমেজ অব নলেজ বুঝতে আমাদের এই প্রশ্নগুলির উত্তর দরকার, জ্ঞান কি? বস্তুবাদী এবং সামাজিক দিক দিয়ে কিভাবে জ্ঞান অর্জিত বা তৈরি হয়? কিভাবে এবং কার দ্বারা এই জ্ঞান শংসিত হয়? কার কথা মান্যতা পায়? কিভাবে, মৌখিক না লিখত, কোন ভাবে এই জ্ঞান বাহিত হয়? কে এবং কাকে এই জ্ঞান প্রসারিত করছে? কোন দল এই জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করছে? এই জ্ঞান তাদের কি ক্ষমতা দ্যায়? সাধারণভাবে সমাজের পক্ষে এই জ্ঞান কি অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি দেয়? এই জ্ঞান কি বৃহত্তর সমাজের জন্য ইত্যাদি। এই প্রতিফলন আংশিকভাবে একটি সমাজের সামাজিক-কথোপকথন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং এই কাঠামোর কোন পরিবর্তন ইমেজ অব নলেজের কাঠামোর পরিবর্তনও সূচিত করে।
এর আগে আমি(কপিল রাজ) দেখাতে চেষ্টা করেছি ভদ্রলোকেরা মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারণার জ্ঞানের প্রতিচ্ছবির ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন – যা উনবিংশ শতকে হয়ে উঠেছে আদতে একটি নিষ্কলুষ কর্ম, মূলত হাতেকলমে ছোটখাট দৈনন্দিনের জীবনের পরীক্ষা নিরীক্ষা নয়, বিমূর্ত ধারনার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং ইওরোপিয় বৈজ্ঞানিক নীতিবোধের সঙ্গে বেশ মেলে। যদিও বহু শতাব্দের যাত্রায় বৈদিক হিন্দুত্বের বিপুল পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষ রাজারাও, কিন্তু আমার মনে হয় এই ইমেজ অফ নলেজের নিষ্কলুষ কর্মের ধারণাটি ভদ্রলোকেদের নিজেদের পরিচয়ের খোঁজে অপরিবর্তিত থাকে, এবং শেষমেশ এই ধারণাটিই ভদ্রলোকেদের নিজেদের চরিত্র খোঁজার কাজে নতুন করে উঠে আসে। এই বস্তবতা সার্বিকভাবে এবং সঠিকভাবে সমালোচিত হয়ে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যাতে মনে হয় ঐতিহাসিকভাবে সতত পরিবর্তনশীল পশ্চিমিদের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়রা স্থবির, মানসিকভাবে রক্ষণশীল।
কপিল রাজ বলছেন, বাঙালি ভদ্রলোকেদের ইমেজ অব নলেজের ধারনাটি পূর্বপ্রথিত নয়, কলেজের পাঠ্যসূচী নিয়ে বেশ কয়েক বছরের নিজেদের সমাজের সদস্যদের মধ্যে চলতে থাকা বিতর্ক সঞ্জাত ধারণা। এই বিতর্কের একটা বীজ আমরা পাই হ্যারিঙ্গটনের প্রতি ঈস্টের চিঠি থেকে। হ্যারিংটন তাঁর বাড়িতে হওয়া একটি বৈঠকের বর্ণনা দিচ্ছেন কিভাবে জ্ঞান, জ্ঞানের দখলদারি, গোষ্ঠীর আনুগত্য ইত্যাদির বিতর্ক উপস্থাপিত হয় - Talking afterwards with several of the Company, before I proceeded to open the business of the day, I found that one of them in particular, a Brahmin of good caste, and a man of wealth and influence, was mostly set against Ramohun [sic] Roy . . . (who has lately written against the Hindoo idolatry, and upbraids his countrymen pretty sharply). He expressed a hope that no subscription would be received from Ramohun Roy. I asked why not? ‘Because he has chosen to separate himself from us, and to attack our religion.’ ‘I do not know’, I observed, ‘what Ramohun’s religion is’—(I have heard it is a kind of Unitarianism)—‘not being acquainted or having had any communication with him; but I hope that my being a Christian, and a sincere one, to the best of my ability, will be no reason for your refusing my subscription to your undertaking.’ This I said in a tone of gaiety; and he answered readily in the same style, ‘No, not at all; we shall be glad of your money; but it is a different thing with Ramohun Roy, who is a Hindoo, and yet has publicly reviled us, and written against us and our religion; and I hope there is no intention to change our religion.’ . . . This frank mode of dealing with them, I have often before had occasion to remark, is the best method of gaining their personal regard and confidence. Upon another occasion I had asked a very sensible Brahmin what it was that made some of his people so violent against Ramohun. He said, in truth, they did not like a man of his consequence to take open part against them; that he himself had advised Ramohun against it: he had told him, that if he found anything wrong among his countrymen, he should have endeavoured, by private advice and persuasion, to amend it . . . They particularly disliked . . . his . . . being continually surrounded by [Mussulmans], and suspected to partake of meals with them।
