Friday, June 3, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

ষষ্ঠ অধ্যায়
আইন ও বিচার ব্যবস্থা

৫। মুসলমান আইন, চরিত্র এবং সূত্র
ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার মাথায় অপরিণত এবং অপ্রতুলতার টিকা আরও ঘণিয়ে ওঠে কেননা, তখন সম্রাট এবং তাঁর বিচারকেরা একমাত্র ইসলামি আইনকেই আইনরূপে গণ্য করতেন, যার উতপত্তি ও পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল ভারতের বাইরে। কোরাণের দুই মলাটের মধ্যে যা আছে এবং আরবি নবি পরম্পরাগতভাবে(হাদিস) যা বলে গিয়েছেন, তাকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে তাকে প্রয়োগ করাই ছিল সেই বিচার ব্যবস্থার অন্তিম লক্ষ্য। অথচ বিশ্বজুড়ে কোরাণের শব্দগুলির নানা ধরণের ভাষ্য বর্তমান। এবং এই জন্য আমাদের ভারতীয় বিচারকেরা, ভারতের বাইরের বিভিন্ন ইসলামি সভ্যতার কেন্দ্রে অবস্থান করা অতীতের পুণ্যতোয়া মুসলমান সম্রাট এবং প্রখ্যাত মুসলমান বিচারকেদের ভাবনাগুলি অনুসরণ করতেন। ফলে ভারতে মুসলমান আইন, আইনপ্রণয়নের মাধ্যমে নিজের মত করে বিকাশলাভ করে নি, বরং আপ্তবাক্যরূপে স্বীকৃত হয়েছে; এর দুটি অন্য সূত্র ছিল, যেমন, অতীতের মামলাগুলির নজির(কেস-ল), এবং বিচারকেদের মন্তব্য, তবে এই দুটি প্রথা ব্যবহৃত হয়েছে শুধু নবীর বই, কোরাণের অর্থ উদ্ধার করতে, নতুন করে বিচারের বা আইনের নতুন নীতি বা আইন তৈরি করার জন্য নয়।

ভারতীয়-মুসলমান আইনের এই তিন সুত্র ভারতব্যাপী(প্রযুক্ত হয়েছিল)। কোন সম্রাট বা কাজীর বিচারের নীতিকে ব্যবহার করা হয় নি কোরানের কোন অংশ স্পষ্ট করার কাজে, বা নতুন করে ব্যাখ্যা করার কাজে বা জোড়পত্র(সাপলিমেন্ট) তৈরি করার কাজে, বরং কোরাণের প্রতিটি স্তবক অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছিল, তাকে অযুত সম্মান দিয়ে বিচারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।

ফলে ভারতীয় কাজিরা ইসলামিক আইন এবং গ্রহণযোগ্য আরবি লেখকদের তৈরি করা নানান মামলার নজির স্থিরভাবে অনুসরণ করে গিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে এই সঙ্কলন তৈরি হয়েছে, তাদের চরিত্র নির্ধারণ করা হয় চার আঙ্গিকের ইসলামি আইনে, হানাফি, মালাকি, শাফি এবং হানবালি। ভারতে হানিফি রক্ষণশীল বলে গণ্য করা হয়। ভারতে যে শেষতম আইনের সঙ্কলনটি তৈরি হয়েছে, তাঁর নাম ফতোয়াইআলমগিরি, আওরঙ্গজেবের আমলে একদল ধর্মতাত্ত্বিকের উদ্যোগে দুলক্ষ টাকা ব্যয়ে এই পুস্তকটি সঙ্কলিত হয়। ভারতে ইসলামি আইন, তার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটায় না যতক্ষণ না মিশর বা আরবের আইনগুলি পরিবর্তিত না হচ্ছে।
মধ্যযুগের ইতিহাসের কোন ছাত্র জানবে মুসলমান রাষ্ট্রে দেওয়ানি আইন ধর্মশাস্ত্রের অধস্তনরূপে গন্য হয়। এবং ধর্মতাত্ত্বিকেরাই এখানে বিচারক হিসেবে কাজ করেন।

প্রাচীন মারাঠি নথিতে আমরা দেখি বিভিন্ন হিন্দু জাতি আদালত এবং শালিশি বোর্ড চিরাচরিত আইনে বিচার করত। তবে সেগুলি দাক্ষিণাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানের সমাজ উত্তরের সমাজের থেকে অলাদাভাবে গঠিত হয়েছে। মারাঠা দেশে কিছু পুরোনো সংস্কৃত ভাষায় রায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যার থেকে প্রমাণিত আকবরের অনুজ্ঞায় শুধুই ব্রাহ্মণেদের জন্য আদালত তৈরি হয়েছিল যা মনুর আইন অনুসরণ করত, যাকে নাথানিয়েল বি হ্যালেদ জেন্টু সংহিতা নামে অভিহিত করে বলছেন, মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে হিন্দুদের নানান বিবাদ মেটাতে এই আইনকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
(চলবে)
Post a Comment