Sunday, June 9, 2019

কেন আজ পলাশীকে ঘুরে দেখা? শুধুই কি অতীতাচার?

ঢাকা বাতিঘরে আলোচনা শুরুর আগে পলাশী বিষয়ে তিনটে মূল ধরতাই দেওয়া দরকার, আজকে দাঁড়িয়ে পলাশীর ২৬২ বছর পরেও আমরা কেন সেই সময়টা ছুঁতে চাইছি।
এক।
পলাশী বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের সময় সারণিতে গুরুত্বতম বিন্দু, যে বিন্দুকে ব্যবহার করে ইওরোপ, এশিয়া/আফ্রিকার সঙ্গে কয়েক হাজার বছরের ঘাটতি বাণিজ্যের হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ করল, যে বাংলা সে সময় ছিল বিশ্ব ধনসম্পদের সিঙ্ক, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ - এই সাত বছর বাংলার সেই অমিত সম্পদ লুঠে পশ্চিম ইওরোপের ধনসম্পদে অপুষ্ট দ্বীপ রাষ্ট্রটি সম্পদশালী হল এবং বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ লুঠেরা অত্যাচারী খুনি সামরিক রাষ্ট্র হয়ে উঠল।
১৭৫৭য় কার্যত তার দখলে চলে যাওয়া সোনার বাংলায় সে ক্রমশ নামিয়ে আনল অমিয় কুমার বাগচী কথিত ২০০ বছর ধরে স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট পলিসি, যে নীতিগুলির মধ্যে প্রধানতমগুলি ছিল নুন সুপুরি আফিম চট বাঁশের মত হাজারো নগণ্য ব্যবসার একচেটিয়া করণ, বাংলার রাজস্বকে ব্যবহার করে বিনামূল্যে বা অর্ধমূল্যে বাংলায় পণ্য সংগ্রহ এবং সেই আর্থিক এবং ধনসম্বল নিজের দেশে লুঠেরা এককেন্দ্রিক শিল্পতে বিনিয়োগ করা, ১১৭৬তে পরিকল্পিত গণহত্যা করে বাংলার জনসংখ্যা একতৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা যাতে নিয়মিত বাংলার ব্যবসায়িক গঞ্জ হাট এবং বাজার দখল করা যায়, কম মূল্যে বিনামূল্যে নিজের দেশের শিল্পের জন্যে কাঁচামাল রপ্তানি করা যায়, বাংলার উতপাদন ব্যবস্থার বিশিল্পায়ণ করা হল, ১৭৯৩তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হল যার ফলে বাংলার জমির বাজার তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে শিল্প ধংসের ফলে বিশাল কারিগর দিন মজুর এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত নানান দেশে দাস খাটতে যেতে বাধ্য হয়। সাম্রাজ্য একই সঙ্গে রেনেলকে দিয়ে মুঘল মানচিত্র আর সমীক্ষা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সম্পদ লুঠের জন্যে মানচিত্র আর কোলব্রুককে কাজে লাগিয়ে পণ্য উতপাদন সমীক্ষা করায়, যে নীতি, জ্ঞান হাতিয়ারগুলি ব্যবহার করে শুরুতে বাংলা পরে গোটা উপমহাদেশকে অধমর্ণ করবে চিরকালের মত আর ইওরোপকে বসবে চালকের আসনে, হবে উত্তমর্ণ। আজকে ইওরোপিয় যে সব সেবা বা প্রযুক্তি পাই তার সলতে পাকানো বিভিন্ন উপনিবেশের জ্ঞান ধার করে, মেট্রোপলিটনে নয়।
দুই।
এই সামগ্রিক ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উতপাদক কারিগর আর হকারদেরে চাষীদের নিষ্ক্রমণ ঘটল।পলাশীর আগে যে জ্ঞান দক্ষতা বাজার নির্ভর করে কারিগরেরা এই উপমহাদেশকে সোনার বাংলা বানিয়েছিলেন, ইওরোপকে নতুন ফ্যাশান দিয়েছিলেন, উপনিবেশের কবল থেকে মুক্তির পরও কারিগরদের তো পুনর্বাসন ঘটলই না, একই সঙ্গে উপমহাদেশিয় তিনটি প্রধানতম দেশের অধমর্ণতাও ঘুচল না উপমহাদেশ ভাগের আট দশক পরেও।
এই দুটি ঘটনার মধ্যে আমরা মনে করি বিপুল যোগসূত্র আছে। আজও পশ্চিমের ধারের জ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, বিদ্যায় বলীয়ান হয়েও উপমহাদেশিয় ত্রয়ী অধমর্ণই থেকে গেলাম। পলাশীর ৪ দশক পরেও যে উপমহাদেশিয় ভৌগোলিক ভূখণ্ডর জিডিপি ছিল ২৫, যে উপমহাদেশের পূবভাগের জিডিপি ছিল ৬, আজকের ভারত ভূখণ্ড তদানীন্তন বাংলার ৬ জিডিপি ছুঁতেই হিমিশিম।
তিন।
যে নিজের দেশের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গী। যার ইতিহাস চর্চা নেই সে খড়ের মানুষ।
আমাদের শিক্ষক কারিগরদের দেখানো পথে, গণ কমিটির ডাকে ৬ জৈষ্ঠ বিকেল চারটে থেকে ফেলে আসা সময়টাকে দেখব।
জয় বাংলা।

No comments: