Saturday, June 18, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

সপ্তম অধ্যায়

৩। ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্বের দাবি আকবরের

পরম ভগবত বিশ্বাসীরা এ ধরণের মহামানব গুরু বা অবতারএর(সাহিবিজামান) আবির্ভাবের জন্য অপেক্ষা করেন, কিন্তু চরম বিদ্রুপে অল বাদাউনি বলে গিয়েছেন, মানুষের চরিত্রটাই হল, কাউকে ধর্মপ্রধান চিহ্নিত করে কিছুটা ঐহিক লাভ কামিয়ে নেওয়ার।

ভারতের ধর্মীয় পরিবেশ ষোড়শ শতাব্দের প্রথম দিকে প্রায় অসম্ভব বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় শ্রীচৈতন্য বা নানক এই সময় তাঁদের ধর্মীয় প্রচার চালাচ্ছেন, নতুন নতুন শিষ্য হচ্ছে, তাঁদের নতুন ভাবধারা সেই যুগের উপযোগী করে ধর্মকে ভেঙ্গেচুরে গড়ে নিয়ে নতুন সময় তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছিল। পুরোনো পরম্পরার অন্যান্য ধর্মও ভারতে নতুন করে নিজেদের খুঁজে নিচ্ছিল নিজেদের স্থান, ব্লকম্যানের আইনিআকবরীর মহদাওই(Mahdavi) গোষ্ঠী, নিজেদের মত করে নতুন মহদি বা পরম ঐশ্বরিক গুরু খুঁজে নেওয়ার পথে চলতে শুরু করেছিল(মহদাওই বিজাপুরের গোষ্ঠী, এবং মধ্য সপ্তদশ শত পর্যন্ত এবং তাঁর পরেও আজও তারা সক্রিয়)।

শাহেনশাহ আকবর এই চরিত্র দাবি করলেন, অল বাদাউনি বলছেন কিছুটা নিজের অহঙ্কারের যায়গা থেকে আর সব থেকে বেশি তাঁর আশেপাশে ঘিরে থাকা মানুষের চাটুকারিতায়। নিজে নিরক্ষর হয়েও সে সময়ের কোরাণের, মুজতাহিদ এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্বে যত কিছু বিরোধ, ঝগড়া সব থেকে বড় ব্যাখ্যাকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন(১৫৭৯)। হিন্দুধর্মের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময় ধরে সাধু সন্ত পণ্ডিতদের সঙ্গে যে কথোপকথন, হিন্দুধর্মের বিভিন্ন অনুশাসন, বিভিন্ন হিন্দু প্রথা, উৎসব, নীতি ইত্যাদি আত্মীকরণ করায় হিন্দুরা তাঁকে নিজেদের একজনই ভাবতে শুরু করে। তারা আকবরকে জগতগুরু রূপে সম্মানিত করেন, অন্য দিকে মুসলমান অনুগামীরা(বিশেষত পারসিরা) তাঁকে ইনসানিকামিল আর সাহেবইজামান রূপে চিহ্নিত করল।

তাঁর প্রজাদের ধর্মীয় নির্দেশক হিসেবে, আকবর গুপ্ত এবং সাবধানী চরণে প্রফেটের পদগর্ব এবং গুণগুলি আত্মীকরণ করে নিলেন, এমনকি নিজেকে অবতার হিসেবেও দেখালেন। তার এই সুচতুর পদক্ষেপ, পুরোনো ধরণের মোল্লাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এমন কি তাঁদের নির্দেশে বিপ্লব করতে পিছপা না হওয়া মুসলমান মৌলবাদী প্রজা এবং সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রাখল।

৪। ধর্মীয় উপদেষ্টা/পথপ্রদর্শক হিসেবে আকবরের পুজিত হওয়া

তার সভাচাটুকার আবুল ফজলএর লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যাক,
‘একটা জাতি কপালগুণে এমন এক সময়ে উপনীত হয়, যখন জাতি বোঝে কিভাবে সত্যকে পুজো করা যায়, এবং তার ফলে প্রজারা তাঁদের সম্রাটের পানে তাকায়...এবং তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কখন তিনি তাদের ধর্মীয় গুরু হয়ে উঠবেন; সম্রাট মানুষ নন, তিনি সত্যের এবং জ্ঞানের রেখা...এবং আজকে আমাদের সম্রাট সেই সত্য ধারণ করেন...ভবিষদ্বক্তারা জানিয়েছিলেন, কখন মহামহিম জন্মাবেন, এবং ততদিন থেকে তাঁরা তার অপেক্ষা করছেন।