কপিল রাজএর রিলোকেটিং মডার্ন সায়েন্স – সার্কুলেশন অব কন্সট্রাকশন অব নলেজ ইন সাউথ এশিয়া ১৬৫০-১৯০০ের অনুবাদ ১৬৮ পৃ

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১ - পশ্চিমিজ্ঞান ও ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক

হিন্দু কালেজ এবং ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি স্থাপন করার মধ্যেদিয়ে শহুরে স্বচ্ছল এবং অভিজাতরা ব্রিটিশ জ্ঞানপ্রথার সঙ্গে নিজেদের আত্মস্থ করতে চাইল। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশেরা যখন থেকে এসেছে তারা দক্ষিণ এশিয়ার জ্ঞান আত্মস্থ করেচলেছে। তবে এই সময়ে ভদ্রলোকেদের একটাই উচ্চাশা ছিল ব্রিটিশদের সামনে নিজেদের একমাত্র দেশিয় অভিজাত শ্রেণী হিসেবে তুলে ধরা, যাদের কাজ হবে ইওরোপিয়দের সঙ্গে দেশিয় মানুষদের মধ্যে মধ্যস্থতা। ততদিনে কলকাতা একটা খোড়োবাড়িময় ঘুমিয়ে থাকা গ্রাম্য সমাজ থেকে এশিয়ার সব থেকে বড় ব্যবসা কেন্দ্র, এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, এবং নব্য অভিজাতরাও একইভাবে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এই শহরে তারা অপরিমিত অর্থ রোজগার করেছেন এবং এমন আইন অর্জন করেছেন যার মাধ্যমে তারা বিপুল বিশাল গ্রাম্য সম্পদ আর শহুরে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সুবিধের জন্যে খোলা পেশাদারি সঙ্গঠন – দপ্তর, বিদ্যালয়, বিচারালয়, এবং অন্যান্য পেশাদার সঙ্গঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কব্জা করতে পারেন। এটা আজ পরিষ্কার যে ইংরেজি ভাষার ওপর দখল নব্য কলকাতায় স্বচ্ছলতার প্রাথমিক শর্ত –ইংরেজি না জানলেও চাকরি পাওয়া হয়ত যাবে, কিন্তু তা বেঁচে থাকার জন্যে যথেষ্ট নয়(People ignorant of English no doubt got berths, but berths to which only paltry salaries were attached)। উনবিংশ শতাব্দের প্রথম দশকেই দেশিয় এবং ইওরোপিয় ব্যক্তিগত উদ্যমে কলকাতায় একের পর এক ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় গজিয়ে উঠছিল। এই ধরণের বিদ্যালয়গুলিতে সর্বপ্রথম ইংরেজি ও ইংরেজি মাধ্যমে পড়েন রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন, দ্বারকানাথ ঠাকুর ইত্যাদি।
হিন্দু কলেজের পাঠ্যসূচী থেকে পরিষ্কার, অন্যগুলির মত এটি শুধুমাত্র ইংরেজি শিক্ষার বিদ্যালয় ছিল না। কলকাতার বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তালমিলিয়ে শিক্ষার কেন্দ্রগুলি আর প্রশাসনিক প্রাতিষ্ঠানগুলি তৈরি হচ্ছিল, যা ১৮১০ সালের আগে তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ নব্য ঔপনিবেশিক সমাজে সে প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে যে জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রয়োজন ছিল তা ভদ্রলোকেরা তার আগে করে উঠতে পারেন নি। ভদ্রলোকেরা যেহেতু সামাজিকভাবে উপনিবেশের সঙ্গে থেকে সুবিধেপ্রাপ্ত হয়েছে, স্বচ্ছল এবং ক্ষমতাশালী হয়েছে, এখন তাদের সময় এসেছে সামাজিক জ্ঞান, সামাজিক প্রযুক্তি, সামাজিক প্রজ্ঞাকে কর্পোরেট লুঠেরা আকার দিয়ে প্রমিতিকরণ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তরকরণ করার। বিদ্যালয়গুলি নব্য ক্ষমতার পকড় রাখা আর সামাজিক সিঁড়িতে ওঠার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ১০০ বছর পরে সাইমন কমিশন মন্তব্য করবে, ভদ্রলোক সমাজের ঢোকার একমাত্র রাস্তা বিদ্যালয়গুলি(The school is the one gate to the society of the Bhadralok)।
নতুন ব্যবস্থাপনাযুক্ত জ্ঞান অর্জনের প্রতি অভিজাত ভদ্রলোকেদের আগ্রহ বাড়ল। সাধারণভাবে আমরা ইওরোপিয় জ্ঞানব্যবস্থা পশ্চিমের বাইরে বিকিরত হওয়ার যে তত্ত্ব শুনে আসছি, বাংলায় এসে দেখা গেল সেই তত্ত্ব কাজ করছে না। এখানে পশ্চিমি জ্ঞানের চারা তৈরি করে লাগাতে হচ্ছে। ফলে পশ্চিমি জ্ঞানচর্চার বিকিরণের নিস্ক্রিয়তার তত্ত্ব কলকাতায় একে দেখাগেল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা দেখব ইওরপিয়রা ভারতে এসে যে ধরণের ব্যবস্থা নিচ্ছিল, বা ব্রিটেনেও যে ধরণের জ্ঞানচর্চার ধারা ছিল, সেই তুলনায় হিন্দু কলেজের পাঠ্যক্রম যথেষ্ট ব্যতিক্রমী।
কপিল রাজএর রিলোকেটিং মডার্ন সায়েন্স – সার্কুলেশন অব কন্সট্রাকশন অব নলেজ ইন সাউথ এশিয়া ১৬৫০-১৯০০ের অনুবাদ ১৬৭ পৃ