Showing posts with label টিকা. Show all posts
Showing posts with label টিকা. Show all posts

Friday, March 9, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৫ - ইওরোপের এশিয় মানচিত্র উদ্যম - মানচিত্র তৈরির দেশিয় জ্ঞান স্রেফ চুরি করেছে

তো লুঠেরা ব্রিটিশদের ভূসমীক্ষা করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল কেননা তাদের আরও আরও রাজস্ব চাই দেশে লুঠেরা শিল্পবিপ্লবীয় প্রযুক্তি আর কেন্দ্রিভূত উতপাদন ব্যবস্থা চালু করতে প্রচুর ভর্তুকি প্রয়োজন। পলাশীর পর লুঠে একলপ্তে বিপুলতম সম্পদ দেশে গিয়েছে আর সেই অর্থ এত পরিমানে ছিল যে, বাংলার পণ্য কিনতে আর সারা বিশ্ব লুঠ করে দামি ধাতু আনতে হয় না। বাংলায় ব্যবসা দখল আর জ্ঞানলুঠের পরম্পরা বাড়ল এই সময়ে।
কিন্তু শাসকেরা তো দেশটাই চেনে না, ভূপ্রকৃতি জানে না। তাই প্রয়োজন পড়ল ভূসমীক্ষার। আর আগে আমরা উল্লেখ করেছি ১৭৬০ সালে কিভাবে কলকাতা কাউন্সিল একজন নৈসেনানায়ককে সমীক্ষা করে মানচিত্র তৈরি করে দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেছিল। এই ধরণের একটা সমীক্ষার উল্লেখ পাচ্ছি ফরাসী ভূপর্যটক Abraham-Hyacinth Anquetil-Duperronর লেখায়... I have travelled in the interior of India alone, in a group, and with the army. The commanding officer spends the better part of the day sleeping in his palanquin. At dinner he asks his Dubash [interpreter] . . . what distance they have travelled and which places they have passed. The latter in turn asks the porters or else replies himself, for reply one must; and the distances and place names are inscribed on the itinerary, on the map . . . which, by the way, I found perfectly well made।
জেমস রেনেল প্রথম ভূগোলবিদ যিনি সে সময়ের ইওরোপিয় মানচিত্র তৈরির সীমিত জ্ঞানের সঙ্গে সময় পরীক্ষিত ভারতীয় প্রশাসনিক ভূসমীক্ষা করার জ্ঞানকে মেলালেন। রেনেলের জন্ম ডেভনশায়ারে। শিশুবয়সের অনাথ। এক ভাইকারের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষাটা কোনক্রমে সম্পন্ন হয়। সাতবর্ষ যুদ্ধে সাধারণ যোদ্ধা নাবিক হিসেবে ১৪ বছর বয়সে ব্রিটিশ নৌপোতে চাকরি। ব্রিটেনিতে উপকূলীয় ভূসমীক্ষার মূল সূত্র শিখে নেন। কোয়াড্রেন্ট আর আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে তিনি ভেসে পড়েন ভারতের উদ্দেশ্যে। করমণ্ডলে কিছু কাজ করে চোখে পড়ে যান ভূগোলবিদ আলেকজান্ডার ডালরিম্পলের। ১৭৬২তে চিনের সুলু দ্বীপে সমীক্ষায় অংশ নেন। তার ভ্রমনে তিনি ক্রমশ চিনের সঙ্গে আফিম ব্যবসার গুরুত্ব বুঝতে পারেন।
এরপরে কোম্পানির চাকরি, কোম্পানির প্রথম প্রোবেশনার ইঞ্জিনিয়ার এবং শেষে সার্ভেয়র জেনারেল অব বেঙ্গল হন। কোম্পানির বাণিজ্য সুবিধের জন্যে প্রথমে গঙ্গার বদ্বীপ সমীক্ষা করেন the shortest and safest Channel leading from the great River to Channel Creek or Rangafulla। লুঠের প্রাথমিক শর্ত এবং আগামী দিনে বাংলাকে ব্রিটিশ শিল্পের কাঁচামালের আড়ত তৈরি করতে কোন কোন নদী দিয়ে বাণিজ্য হতে পারে সেটা জানা জরুরি ছিল। বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপ অঞ্চল তাদের শাসন এলাকায় পড়েছিল। এই কাজে তিনি ব্রিটিশ নৌসেনার উপকূল সমীক্ষার সঙ্গে দেশিয় জ্ঞান যোগ করেন। ১৭৭৭ সালে ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে তিনি বাংলা-বিহার-ওডিসার পরে সারা উপমহাদেশের স্থল মানচিত্র প্রকাশ করেন, রেনেল তার প্রথম জীবনে করা নদী সমীক্ষার কিছু তথ্য ব্যবহার করেন। যদিও তিনি মূলত ব্রিটিশ আর ভারতীয় সেনার আর সার্ভেয়ারদের রুটমার্চের তথ্যই ব্যবহার করেন।

