Sunday, June 5, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

সপ্তম অধ্যায়
সম্রাটের বিশেষ ক্ষমতা

দ্বাদশ, দুটি হাতির মধ্যে লড়াই করাতে পারত একমাত্র সম্রাটই। এই অধিকারটিও দিল্লির সম্রাটেরা ভীষণ অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে দখলে রেখেছিলেন। এবং আকবরের সময় থেকে এটি সম্রাটদের অন্যতম অবসর বিনোদনের পদ্ধতি ছিল। প্রত্যেক সম্রাটের সন্তান এই রুচিটি সম্বল করেছিলেন, এ প্রসঙ্গে একটি কৌতুকপ্রদ ঘটনা বলা যাক শাহজাদা শাহ আলম সরহিন্দ থেকে ফেরার পথে হাতির লড়াই করানোর প্রলোভন রোধ করতে না পেরে পিতার শাস্তির মুখোমুখি হয়ে বলেছিলেন, দুটি হাতি হঠাতই নিজেদের মধ্যে লড়াই করা শুরু করে দিয়েছিল।
আগ্রার প্রাসাদের(এবং দিল্লিরও) বাইরের দেওয়াল আর যমুনা নদীর মধ্যে বড় বালুময় সমতল এলাকা ছিল। সকালের দর্শনের পরে সেই সমতল এলাকা থেকে জনগণ হঠিয়ে দিয়ে দুটি রাজকীয় হাতিকে লড়িয়ে দেওয়া হত। তাভার্নিয়ে লিখছেন, ‘তারা এই জলের পাশের এলাকা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে বেছেছে, কেননা যে হাতি গর্জন করে জিতেছে, তার ক্রোধ শান্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ত, যদি না তারা তাকে শস্ত্রের জোরে কারচুপি করে নদীতে ঠেলে দিত’ – মানে তারা অস্ত্রের মুখে আগুণ আর বাজি তৈরি রাখত, লড়াই শেষে সেইগুলি জ্বালিয়ে হাতিটিকে নদীতে তাড়িয়ে নিয়ে যেত।
সাম্রাজ্যের হাতিশালায় প্রত্যেক হাতির লড়াইএর জোড়া তৈরি করা ছিল। প্রত্যেক হাতির জন্য দুজন মাহুত তৈরি থাকত। প্রত্যেকটির ওপরে বসত একজন মাহুত, সে যদি পড়ে যেত বা মারা যেত তাহলে তার স্থান নিত অন্য জন। মাহুত হাতিতে উত্তেজিত করত চিৎকার করে তাকে ভিতু বলত, তাদের মানে কটু কথা বলত, পা দিয়ে তাদের আগাহত করত...এর প্রভাব হত অদ্ভূতরকম। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া হত, বার শুরু হত লড়াই, দুটি পশুর মধ্যে সব থেকে উদ্যমী শক্তিশালী হাতিটি তেড়ে যেত তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা হাতিটির দিকে, যে জেদে তারা লড়ত, যুদ্ধ শেষে তাদের আলাদা করা খুব শক্ত কাজ ছিল, দুটির মধ্যে আগুণ জ্বালাতে হত, বাজি পোড়াতে হত’(বার্নিয়ে)।
সম্রাটের আহ্লাদ প্রাণঘাতী হত মাহুতের, বেঁচে গেলে তার হয়ত হাত পা কিছু একটা নষ্ট হত। আহিত হত দর্শেকেরাও।
‘প্রায়ই বহু মাহুত লড়াইএর মধ্যে হাতি থেকে পড়ে যেত এবং সেখানেই পদপিষ্ট হয়ে মারা যেত, কেননা হাতি চাইত তার মাহুতকে কজেড়ে ফেলে ফিতে, কেননা সে তাকে কটু কথা বলে উত্তেজিত করেছে, সে চেষ্টা করত তাকে তার শুঁড়ে জড়িয়ে টেনে আনতে। বিষয়টা এতই ঝুঁকির ছিল যে, প্রাণভয়ে ভীত মাহুতেরা তার স্ত্রীপুত্রের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যেত, যেন তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে’।
মানুচিও লিখছেন, ‘যখন সম্রাট হাতিগুলোকে লড়িয়ে দিতেন, মাহুতদের স্ত্রীরা তাদের চুড়ি ভেঙে ফেলত, সিঁদুর মুছে ফেলত, তাদের গয়না খুলে ফেলত যেন তারা বিধবা হয়েছে। যদি তাদের স্বামীরা ফিরে আসত জীবিরভাবে, তারা এমন উদ্বেলত হয়ে উঠত যেন তাদের নতুন করে বিবাহ হয়েছে’।
আইনিআকবরি লিখছে, লড়াইয়ে যাওয়া মানুষদের প্রাপ্তি ছিল তামার ৬টাকা ২৫ পয়সার একটা থলে – যা তাদের এক মাসের রোজগার।
শুধু এটাই একটা ঝুঁকি ছিল না, বার্নিয়ে লিখছেন, ‘কখোনো এমন হত, কোন কোন দর্শক পড়ে যেতেন, এবং মত্ত হাতি তাদের পায়ে পিষে দিত। সে সময় পালিয়ে যাওয়ার হুড়োহুড়ি পড়ে যেত, সে মত্ত লড়াই থেকে বাঁচতে নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যেত’। মুঘল ইতিহাসের পাঠক জানেন তিনি যখন প্নের বছর বয়সী তখন ঠিক এই রকম এক হাতির যুদ্ধের মধ্যে ঘোড়া চড়ে ঢুকে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, এবং তার বরফঠান্ডামাথা আর অসীন সাহসে তিনি সেই অবস্থা থেকে বেঁচে এসেছিলেন(এই ঘটনার বিশদ বর্ণনাটি রয়েছে হামিদুদ্দিনের আকমএ)। ঈশ্বরদাস সূত্রে জানাযাচ্ছে, দুটো হাতি লড়িয়ে দেওয়ায় এক আধিকারিককে শাস্তি দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব।
এই হল জাহাঙ্গীর উল্লিখিত সম্রাটদের ১২টি অধিকার।
(চলবে)
Post a Comment