Wednesday, June 1, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার



পঞ্চম অধ্যায়
করব্যবস্থা
১। রাজস্ব আদায়কারীদের ক্রমাগত বিরোধিতা করেছে ভারতীয় চাষীরা

ভারতীয় ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্ররা দীর্ঘকাল ব্যাপী চলতে থাকা রাজস্ব আদায়কারী এবং ভারতীয় চাষীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বে নিশ্চই তাড়িত হয়েছেন। স্তোরিয়া দা মোগোরএ মানুচি এবং অন্যান্য অভিযাত্রীরাও লক্ষ্য করেছেন, কিভাবে কৃষকেরা তাদের দেয় রাজস্ব ফেলে রাখছে, এবং তাঁর ফলে তার যে বকেয়া পড়ছে, সেই বকেয়া উদ্ধারে তাঁর ওপর বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সংস্কৃত এবং পারসিক-বুরুঞ্জীতে আমরা পড়ি কিভাবে রাজার অনুগামীরা – এক্ষেত্রে রাজস্ব দপ্তরের আধিকারিক আর নিম্নস্তরের রাজকর্মচারীরা কৃষকদের ওপর চড়াও হচ্ছেন, এবং দুই যুগেই রাজার ডাক পড়ছে রক্তচোষাদের হাত থেকে চাষীদের উদ্ধার করতে।
ভারতের কৃষকেরা কেন দীর্ঘকাল ধরে রাজার বরাদ্দ বকেয়া করে ফেলে রাখতেন, তার একটা কারণ হল, রাজা চাষীর দেয় করের বদলে কোন কিছুই চাষীকে ফিরিয়ে দিতেন না; আরও একটা কারণ হল সরকারের স্থায়িত্বর অভাব। আমি এর আগে বর্ণনা করে বলেছি, মুঘল সরকার তাঁর কোন সামাজিক দায়িত্ব পালন না করে শুধু বিদেশি হানাদার এবং বিদ্রোহীদের থেকে দেশকে বাঁচাবার কাজ করত। কিন্তু সে সময় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও খুব খারাপভাবে হ্যান্ডল করা হয়েছে, ঠিক তেমনি গ্রামের আরক্ষার ভারও রাষ্ট্র নিজের হাতে না রেখে চোর ডাকাতের থেকে তাদের বাঁচানোর দায় গ্রাম অধিবাসীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল, ফলে চৌকিদারদের পিছনে খরচ করতে হত গ্রামসমাজের। কোন রায়তই রাজাকে তাঁর রক্তঝরা শ্রমের বিনিময়ে তোলা ফসলভিত্তিক যে রাজস্ব দিচ্ছে, তাঁর কোন অংশই সে রাষ্ট্রের থেকে ফেরত পেত না।
দ্বিতীয়ত, রাজত্বের পরিবর্তন খুব তাড়াতাড়ি ঘটত, ভ্রাতৃঘাতী সিংহাসনের লড়াইও খুব যে ব্যতিক্রম ছিল তা বলা যাবে না, বরং নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং পাশের রাজত্ব থেকে আক্রমণ(সংস্কৃত ভাষায় দিগ্বিজয় পারসিতে মুলুকগিরি) শুধু হিন্দু রাজাদের ধর্মকর্তব্য ছিল তা নয়, মুসলমান সম্রাটেরাও সেই কাজ করতেন – ফলে ভারতের কৃষকেরা বুঝে উঠতেই পারত না তারা কাকে রাজস্ব দেবে, এমন কি যখন তারা রাজস্ব দিতে ইচ্ছুক, তখনও। সে দুবার একই শুল্ক দেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা স্বভাবতই ভাবত। (সে ভাবত) পিঠে দুচারঘা পড়ার আশংকা বুকে নিয়েও, দুচারমাস বা কয়েক বছর অপেক্ষা করে দেখা যাক না কি হয়, কোন পক্ষ সিংহাসনে দৃঢভাবে পা রাখে, এবং তাঁর পরে সে তাদের শুল্ক দেবে। কিন্তু যে বিশাল পরিমান বকেয়া পড়ে গেল, সে অংশ তাঁর পক্ষে আর পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব হয়ে উঠত না; কারণ, সেই উৎপাদন হয় সে নিজে খেয়ে ফেলত বা রাজনৈতিক গোলোযোগে সেই জমিয়ে রাখা শস্য অদৃশ্য হয়ে যেত।
বহু শতাব্দের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রবিপ্লবের প্রেক্ষিতে, ভারতীয় কৃষক এমন কি এই বিংশ শতাব্দতে ধরে নিয়েছিল, এই উপমহাদেশ সিংহাসন দখলের রাজনীতি থেকে মুক্ত হবে না, এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যে সরকারই যুদ্ধে যেখানেই লিপ্ত থাক, একজন বুদ্ধিমান কৃষক তার রাজস্ব দেওয়ার কাজে দুবার ভাবত।
জার্মানির সঙ্গে শেষ যুদ্ধে, চট্টগ্রামের বহু খাসমহলের কৃষক তাদের ভূমি রাজস্ব দিতে দুবার ভেবেছে, এবং ডেপুটি কালেক্টরকে বলেছে, যদি কোসিউর(মানে কাইজার) ভারত দখল করে, সে আবার এসে দ্বিতীয়বারের জন্য ভূমিরাজস্ব  চাইবে নাতো? দুবার একই ভূমিরাজস্ব দেওয়ার থেকে আমাদের বাঁচান মহাশয়।
রাজা সপ্তম এডোয়ার্ডের মৃত্যুর সময় আমি উত্তরবঙ্গে ছিলাম। তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত হওয়ার সংবাদে একজন কৃষক আমায় প্রশ্ন করেছিল, রাজার সভাসদেরা তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিসংবাদ করবে কি না। এই সব উদাহরণ থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি দীর্ঘকাল ধরে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এই মহাদেশ জুড়ে, সেই কালো ছায়া এখোনো কৃষিজীবির মন থেকে মুছে যায় নি।
(চলবে)
Post a Comment