Showing posts with label প্রাচীন ভারতের ধাতুবিদ্যা. Show all posts
Showing posts with label প্রাচীন ভারতের ধাতুবিদ্যা. Show all posts

Sunday, June 23, 2013

লৌহ ও ইস্পাত প্রযুক্তি বিকাশে ভারতের অবদান, Iron & Steel Industry & Technology in Ancient India

ভারতে আর্য অনুপ্রবেশের অতিকথাটির ফোলানো ফানুশ আজ চুপসে গিয়েছে। খুব ছোট্ট একটা ধাতু প্রযুক্তির উদাহরনেই এই অতিকথাটি  অপ্রমাণ করা যায়। সেটি হল লোহা। প্লেইনার বলছেন,(Pleiner, R. The Problem of the Beginning Iron Age in India. Acta Praehistorica et Archaeologica 2 (1971): 5–76) খৃস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয় অর্ধ পর্যন্ত তথাকথিত আর্যরা লোহার দ্রব্য তৈরি করতে পারত না। শুধু তাই নয়, যে এলাকায় সংস্কৃত ভাষায় কথা বলা আর্যরা বাস করত, সে এলাকা থেকে অন্ততঃ পশ্চিমের দেশগুলোতে লৌহ দ্রব্য রপ্ততানি হত না। তবে এর বহু পূর্ব থেকেই ভারতে লোহার দ্রব্যের প্রচলন যে ঘটেছে তার নির্দিষ্ট তারিখ চিহ্নিত করছেন ভারতের নানান উৎখননের স্থানে বিকরিত কার্বন পরীক্ষা করে ডি কে চক্রবর্তী (Chakrabarti, D. K. The Early Use of Iron in India. Delhi: Oxford University Press, 1992)। আগরওয়াল আর খারাকওয়াল(Kharakwal. Outstanding Problems of Early Iron Age in India: Need of a New Approach. Tradition and Innovation in the History of Iron Making: An Indo European Perspective. Girija Pande, Jan af Geijerstam. Nainital, India: PAHAR Parikrama, 2002. 3–20.)। তিনি বিকরিত কার্বন পদ্ধতিতে প্রাচীনতম লোহার চুল্লির তারিখ নির্ণয় করেছেন, উত্তর প্রদেশের রাজা নল কা টিলায় ৩০৫০-৯০ খৃস্ট পুর্বাব্দে(Tiwari, R. The Origins of Iron-Working in India: New Evidence From the Central Ganga Plain and the Eastern Vindhyas. Antiquity 77 (2003): 536–45)। পি নিয়োগী, ডি কে চক্রবর্তী, এ কে বিশ্বাস, ভি ত্রিপাঠি এবং আর বালাসুব্রমনিয়ামএর নানান যুক্তিপূর্ণ গবেষণা থেকে পরিস্কার, ইউরোপের বহু আগেই ভারতে লৌহ ইস্পাত প্রযুক্তির উদ্ভব ঘটেছিল। ভারতের লোহা আর ইস্পাত তৈরির ধাতুবিদ্যা আমরা এই প্রবন্ধে আলোচনা করব।

লৌহ নিষ্কাশন
রিডাকসন পদ্ধতিতে ভারতে বহু কাল ধরে লৌহ আকরিক নিষ্কাশন করা হত। লৌহ আকরিকের তাল ব্যবহার করে নানান লৌহদ্রব্য প্রস্তুত করা হত। লোহার গলনাঙ্ক ১৫৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। যে সময়ের কথা আমরা আলোচনা করছি, সে সময়ে ভারতের গলন চুল্লিগুলো এত তাপ উতপন্ন করতে পারত না। সে সময়ের ভারতের নানান লৌহ গলন চুল্লির(একে ব্লুমারি পদ্ধতি বলা হত, কেননা লোহা গলিয়ে ব্লুম তৈরি হত) বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন ভি ত্রিপাঠী(Tripathi, V. The Age of Iron in South Asia: Legacy and Tradition. New Delhi: Aryan Books International, 2001)। লৌহ কারিগরেরা নির্দিষ্টভাবে নির্দিষ্ট ধরণের লৌহ আকরিক আহরন করতেন। কি ধরণের দ্রব্য উৎপাদন করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে লৌহ আকরিক আহরন করা হত। লৌহ চুরকে ভেঙ্গে গুঁড়ো করার জন্য চুল্লিতে দেওয়ার আগেই একবার তাপ দেওয়া হত। সেই তাপিত গুঁড়োতে জল বা বাতাস বইয়ে মাটি বা অন্যান্য বর্জ্য থেকে লোহা আলাদা করা হত। উত্তপ্ত লৌহ আকরিক এবং চারকোল পরপর স্তরে রেখে চুল্লিটি ক্রমশঃ কম থেকে বেশি তাপে জ্বালানো হত। তাপ উঠত ১০০০-১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত। একটু পরে আমরা নানান ধরণের চুল্লির গড়ন আলোচনা করব। সেগুলর উচ্চতা ছিল ৫ থেকে ২০ ফিট পর্যন্ত।
চুল্লির তলায় হাওয়া দেওয়া বিশেষ ধরনের হাপর জোড়া থাকত। সেগুলো দিয়ে প্রয়োজনমত হাওয়া দেওয়ার পরিমান কমানো বাড়ান যেত। লৌহ আকরিক হল লোহার অক্সাইড। এগুলিতে পোড়া কয়লা(চারকোল) জ্বালিয়ে(কার্বন মনোকসাইড) ব্লুমি চুল্লিতে পোড়ান হত।  লৌহ আকরিকে মিশে থাকা সিলিকন ডাইঅক্সাইড আলাদা করা হত। সম্ভবতঃ এই পদ্ধতিতে আয়রন সিলিকেট(FeSiO4) বা ফায়ালিটিক স্ল্যাগ (2FeO·SiO2) নামওয়ালা গলিত বর্জ্যকে আলাদা করা হত। ব্লুমারি চুল্লি থেকে লৌহ আকরিক গলিয়ে লোহা তৈরি করে বের করার সময়ও কিছু এই ধরনের গলিত বর্জ্য গড়িয়ে বেরিয়ে আসত যেমন, তেমনি আবার কিছু আধপতিত হয়ে পড়ে থাকত চুল্লিতে, কিছুটা আবার লোহার সঙ্গে মিশে থাকত। ফলে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা পরে চুল্লি থেকে তাতাল গলিত মন্ডগুলি বের করে নেহাই দিয়ে পেটানো হত। এই লোহা পেটানোর মধ্যে দিয়ে প্রচুর বর্জ্য বেরিয়ে যেত। তবে যতদূর সম্ভব হয়ত লোহাকে পুরোপুরি বর্জ্য মুক্ত করা সম্ভব হত না, কিছু রয়েই যেত। এগুলির মধ্যে কিছু ফায়ালিটিক স্ল্যাগ রয়েছে তেমনি কিছু লৌহ অক্সাইডও(wüstite FeO), কিছু কাঁচেরমত ক্যালসিয়াম সিলিকেটও থাকত। ফলে চুল্লি থেকে বের করা লোহাতে বেশ কিছু বর্জ্য থাকে যেত বলে তখনকার লোহার তুলনামূলক ভার শুদ্ধ লোহা (Fe)র থেকে কম হত।  
পুরনো দিনের পাওয়া লোহায় যে বর্জ্য মিশে থাকত, তা খালিচোখে দেখা যায় না। তার চরিত্র আণুবীক্ষণিক। কঠিন বর্জ্য বের করানোর পদ্ধতিতে রয়ে যাওয়া বর্জ্যগুলো লোহায় সমান ভাবে ছড়িয়ে যেত। কেননা চাইলেও পিটিয়ে পিটিয়ে সব বর্জ্য বের করা যেত না। লোহায় থেকে যাওয়া কিছু FeO এবং অন্যান্য বর্জ্য অসমানভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত, এরা সমান দৈর্ঘ্যেরও হত না।
ধাতুবিদ্যার দৃষ্টিতে লৌহ আকরিক থেকে লৌহ আকরিক গুঁড়ো করা, পাউডার কনসলিডেসন এবং সিন্টারিং(Sintering is a process in which solid wastes are combined into a porous mass that can then be added to the blast furnace. These wastes include iron ore fines, pollution control dust, coke breeze, water treatment plant sludge, and flux) পদ্ধতি এক বারেই ধাপে ধাপে সম্পন্ন করত, বলছেন আর কে দুবে(Dube, R. K. Aspects of Powder Technology in Ancient and Medieval India. Powder Metallurgy 33 (1990): 119–25)।
