Wednesday, June 1, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

পঞ্চম অধ্যায়
করব্যবস্থা

২। কৃষকের রাজস্ব বাকি পড়েই থাকে
ফলে রাজস্ব আদায়ের জন্য দ্বন্দ্ব শুরু হয় রায়তের সঙ্গে সরকারের, আর বকেয়া যদি, খুব কম পরিমানে হয়, তাহলে সে দ্বন্দ্ব খুব দূর পর্যন্ত এগোয় না। কিন্তু দেখা যায়, রায়তদের যে পরিমান রাজস্ব বাকি পড়ে তা কোনোদিনই শোধ হয় না, তৈরি হয় রাজস্ব শোধ না হওয়ার আর আদায়কারীর খাতা তৈরির বিষচক্রের ফাঁদ। ফলে তার বেঁচে থাকার ন্যুনতম পরিমান ছেড়ে তার সব উদ্বৃত্ত কেড়ে নেওয়া হয়। মুঘল সাম্রাজ্যে মোটামুটি সারা ভারতে রায়তদের আর্থিক অবস্থা ছিল পঞ্চদশ লুইয়ের আমলে ফরাসী দেশে কৃষকদের মত যারা অনৈতিক টাইল শুল্ক এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনেক কিছু করত বা আয়ারল্যান্ডের চাষীদের মত তাদের মালিকদের কাছে চিরকালীন ধারে ডুবে থাকত।

কিন্তু একটা পার্থক্য ছিল, ব্রিটিশ যুগের আগে বকেয়া বরাদ্দের জন্য কোন কৃষককে উচ্ছেদ করা হত না বা না খেয়ে মরতে হত না(যদি না সেখানে মন্বন্তর ঘটে, আর অন্যান্য এলাকার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়)। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে কৃষক তার জমিতে ডেঁটে থাকত, তার ফসল সেই ভোগ করত, যদি না সেটি শুখা মরশুম হয়। পুরোনো বাতাই পদ্ধতির উৎপাদন বিভাজন তার(কৃষকের) অনুকূলে ছিল, অর্থাৎ সে বছরে যা উৎপাদন হত, তার ওপরে নির্ভর করত তার রাজস্বের পরিমান – আজকের মত জমির একটা নির্দিষ্ট রাজস্ব পরিমান বরাদ্দের নীতি ছিল না, ফসলের উৎপাদন যাই হোক না কেন। সে প্রবল যুদ্ধ পরিস্থিতির এবং অরাজকতার(ডিসর্ডার) যুগে কৃষকদের কিছুটা হলেও তোল্লাই দেওয়া হত এবং জমিদারের কাছে কৃষকের মূল্য যথেষ্ট ছিল, কেননা যুদ্ধের জন্য চাষীকে সে অস্ত্র ধরাত। সে যুগে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কৃষকদের ধরে নিজের জমিদারিতে নিয়ে আসা ছিল জমিদারদের লড়াই। কখোনো কখোনো গরীব কৃষক এক জমিদারের আওতা থেকে পালিয়ে পাশের জমিদারের এলাকায় বাস করতে চলে আসত। এমনকি ষাট বছর আগেও উত্তরবঙ্গে এ ধরণের পলাতক রায়তের সংখ্যা খুব কম ছিল না।

৩। কৃষকদের ওপর বেআইনি করাঘাতে সরকার প্রধানের নিন্দা

সাধারণত একজন রায়তের চেষ্টা ছিল কি করে হয় রাজস্ব দেওয়ার পথ বন্ধ করা বা রাজস্ব দিতে অস্বীকার করা। এবং একই সঙ্গে বিপরীতে রাষ্ট্র প্রত্যেক তিন বা পাঁচ বছরে তার বকেয়া রাজস্ব প্রদান থেকে মুক্তি না দেওয়ার ঘটনাও মুঘল আমলের রাজস্ব দপ্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণ্ডগোলটা ছিল রাজস্ব দপ্তরের এবং কোন কোন সম্রাটের রাজস্বের প্রতি তীব্র খাঁই। আমার করা মুঘল আমলে বিভিন্ন বেআইনি রাজস্ব বা আবওয়াবএর তালিকা পাঠক পড়ে নিশ্চই বুঝতে পারবেন, সাধারণ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার সর্বস্ব নিংড়ে নেওয়ার জন্য মনুষ্য মস্তিষ্কের উচ্চশ্রেণীর ক্ষমতার কথা। বহু আবওয়াব কৃষক দিতেন না, কিছু কিছু ছোট ছোট শহরের মধ্যশ্রেণী বা নাগরিককেও আঘাত করত। তবে আমাদের দেশে অধিকাংশই ছিলেন কৃষিজীবি, তাই আবওয়াবগুলি সরাসরি বিদ্ধ করত কৃষকদের।

তবে এখানে আবওয়াব আদায় বিষয়ে বলে নেওয়া দরকার, সম্রাটের কর নীতি মেনে চলত না রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীরা। সম্রাট তার ফার্মানে নির্দেশ দিতেন, যাতে তার কর্মচারীরা কৃষকদের ওপর অত্যাচার না করে, সমস্ত আবওয়াব আদায়ের চেষ্টা ত্যাগ করে এবং স্থানীয় নানান অভাব অভিযোগের প্রতিকার করে। উল্টো দিকে রাজস্ব দপ্তরের আধিকারিকেরা কৃষকের খাদ্যটুকু রেখে তার সব কিছু কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। এইভাবে এক সম্রাট সব আবয়াব রদ করার জন্য ফর্মান জারি করে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও’ যেন তারা এই নির্দেশ অমান্য না করে। কিন্তু আবওয়াব আদায়ের চেষ্টার খামতি হয় নি, এবং ঠিক তার পরের উত্তরাধিকারীকে ঠিক এই ধরণের আরও একটি ফর্মান জারি করতে হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি, যথা পূর্বং তথা পরং। এন্সাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামে, মিশরের মত ইস্লামিক দেশেও একই উদাহরণ পাচ্ছি।

মুঘল আমলের রাষ্ট্র প্রধানদের নীতি ছিল কোন কৃষকের ওপরে অনাবশ্যক আঘাত না করার। এবং এটি শুধু সাধারণ উচ্চশ্রেণীর ইচ্ছে ছিল তাই নয়, এটি তারা বাস্তবে প্রমান করেছিলেন। শাহজাহান আর আওরঙ্গজেবের আমলের ইতিহাসে এধরণের নানান ঘটনা ছড়িয়ে রয়েছে। অবৈধ শুল্ক আদায়ের কোন ঘটনা যদি সম্রাটের কানে পৌঁছত, তাহলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে চরম শাস্তি প্রদান করেছেন, এমন কি দেওয়ানকেও বরখাস্ত করেছেন। এ বিষয়ক একটি ঘটনা ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ৩৭০ নং পারসিক পাণ্ডুলিপির ৬৮ নম্বর পাতাটি দ্রষ্টব্য। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় শাহজাহান তার সাম্রাজ্যের কৃষকদের মুক্তিদিতে কি করে ছিলেন। সেই গল্পটি এখানে বর্ণনা করা যাক।

‘একদিন শাহজাহান তার রাজস্বের হিসাবপত্রগুলি নজর দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। তার চোখ পড়ল একটি গ্রামের রাজস্বের ওপর, দেখলেন এই বছরের রাজস্ব আগের বছরের রাজস্বের তুলনায় কয়েক হাজার(দাম?) বেশি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রধান দেওয়ান সাদাউল্লা খাঁকে তার সামনে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিয়ে এই ঘটনার বিবৃতি দাবি করলেন। সাদাউল্লা খাঁ তখন খাজাঞ্চিখানায় বসে কিছু হিসেবপত্রে চোখ বুলোচ্ছিলেন এবং তার জটিল দপ্তরের নানান হিসেব নিকেশে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি যে অবস্থায় ছিলেন(যে পোষাক পরেও) সেই অবস্থায় বার্তাবহনকারী তাকে সম্রাটের সম্মুখে নিয়ে এলে সম্রাট তাকে প্রশ্ন করলেন, এই গ্রামের রাজস্ব বৃদ্ধির কারণ কি? স্থানীয় তদন্তে দেখা গেল, গ্রামের পাশের বহতা নদী কিছুটা সরে গিয়ে একটি চর গজিয়ে উঠেছে, তার ফলে সেই গ্রামের উৎপাদন বেড়েছে। সম্রাট প্রশ্ন করলেন জমিটার চরিত্র কি, খালসা না আইমা – আবারও তদন্ত হল, দেখাগেল এই জমিটি আইমা(শুল্কহীন) চরিত্রের। তখন সম্রাট শাহজাহান বিপুল ক্রোধে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ঐ জমিটার ওপরের জল সরে গিয়েছে কেননা বিধবা, অনাথ এবং গরীবদের ওপর অত্যাচারের কান্নায়, এটা তাদের প্রতি সর্বময়ের আশীর্বাদ স্বরূপ এবং রাষ্ট্র কি করে এই জমিটির রাজস্ব আদায় করে! যদি ভগবানের আশীর্বাদ এই মানুষের ওপর না পড়ত তা হলে আমি ঐ দ্বিতীয় শয়তান, অত্যাচারী ফৌজদারকে(যার আদেশে এই নতুন জমি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে) এক্ষুনি হত্যা করার আদেশ দিতাম। তাকে এই মুহূর্তে বরখাস্ত করে অন্যদের এই ধরণের কাজ না করতে বার্তা পাঠাও। আর যে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে, তা সেই গ্রামে ফেরত দিয়ে এস।’’
এই গল্পটি হয়ত গল্পই, সত্য নাও হতে পারে, কিন্তু যদিও এটি সত্য না হয়(বেন ট্রোভাটো) তাও এটা শাহজাহানের মহত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস প্রমান করে।
(চলবে)
Post a Comment