Friday, June 24, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

২। হিন্দু মুন্সি এবং তাঁদের কাজ

মুঘল আমলের সপ্তদশ শত থেকে দেখা যায় অধিকাংশ মুন্সিই হিন্দু, এবং তাঁদের সংখ্যা দ্রুতহারে বেড়েছে। টোডরমল্ল(আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী)এর বহু আগে থেকেই, হয়ত ভারতে মুসলমান সাম্রাজ্য শুরুর সময় থেকেই রাজস্ব(দেওয়ানি) দপ্তরের অধিকাংশ নিম্নস্তরের কেরাণি ছিলেন হিন্দু। টোডলমল্ল প্রত্যেকটি নথি পার্সিতে লেখার নির্দেশ দিলে(শের শাহর আমলে একটি লেখা হত পার্সি, অন্য নকলটি হিন্দিতে) হিন্দু দপ্তরীরা পার্সি শিখে নেওয়ার চেষ্টা করে, এবং এই পরিবর্তনের প্রভাবটি পরবর্তী শতে লক্ষ্য করা যায়, যখন হিন্দুরা রাজস্ব দপ্তরের পাশাপাশি হিসাবকিতাব দপ্তরটি ভরিয়ে ফেলে। এমনকি নায়েব এবং ব্যক্তিগত সহায়তাকারী(পেশদাত) পদে, এবং অন্যান্য দপ্তরের প্রধান হিসেবে উঠে আসতে শুরু করে তারা। সপ্তদশ শতের শেষের দিকের অধিকাংশ অভিজাত এমন কি শাহজাদারাও(রাজপুত্র) তাঁদের পার্সি চিঠি লেখানোর ব্যক্তি, মুন্সিরূপে হিন্দুদের নিয়োগ করা শুরু করলেন। সহজবশ্য এবং সংযতচিত্ত কুশলী হিন্দুদের হাতের লেখা শস্তায় সাম্রাজ্যের নানান কাজ সম্পাদন করত। পারস্যজন্ম বা পারস্যে শিক্ষিত মুসলমান করণিক হয়ত আরও শুদ্ধ বাগধারা ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু ভারতের অভিজাতদের পক্ষে তাঁদের নিয়োগ করা খুব খরুচে হয়ে পড়ত। এছাড়া, সপ্তদশ শতে পারস্যে রাষ্ট্রবিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে এই ধরণের দক্ষ করণিকের সংখ্যা কমে যেতে শুরু করে। আর ভারতীয় মুসলমানেরা করণিকের কাজে খুব দক্ষ ছিল না।

১৬২৩এর হরকণ ইতিবারখানির পর সব থেকে প্রখ্যাত যে হিন্দু মুন্সির নাম আমার মনে আসছে সে হল, শাহ জাহানের উজির শাদুল্লা খাঁএর হাতে তৈরি চন্দ্রবদন(শৈল্পিক/কাব্যিক নাম ব্রহ্মণ), যিনি প্রচুর পার্সি পদ্য এবং সুন্দর প্রচলিত কবিতা লিখেছেন, কিন্তু যে চিঠি লিখেছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বড় কম। অথচ সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে অভিজাতদের দপ্তরে হিন্দু করণিকেদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, এমন কি অষ্টাদশ শতের শেষ প্রান্তে, সম্রাট মহম্মদ শাহের অধীনে মীর মুন্সি(বা প্রধান সচিব) পদ অলঙ্কৃত করেন এক হিন্দু – এমন এক মানুষের নাম আনন্দ রাম, যার ছদ্মনাম মুখলিস।

মুঘল সাম্রাজ্যের করণিক এবং অন্যান্য নিচুপদে কাজ করতেন হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, এঁরা নিজেদের মধ্যে একটি সুফি-দর্শনের ডোরের অদৃশ্য বন্ধনে ভাইচারা তৈরি করে নিয়েছিলেন। সপ্তদশ থেকে অষ্টদশ শত পর্যন্ত এই দুই সম্প্রদায়ের ভাল লাগার একটাই সম্পদ ছিল সেটা সুফি সংস্কৃতি। অধিকাংশ চিঠিখণ্ড শেষ হত হয় মুন্সির নিজের সুফিবাদী কবিতা দিয়ে না হয় তার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর কবতায়।
(চলবে)

Post a Comment