গলন চুল্লি থেকে লোহা পিন্ডটি বের করে আনা হত। সেটি কখনো সরাসরি, আবার কখনো নতুন করে তাপ প্রয়োগ করে লৌহ দ্রব্য তৈরির কাজে ব্যাবহার করা হত। এদের মধ্যে একটি সফল ও নিয়ন্ত্রিত তাপীয় পদ্ধতিতে এই লোহার পিন্ডকে বিশেষভাবে তৈরি একটি ক্রুসিবলএর মধ্যে রেখে কারবুরাইজেসন (কার্বন সংযুক্তি বা বিযুক্তি) করা হয়। লোহার সঙ্গে কার্বনের মিশেলওয়ালা একটি সংকর ধাতু, ইস্পাতে কারবুরাইজেসনএর বিপরীত ডিকারবুরাইজেসন পদ্ধতিতে, লোহায় কার্বনের পরিমান নিয়ন্ত্রন করা হয়। ইস্পাতে কার্বনের পরিমান নিয়ন্ত্রনের প্রয়োজন কেননা ইস্পাতের ভৌত(মেকানিক্যাল) ধর্ম নির্ভর করে কার্বনের পরিমানের ওপর। প্রাকৃতিক নিয়ম হল, লোহায় যত বেশি কার্বন থাকবে ইস্পাত তত কঠিন হবে।
ব্লুমারি চুল্লিতে যে পরিমানে লোহা উতপন্ন হত, সেই লোহাই হল নানান লৌহ দ্রব্য তৈরির প্রথম ধাপ। পিণ্ডগুলোকে আবার নতুন কিছু পদ্ধতির মধ্যে ফেলে তৈরি হত কৃষির জন্য হাতিয়ার, গৃহস্থালির দ্রব্যাদি, ইমারতি দ্রব্য, শিল্পের কাজে লাগা নানান কাজের হাতিয়ার এবং যুদ্ধের জন্য নানান হাতিয়ার।
লোহায় কার্বন মেশানোর পদ্ধতি আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দশ খৃস্টপূর্বাব্দে, ভারতে উচ্চ মানের কার্বন ইস্পাত তৈরির গৌরবময় অধ্যায়ের সুচনা হল। পরবর্তী কালে এই ইস্পাতের নাম হল উজ় ইস্পাত। উজ় ইস্পাত যুদ্ধ ব্যাবসায়ীদের ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠল। কেননা, ঊজ় ইস্পাত ব্যাবহার করলে যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধাস্ত্র ভেঙে যাওয়ার আশংকা থাকে না, কেননা ঊজ় স্টিল যেমন অসম্ভব নমনীয়, তেমনি, শক্তও। ফলে তরোয়াল, শিরস্ত্রাণ এবং অঙ্গবস্ত্র তৈরি হতে থাকল এই ঊজ় ইস্পাত দিয়ে।

শ্রেণীভবন
ইংরেজরা ভারতে ক্ষমতা দখলের আগে পর্যন্ত লোহা এবং ইস্পাত প্রযুক্তিতে ভারতের ধাতুবিদেরা দক্ষতো ছিলেনই, বিশ্বের কোনও দেশ, এই প্রযুক্তিতে ভারতের পাশে দাঁড়াতে পারত না। লৌহ আকরিক থেকে রট লোহা তৈরির কালক্রম চলেছে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশএর আগেই ভারত লোহায় কার্বন সংকর মিশিয়ে শক্ত লোহা তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। কার্বন সংকরের সবথেকে পুরনো প্রত্নতাত্বিক কাল পাওয়া গিয়েছে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ(Ghosh, A. L. and P. K. Chattopadhaya. Masca Journal 2 (1982): 63)। প্রত্নতত্ববিদেরা বলছেন গঙ্গার অববাহিকাজুড়ে যে দ্বিতীয় শহরিকরনের উদ্যম গড়ে উঠল, সেটি তৈরি হওয়ার বড় সহায় ছিল এই সংকর ইস্পাতএর তৈরি হাতিয়ার।
কাবন সংকরকে তিনটি শ্রেনিতে লোহাকে ভাগ করা যায়। এগুলিকে আবার তাদের গড়ন এবং পরিমান অনুসারে আবার উপবিভাগে ভাগ হতে পারে। অষ্টাদশ থেকে দ্বাদশ শতের(যথা রস রত্ন সমুচ্চয়) সংস্কৃত সাহিত্যে লোহাকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে কান্তা লোহা(Kanta Loha) বা রট আয়রন, তিক্ষণ লোহা(Tikshna Loha) বা কার্বন স্টিল, এবং মুন্ড লোহা(Munda Loha) বা কাস্ট আয়রন। রাসেন্দ্রসার সংগ্রহে এই