Sunday, June 19, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

নবম অধ্যায়

৩। অভিজাতদের সম্পত্তি দখলের রাষ্ট্রীয়করণের সম্রাটের ফরমান

আমরা দেখলাম, মুঘল সম্রাটদের নীতি ছিল আধিকারিকদের মৃত্যুর পর, হয়ত সাময়িকভাবেই তাদের সম্পত্তি দখল করে নেওয়া। দেখলে যতটা মনে হয় ব্যাপারটা অন্যের সম্পত্তি আত্মস্যাত করে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটার অতটা চক্ষুলজ্জাহীন অনৈতিক ছিল না। সম্রাট কখোনোই নিজেকে মৃত আধিকারিকদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেন নি, যদি না সেখানে যদি ব্যক্তিগত কোন ব্যপারের বা আইনি উত্তরাধিকারীর সমস্যা থেকে যায়(সেখানেও কিন্তু সম্রাট আইনিভাবে সেই সম্পত্তির দাবিদার নন, বরং সেই সম্পত্তির দাবিদার মুসলমান সমাজ)। তাঁর চাহিদা ছিল তাঁর রাষ্ট্র যাকে ঋণ দিয়েছে, সেই মৃতের সম্পত্তি থেকে ঋণ উসুলিমাত্র।

১৬০৫ সালে সিংহাসনে বসার পরে যে ১২টি ফরমান জারি করেন জাহাঙ্গির, তাঁর একটি হল, ‘যখন কোন নাস্তিক বা মুসলমান আমার সাম্রাজ্যে মারা যান, কোন এবং কারোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাঁর উত্তরাধিকারী সেই সম্পত্তির মালিক হবে। যদি কোন উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে একজন আধিকারিক নিযুক্ত হবেন তাঁর সম্পত্তির দখল নিতে, এবং ইসলামের নীতি অনুসারে সেই সম্পত্তির বিকাশ হবে, হয় সেখানে মসজিদ হবে, সরাই হবে বা সেই সম্পত্তি কাজে লাগানো হবে ভাঙা সেতু সারাতে বা পুকুর বা কুঁয়ো খুঁড়তে(তুজুক)’। কিন্তু এটা থেকে পরিষ্কার হল না তিনি মৃত আধিকারিকদের সম্পত্তি দখলের নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন কি না, বিশেষ করে যেই সব আধিকারিকদের যাদের খাজাঞ্চিখানায় বাকি পড়ে আছে। ২৪ জুলাই ১৬৬৬ সালে আওরঙ্গজেব এবাবদে একটি ফরমান জারি করেন, সেখানে বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কারভাবে বিবৃত। তিনি সেই ফরমানে সুবাগুলির দেওয়ানদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যদি কোন কর্মচারী উত্তিরাধিকারী বা অগ্রিম (মুতালিবা) নেওয়া অর্থে প্রাপ্তিযোগ না রেখে মারা যান, তাঁর সম্পত্তি বাইতুলমালের ভাণ্ডারীর কাছে দখল দাও। তাঁর যদি কোন কিছু রাষ্ট্রের কাছে পাওনা থাকে, তাহলে তাঁর মৃত্যুর তিন দিন পরে তাঁর সম্পত্তির দখল নাও। তাঁর ঋণের তুলনায় যদি তাঁর সম্পত্তির পরিমান বেশি হয়, তাহলে ঋণের পরিমানটি কেটে নিয়ে তাঁর যোগ্য উত্তরাধকারী ঠিক করে তাকে চিঠির মাধ্যেমে তাঁর ফেরতের বিষয়টি জানাও। আর যদি রাষ্ট্রের কাছে কোন কিছুই পাওনা না থাকে তাহলে, তাঁর সম্পস্ত সম্পত্তি তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকারীর আইনি প্রমান নিয়ে ফেরত দাও(মিরাটইআহমদি)।

এটি খুবই বাস্তব এবং ন্যায়নিষ্ঠ নির্দেশিকা। তবে মানুচি বলছেন আওরঙ্গজব এই নীতি যে সবসময় মেনে চলতেন তাও নয়। সম্রাট সম্বন্ধে তিনি লিখছেন, ‘যদিও তিনি ঘোষণা করেছিলেন তিনি কারোর সম্পত্তি দখল নেবেন না, কিন্তু সেনানায়ক, আধিকারিক এবং অন্যান্য কর্মচারীর মৃত্যুর পর তিনি সেই কাজটি করেছিলেন। তারা তাঁর সাম্রাজ্যের কাছে ঋণী, এই অজুহাতে তিনি তাদের সব কিছুই দখল নিয়ে ছিলেন। তাদের যদি বিধবা থাকত তাদের তিনি বছরের জন্য তুচ্ছ পরিমান দান দিতেন, এবং তাদের ভরণ পোষণের জন্য কিছু জমি দান করতেন’।

কিন্তু আওরঙ্গজেবের সময়ের বেশ কিছু তথ্য খুঁটিয়ে পড়ে বোঝা গিয়েছে, মানুচির অভিযোগ সত্য ছিল না। অবশ্য অনেক সময় দখল নেওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে যে হিসাব-কিতাব করতে হয়, তাতে বেশ কিছু অমানবিক দেরি হয়েছে যেহেতু সম্পত্তি বাইতুলমালের অধীনে চাবিতালা দেওয়া থাকত, কিন্তু আত্মস্যাত করার মানসিকতায় তিনি কিন্তু তাদের সম্পত্তি দখল করতেন না। আমরা যখন পড়ি, গুজরাটের সদর এবং জাজিয়ার আমিন, শেখ মুহিউদ্দিন যখন মারা যান, তখন তাঁর সম্পত্তি দখলিকৃত হয় নি, কেননা তাঁর পুত্র আক্রমুদ্দিন, খাজাঞ্চিকজানায় পিতার ঋণ শোধ করেন(মিরাটইআহমদি)।

১৬৬৬ সালের আওরঙ্গজেবের ফরমান ভণ্ডামি ছিল না, বরং বলা যায়, তাঁর শাসনের পরবর্তীকালে, বুইয়াতাতের কাজ ছিল, যে সব কর্মচারী ঋণ রেখে মারা গিয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে, বাকি উদ্ধার করা এবং তাদের উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি অর্পণ নিশ্চিন্ত করা।

আবার, যাওয়াবিত ১৬৯১ সালে দখলিকৃত সম্পত্তিগুলির একটা তালিকা দিচ্ছে, যেখান থেকে আমরা পাই যে সব অভিজাত তার পূর্ববর্তী আট বছরে মারা গিয়েছেন তাঁর তালিকা, তার আগের সময়ে নয়। এর থেকে আমরা একটা তথ্য বুঝতে পারি, যে ততদিনে এই অভিজাতদের হিসাবকিতাব সমাপ্ত হয় নি, ফলে দখলদারি সাময়িক, মামলা বিচারাধীন হয়ে রয়েছেমাত্র।

(চলবে)
Post a Comment