শুরু করেন বাংলার মানচিত্র তৈরি করতে পরে সারা ভারতেরই করেন। তিনি ১৭৮৩র প্রথম সংস্করণে সব সূত্রকেই উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে the roads and country between Bengal and the Deccanএ ছিলেন Sepoy officer গুলাম মহম্মদ, উত্তরপশ্চিম ভারতের জন্যে মির্জা মুঘল বেগ, এবং গুজরাটের জন্যে সদানন্দ নামক এক a Brahmin of uncommon genius and knowledge। দেশিয় সহায়ক ছাড়া তার কাজে ছিলেন জেসুইট Monserrate এবং Tieffenthaler, ফরাসী Marquis de Bussy, Jean Law de Lauriston, Antoine Polier, Claude Martin। আর তিনি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করেছেন আইনিআকবরি, যে বইটিকে অন্যান্য ইওরোপিয়দের মত গালিতে ভরিয়ে দেবেন আচার্য যদুনাথ সরকার। 

Thursday, March 8, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪ - ইওরোপের এশিয় মানচিত্র উদ্যম - মানচিত্র তৈরির দেশিয় জ্ঞান স্রেফ চুরি করেছে

উপমহাদেশে প্রশাসকেরা বহুকাল ধরে cadastral এবং route মানচিত্র করাতেন। মাদ্রাজের ইম্পিরিয়াল সূত্রে জানা যাচ্ছে, তাঞ্জাভুরের প্রথম রাজারাজা(৯৮৫-১০১১) এই ধরণের সমীক্ষা করান ‘carried out a careful survey of the land under cultivation, and assessed it। ব্রিটিশপূর্বের বহু কাল ধরে ভারত জুড়ে জমির উর্বরতা, জমির মালিকানা, এবং জমির মাপ, রাজস্বের বিশদ বিবরণ ইত্যাদি নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীন আমল থেকে সুলতানি, মুঘল আর নবাবি আমলের আমরা জরিপের ইতিহাস আমরা পাই, অরুণ কুমার মজুমদারের প্রাচীন জরিপের ইতিহাস বইতে। কোম্পানির ভূসমীক্ষক বেঞ্জামিন হেইনের অনুবাদে অষ্টাদশ শতের প্রথম যুগের একটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা বইতে পাচ্ছি মাপের বর্ণনা(সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মেমোয়ারে উল্লিখিত ছেত্রী গণিতম, “Chetrie Ganietam”—A Sanskrit Work on Land Measurement Translated by Benjamin Heyne’.) – 
The fundamental measure is that of an Inch which is determined in three different ways.
First, By placing three rice corns in a line length ways—the place they occupy is called an Inch.
Secondly, By measuring the circumference of the second joint of the thumb, half of the length of which is an Inch.
Thirdly, By measuring the second joint of the middle finger, the half of which is called an Inch.
12 of these Inches are One Jana (literally translated as paw) 32 Janas are One Ghada (or Bamboo)—4 Ghadas (or One Square Bamboo) is One Kunta.
These measures . . . are universally understood.
শুধু যে বিদেশিরা উল্লেখ করছে তাই নয়, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সম্রাট প্রথম শাহ আলমের সময়ের ঐতিহাসিক মহম্মদ হাদি কামওয়ার খান, মুশকখসের(ভূমি সমীক্ষার কাজ) খুশমঞ্জিল – সমীক্ষাকারী নিয়োগের উল্লেখ করছেন। সে সময় দূরত্বের নানান তথ্য কিছুটা তালিকা এবং কিছুটা নকশায় ধরে রাখা হত বিভিন গেজেটিয়ার এবং প্রশাসন নির্দেশনায় – এর থেকে প্রমান হয় মুঘল প্রশাসনে মানচিত্র বিষয়ে জ্ঞান ছিল। এই গেজেটিয়ারে বিভিন্ন সুবার বিভিন্ন সময়ের নানান তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে ষোড়শ শতের শেষে আইনি আকবরির কথা আমরা প্রায় সকলেই জানি।
মনে রাখতে হবে সুলতানি বা মুঘল সাম্রাজ্য যদিও কেন্দ্রিভূত প্রশাসন ছিল, কিন্তু বিভিন সুবা ছিল স্বশাসিত। ফলে আজকের ইওরোপিয় জাতিরাষ্ট্রের তত্ত্বে সুবার প্রত্যেকটি বিষয়ে সাম্রাজ্যের নাক গলাবার প্রয়োজনীয়তা ছিল না।
লাঠি, দড়ি, দানাশস্য এবং মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়াও মুসলমান জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্র কারিগরদের তৈরি astrolabe দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মাপন কাজে ব্যবহৃত হত। চতুর্দশ শতক থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রত্যেক মতের জ্ঞানী, জ্যোতির্বিদেরা এই যন্ত্রটা ব্যবহার করতেন। মুঘল পৃষ্ঠপোষকতায় সমরখন্দ পদ্ধতির বিদ্যাচর্চার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায় গোটা দক্ষিণ এশিয়ায়, যেটার একটা বড় অংশ ছিল ভূসমীক্ষণের তত্ত্ব।
এটা পরিষ্কার যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভূমি মাপন দীর্ঘকালের একটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক ঘটনা ছিল। দীর্ঘকাল ধরে ঔপনিবেশপূর্ব কালে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের প্রশাসনের এই কাজের ধারাবাহিকতায় একটা নির্দিষ্ট জ্ঞানচর্চা গড়ে ওঠে।
(সঙ্গের ছবিতে এস্ট্রালোব আর এস্ট্রালোবের দেখার চিত্র)

