Thursday, June 2, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

পঞ্চম অধ্যায়
করব্যবস্থা

৮। আবওয়ান বা বেআইনি শুল্ক
ভূমি-রাজস্ব বা আবগারি শুল্ক আদায় করা ছাড়া যে কোন ছল ছুতোয় যে সব বেআইনি আবওয়াব আদায় করা হত, তা এবারে আলোচনা করব। এই করগুলি বারবার তাদের রাজত্বকালে মুসলমান শাসকেরা বেআইনি এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু কোন না কোন ছলে একটু অদলবদল করে সেগুলি বারবার ফিরে আসত। রেভিনিউ রিসোর্সেস অব দ্য মুঘল এম্পায়ারএ, টমাস, পার্সি সূত্র উল্লেখ করে একটা তালিকা দিয়ে লিখছেন ১৩৭৫ সনে ফিরোজ শাহ তুঘলক এবং ১৫৯০ সনে আকবর সেই বেআইনি করগুলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এ বিষয়ে মিরাটিআহমদিতে একটা তালিকা উল্লিখিত হয়েছে। ২৯ এপ্রিল ১৬৭৩তে আওরঙ্গজেবও একটি ফর্মানে সেই করগুলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। মিরাটএ ৪৪টা, অন্য দুটর একটাতে ৭৪টা এবং ৭৮টা যে আবওয়াবের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলি বিভিন্ন সম্রাটের সময় রদ করা হয়েছে। রামপিনি, বেঙ্গল টেনান্সি এক্টএ লিখছেন, উনবিংশ শতেও বিভিন্ন ভাড়াটেদের জন্য এ ধরণের ১৯টি আবওয়াব জারি ছিল এবং ব্রিটিশ আদালতকে সেগুলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। আমাদের ইতিহাসে শতাব্দর পর শতাব্দ জুড়ে আবওয়াব করগুলির প্রবৃদ্ধির পরিমাণগুলি নিয়ে এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করতে পারি।

আবওয়াব সাধারণত ছটি বড় শ্রেণীভূক্ত করা যায় –
১। বিভিন্ন স্থানীয় বিক্রির ওপর শুল্ক – এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আধুনিক ভারতের বিভিন্ন পৌরসভায় অক্ট্রয় শুল্কের সঙ্গে।
২। স্থাবর সম্পত্তির ওপর কর।
৩। তাদের নিজেদের জীবনধারণের স্বার্থে, এবং রাষ্ট্রের নাম করে, আমলারা যে কোন সময়ে বিভিন্ন ধরণের কর আরোপ করতেন।
৪। নির্দিষ্ট ধরণের ব্যবসা করার জন্য ব্যবসামঞ্জুরি শুল্ক(লাইসেন্স ট্যাক্স)।
৫। বাধ্যতামূলক চাঁদা।
৬। হিন্দুদের ওপর বিশেষ কর।

আকবর যেগুলি নিষিদ্ধ করেন, তাঁর বিশদ বর্ণনা আইনিআকবরিতে বিশদে উল্লিখিত হয়েছে, যদিও টমাস তাঁর পূর্বোল্লিখিত বইতে তার কিছুটা ভিন্ন বর্ণনা দিচ্ছেন। এই অধ্যায়ের আলোচনা সূত্রে এই দুটো তালিকাই সম্পাদনা করার আশু প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছি।

জাহাঙ্গির তামঘা এবং মীরভারি নামক শুল্ক নিষিদ্ধ করে দেন, এলিয়ট বলছেন, ‘এই দুটো শুল্ক প্রত্যেক সুবায়, প্রায় প্রত্যেক জায়গিরদার এবং প্রত্যেক সরকার এগুলি নিজেদের তহবিলে(রাষ্ট্রকে না দিয়ে) ঢুকিয়ে রাখর স্বাভাব তৈরি করে ফেলেছিলেন।

