Friday, June 3, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

ষষ্ঠ অধ্যায়
আইন ও বিচার ব্যবস্থা

১। কিভাবে মুঘল সম্রাটেরা বিচার করতেন
কাজি, তাত্বিকভাবে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি উভয় মামলারই বিচার কর্তা। কিন্তু বাস্তবে, ইসলামিক খলিফা শাসনের প্রথম পর্ব থেকেই প্রশাসনে দুধরণের পদ্ধতি অনুসৃত হয়ে এসেছে, ১। কোরানের আইন অনুযায়ী ধর্মীয় মামলাগুলির বিচার কর্তা হলেন কাজি, ২। অধর্মীয় মামলাগুলি কোরানিয় শারা’র আইনের বাইরে, সাধারণ আইনে বিচার করা হত। ‘নবী এবং প্রথমের দিকের খলিফাই বিচারক হিসেবে মামলার রায় দিতেন, এবং তাঁদের প্রশাসক এবং পরগণার প্রতিনিধিরাও সুবা বা পরগণায় তাই করতেন। মুসলমান জগতে সাধারণত বিচার দিতেন স্থানীয় প্রশাসকেরাই। এদের বলা হত নজর ফিল-মাজালিম – যেমন ঔরঙ্গজেব তার বুধবারের বিচারের দিনটিকে বলতেন দিওয়ানিমাজালিম।
হিন্দু এবং মুসলমানদের প্রাচীনতম রাজনৈতিক ধারণা, আদর্শ অনুসারে দেশের রাজাই বিচারকর্তা, এবং খোলা রাজসভায় বিভিন্ন মামলায় ব্যক্তিগতভাবে বিচার দেওয়া তাঁর নৈতিক কর্তব্য। এই আদর্শে মুঘল সম্রাটেরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এছাড়াও আমাদের হাতে রাজসভার ঐতিহাসিক, ইওরোপিয় ভ্রমণকারী, এবং সে সময়ের যে সব নথিপত্র রয়েছে, তাতে আমরা দেখার চেষ্টা করব মুঘল আমলে বিচার ব্যবস্থার অবস্থা কেমন ছিল।

শাহজাহান এবং ঔরঙ্গজেব দুজনের বুধবারে আমদরবার বসাতেন না, বরং সেই দিন তাঁরা বিচার করতেন। ‘সম্রাট সোজাসুজি দর্শন ঝরোখা(জানালা) থেকে চলে আসতেন দেওয়ানিখাসএ সকাল ৮টায় এবং তাঁর সিংহাসনে বসেই মাঝদুপুর পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া চালাতেন। এই ঘর পূর্ণ থাকত সাম্রাজের আইন আধিকারিকের, কাজিদের, আদিলদের(সাধারণ আইনের বিচারক), মুফতিদের, আদালতের দারোগাদের (দারোগাইআদালত) এবং কোতোয়ালের বা শহরের শান্তিরক্ষকদের ভিড়ে। সাধারণভাবে তাঁর সভাসদেরা সেদিন একজনও উপস্থিত থাকতে পারতেন না, যদি না তাঁদের বিশেষ কোন কাজ থাকে অথবা মামলায় তাদের প্রয়োজন হয়। বিচার আধিকারিক একের পর এক বাদীকে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করতেন এবং তাঁদের অভিযোগগুলি বর্ণনা করতেন। সম্রাট ভদ্রভাবে তথ্যগুলি বিচার করতেন, উলেমার থেকে নিদান নিতেন, সেই অনুযায়ী রায় প্রদান করতেন। প্রত্যন্ত সুবা থেকে বহু বিচারপ্রার্থী দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান মানুষটির মুখ থেকে বিচারের বানী শোনার জন্য জন্য আসতেন। তাদের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে তদন্ত হত; সম্রাট সেই ভৌগোলিক এলাকার প্রশাসককে নির্দেশনামা লিখতেন, তাঁদের সত্য উদ্ঘাটনের নির্দেশ দিতেন, বলতেন হয় সেখানেই অভিযোগের বিচার করতে অথবা তাকে আবার রাজধানীতে পাঠাতে’(স্টাডিজ ইন আওরঙ্গজেবস রেইন)।

সম্রাট আবেদনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ছিলেন। কখোনো কখোনো মামলা শুরু(কোর্ট অব ফার্স্ট ইন্সট্যান্স) তাঁর সভা থেকেই হত। কিন্তু বাস্তবিকতা বিচার করলে, সারা দেশে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হাতে গোণা কিছু বাদী হয়ত তাঁর সামনে বিচার নিয়ে উপস্থিত হতে পারত, এবং যে পরিমান বিচারের মামলা তাঁর সামনে পেশ করা হত, তাঁর একটা ক্ষুদ্র অংশই তিনি রায় দিতে পারতেন। যদিও কয়েকজন মুঘল সম্রাট তাঁদের কাজে অসাধারণ একনিষ্ঠতা দেখিয়েছেন, বিশেষ করে জাহাঙ্গীর, তাঁর প্রাসাদ থেকে আগ্রা দুর্গের বাইরে একটা সোনার শিকলি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, যতে যে কোন মানুষ তাঁর বিচারের আর্জি প্রাসাদের কর্মী, কর্মচারী বা অন্যান্য মধ্যস্থকে ঘুষ না দিয়ে, তোয়াজ না করে সেই শিকলিতে ঝুলিয়ে দিলে, সম্রাট তা পড়ে নিতে পারতেন।

সব থেকে বড় খুঁত হল, এই আইন এবং বিচার ব্যবস্থার কোন সাংগঠনিক রূপরেখা তৈরি করা হয় নি, যাতে একেবারে নিম্ন থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত একজন বিচারপ্রার্থী সঠিক বিচারের জন্য যেতে পারেন, এছাড়াও এলাকা ধরে ধরে আদালতের সংখ্যা মোটেই খুব বেশি ছিল না। দেশের অধিকাংশ মামলা(মূলত হিন্দুদের গ্রামীণ সালিসি ছাড়া) কাজি এবং সদরদের কাছে উপস্থিত করা হত। আধিকারিকদের দায় এবং দায়িত্ব আর তাঁদের যোগ্যতা বিষয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
(চলবে
Post a Comment