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - ইওরোপের এশিয় মানচিত্র উদ্যম - মানচিত্র তৈরির দেশিয় জ্ঞান স্রেফ চুরি করেছে

একই ঘটনা ঘটেছে এশিয়ায় মানচিত্র তৈরি করার ক্ষেত্রেও। আজও মানচিত্র তৈরি যে পশ্চিমি উদ্যম সেটা তারা কম্বুকণ্ঠে বলে থাকে। তাদের আগে কোন অইওরোপিয় দেশেই এ ধরণের কোন উদ্যম নেওয়া হয় নি এমন দাবিও বৌদ্ধিক স্তরে করা হয়। ম্যাথু এডনি Mapping an Empire: The Geographical Construction of British India, 1765-1843, নামে একটা বই লিখেছেন, সেখানে তার দাবি cartographic culture ভারতে ব্রিটিশ অভিজাতরা আমদানি করেছে কেননা, তার ভাষায় spatial architecture rooted in non-Indian mathematics and structures। তিনি লিখছেন ঔপনিবেশিক ভারতে the measurement and observation inherent to each act of surveying represented science. By measuring the land, by imposing European science and rationality on the Indian landscape, the British distinguished themselves from the Indians: they did science, the Indians did not, unless in a limited way and then only at the express request of a British official . . . The practising of cartography—the making of surveys and the compilation of maps—was quintessentially at once a scientific and a British activity।
এই লেখায় স্পষ্টভাবে ভারতীয় ভূমির ওপর ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কব্জাকে আইনি ও কৃষ্টিগত বৈধতা দিতে বলা হল দেশিয় জ্ঞানচর্চাকে ইওরোপিয় উন্নত জ্ঞানচর্চার অধীন হতে হবে, যে দাবি করেছিলেন বিদ্যাসাগর থেকে রামমোহন থেকে আজকের জ্ঞানচর্চও কেননা mystical, religious, Hindu space of India কে ইওরোপিয় rational, scientific, imperial structure of spaceএ আত্মনিবেদনই করতে হবে, এটা যেন স্বতঃসিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃত হল। বলে দেওয়া হল ইওরোপিয় উপনিবেশ দেশিয় শিক্ষিত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের হাতে এমন একটা অস্ত্র তুলে দিল, যার দিয়ে সে বিপুল বিশাল দেশের মানুষ, সম্পদ এবং প্রকৃতির ওপর নজরদারি করতে পারবে।
এবং আমরাও যারা সেই ইতিহাস পড়ে সমৃদ্ধ হই, পড়াই, গবেষণা করি, তারা হয় না জেনে, অথবা না জানার ভান করে সেই ইওরোপমুখ্যতার ধুনোয় ধোঁয়াদিয়ে সেই ধারনাকে বিনা বাক্যব্যয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঔপনিবেশিক অনৃতকর দাবিগুলি মানিয়ে নিতে বাধ্যকরি – একবারও ইতিহাস খুঁড়ে দেখতে বলিনা বাস্তব কি। খুব সম্প্রতি কালেও এই বিশেষজ্ঞমূলক ঔপনিবেশিক বিজ্ঞানচর্চা আর ক্ষমতার মিশ্রণ অপশ্চিমি বিজ্ঞান বিশ্বের ওপরে আধিপত্য বিস্তার করার দাবি করেছে – এবং তাদের মতে ইওরোপিয়দের সভ্যতা বিস্তারের দায় থেকেই এও উদ্যমগুলি নেওয়া হয়েছে। ভিক্টোরিয় বিজ্ঞানের ইতিহাসকার Susan Faye Cannon, তার Science in Culture: The Early Victorian Period বইতে লিখছেন, The Great Trigonometrical Survey of India shows the workings of British policy better than still another study of Macaulay’s education minute . . .।


বলা দরকার যে এই মানচিত্র তৈরির উদ্যমের আরেকটি উদ্দেশ্য হল দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা থেকে যে লুঠ চলছিল ইওরোপিয় অত্যাচারি দখলদারি লুঠেরা শিল্পবিপ্লব গড়ে উঠছিল সেই কাজে ভর্তুকি দেওয়া। আলবর্দি বা সিরাজ বাংলা সুবা থেকে যে কর তুলত, সেই করের বোঝা নতুন জমাকালেমতুমারি করে বিপুলাকারে বাড়িয়ে দিল মীরজাফরের বাংলা সরকার। পলাশীর পরের লুঠ আর তার পরের মীর জাফর আর মীর কাশিমের সময়ের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় লুটেপুটে খাওয়া কোম্পানি বহুকাল ধরেই জানত বাংলা দুধেলা গাই, তাকে যতটা পারা যায় দোহন করা দরকার। এই দোহনের কাজে দেশিয় বানিয়া আলালেরা তাদের সহায়ক হয়েছে। পলাশীর ৮০ বছর পরেও বালী-উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারি কিনে নিয়ে প্রত্যেক অঞ্চলে ‘লুকিয়ে রাখা’ জমির সত্ত্ব উদ্ধার করে প্রগতিশীল ব্রিটিশ সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। তার এই কাজ বর্তমান যুগের ঐতিহাসিকদের বাহবাও পেয়েছে। ফলে ব্রিটিশদের বাংলা জানা আর লুঠকর্মের সহায়তার প্রাথমিক উদ্যম হল বাংলার জরিপ এবং ভূমানচিত্র তৈরি।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১ - ইওরোপের এশিয় মানচিত্র উদ্যম - মানচিত্র তৈরির দেশিয় জ্ঞান স্রেফ চুরি করেছে

