Saturday, June 18, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন যদুনাথ সরকার

যদুনাথ সরকার

সপ্তম অধ্যায়

৬। সুন্নী গোঁড়ামির চূড়ান্ত হল আওরঙ্গজেবের সময়ে; শিয়ারা নির্যাতিত হলেন

আকবর বা আদিল শাহ জগত-গুরু উপাধি নিয়ে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী সন্তের পর্যায়ে নিয়ে যান এবং আওরঙ্গজেব সিংহাসনে বসেই নিজেকে জীবিত সন্ত ভাবতে ভালবাসতেন, এবং সেই ধরণের উপাধিও নিয়েছিলেন, যদিও সাংবিধানিকভাবে তিনি প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। তাঁর সময়ের খলিফা হিসেবে তাঁর দায় ছিল ইসলামের সুন্নি মতাবলম্বীদের আচার আচরণ দেশজুড়ে প্রয়োগ করা। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং তাঁর পূর্বজদের খোলামেলা ধর্মীয় আচার আচরণে তিনি শিয়াদের যোগ্যতাকে সহ্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন – এঁদের কেউ মধ্য এশিয়া থেকে আসা, আবার কেউ এসেছিলেন পারস্য থেকে – কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যে তাদের অবস্থা খুব একটা সুখকর ছিল না। আওরঙ্গজেব ভাইদের সঙ্গে লড়াই করে ক্ষমতায় আসার পথে কিন্তু একজন শিয়া, মির জুমলা তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু যত তাঁর বসয় বেড়েছে তত তাঁর ধর্মান্ধতা বেড়েছে, তাঁর সভাকে তিনি শিয়া শূন্য করার পথে হেঁটেছেন। তাঁর চিঠির বহু ক্ষেত্রে আমরা শিয়া মতের বিরোধিতার অবস্থান পাই এমন কি সরকারি ভাষ্যেও সেটা খুব অমিল ছিল না।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী শিয়ারা পাষণ্ড(রাফিজি) এবং তিনি সাধারণত পার্সিদের পচা মাংস খাওয়া রাক্ষস (ইরানী গুলইবায়াবানি)রূপে বর্ণনা করতেন। তবে এই লব্জটা তিনি সাধারণত রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতেন সাফাভি শাহ সাম্রাজ্য বর্ণনা করার সময়। তাঁর একটি চিঠিতে পাচ্ছি, যখন একজন আভিজাত তাঁকে একটি কুকরি উপহার দেওয়ার তিনি যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন, কেননা, এটির নাম ছিল রাফিজিকুশ বা শিয়াহত্যাকারী এবং তাঁকে এ ধরণের চেহারার আর নামের কুকরি উপহার দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন (রুকায়তইআলমগিরি)।

যার ফলে সাধারণভাবে শিয়া আধিকারিকরা(তাঁর সামনে বা সভায় সম্রাটের বা অন্য অভিজাতদের) সামনাসামনি দ্বৈত ভূমিকা পালন করতেন নিজেদের পিঠ আর মাথা বাঁচাবার জন্য।

বাদসাখান রাজার পুত্র সর্বুলন্দ খাঁ, আওরঙ্গজেবের রাজত্বে দ্বিতীয় বক্সি ছিলেন ১৬৭২ থেকে ১৬৭৯ পর্যন্ত। একবার সর্বেসর্বা আওরঙ্গজেব অভিযোগ করে বল্ললেন সর্বুলন্দের কথায় সূক্ষ্মভাবে শিয়াভাবের লব্জ জুড়ে রয়েছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। এর উত্তরে সর্বুলন্দ বললেন, ‘ঠিকই, বুখারার সঈদদের অনেকের লব্জে এই ধরণের টান রয়েছে। আমি যেহেতু অতীতে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেহেতু আমারও কথায় কিছুটা সেই প্রভাব যে রয়েছে তা আমি আস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু বর্তমানে আমি এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী নই। ভাগ্যের দোষে আমি এখন সেই গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মুক্ত, কিন্তু পুরোপুরি(তাঁর থেকে বেরিয়ে আসতে) পারি নি’। ইতিহাস বলে, সর্বুলন্দ খাঁ বহু পার্সিকে সাহায্য করেছেন, এবং তাদের বড় পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন। আওরঙ্গজেব শিয়াদের অবিশ্বাস করতেন, কিন্তু তাঁদের হিসেব রাখার এবং আর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে তিনি অস্বীকার করতে পারেন নি।

