Saturday, June 18, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

সপ্তম অধ্যায়

৭। মুসলমান ভারতে শিক্ষা
মধ্যযুগের ইওরোপের মতই মুঘল ভারতেও শিক্ষার সঙ্গে ধর্মের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল। আর শিক্ষার জন্য রাষ্ট্র ব্যয় করত দান তহবিল থেকে এবং এই কাজটি করতেন প্রাথমিকভাবে সাম্রাজ্যের দাতা, যে পদটির নাম সদরউসসাদুর। বিপুল সংখ্যক অমুসলমান জনগণ সরকারি দানখয়রাতির বাইরেই পড়াশোনা করতে বাধ্য হতেন। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের প্রথম দিকে একটা ফরমান সূত্রে এই তত্ত্ব সরাসরি প্রমান হয়। তিনি গুজরাটের দেওয়ানকে নির্দেশ দেন, যাতে প্রত্যেক বছর রাষ্ট্রের খরচে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, এবং শিক্ষকের ছাপ এবং প্রতি স্বাক্ষরের প্রেক্ষিতে সুবার সদরের প্রত্যয়নে(তাসদিক) নির্দিষ্ট কিছু ছাত্রদের নাম জলপানির জন্য প্রস্তাব করা হয়। রাষ্ট্রের খাজাঞ্চিখানা থেকে এই অর্থে সরাসরি দেওয়া হবে। দানের পরিমানটা অবশ্য খুবই কম ছিল, আমেদাবাদ, পাটন এবং সুরাটে একজন করে মোট মাত্র তিন জন মৌলবি নিয়োগ করা হয় আর জলপানি পাওয়া ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৪৫(মিরাটইআহমদি)।(মরক্কোতে কিছু উলেমাকে সরকারি সাহায্য দিয়েই সরকার হাত ধুয়ে ফেলত। জনস্বাস্থ্যের জন্য সরকার কিছু করত না, মাত্র কিছু এলাকায় যেখানে মানুষ নোংরা, জঞ্জালের মধ্যে মারা যাচ্ছে সেখানে হয়ত এক ধরণের কাজ না করা হাসপাতাল বা বিদ্যালয়ের মত কিছু গড়ে উঠেছিল। মিশরে একটি বিশাল মহাবিদ্যালয় ছিল, যার নাম আল আযহার)
খানকাগুলিতে বিপুল পরিমান সরকারি ভর্তুকির অর্থ বিনিয়োজিত হত, যেভাবে খ্রিষ্ট সাম্রাজ্যে ক্যাথিড্রালগুলি তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চার অংশ হয়ে উঠেছিল, খানকাগুলিও মুঘল সাম্রাজ্যে সেই কাজ করত। দিল্লি সরকার সরহিন্দ, শিয়ালকোটের মত শহরের বিখ্যাত জ্ঞানীদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করত(যারা নিজেদের বাড়িতে ছাত্র পড়াত)। কিন্তু পরিবারের জ্ঞানীদের অভাব ঘটলে এই পরিবারে সাহায্য বন্ধ হয়ে যেত।
শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা আমরা শেষ করব সভাকবিদের আলোচনায়। এঁরা পারস্যে জন্মগ্রহণ করা ইরানী। গোঁড়া আওরঙ্গজেব ছাড়া প্রায় সকল সম্রাট, এঁদের বহুলভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এই সাহায্যের বদলে তাদের যুদ্ধ জয়, রাজ বিবাহ, সিংহাসনে আরোহন, জন্ম দিন বা সভার উৎসব বিষয়ে বা বিভিন্ন প্রাসাদে বা রাজসিংহাসনে খোদাই(খুতবা) করার জন্য কবিতা লিখতে হত। জাহাঙ্গিরের সময় কিভাবে একটি শিক্ষিত চিতা জংলি মোষকে পেড়ে ফেলল, এই চার লাইনের কবিতা লেখার জন্য একজন কবি ১০০০০টাকা পারিতোষিক পেয়েছিলেন।
সপ্তদশ শতকে এই কবিরা জুড়ে থাকতেন সভা বৈদ্যদের সঙ্গে এবং সভা বৈদ্যরা অনেকেই পার্সি হতেন, কবিরা বৈদ্যদের পরিবারের নানা উতসবের সঙ্গে জুড়ে ছিলেন। পারস্যের শাহের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা একজন সভা বৈদ্য যে দিল্লিতে রাজ দরবারে সাদরে গৃহীত হতেন(আবদুল হামিদ, পাদশানামা, আলমগিরনামা)।
এই পার্সি কবি আর বৈদ্য পরিবারের মহিলারা খুব জ্ঞানী হতেন। এঁরা সাম্রাজ্যের হারেমে নিযুক্ত হতেন রাজকুমারী আর সাম্রাজ্ঞীদের পড়ানোর জন্য এবং তাদের দেওয়া বিভিন্ন দানধ্যানের খরচ দেখাশোনা করার জন্য। এঁদের নাম ছিল সদরউন্নিসা। মুমতাজ মহলের বন্ধু এবং তাঁর কন্যার গভর্নেস সিলিউন্নিসার জীবনী শাহজাহানের সময়ের হারেমের উজ্জ্বলচিত্র তুলে ধরে।
(চলবে)

Post a Comment