আমরা কারিগরেরা গুরু বাক্য স্মরণ করে বলে থাকি উপনিবেশের বড় শক্তি হল, সে তাঁর পদ্ধতিতে শিক্ষিতজনকে তাঁর সমাজের কৌমস্মৃতিতে ফিরে যেতে কৃষ্টিগতভাবে বাধা দেয় এবং সে মনে করে উপনিবেশের কৃষ্টির তুলনায় তার সমাজের কৃষ্টি যথেষ্টই ন্যুন। প্রশ্নহীনভাবে সে উপনিবেশের দেখিয়ে দেওয়া জ্ঞানচর্চা অনুসরণ করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোন একটি আবিষ্কারের যে পূর্বাপর থাকে সেই উদাহরনগুলো পশ্চিম সযত্নে এড়িয়ে যায়। কর্পোরেট আবিষ্কারের উদ্যম এমন একটা জ্ঞানচর্চার ধারা তৈরি করার চেষ্টা করে যাতে মনে হয়, আধুনিক, ঔপনিবেশিক বিজ্ঞানের কোন পূর্বসূরী নেই, আধুনিক ঔপনিবেশিক ইওরোপিয় বিজ্ঞান স্বয়ম্ভু, একমেবদ্বিতীয়ম, ইওরপিয় নবজাগরণের আগে সারা বিশ্ব অন্ধকারে বিরাজ করছিল। বিশ্বের কোন অঞ্চলের দীর্ঘ জ্ঞানচর্চার প্রবাহের প্রভাব তার ওপরে পড়ে নি।
এর আগে আমরা চিকিৎসা শাস্ত্রের ক্ষেত্রে দেখেছি, কিভাবে ইওরোপিয় সওদাগর কোম্পানিগুলি মালাবার ওডিশা, বাংলার দেশিয় গাছগাছড়া এবং তার গুণাগুণ আর প্রয়োগের জ্ঞান নথি করণ করে, ইওরোপিয় চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান উন্নত করেছে। অথচ সেই প্রভাব তারা আজও অস্বীকার করে। একই ঘটনা ঘটেছে টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও। জেনারের টিকা আবিষ্কারের আগে বহুকাল ধরে এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গুটি বসন্তের টিকা দেওয়া হত এবং সেই টিকা ইওরোপিয় এলাকায় নিয়ে গেলে সেখানে অন্তত একশ বছরের বেশি সময় ধরে তার সক্রিয় বিরোধিতা করা হয় এবং শেষমেশ গরীবদের নগদ কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে টিকা দেওয়ার উদ্যম হাতে নিতে হয়। এবং পরের দিকে এশিয় পদ্ধতিতে টিকাকরণের প্রভাব বাড়তে থাকলে, কর্পোরেট টিকাকরণকে চালাবার জন্যে এই টিকা করণ পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করণ করে। একইসঙ্গে চিনা-বাংলার টিকা দেওয়ার জ্ঞানের যে শিক্ষা তারা নিয়েছিল, নিজেরদের দেশের টিকা আবিষ্কার হওয়ার পরে সেই জ্ঞানচর্চার অভিজ্ঞতা তারা মুছে ফেলে। বাল্যে বিদ্যালয় পড়াশোনায় আমরা ইওরোপের মুক্তিদাতা হিসেবে জেনারের কথা অপরূপ সম্মান নিয়ে পড়েছি।
কিন্তু দুটো তথ্য সেই লেখাগুলোতে বলা হত না, প্রথমত এশিয় টিকা করার অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়ত ইওরোপিয় পাগান(গাঁইয়া) নিদান। জেনারের একজন দুধওয়ালির থেকে জ্ঞান আহরণ, যে যার গো-বসন্ত হয় তার গুটি বসন্ত কখোনোই হয় না – এই তথ্যটার বিশ্লেষণের গুরুত্ব এড়িয়ে গিয়ে জেনারের আবিষ্কারকেই রোমান্টিকভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা হয়। জানানো হয় না এটা গ্রাম ইওরোপের নিজস্ব নিদান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাটি কি ছিল। জেনার শুধু সেটি নকল করে বড় পুঁজির জ্ঞনাকারে ঢেলে সাজিয়েছেন। টিকার আবিষ্কারে এশিয়া আর গ্রাম ইওরোপ, নব্য কর্পোরেটিয় ইওরোপের কাছে সেই সম্মানটা কখোনোই পায় নি।
এই জ্ঞানটি বিশ্বের দুটো প্রান্তের গ্রাম সভ্যতার, নব্য ইওরোপ সেটিকে আত্মীকরণ করে নিজের মত করে সাজিয়েগুজিয়ে নিয়েছে মাত্র। এইভাবে গ্রাম এশিয়া পাগান ইওরোপের জ্ঞান আত্মীকরণ করে সেগুলিকে ধ্বংস করেছে বা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে বা বেমালুম অস্বীকার করে চোখ উল্টে ফেলেছে।
পরের কিস্তিতে আমরা ভারতে মাচিত্র তৈরির প্রথম পর্যায়ে কিভাবে দেশিয় জ্ঞান চুরির ঘটনা ঘটেছিল সেই উদাহরণ দেখব।