Sunday, June 19, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

নবম অধ্যায়

২। মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণের কারণ

পরিবারগুলি বিধ্বস্ত হওয়ার কারণগুলির একটি হল, সাধারণত সরকারিভাবে আমলারা রাষ্ট্রের কাছে ঋণী থাকত। নিয়গের সময় রাজস্ব তোলার জন্য অগ্রিম অর্থ নিয়ে জায়গির তারা ভোগ করত। সেটা আদতে রাষ্ট্রের চোখে ঋণই। যে অগ্রিম অর্থ নিয়ে তারা জায়গিরদার হল এবং জায়গিরদারি চালাতে সেই অগ্রিম অর্থ শোধ না করে ব্যবহার করল, নতুন করে তাদের পরিকাঠামো বজায় রাখতে বার বার রাষ্ট্রের সামনে হাত পাততে হত এবং তাদের ঋণ বাড়ত। আর সাধারণত প্রতিরক্ষা বিষয়ক জটিলতম হিসেব নিকেশ খুব শম্বুক গতিতে চলত, তাই জায়গিরদার তাঁর কাজের সময়ে বুঝে উঠতে পারতেন না, কত সম্পদ তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে ধার করলেন আর কত সম্পদ তারা রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দিলেন। জায়গিরদারদের বেতন ঠিক হত তাদের ঘোড়ার সংখ্যা দিয়ে, যখন তারা তাদের ঘোড়ার সংখ্যা গুনতি আর ছাপানো আর সেনাদের গুনতির জন্য অধীক্ষকের(দাগ ওয়া তাহসিহা) সামনে এনে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত করতে হত। তখনই তাদের নথি (চিহারা) ঠিক হত। এই কাজটি করতে বহু সময় লেগে যেত আর এই কাজ একমাত্র সঠিকভাবে শান্তির সময়েই করে ওঠা যেত। মাঝে মাঝে আমরা সরকারি নথিতে পড়ি যে আধিকারিকদের দাগ অত্যাদি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ যুদ্ধ বা অন্যান্য গোলযোগের সময় কাজ তোলার তাগিদে ঠিকঠাক গুনতি না করিয়েই তাদের অর্থ মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে যখন ভারত জুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চলছে, তখন ঠিকঠাকভাবে সামরিক বিভাগের হিসাবকিতাব রাখা এবং তা পরীক্ষা করা সময়সাধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী কাজ ছিল। মধ্য উনবিংশ শতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজত্বেও যখন প্রথম শিখ যুদ্ধ চলছে, তখন ব্রিটিশ সেনাদের বেতন তিন চার বছরের পরে চোকানো হয়েছে(ব্যানক্রফটের ফ্রম রিক্রুট টু স্টাফ সার্জেন্ট থেকে)।

মুঘল ভারতে বিষয়টা আরও খারাপ অবস্থায় ছিল। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বেতন বিভাগের ঢিমেতালে চলা করনিক কাজ আর তাদের দুর্ণীতি সেনাদের বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছিল। মীর জুমলা এবং বাংলার শাসক শায়েস্তা খাঁর (১৬৫৯-১৬৬৫) অধীনে কাজ করা একজন সেনা নায়ক, শিহাবুদ্দিন তালিশ এই হিসাব রাখার গোলযোগের একটা বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখছেন, ‘আমার দৃঢ বিশ্বাস এই সব চুরিতে দক্ষ করণিকদের জন্য যেভাবে সেনাদের যন্ত্রণা সইতে হয় আর নাকাল হতে হয়, সেই বর্ণনা নিশ্চই কেউ না কেউ একদিন মহামহিমকে জানাবে...ঘুমন্ত হিন্দু করণিকেরা যেভাবে সেনাদের ব্যবহার করে, তা অগ্নি-উপাসক দাসেদের থেকেও ঘৃণ্য আর ইহুদিদের কুত্তার থেকেও নোংরা’। তারপরে তিনি আরও বিশদে লিখছেন, কি করে একজন ভাতা-প্রাপক ‘কাছারিতে ঘুরতে ঘুরতে বহু বছর পরে তাদের বরাদ্দ আদায় করে’।