বিভিন্ন ব্যক্তিগত ব্যবসা আর পেশার ওপর নানান ধরণের আবওয়াবের মত সরাসরি বেআইনি কর আরোপ করার পাশাপাশি আরও কতগুলি কর আরোপ করা হত বিভিন্ন কর্মচারীর ব্যক্তিগত ব্যবসা(পার্সিতে তারা, সূত্র ঘিয়াসুললুঘাত) ওপরে; যদিও প্রায় প্রত্যেক সম্রাট সেগুলির সবক’টি নিষিদ্ধ করে যান, কিন্তু সেই বিপুল করগুলির প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হত সাধারণ মানুষকেই।

১৬৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জারিকরা এক ফর্মানে আওরঙ্গজেবনির্দেশ দেন, গুজরাটের হাকিম(ম্যাজিস্ট্রেট) এবং অন্যান্য আধিকারিক বাজারের তুলনায় কম দামে পন্য কিনে অতিরিক্ত বেশি দামে সেগুলি গাজোয়ারি বিক্রির ব্যবসা সুরু করেছে। মুতাসাদ্দি(কর আদায়কারী), শেঠ(পাইকারি ব্যবসায়ী) এবং দেশাই(মোড়ল)রা বহু পরগণায় নতুন ফসল উঠলে সাধারন মানুষকে তা কিনতে বাধা দিচ্ছে, সমগ্র উতপাদনটা তারা নিজেরা কব্জা করে নিচ্ছে, এবং পচা, খারাপ না বেছে ভাল সবজির দামে সেগুলি বিক্রি করে দিচ্ছে... সুবার প্রশাসক এবং ধনীরা তাদের নিজেদের, রাষ্ট্রের বাগানে সবজি ফলিয়ে, সেগুলি দ্বিগুণ দামে বিক্রেতাদের কিনতে বাধ্য করছে। ...আহমেদাবাদ এবং বিভিন্ন পরগণায় কিছু মানুষ একচেটিয়াভাবে ইজারা নিয়ে চালের ব্যবসা শুরু করেছে, এবং তাদের সম্মতি ছাড়া এই ব্যবসায় সাধারণ মানুষ আসতে পারছে না, ফলে গুজরাটে চালের দাম আকাশ ছুঁয়েছে’।

সাধারণাভবে কিছু অসৎ প্রশাসক, এমনকি ফৌজদারও রাস্তায় ব্যবসায়ীদের বাঁধা গাঁটরিগুলো খুলে, তাদের ইচ্ছেমত ধার্যকরা দামে তাদের প্রয়োজনমত দ্রব্য তুলে নিতেন, এবং এই ঘটনা জাহাঙ্গিরের সময় নিয়মিত ঘটত এবং তাঁর ১২ট ফর্মানের সব কটাতেই এই প্রথা তিনি নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু ইওরোপিয় ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় পাই এই প্রথার ছেদ ঘটে নি। অষ্টাদশ শতে আওরঙ্গজেব বাংলায় তাঁর পুত্র আজিমুশ্বানকে ব্যক্তিগত ব্যবসা(সওদাইখাস) থেকে বিরত থাকার জন্য কঠিন ভাষায় পত্রাঘাত করছেন(সূত্র -রিয়াজুসসালাতিন)।

মধ্যযুগের ভারতে কম মাইনেয় চাকরি করা দুর্ণীতিগ্রস্ত, খাঁইদার আধিকারিকেরা জনগণের অর্থ নয়ছয় করেছে এই ধরণের বেআইনি কর আরোপের মধ্যে দিয়ে – এ তথ্য খুব বেশি প্রচার পায় নি, কিন্তু প্রায় প্রত্যেক সম্রাটের রাজত্বে এই প্রথা কমবেশি চলে এসেছে। জনগনের প্রায় সবকিছু মাথা নামিয়ে মেনে নেওয়া, দুর্বল কেন্দ্রিয় সরকার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের জন্য বহু মানুষ সরকারিভাবে জনগনকে দুয়ে নিতে পেরেছে। সম্রাটের নিষেধ সত্ত্বেও কোন কোন পণ্য কখোনো কখনো দুবার, তিনবার কর আরোপ হয়েছে।

আওরঙ্গজেবের ২০ নভেম্বরের ফরমানে গুজরাটের যে ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, সেটা যে অন্য সুবায় ঘটত না তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। এর কিছু কিছু বর্ণনা করা গেল।
(চলবে)
Post a Comment