Wednesday, June 1, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

চতুর্থ অধ্যায়
সুবাগুলির প্রশাসন৮



৬। খবরদার/গুপ্তচর
সারাদেশজুড়ে যে সংগঠন সারা দেশের খবর সংগ্রহ করে, সেই সংগঠনের পদগুলি হল ১)ওয়াকায়িনবিশ, ২) সাওয়ানিনিগার, ৩) খুফিয়ানবিশ, ৪) হরকরা - মানে খবর বহনকরে নিয়ে যাওয়া, কিন্তু বাস্তবে গুপ্তচর, যে মুখের খবর বয়ে নিয়ে আসে, এবং লিখিত খবরের পত্রিকা বহন করে।
ওয়াকায়িনবিশ কখোনো লেখা হয়ে থাকে ওয়াকায়িনিগার, এবং সাওয়ানিনিগার দুটি একই অর্থ বহন করে – ঘটনার লেখক বা সমীক্ষক। তবে তাদের মধ্যে পার্থক্যটুকু হল, ওয়াকায়িনবিশ হল দুটি পদের মধ্যে মোটামুটি নিয়মিত পদাধিকারী যিনি গোপন থাকে না, ওয়াকায়িনিগার হল এমন এক পদ, যা প্রায় গোপন থেকে বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করে। ওয়াকায়িনবিশ প্রত্যেক বাহিনী, সুবার প্রশাসন বা বড় শহরের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকে, কিন্তু সাওয়ানিনিগার বিশেষ কোন স্থানে বা ঘটনায় কাজ শুরু করে। ওয়াকায়িনিগার মোটামুটি গুপ্তচর এবং সাওয়ানিনিগারএর ওপর সে নজরদারিও করে। মীরাটিআহমদি সূত্রে বলা হচ্ছে – আগের সম্রাটদের সময়ে ওয়াকায়িনবিশ নিয়োগ করা হত সুবার বিভিন্ন ঘটনা বিবৃত করতে; কিন্তু সাওয়ানিনিগারেরা বিভিন্ন পদাধিকারীদের সঙ্গে যোগসাজস করে গোপনে খবর জোগাড় করার চেষ্টা করত – এদের আরেকটি নাম ছিল খুফিয়ানবিশ। কিন্তু যখন তারা চিঠিপত্র ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে শুরু করত তখন আর এদের অস্তিত্ব গোপন থাকত না। আমার মনে হয়, এই ব্যবস্থায় তৃতীয় ধরণের আরও এক গুপ্তচরের অস্তিত্ব ছিল, যাদের নাম হরকরা – যারা আদতে আসল খুফিয়ানবিশ, তারা সুবার বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত হতেন। মানুচি এধরণের কথা বলে গিয়েছেন।
জাহাঙ্গীরের সময়ের বাহারিস্তানিঘাইবি-র ইতিহাস অনুসারে, বিভিন্ন সুবায় গুপ্তচর নিয়োগ করা এবং প্রকাশ্য সভায় তাদের পাঠানো সমীক্ষা পড়ার রেওয়াজ শুরু করেছিলেন, যাতে আগামী দিনে ভারত ভ্রমনে আসা পারসি রাজদূতের সামনে নিজের মহত্ব দেখানো যায়। তবে আব্বাসিদ সাম্রাজ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রদেশ থেকে পাঠানো গোয়েন্দাদের সমীক্ষা একটা বড় ভূমিকা পালন করত।
সুবার প্রকাশ্য গুপ্তচর ওয়াকায়িনবিশ বিভিন্ন পরগণায় তার কর্মচারী নিযুক্ত করতেন যাতে তারা সরাসরি তার কাছে বিভিন্ন ঘটনাবলীর সমীক্ষা পেশ করতে পারে। যেগুলির মধ্য কিছু বাছাই করা সংবাদ/ঘটনা সরাসরি সম্রাটের সামনে উপস্থিত করা হত আর নিউজলেটারে লেখা হত। তিনি তাঁর কর্মচারী পাঠাতেন সুবাদারের, বিচারকক্ষে, কোতোয়ালের চবুতরায়, যারা সেসব বিষয়ের সারাদিনের খবর প্রত্যেক সন্ধ্যায় তার কাছে এনে দিত। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরগণায়, সরাসরি সম্রাটের সভা থেকে গুপ্তচর কর্মচারীরূপে নিযুক্ত হত, তারা সুবার দেওয়ানের কাছে মৃত, পালিয়েথাকা বা অনুপস্থিত মনসবদারদের সম্পত্তি সম্বন্ধে সিয়াহা(সমীক্ষা) পাঠাত।
সুবার সুবাদার যখন প্রকাশ্য সভা করতেন তখন ওকায়িনবিশ উপস্থিত থাকত, তখনকার নানান ঘটনা সেখানেই লিখে নিত। এই লিখিত বস্তুটি সম্রাটের কাছে পাঠাবার আগে সুবাদার বা সুবার সেনাপ্রধান বা সেনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের দেখিয়ে নেওয়া হত। সাওয়ানিনিগার কিন্তু তা করত না।
ওয়াকায়িনবিশ প্রত্যেক সপ্তাহের সমীক্ষা পাঠাত একবার, কিন্তু সাওয়ানিনিগার পাঠাত মাসে আটবার, মানে সপ্তাহে দুবার। এর মানে হল পূর্বের আধিকারিক শুধু সুবায় তাঁর সমীক্ষা পাঠাত আর সাওয়ানিনিগার পাঠাত কেন্দ্রে।
বহু সুবায় অনেক সময় ছোট সেনার টুকরো, আর বক্সীর পদ এবং ওয়াকায়িনবিশের পদ একটি মানুষের হাতে ছিল।
খুফিয়ানবিশ বা গুপ্তচর ছিল সব থেকে গোপন আধিকারিক। স্থানীয় আধিকারিকদের সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ না করেই সে তাঁর সমীক্ষা পাঠাতে পারত। বহু সময় স্থানীয় আধিকারিক তার নামও জানত না। এই গুপ্তচরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বহু মানুষই ভয়ে ভয়ে থাকত, কেন না তার দপ্তর কোথায়, তাঁর কি না কেউ তা জানত না(এই গুপ্তচরের নাম পরিচাওয়ালা – যদিও এই মানের সঙ্গে পর্চানবিশ পদটি মিলিয়ে ফেললে চলবে না)(আলমগীরনামা)।
বিভিন্ন মহকুমায় নিযুক্ত হরকরা সরাসরি সুবাদারদের খবর দিত, এবং বন্ধ খামে তার সমীক্ষা সুবার ডাকবিভাগ মার্ফত রাজসভায় পাঠাত। নিজাম এবং অন্যান্য দপ্তরে ওয়াকায়িনিগার বা সাওয়ানিনবিশদের মত লোক নিযুক্ত করত, এদের বলা হত আখবারনবিশ।
এই গোয়েন্দা সমীক্ষাগুলি প্রথমে ডাকচৌকির দারোগার দপ্তরে পাঠানো হত, তিনি সেইগুলি না খুলেই সম্রাটের কাছে পাঠাবার জন্য উজিরকে প্রদান করতেন। চার ধরণের গুপ্তচর এই দারোগার অধীনে কাজ করত। কখোনো কখোনো তাঁর বিরুদ্ধে লেখার জন্য সুবাদার কোন গুপ্তচরকে খোলা সভাতেই অপমান করতেন কখোনো কখোনো মেরেও বসতেন। তখন সেই গুপ্তচরকে নিয়ে সেই পদাধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে সুবাদারকে শাস্তি দিয়ে সুবিচার আদায় করে নিতেন দারোগা। আওরঙ্গজেবের আমলে গোয়েন্দা দপ্তর খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে, সম্রাট এই গুপ্তচরদের নিজের চোখ আর কান বলে অভিহিত করতেন। এর কয়েকটি উদাহরণ আমার অনুদিত আখামিআলমগিরি, এনেকডোটস অব আওরঙ্গজেবে আমি বর্ণনা করেছি।
নতুন পদ পাওয়া ওয়াকায়িনবিশকে নিম্নলখিত তীক্ষ্ণ উপদেশ দেওয়া হতঃ-
‘সত্য বর্ণনা করবে যাতে অন্য সূত্র থেকে সম্রাট সত্য জেনে তোমায় শাস্তি না দেন। তোমার কাজ খুব নাজুক। দুপক্ষকেই দেখতে হবে। গভীর বিচক্ষণতা এবং ভাবনা প্রযুক্ত করতে হবে যাতে ‘শেখ আর বই দুটোই তার নিজস্ব স্থানে অবিচল থাকে।’ উচ্চস্তরের আধিকারিকদের দপ্তরে বেআইনি কাজকর্ম সম্পাদিত হয়। তুমি সবগুলি যদি বিবৃত কর তাহলে তাদের সম্মান ধুলোয় লুটোয়, আর তুমি যদি তোমার কাজ না কর তাহলে কর্তব্য বিচ্যুত হবে। তাই তুমি সেই দপ্তরের প্রধানকে বলবে, ‘আপনার দপ্তরে বেআইনি কাজ হচ্ছে, তাকে থামান।’ তারা যদি তোমায় কড়া কথায় জবাব দেয় তাহলে তৎক্ষণাৎ তুমি সেই কাজগুলি কোতোয়ালকে জানাবে। তখন সেই আধিকারিক তা জানতে পারবে। তবে খুব সহজে যে এই বেআইনি কাজ আটকানো যাবে তা নয়, কিন্তু কেউ যদি তোমার বিরুদ্ধে সম্রাটকে অভিযোগ করে, তাহলে অন্তত তুমি যাতে নিজের পক্ষে বলতে পারবে, এ বিষয়ে তুমি সেই আধিকারিক এবং কোতোয়ালকে জানিয়েছিলে।
‘প্রত্যেক বিষয়ে সত্য লিখবে; তবে অভিজাতদের সহজে চটিও না। প্রত্যেক তথ্য যাচাই করে তোমার বক্তব্য লিখবে।
‘খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যতিরেকে(যা সত্ত্বর পাঠাতে হবে), প্রত্যেক সপ্তাহে একটি ওয়াকায়ি, দুবার সাওয়ানি এবং একবার(মাসে?) হরকরার আখবার একবার, নাজিম এবং দেওয়ানএর থেকে চোঙ্গা(নালো) মাসে দুবার পাঠাতে হবে। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের প্রথমের দিকের গুজরাটের প্রথা ছিল, সপ্তাহে একবার খাজাঞ্চিখানার হিসাবকিতাবের কাগজের সঙ্গে সবধরণের সমীক্ষা সম্রাটকে পাঠানো হত।
(চলবে)
Post a Comment