Monday, June 20, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

নবম অধ্যায়

৬। বাইতুলমাল, দখলি সম্পত্তির ভাণ্ডার

বাইতুলমাল হল সরকারি ভাণ্ডার, যেখানে উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়া মৃত আধিকারিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাখা হয়, এবং বাস্তবে আওরঙ্গজেবের ফারমানে পাচ্ছি যেখানে অভিজাতদের ক্রোক করা সম্পত্তিও রাখা হত। ইসলামি সূত্র অনুসারে বাইতুলমাল হল ঈশ্বরের সম্পত্তি, যে ভাণ্ডারের সম্পত্তি ব্যয়িত হয় দানধ্যানে, সম্রাটের বা রাষ্ট্রের ইচ্ছানুসারে নয়(এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম)।

তার ফরমানে আওরঙ্গজেব বলছেন, ‘বাইতুলমালের অছি(মালিক নন) হলেন তার সময়ের খলিফা(দেশের সম্রাট)(রুকাত)’। এবং অন্য দুটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, ‘আমার দায়িত্ব হল বাইতুলমালএর সম্পত্তি বৃদ্ধি করা’ এবং ‘আমাকে যে সব উপহার দেওয়া হবে সেগুলি বাইতুলমালএ জমা হবে’।

তার জীবদ্দশার শেষের দিকে তিনি বাস্তবিকভাবে এই তত্ত্ব কাজে লাগতে শুরু করেন। ১৬৯০ সালে তিনি সুবাগুলির আমিন এবং কাজিদের বাইতুলমালএর অছি হওয়ার অনুরোধ জানান। ফলে আহমেদাবাদের কাজি শহরের ফকির বা ভিক্ষুককে শীতকালে দেড় টাকা আট আনা দামের ১৫০টা গরম জামা(কাবা) এবং একই পরিমান কম্বল দানের নির্দেশ দেন। শহরের গরীবদের পরিধেয়র জন্য ৬০০০ টাকা ব্যয় হয়; এবং আরও বহু সময়ে এই ধরণের নানান দানধ্যানের নজির পাওয়া যায়।

আমাদের হাতে যে তথ্য রয়েছে তাতে পরিষ্কার নয়, বাইতুলমাল এবং অন্যান্য দানধ্যানের চরিত্র কি ছিল, বিশেষ করে সম্রাটের নির্দেশে সদর বা দাতা(আলমনার) যে ধরণের কাজ করতেন সেগুলির কাজের এলাকা কি ছিল। ব্যক্তি মুসলমানদের রোজগারের আড়াই শতাংশ দিতে হত জাকাত হিসেবে, ব্যয় হত শুধুই ধর্মীয় কাজে যেমন ইসলামি জ্ঞানীগুনীদের পৃষ্ঠপোষকতায়, ধর্মতত্ত্ব পড়া ছাত্রদের ভাতা দিতে, গরীবদের বা ফকিরদের সাহায্য করতে, অবিবাহিত মেয়েদের বিবাহে যৌতুক হিসেবে ব্যবহার করতে। সত্যি বলতে কি, বাইতুলমালে জাকাতের দানগুলি জমা পড়ত, কেননা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়লে সম্রাট তা নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারেন এমন আশংকা থেকেই। মানুচি বলছেন তার রাজত্বের শেষ সময়ে যখন তিনি দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ নিয়ে নাজেহাল এবং তার খাজাঞ্চি প্রায় শূন্য, আর্থ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে, তখন সম্রাট বিভিন্ন মৃত ধনীদের ধনে উপচে পড়া ভাণ্ডার বা আকবর, জাহাঙ্গির এবং শাহজাহানের সময়ে বিভিন্ন কর্মচারীর থেকে দখল নেওয়া সম্পত্তি উন্মুক্ত করার দিকে নজর দিয়েছিলেন। পরে আবার তার সেই নির্দেশ তুলে নিয়ে এগুলি না খোলার নির্দেশ জারি করেন – কিন্তু ততদিনে তার অবর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরী উত্তর ভারতের সেইসব ভাণ্ডার থেকে প্রায় অর্ধেক সম্পত্তি লুঠ করে নিয়েছিলেন।

দ্য ম্যানুয়্যাল অব অফিসার্স ডিউটিতে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে ঋণী(মুতালিবদর) যে সব অধিকারিক মারা যাচ্ছেন তাদের ক্রোক হওয়া সম্পত্তির ভাণ্ডারে বা আমুয়ালএ জমা হয়, সেগুলি রাষ্ট্রের প্রাপ্য এবং রাষ্ট্রের খাজাঞ্চিখানায় জমা পড়বে এবং যে সব আধিকারিক উত্তরাধিকারী না রেখে মারা যাচ্ছেন তাদের ক্রোক হওয়া সম্পত্তির মালিক সর্বশক্তমান এবং এগুলি বাইতুলমালএ জমা পড়বে এবং দানধ্যান ছাড়া কোন কাজেই ব্যবহার হবে না। কিন্তু আওরঙ্গজেবের বিভিন্ন বিস্তৃত চিঠিপত্রে কোথাও আমুয়াল নামক দপ্তরের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে না, শুধু বলা হচ্ছে, যে কোন দখলীকৃত সম্পত্তি বাইতুলমালে জমা পড়তে হবে। যে ম্যানুয়্যালের উল্লেখ দিয়ে এই স্তবকটি শুরু করেছি, তা পাঠে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আজনা(সুবাদার, এবং সেনানায়কদের অগ্রিম ঋণ দেওয়ার জন্য ভাণ্ডার), আমুয়াল(মৃত আধিকারিকদের সম্পত্তি দখল করার দপ্তর) এবং বাইতুলমাল (উত্তরাধিকারী না রেখে মৃত আধিকারিকদের সম্পত্তি রাখার ভাণ্ডার) – এই তিন দপ্তর একজন দারোগার নজরদারিতে থাকত, তাকে সাহায্য করার জন্য থাকতেন একজন হিসাবরক্ষক, এক জন ভাণ্ডাররক্ষক, এবং একজন দারোয়ান। এই দপ্তর থেকে আধিকারিকদের স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে গুলি-বারুদ বরাদ্দ করা হত।

অতএব মনে করা হচ্ছে গোলান্দাজ বাহিনীর উদ্বৃত্ত সোরা/বারুদ, কামানের গোলা, দিকনির্দেশক এবং বর্ষাতি(মম-জামা) আজনা দপ্তরে রাখা হত।

ম্যানুয়্যালে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত দারোগার দায় দায়িত্ব বিশদে লেখা আছে।
(চলবে)
Post a Comment