তিন প্রকার লোহার কথা বলাহচ্ছে, তবে কিছু বিস্তৃত মন্তব্যের মধ্য দিয়ে – মুন্ড আয়রন রাস্টএর তুলনায় ১০ গুণ ভাল, তিক্ষণ লোহা মুন্ডর তুলনায় ১০০০ গুণ কাজের, কান্ত লোহা ১০ লক্ষ গুণ ভাল তিক্ষণএর তুলনায়। এছাড়াও কার্বনের পরিমান, তাপ প্রয়োগের পরিমান এবং ব্যবহারের নিরিখে লোহাকে আবার নানান উপবিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। মুন্ড তিন ভাগে বিভক্ত মৃদু, যা সহজে গলে কিন্তু সহজে ভাঙ্গে না এবং চকচকে, কুন্ঠা নেহাই দিয়ে পেটানোর সময় খুব সহজে বিস্তৃত হয় না এবং কাদরা, যা হাতুড়ির ঘায়ে সহজেই ভেঙে যায়। তিক্ষণএর উপবিভাগ করা হয়েছে – খর(khara), সর(sāra), হৃন্নল(hrinnāla), তারাবত্ত (tārābatta), বাজিরা(bājira) এবং কালৌহ(kālaauha)। কান্তর পাঁচটি বিভাগ করা হয়েছে – ভ্রমক(bhrāmaka), চুম্বক(chumbaka), কর্ষক(karshaka), দ্রাবক(drāvaka), এবং রোমকান্ত (romakāntā)। যে লোহাদিয়ে যে কোনও লোহাকে টেনে নেওয়া যার তার নাম ভ্রমক, যেটি অন্য লোহাকে চুম্বন করে তার নাম চুম্বক, যেটি অন্য লোহাকে টানে তার নাম কর্ষক, যে লোহায় সব ধরণের লোহা গলে যায় তার নাম দ্রাবক,রোমকান্ত এমন লোহা, যা ভাঙলে সরু চুলের মত তন্তু বেরিয়ে আসে।
প্রাচীনকালে গলন চুল্লিগুলিতে, লোহা গলানোর সময় নির্দিষ্ট, নিয়ন্ত্রিত পরিমানে কার্বন মিশেল দেওয়া হত। জং ছাড়া লোহায় ফসফরাস মিশেল দেওয়া হত, এবং এই ধরনের ইস্পাত তৈরির সময় ব্লুমারি চুল্লিতে ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা কলি চুন দেওয়া হত না। অর্থাৎ প্রাচীনকালের ধাতুবিদেরা লোহার ব্যাবহার অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমানে নানা ধরণের দ্রব্য মিশেল দিয়ে বিশেষ পরিমানে বিশেষ ধরণের সংকর লৌহ তৈরি করতে পারতেন।
ভারতীয়রা বহুকাল ধরেই ফোরজ ওয়েল্ডিং পদ্ধতিতে লোহা তৈরি করত। ষোড়শ শতকে ইয়োরোপ কাস্ট আয়রন পদ্ধতি আপন করে নিলেও, ভারত বহুকাল এর থেকে দূরে ছিল। তাঁরা পূর্বোক্ত পদ্ধতিতেই বিশাল বিশাল কামান তৈরি করেছে। সারা ভারতে এধরনের বহু কামান এবং লোহার কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বিকাশ মুঘল আমল পর্যন্ত ঘটে চলেছিল। পুর বিষয়টি ওলটপালট হয়ে যায় ১৭৫৭র পরে ভারতে ব্রিটিশেরা কব্জা করার পরে। এই শিল্পকে মারার জন্য প্রথম যে কাজটি তারা করল, সেটি হল আকাশ চুম্বি কর আরোপ এবং বিদেশে লোহা রপ্তানি বন্ধ করা।
আর বালাসুব্রামনিয়ামএর মেটালারজ়ি অব এন্সিএন্ট ইন্ডিয়ান আয়রন আন্ড স্টিল প্রবন্ধ থেকে

Friday, June 21, 2013

দক্ষিণ ভারতের উক্কু বা উজ় ইস্পাত, Wootz Steel or UKKU Steel of South India

Wootz was the first high-quality steel made anywhere in the world. According to reports of travelers to the East, the Damascus swords were made by forging small cakes of steel that were manufactured in Southern India. This steel was called wootz steel. It was more than a thousand years before steel as good was made in the West.”