‘প্রকৃত জ্ঞানীর মত আমাদের মহামহিম নিজের ভগবত চরিত্র চমৎকারভাবে লুকিয়ে রেখেছেন, মনে হয় তিনি যেন আগন্তুক এবং প্রজার বিশ্বাসের পাত্র নন। কিন্তু কেউ কি সর্বেশ্বরের ইচ্ছাশক্তির বিরোধিতা করতে পারে? এবং তিনি নিজের তীব্রতাকে লুকিয়ে রাখতে পারলেন না...তিনি এখন জাতির ধর্মীয় পথপ্রদর্শক। যারা সত্যের জন্য ঊর্ধ্বশ্বাস লালায়িত, তাঁদের সামনে দরজা খোলার কাজের সঠিক পথের দিশারী হয়ে উঠলেন তিনি।

‘প্রত্যেক জাতির আবালবৃদ্ধবনিতা, বন্ধু এবং অজ্ঞাতকুলশীল বা কাছের-দূরের মানুষ, প্রত্যেকে জীবনের দুস্তরপারাবারের বাধার দরজা হঠাতে তার দেওয়া সমাধানের দিকে সাগ্রহে তাকয়ে থাকে, এবং যখন তিনি দরবার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যম গ্রহণ করেন, তখন তার সামনে মাথা নত করে বিষ্ফারিত নয়নে পুজো করতে থাকেন, দেশের এমন কোন গ্রাম-শহর নেই যেখান থেকে মানুষ কৃতাঞ্জলিপুটে আর অনুরঞ্জনকৃত্য ঠোঁটে নিয়ে, তারা যেভাবে পথ দেখেছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তার সামনে এসে দাঁড়ায় নি, মহামহিম, তাঁদের প্রত্যেকের প্রশ্নের উচিত জবাব দিয়েছেন, এবং ধর্মীয় নানান জিজ্ঞাসার পথ প্রদর্শন করেছেন। এমন একটা দিনও যায় নি যখন কোন মরণশীল তার সামনে এক পেয়ালা জল এনে তাঁকে সেই পেয়ালায় নিশ্বাস ফেলার অনুরোধ করে নি...এমনকি যে সব মরণাপন্ন রোগীকে হাকিম জবাব দিয়েছেন, তাঁদের তিনি স্বর্গীয় অনুপ্রেরণায় সুস্থসবল করে দিয়েছেন’। (আইনিআকবরী)

রাজসভায় প্রত্যেকে সম্রাটকে কুর্ণিশ এবং তসলিম জানাতেন যেমন, তেমনি আকবরের অনুগামীরা সিজদা(মাথা মাটিতে ঠেকানো) প্রদর্শন করতেন। এই প্রথাটি সর্বশক্তিমান খোদার উদ্দেশ্যে প্রণতি জানানোর ধর্মীয় উপাচাররূপে ব্যবহৃত হয়। খোদার প্রতি প্রণতি ছাড়া এর ব্যবহার বারণ ছিল। এবং আকবর সেই বুঝেই এই ধরণের উপাচার তার রাজসভাতেই আবদ্ধ রেখেছিলেন, যাতে কোন ভুল বার্তা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে না যায়। জনগণ এর নাম দিয়েছিল জমিন-বওস বা সম্রাটের সামনে জমি চুম্বন। প্রাচীন পারস্য এবং হিন্দু রাজ্যগুলিতে এই ধরণের প্রথা চালু ছিল। আমরা আমাদের চারপাশে যা দেখি, তা হল ধর্মীয় গুরুরা এই আচারে বৃত হতেন, আজও হন। আবুল ফজল এর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করে লেখেন, ‘তারা ভগবানের সামনে যেভাবে নত হয়, তারা সর্বশক্তমান সম্রাটের সামনেও(সেইভাবে) নত হচ্ছে; কেননা রাজক্ষমতা ভগবান প্রদত্ত’।

মুসলমান সমাজে ঘৃণিত এই প্রথা জাহাঙ্গির চালিয়ে যান এবং শাহজাহান জনগনের মত গ্রহন করে এই প্রথাকে উচ্ছেদ করেন।

আগেই বলেছি, দর্শনিয়ায়ারা, যারা প্রাতকৃত্য না করেই সম্রাটের দর্শনের জন্য তার ঝরোখার তলায় উন্মুখ হয়ে বসে থাকতেন, তাঁরাও আরও এক ধরণের সম্রাট-উপাসক হিসেবে গণ্য হতেন।

বহু রাজভার ঐতিহাসিক লিখে গিয়েছেন, রাজপরিবারের দাসেরা/ভৃত্যেরা সম্রাটের অনুগামীরূপে ধর্মান্তরিত হতেন, ‘মহামহিম ধর্মীয় সূত্র ধরেই দাস এই শব্দটি মুছে ফেলতে চেয়েছেন, তিনি ভগবানকেই প্রভুরূপে দেখতেন(অন্যকাউকে নয়)। তাই তিনি এই মানুষদের চেলারূপে গণ্য করতেন। এবং তাঁর দয়াশীলতায়, তাঁদের অনেকেই সুখানুভূতির দিকে এগিয়ে গিয়েছে(আকবরের ধর্মপথ গ্রহণ করেছে)’।
(চলবে)
Post a Comment