মানুচি বলছেন সেনা বেতন দপ্তরের করণিকদের ক্ষমতা আর ঔদ্ধত্যের বর্ণনা, ‘শাহজাহানের সময় একজন সেনা কাছারিতে গিয়ে তাঁর বেতন চাইলে করণিক তাঁকে হাঁকিয়ে দেয় যে তাঁর হাতে এখন সময় নেই, সময় হলেই তাঁর বিষয়টা দেখবে। তখন সেনাটি হুমকি দিয়ে বলে সে তাঁর তরবারি দিয়ে করণিকের(না তাঁর নিজের?) দাঁত ভেঙে দিতে পারে। করণিকটি কথা না বাড়িয়ে সেনাকে বেতন দিয়ে দেয়। ধূর্ত কেরাণিটি এই ঘটনার বদলা নেওয়ার জন্য খাতায় সেই সেনার বেতনের বিশদ বর্ণনার পাশে লিখে রাখল যে সেনাটির সামনের দুটি দাঁত নেই। ...কয়েক মাস বাদে যখন আবার সেই সেনাটি ফিরে এল বেতনের জন্য সেই করণিকের সামনে, তখন সেই খাতায় লেখা সেনার চেহারা বর্ণনায় দেখাগেল যে তাঁর সামনের দুটো দাঁত নেই। সেই করণিক এমন একজন সেনাকে বেতন দেবে যার সামনের দুটো দাঁত নেই...ফলে সেনাটি নিজের পরিচয়ে বেতন তুলতে গিয়ে তাঁর সামনের দুটি দাঁত ফেলতে হল’।

কোন সময়েই সামরিক বাহিনীর হিসাব পুরোপুরি হাল নাগাদ হয়ে ওঠে না। কোন আধিকারিকের কাছে রাষ্ট্র কি পাবে বা সে রাষ্ট্রের কাছে কত পাবে তাঁর শেষতম হিসেব তাঁর জীবদ্দশায়, এমন কি তাঁর মরণের পরেও সঠিভাবে শেষ করে ওঠা যায় না। সম্রাটের সামনে সহজ উপায় হল, মৃত্যুর পরে পরেই মৃতের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় করণ করে নেওয়া তাঁর পরে খাজাঞ্চিখানার হিসাবকিতাব হালনাগাদ করা।

এইভাবেই মহারাজা যশবন্ত সিং, রাষ্ট্রের কাছে বিশাল ঋণী ছিলেন, ১৬৭০ সালে যখন তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য গুজরাটের সুবাদার নিযুক্ত হচ্ছেন, তাকে বলা হল, যতদিন না তাঁর ঋণ শোধ হয়, তত দিন যেন তিনি প্রত্যেক বছর রাষ্ট্রকে ২ লাখ টাকা পরিশোধ করে যান(মীরাটইআহমদি)।

১৬৭৮ সালে সম্রাট বাংলার দেওয়ানকে জানালেন জায়গিরদার সায়েস্তা খাঁ খাজাঞ্চিখানা থেকে তাঁর বাতসরিক ১২ মাসের মাইনে ছাড়াও ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা বেশি তুলেছেন। এই অঙ্কটা তাঁর নামের পাশে ঋণ হিসেবে বসিয়ে দিতে(মাসিরইআলমগিরি)। আবার ১৬৮৩ সালে দেওয়ানকে জানানো হল অসম যুদ্ধ বাবদ যে ৫২ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে, তা যেন শায়েস্তা খাঁয়ের খাজাঞ্চিখানায় ফিরিয়ে দেন। দেওয়ান জানালেন সেই যুদ্ধে মাত্র ৭ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে, বাকি টাকাটা বাংলার প্রশাসনের কাজকর্মের অগ্রিম হিসেবে দেখানো হয়েছে। তখন সম্রাট তাঁর ফর্মান সম্পাদনা করে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর থেকে ৭ লক্ষ টাকা উসুল করা হোক।

(চলবে)
Post a Comment