-J. D. Verhoeven and A. Pendray The Mystery of the Damascus Sword,, Muse, 1998

আজ ভারতের কয়েকজন হাতে গোণা মানুষ ছাড়া কেউই প্রায় তার একদা সর্বব্যাপক লোহা এবং জং ছাড়া লোহা(ইস্পাতের)র ইতিহাস জানেন না বললেই চলে। দিল্লি বা ধরের লৌহ স্তম্ভ বা নানান ঐতিহাসিক এলাকায় অবহেলায় পড়ে থাকা কামান ইত্যাদি চোখে পড়লেও, সেগুলি কীভাবে খোলা আকাশের তলায় কোনও রকম ছাউনি, রঙের প্রলেপ, রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই শতাব্দর পর শতাব্দ টিকে রয়েছে, সে বিষয়ে জনমানসে বোধহয় খুব একটা চিন্তা ভাবনা হয় নি। আজও সারা বিশ্বে দিল্লির লোহার থাম একটি প্রযুক্তিগত বিস্ময়। কিন্তু এতেই ভারতের লৌহ ইস্পাতের প্রযুক্তির বয়ান শেষ হয়ে যায় না।
এর বাইরেও মুলতঃ দক্ষিণ ভারতের লোহার কারিগরেরা একধরনের লোহার পিণ্ড বানাতে সক্ষম ছিলেন, যে পিণ্ড গলিয়ে আরব করিগরেরা বিশ্বজয়ী যে সব নানান হাতিয়ার তৈরি করতেন, সেগুলোর ভৌগোলিক উৎসের উপসর্গ ছিল দামাস্কাস। দামাস্কাসে তৈরি হাতিয়ার আজও সারা বিশ্বে প্রবাদপ্রতিম হয়ে রয়েছে। দামাস্কাস হাতিয়ার নিয়ে গবেষণায় গত কয়েকশ বছর ধরে উঠে আসছে উক্কু বা উক্কু ইস্পাতের কথা।
বিগত দুই সহস্রাব্দ ধরে ভারতের জং ছাড়া লোহা, ইস্পাতের বিশ্বময় চাহিদা ছিল। এবং দামাস্কাস তরোয়ালের সুত্রে ভারতের এই ইস্পাতের নাম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ সময় ধরে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় উক্কু ইস্পাতের মাহাত্ম্য বজায় ছিল। আগেই বলেছি উক্কু ইস্পাতের জন্ম দক্ষিণ ভারতে। এবং ভারতে ইংরেজ প্রাধান্যের পর থেকে এই ইস্পাতের অক্ষহৃদয় ভেদ করতে ইংলন্ড, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা উঠেপড়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। দেখাযায়, এই ইস্পাতে ন্যানো প্রযুক্তির ছোঁয়া রয়েছে এবং এতে এত বেশ বেশি পরিমানে কার্বনের মিশেল রয়েছে যে এটি সধারন ইস্পাতের থেকেও শক্ত এবং টেঁকসই। তাই আজও বিশ্ব জুড়ে উক্কু বা ঊজ় ইস্পাত নিয়ে গবেষণায় ছেদ পড়ে নি। আজও গবেষকেরা এই বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট পরিমানে উৎসুক।

ভারতের ধাতুবিদ্যা
সুপ্রাচীন অতীত থেকে ভারতের ধাতুবিদ্যা, বিশেষ করে লৌহ দ্রব্য প্রস্তুতির প্রযুক্তি বিশ্বের নজর কেড়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে আলেকজ়ান্দারের আগে থেকেই ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ভারতের লোহার সুখ্যাতির বর্ণনা পাওয়া যায়। আলেকজ়ান্দারকে নির্দিষ্ট পরিমান জং ছাড়া লৌহ পিন্ড উপহার দেওয়া হয়। এই পিন্ডটি ভারত থেকে ভুমধ্যসাগর এলাকায় রপ্তানি শুরু হয়। এবং তখন থেকেই সেই পিণ্ড নির্ভর করে দামাস্কাসে পৃথিবী বিখ্যাত তরোয়াল শিল্পের সুচনা। দ্বাদশ শতকে আরব