Saturday, September 11, 2010

শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - মধ্যমণ্ডল

শঙ্খাসুরের রক্ত থেকে শঙ্খ
বাঙালী ঐতিহ্যের একটি নির্দিষ্ট স্থান দখল করে আছে শাঁখা৷ শাঁখা ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন ধর্মীয় আচারভিত্তিক কর্মকান্ডই সুসম্পন্ন হয় না৷ হিন্দু নারীদের সধবা হওয়ার প্রতীকই হলো শাঁখা৷ পৌরানিক কাহিনীতে শাঁখার উত্‍পত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে- শঙ্খাসুরের স্ত্রী তুলসী দেবী ছিল ঈশ্বর নারায়ণে বিশ্বাসী খুবই সতীসাধ্বী নারী৷ কিন্তু শঙ্খাসুর ছিল ঈশ্বরবিমুখ অত্যাচারী৷ তার পাপের শাস্তিস্বরূপ তাকে ঈশ্বরের আদেশে হত্যা করে ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়৷ পতিব্রতা তুলসী তা সইতে না পেরে স্বামী এবং নিজের অমরত্বের জন্য ঈশ্বরের কাছে বিনীত প্রার্থনা করে৷ ঈশ্বর তার প্রার্থনা মঞ্জুর করে তার দেহভস্ম থেকে তুলসী গাছ এবং সমুদ্রে হত্যা করা স্বামীর রক্ত থেকে শঙ্খ বা শাঁখা উত্‍পত্তি করেন৷ এখানেই শেষ নয়, তুলসী দেবীর ধর্মপরায়ণতায় সন্তুষ্ট হয়ে ঈশ্বর তুলসী ও শাঁখাকে তাদের সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের আবশ্যকতা নির্ধারণ করে দেন৷ সেই থেকে পতিব্রতা তুলসীকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে হিন্দু সম্প্রদায় তুলসী ও শাঁখার ব্যবহারের প্রচলন করে৷ এ কাহিনী সূত্রে বলা যায় খ্রীষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে (মহাভারতের যুগে) শাঁখার ব্যবহার শুরম্ন হয়৷ হিন্দু সমাজে শান্তির প্রতীক, মঙ্গলের প্রতীক শাঁখার ব্যবহার বহুল প্রচলিত৷ তবে শাঁখা দিয়ে গড়া গহনা ও বাদ্যশঙ্খের ব্যবহার ছাড়া তাদের সামাজিকতা ও ধর্মীয় কার্যাদি অচল বলা চলে৷ বিবাহিত নারীদের তো বরের দেয়া শাঁখার বালা ধারণ করতেই হবে৷ আর পূজা-অর্চনা, সামাজিক, মাঙ্গলিক বা যেকোন শুভ অনুষ্ঠানে বাদ্য শঙ্খের ধ্বনি ছাড়া তা অসম্ভব বলেই ধরে নেয়া যায়৷
শাঁখের প্রকারভেদ
সাধারণত শাঁখা হয় বামাবর্তী, কিন্তু হাতে গোণা যে সব শঙ্খ দক্ষিণদিকে মুখ করা তাদের দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ বলাহয়৷ সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মে কিন্তু দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের চাহিদা আর তার গুরুত্ব বেশ বেশি, এ ধরণের শঙ্খ খুব বেশি পাওয়া যায়না বলেই হয়ত৷ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক৷ আমরা যেন মনেরাখি ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে দক্ষিণ দিকটি সম্পদের দেবতা কুবেবের দিক, সে জন্যও হয়ত দক্ষিণবর্ত শঙ্খের দাম৷ সুপুরি থেকে বড় নারকেলের পরিমানমত হয়ে থাকে দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ৷ আজকের বাজারে একটি সাধারণ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম দেড় হাজার টাকা থেকে দুহাজার টাকা প্রতি গ্রাম, আবার দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দুধেলা প্রকারের দাম হয় গ্রাম প্রতি দু হাজার টাকাও৷ কখোনো আবার লক্ষণ, রং আর নানান উপাদানের উপর নির্ভর করে দাম ওঠে গ্রাম প্রতি দশহাজার টাকা পর্যন্তও৷ মাঝারি পরিমানের একটি দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম ওঠে প্রায় দশ থেকে পনের লাখ টাকা৷
ভারতে যেসব শঙ্খ ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে শঙ্খের ব্যবহার হয় দুভাবে ৷ আস্ত শঙ্খ আর কাটা শঙ্খ, যেখানথেকে তৈরি হয় শাঁখা, নানান শঙ্খজাত দ্রব্য৷ আস্ত শঙ্খ আবার ব্যবহার করা হয় দুভাবে৷ তার একটি বাদ্যশঙ্খ অন্যটি জলশঙ্খ৷ আর কাটা শঙ্খ দিয়ে হয় শাঁখা, আংটি, চুনসহ নানা উপকরণ৷
বাদ্যশঙ্খ : শ্রীলঙ্কা থেকে আসা শঙ্খ পরিষ্কার করে পেছনের অংশ কেটে বাদ্যশঙ্খ তৈরি করা হয়৷ এ শঙ্খ বিশেষ কায়দায় ধরে কাটা অংশ মুখে লাগিয়ে ফুঁ দিয়ে শব্দের সৃষ্টি করা হয়৷ এ শব্দকে বলা হয় মঙ্গলধ্বনি৷ পূজার আগে বা বিশেষ ক্ষণে বাদ্যশঙ্খ বাজিয়ে মঙ্গলধ্বনি দেওয়া হয়৷ প্রতিটি মন্দির অথবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে বাদ্যশঙ্খ একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ৷
জলশঙ্খ : জলশঙ্খ অনেকটা বাদ্যশঙ্খের মতোই৷ তবে এতে জলশঙ্খের মতো পেছনের অংশ কাটা হয় না৷ আস্ত শঙ্খটিকে চিত করে রেখে তার মধ্যে জল রাখা হয়৷ জল রাখা হয় বলেই এর নাম জলশঙ্খ৷ জলশঙ্খের জল পূজার কাজে ব্যবহৃত হয়৷ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জলশঙ্খে রাখা জল গঙ্গার জলের মতোই পবিত্র মনে করেন৷ জলশঙ্খ মন্দিরে বা ঘরে একটি ত্রিপদের ওপর রাখা হয়৷
বাদ্যশঙ্খ ও জলশঙ্খ উভয়ের গায়ে নকশা করা থাকে৷ নকশা ছাড়া শঙ্খও ব্যবহার কম নয়৷
সাধারণত প্রতিটি শঙ্খে গায়ে দেখা যায় ফুল, লতাপাতার নকশা৷ বিশেষ কিছু শঙ্খের ওপর মা কালী, রাধা-কৃষ্ণ, দুর্গা প্রতিমার নকশাও দেখা যায়৷ দিনের পর দিন কাটাকাটি করে একটি শঙ্খের ওপর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়৷ নকশা করা প্রতিটি শঙ্খ বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম উপাদান৷ শখের হাঁড়ি, কাঠের পুতুল, মনসার মঞ্জুষ, পাথরের তৈজস, শোলার কদম, লক্ষ্মী সরার মতোই নকশা করা শঙ্খ লোকশিল্পের উপাদান৷ ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের 'ঢাকার বিবরণ' (১৯১০) গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে সে সময় ঢাকার কারখানার জন্য শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা থেকে তিন-চার লাখ টাকার শঙ্খ আমদানি করা হতো৷ শঙ্খগুলোর ছিল তিতকৌড়ি শঙ্খ (লঙ্কা দ্বীপ), পটী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), ধলা শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), জাহাজী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), গুড়বাকী (মাদ্রাজ), সরতী, দুয়ানী পটী (মাদ্রাজ), আলাবিলা শঙ্খ, জলী শঙ্খ (মাদ্রাজ)৷ শাঁখারিদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খশিল্পের ওপর৷ শাঁখারিরা শঙ্খের অলঙ্কার তৈরির জন্য বেশ কয়েক প্রকারের শঙ্খ ব্যবহার করে৷ এগুলোর নাম আজকাল আর উল্লেখ পাওয়া য়ায না – আগেকার পুস্তক থেকে য়া পাওয়া গেল দিলাম - তিতপুটি, রামেশ্বরী, জামাইপাটি, পাঁজি, দোয়ানি, মতি ছালামত, পাটী, গায়বেশী, কাব্বাম্বী, ধনা, জাডকি, কলকো, নারাখাদ, খগা, তিতকৌড়ি, গড়বাকী, জাহানী, সুর্কীচোনা, সরতী, আলাবিলা প্রভৃতি৷ এসব শঙ্খের প্রাপ্তিস্থল শ্রীলঙ্কা, মাদ্রাজের উপকূল৷
Post a Comment