কিন্তু তাঁর সভায় শিয়া অভিজাতদের অবস্থা খুব স্বস্তিকর ছিল না, কেননা সম্রাট তাঁদের পছন্দ করতেন না; বিষয়টা আরও মর্মন্তুদ হয় সুন্নি আভিজাতদের বিরোধতায়, এঁরা অধিকাংশ ছিলেন তুরানি(মধ্য এশিয়া) অথবা আফগান। অষ্টাদশ শতে মুঘল সভায় পারসি আর তুর্কি – সাধারণভাবে ইরানি আর তুরানিদের মধ্যে বিপুল বিরোধ ছিল। তাদের মধ্যেকার লড়াই পঞ্চদশ শতে দাক্ষিণাত্যে বাহমনি সাম্রাজ্যে ধ্বংস ডেকে আনে। বার্নিয়ে বা মানুচির মত বিদেশি পর্যটকেদের অনভ্যস্ত চোখেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত এবং দুটি সম্প্রদায়ের জন্য রাজকীয় নীতির পার্থক্য এড়ায় নি, বিশেষ করে যখন পারস্যের রাজদূত রাজসভায় আসতেন (তখন এই পার্থক্যটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো যেত)। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েও তাদের সম্মুখ সমর এড়ানো যায় নি। শিয়ারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে করতে পছন্দ করতেন আর সুন্নীরা সাধারণত শিয়াদের হাত ধরা পছন্দ করতেন না। হামিদুদ্দিন খাঁয়ের আহকম থেকে জানতে পারি এরকম একটি ঘটনা। প্রথম রুহুল্লা খাঁ আওরঙ্গজেবের সময়ে প্রধান খাজাঞ্চি(১৬৮৬-১৬৯২) ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় একটা ইচ্ছাপত্র করে বলে যান যে তিনি শিয়া হয়েও সুন্নীমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এবং তিনি সম্রাটকে অনুরোধ করছেন, যাতে তিনি তাঁর দুই কন্যার বিবাহ সুন্নি বাড়িতে দেন। রুহুল্লা খাঁ সে সময়ের অন্যতম প্রধান অভিজাত – তাঁর মা সম্রাটের মায়ের নিজের বোন ছিলেন – তবুও তাঁর কন্যার পাণি গ্রহণে অসম্মত হ’ন একজন সাধারণ অভিজাত অনুচ্চবংশজাত সিয়াদত খাঁ। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘আমি কি করে জানব মহিলাটি সুন্নী ভাবধারায় বিশ্বাসী? সে যদি তাঁর পিতার ধর্মবিশ্বাসে(শিয়ামতে) বিশ্বাসী হন, তাহলে আর কি করা যাবে?’

এবং সম্রাটও রুহুল্লা খাঁয়ের ধর্ম পরিবর্তনের গল্পে বিশ্বাসী ছিলেন না, এবং তাঁর অনুমান অভ্রান্ত ছিল। রুহুল্লা খাঁ তাঁর মৃত্যু শয্যায় সম্রাটকে অনুরোধ করেন তাঁর জন্য একজন সাম্রাজ্যের কাজি(সুন্নি) পাঠাতে তাঁর শব ধোয়া আর তাঁর ওপরে পর্দা দিতে। কাজি তাঁর বাড়িতে এলে তাঁর হাতে একটা চিঠি দেওয়া হয়, তাতে লেখা ছিল যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধি কর্ম যেন কাজি না করেন, তাঁর দায়িত্ব তাঁর ঘনিষ্ঠ ভৃত্য আগা বেগএর হাতে দেওয়া হয়। কাজি জানতেন রুহুল্লার ছদ্ম-ভৃত্য একজন শিয়া তাত্ত্বিক এবং কাজি, এই ঘটনা অবিলম্বে সম্রাটকে বিবৃত করা হয়। তিনি ঘৃণামিশ্রিতস্বরে বলেন-
‘কাজি সেই বাড়ি থেকে চলে আসুন। পরলোকগত খাঁ তাঁর সারা জীবন ধরে নানান মিথ্যার জাল বুনে গিয়েছিলেন, এবং মৃত্যুশয্যায়ও এই ঘৃণিত কাজটি তিনি বর্জন করতে পারলেন না। অন্যের ধর্ম নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। খ্রিষ্ট আর মোজেস তাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাস নিয়েই চলুন না কেন(তাতে আমার কি?)’।

কিন্তু শিয়াদের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ তো ছিলই(৩ নভেম্বর, ১৬৭২ সালে আওরঙ্গজেবের ক্ষমতায় বসার আগের দিন এক পুরোনো ভৃত্য প্রথম তিনজন খলিফাকে অভিশাপ দেওয়ায়, শিরোচ্ছেদ করা হয়। সম্রাট নতুন জাতে ওঠা অভিজাতদের উপাধির আগে আলি শব্দটি বসাবার প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হন। একটি চিঠিতে তিনি সমবেদনার স্বরে লেখেন ইসপাহানে একজন সুন্নি, শিয়াকে হত্যা করে সফল ভাবে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা। তিনি আদেশ দিয়ে বলেন, যে সব নতুন পার্সি ভারতে এসে চাকরি করছে, তাদের যেন পশ্চিমের উপকূলের বন্দরগুলিতে নিয়োগ না করা হয়। প্রথম তিন খলিফার বিরুদ্ধে অভিশাপ দেওয়ায় অভিযোগে শিয়াদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী অত্যাচারের নানান ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যাবে তারিখইকাশ্মীরি আজামিতে)। আওরঙ্গজেবের একটা চিঠিতে দেখি, তিনি একটি আপাত সমাপতনে খুব চিন্তিত হন যে খাজাঞ্চি রুহুল্লা আর তাঁর লাহোরের দুই নিজামি দুই পক্ষই শিয়া, তিনি অবিলম্বে রুহুল্লার বদলির নির্দেশ দেন(কালিমাত-তাই)। তাঁর ক্ষমতার শেষের দিকে তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেন, অবিলম্বে মারা যাওয়া ধনী শিয়াদের হাড় গোপনে কারবালা আর মাশহাদে পাঠিয়ে কবর দেওয়ার কাজ রুদ্ধ করতে হবে(প্রাগুক্ত)। এটাকে তিনি কুসংস্কার হিসেবে দেখতেন। কিন্তু তিনি এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা নবির পায়েরছাপের প্রতি যেভাবে আসক্তি দেখিয়ে গিয়েছেন, তা কি মূর্তি পুজো নয়?
(চলবে)
Post a Comment