ইদ্রিসি বলেন হিন্দুরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধাতুবিদ। ১৮২৫ সালে ওয়াল্টার স্কটের দ্য টেলসম্যান উপন্যাসে, তৃতীয় ধর্মযুদ্ধে, ইংল্যন্ডের সিংহ হৃদয় রিচারডের সঙ্গে সুলতান সালাদিনের যুদ্ধে দামাসকাস তরোয়ালের ব্যবহার উল্লিখিত হয়েছে। যদিও এটি একটি গল্প কথা, বিন্দুমাত্র ঐতিহাসিকতার চিহ্ন মাত্র নেই, তবুও ঔপনিবেশিক ইংলন্ডে এই উপন্যাসটির হাত বেয়ে দামাস্কাস তরোয়ালের মাহাত্ম্য শুরু হয়, সেই ঔৎসুক্য এখনও শেষ হয় নি। এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকে ইউরোপের ঔপনিবেশিক পান্ডিত্যে দামাসকাস তরোয়ালের মাহাত্ম্য বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রবার্ট হারটফিল্ড শ্রীলঙ্কায় উক্কু ইস্পাত নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তার উপলব্ধি, ভারতের উক্কু ইস্পাত তার সময়ের ইউরোপের ইস্পাতের তুলনায় বহুগুণে উপাদেয় ছিল।
সমস্যা হল ভারতের উক্কু ইস্পাত তৈরি পদ্ধতির সেরকম কোনও নির্দিষ্ট নথিকরণ আজও পাওয়া যায় নি। ভারতে ভ্রমনে আসা ইউরোপীয় পর্যটকদের লেখনি সুত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮০৭এ ফ্রান্সিস বুকানন, ১৮১৮য় বেঞ্জামিন হেইন, ১৮৩২এর এইচ ডব্লিউ ভয়সি, ১৮৪০এ জোশায়া মার্শাল হিথের রচনা থেকে ক্রুসিবল পদ্ধতিতে উক্কু স্টীল তৈরির বিষয়ে মোটামুটি ধারণা করা যায়। তাদের বর্ণনায় মহীশুর, মালাবারএর সালেমে এবং অন্ধ্র প্রদেশের গোলকোন্ডায় ক্রুসিবল পদ্ধতিতে ইস্পাত তৈরির বর্ণনা রয়েছে। আনন্দ কুমারস্বামী শ্রীলঙ্কার আলুৎনুভারা এলাকার ক্রুসিবল ইস্পাতের উৎপাদন প্রযুক্তি বিশদে বর্ণনা করেছেন ১৯৫৬ সালে( Mediaeval Sinhalese Artএ)। ১৬০০ সাল থেকে বিশাল পরিমানে উক্কু ইস্পাত মালাবার উপকূল থেকে পারস্যে রপ্তানি হত। এর থেকে একটি বিষয় পরিস্কার, অন্ততঃ ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের পূর্বাহ্ণ পর্যন্ত ভারতে ব্যাপক হারে উক্কু ইস্পাতের পিণ্ড তৈরি হত এবং পারস্যে রপ্তানিও হত। দক্ষিণ ভারতের গোলকুণ্ডা, সালেম বা মহীশুরের উক্কু ইস্পাতএর পিণ্ড গলিয়ে, পারস্যের দামাস্কাসের খোরসান এবং ইস্পাহান এলাকায় তৈরি হত নানান ইস্পাতের অসম্ভব কার্যকরী, টেঁকসই হাতিয়ার। এগুলির চাহিদা সারা বিশ্বে উত্তুঙ্গ ছিল। শোনা যায় এই হাতিয়ার দিয়ে সবথেকে পাতলা কাপড়কেও প্রস্থচ্ছেদে কেটে ফেলা যেত।
ইউরপিয়রা যেমন ভারতের নানান নামকে বিকৃত করে বিশ্বে প্রচলিত করেছে, তেমনি ভাগ্য উক্কু ইস্পাতেরও হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের বহু ভাষায় আজও ক্রুসিবল লোহার নাম উক্কু, সেখান থেকে ইংরেজি জিহ্বায় উজ়। ফলে বিশ্বে এই উক্কু ঊজ়ে পরিনত হয়েছে। উক্কু গবেষক সিরিল স্ট্যানলি স্মিথ বলছেন, পারস্যের দামাস্কাস তরোয়াল তৈরির জন্য যে ইস্পাতএর পিন্ড মুলতঃ দক্ষিণ ভারতের কারিগরেরা বানাতেন, তাতে খুব বেশি পরিমানে, ১.৫ – ২.০% কার্বনএর মিশেল থাকত। যদিও দামাস্কাস ইস্পাতের সঙ্গে উক্কুর পিন্ডের নাম একই সঙ্গে উঠেআসে, তবুও বলা দরকার, উনবিংশ শতক পর্যন্ত ভারতের নানান শহরে অতি উচ্চমানের ইস্পাত হাতিয়ারের প্রযুক্তির কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এগুলির কয়েকটি হল লাহোর, অমৃতসর, আগ্রা, জয়পুর, গোয়ালিয়র, তাঞ্জোর, মহীশুর এবং গোলকুণ্ডায়। এসব এলাকায় উক্কু ইস্পাত দিয়ে নানান ধরণের সূক্ষ্ম হাতিয়ার বানানোর ব্যাপক শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। আজ এই একটিও স্থানে এধরনের শিল্প বেঁচে নেই।
দামাস্কাস তরোয়াল বললে দু ধরণের ইস্পাতের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটি উচ্চমানের কার্বনের মিশেলযুক্ত ইস্পাত, অন্যটি লোহা আর ইস্পাতকে জুড়ে তৈরি করা সঙ্কর ধাতু, যে জোড় খালি চোখেই নজরে পড়ে। যদিও দুটিকেই আসল দামাস্কাস ইস্পাত বলে চালানো হয়েছে, স্মিথ বলছেন ইয়োরোপ অন্ততঃ ১৮২১এর আগে ক্রুসিবল ইস্পাতএর নকল তৈরি করতে পারে নি। জোড় লোহার উদাহরণ পাওয়া যায় সামুরাই এবং ভাইকিংদের তরোয়াল থেকে।
সম্প্রতি অন্ধ্রপ্রদেশের পুরনো গোলকুণ্ডা, আজকের নিজ়ামাবাদ জেলার কোনানসমুদ্রমে উতখনন, এবং নানান গবেষণা করে উক্কু ইস্পাতের প্রকরণ পদ্ধতি পাওয়া গিয়েছে। কর্ণাটকের চিত্রদুরগ জেলার ঘাতিবোসাহাল্লিতেও উক্কু ইস্পাতএর ইতিহাস গবেষণা নিয়েও নানান প্রত্নতাত্বিক কাজকর্ম হয়েছে। এই ক্ষেত্র সমীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে, অন্ততঃ এই এলাকাগুলোয় স্পেসালাইজ়ড, স্ট্যান্ডারডাইজ়ড, সেমি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল উৎপাদন পদ্ধতি বিকশিত হয়েছিল মধ্যযুগে। প্রত্নতত্ববিদ শারদা শ্রীনিবাসন বলছেন তামার খনি এবং তামা গলানোর চুল্লির হদিস করতে গিয়ে তিনি তামিলনাডুর দক্ষিণ আরকট জেলার মেল-সুরুভালুর-এ ধাতু গলানোর প্রাচীন এলাকার সন্ধান পেয়েছেন। এই এলাকাটি দাক্ষিণাত্যের অন্যতম উক্কু ইস্পাত তৈরির স্থান ছিল। তিনি আরও বলছেন, এই অনুসন্ধানের ফলে আরও বোঝাগেল, দাক্ষিণাত্য শুধু যে উক্কু ইস্পাত তৈরির একটি বড় কেন্দ্র ছিল তাই নয়, ক্রমশঃ কারিগরেরা এই পদ্ধতিটির প্রাযুক্তিক রূপ বদল ঘটাতে সক্ষম হচ্ছিলেন।
১৮৮৬ সালে ব্রনসন The making and selling of wootz - a crucible steel of Indiaয় মধ্যপ্রাচ্যের ধ্রুপদী সাহিত্যএর নানান উদাহরণ থেকে ভারতের লৌহ এবং ইস্পাতের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সপ্তম খ্রিস্টাব্দের ইসলাম পূর্ব আরবে হামাসা শ্লোকগুলিতে আলহিন্দ বা হিন্দওয়ানি হাতিয়ারের উল্লেখ পাচ্ছি। অষ্টম খ্রিস্টাব্দের ইসলাম ধর্ম বিষয়ক লেখক জাবির ইবন হাইয়ার এবং একাদশ শতকের আলবিরুনি পরিস্কার করে বলছেন যে ভারত আর শ্রীলঙ্কার ইস্পাত দিয়ে আরবের নানান এলাকায় হাতিয়ার তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল। পঞ্চম খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রীক ভিষগ বর্ণনায় পারস্যের সম্রাটকে ভারতের ইস্পাতে তৈরি তরোয়াল উপহারের বিষটি উঠে এসেছে। প্লিনির ন্যাচরাল হিস্ট্রিতে রোম সাম্রাজ্যে ভারতের, বিশেদ করে সেরেস রাজ্য থেকে, আদতে চের রাজ্যের লৌহ ইস্পাতের গুরুত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। পেরিপ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিসিয়ান সির নাম না জানা লেখক সরাসরি গ্রিসে ভারতের লৌহ ও ইস্পাত আমদানির কথা বলছেন। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব সহস্রাব্দের প্রথম শতকে চের রাজ্য থেকে যে ইয়োরোপে ভারতের লোহা আর ইস্পাত যে রপ্তানি হত তার প্রমান শুধু এইসব লেখায় নয়, প্রত্নতত্বের উতখননের প্রমানেও মিলেছে। এছাড়াও তামিল নাডুর সঙ্গম যুগের চের সাম্রাজ্যের রজধানী কারুরের কাছে কডুমনালে যে লৌহ যুগের মেগালিথিক প্রত্নতাত্বিক এলাকার প্রচুর গলন চুল্লি এবং প্রচুর পরিমানে ক্রুসিবল ইস্পাত ও লোহার বর্জ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে কোন অঞ্চল থেকে পারস্যে রপ্তানি হত, তার ইঙ্গিত একমাত্র ১৬৭৯ সালে তাভারনিয়েরই বর্ণনায় পাওয়া যায়। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি স্পষ্টভাবে বললেন উক্কু ইস্পাতের ভৌগোলিক উৎস। তিনিই বললেন দক্ষিণ ভারতের গোলকুণ্ডার ইস্পাত মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়ে পারস্যের দামাস্কাস তরোয়াল তৈরি হয়।

তিনটি পদ্ধতি
ভারত এক্কেবারে নিজস্বভাবে এই ক্রুসিবল ইস্পাত তৈরির পদ্ধতি উদ্ভব করেছিল। লোহাকে কারবুরাইজ় পদ্ধতিতে ইস্পাতে পরিনত করা হয় বিশাল একটি গলন চুল্লিতে লোহা রেখে তাকে ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে১২-১৪ ঘন্টার বৃত্তে জ্বালানো হয়। দক্ষিণ ভারতের তিনটি মূল যায়গায় এই উক্কু ইস্পাত পিণ্ডটি তৈরি হত। এই তিনটি জায়গার উৎপাদন প্রযুক্তিও কিন্তু আলাদা ধরণের ছিল – একটি ছিল দাক্ষিণাত্য বা হায়দ্রাবাদি পদ্ধতি, একটি মহীশুরী পদ্ধতি আর শেষটি হল তামিলনাডু পদ্ধতি। 

সংকলকের বক্তব্য - খামতি
যেহেতু লেখক ধাতু বিদ্যা বিষয়ে বেশি জানেন না, তাই বহু লেখায় উক্কু ইস্পাতের কিছুটা তৈরির প্রযুক্তির বর্ণনা অনেকেই দিতে চেস্টা করেছেন, কিন্তু, সেই প্রাযুক্তিক শব্দ ভাণ্ডার তার না জানা থাকায় সেই বিষয়ে প্রবেশ করা যায় নি। করতে পারলে ভাল হত। পাঠককে অনুরোধ, বিশেষজ্ঞ কেউ যদি সে সময়ের ভারতের ক্রুসিবল ইস্পাত তৈরি এবং কারবুরেসন প্রযুক্তিসহ আরও কিছু সংশ্লিষ্ট শব্দবন্ধ এবং প্রযুক্তি বিষয়ে আলকপাত করেন তাহলে অনেকেই ঋদ্ধ হবেন। বাঙলায় এই আলোচনা, এই লেখার মতই ইতিহাস বর্ণনায় শেষ হয়ে যায়।