Sunday, June 5, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার



ষষ্ঠ অধ্যায়
আইন ও বিচার ব্যবস্থা


৮। জন-প্রতিহিংসা, জন-অসম্মান
কিসাস বা  সম্পর্ক। কিছু অপরাধে, বিশেষ করে, হত্যার ক্ষেত্রে, এটি অপরাধী এবং তার আত্মীয়দের ব্যক্তিগত অধিকার। যদি কেউ আইনি শাস্তি দাবি করে, কাজি সেই শাস্তি দিতে বাধ্য, তিনি বা সম্রাট তাঁদের ‘ঈশ্বর প্রদত্ত’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই শাস্তি রদ বা কোনরূপ দয়া বা ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন না। আর যদি মৃতের আত্মীয়রা আর্থিক ক্ষতিপূরণেই(যার নাম ‘রক্তের দাম’ আরবিতে দিয়া) সন্তুষ্ট হয় বা তাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে সম্রাট বা কাজি সে অপরাধ বিষয়ে আর দ্বিতীয়বার মাথা ঘামাবেন না। ছোটখাট অপরাধে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মোজেসের আইন অনুযায়ী ‘চোখের বদলে চোখ আর দাঁতের বদলে দাঁত’ অনুসরণ করা হত।
তাস-হির বা জন-অসম্মান - মুসলমান দেশগুলিতে এমন কি হিন্দু ভারতে বা মধ্যযুগের ইওরোপে অনুসরণ করা হত। ইসলামের আইন বইগুলিতে একে যেমন স্বীকার করা হয় নি, তেমনি একে অস্বীকার করাও হয় নি, কিন্তু এটি মুসলমান বিচারক এবং সম্রাট, এমন কি সাধারণ মানুষও অনুসরণ করত, কেননা এটিকে জনতার রায়ে খুনের একটি নিরীহতম সংস্করণ বলা যায়। ভারতে অপরাধীর মাথা মুড়িয়ে দিয়ে তাকে গাধার ওপর উল্টো করে বসিয়ে, সারা গায়ে কাদা লেপে, গলায় জুতোর মালা পরিয়ে ঢাক ঢোক পিটিয়ে রাস্তায় মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হত। ‘বিচারক অপরাধীর মুখে কালো রং লেপে দিয়ে, তাঁর চুল কেটে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাবেন’। এটি আরবি বিচার প্রথা।
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ, যেমন বিদ্রোহ, বা রাজস্ব সময় মত না দেওয়া ইত্যাদি বিচারক শাস্তির নির্দেশ নিজের ইচ্ছে মত দিতে পারেন, কেন না শাস্তি কি হবে সে বিষয়ে কোন কোরনি নির্দেশ নেই। এক্ষেত্রে মৃত্যু দণ্ডের যে প্রথা রয়েছে সেটি হল, হাতীর পায়ের তলায় পিষে মৃত্যু, বা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, কেউটের ছোবলে মারা বা যে কোন উপায়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া(মধ্যযুগের ব্রিটিশ আইনসিদ্ধ)। শাস্তিস্বরূপ অত্যাচারের নানান ধরণ ছিল।
চুরি(সারকা)তে হাত পা কাটার নিদান ছিল। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে যদি হত্যা করে তাহলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত ...এবং দেহ তিন দিন ধরে ক্রসে ঝুলিয়ে রাখা হত জনদর্শনের জন্য। মৃত্যুই দণ্ড হল ‘হক আল্লা’, এক্ষেত্রে রক্তের দাম বা ক্ষতিপূরণের কোন রকম প্রশ্ন উঠত না। দুষ্কর্মের সব দোসরদের একই শাস্তি ছিল। হদএ বর্ণিত সব কটি আইনি শর্ত পূরণ হলে, বিচারক মৃত্যুদণ্ড দেবেন। যার চুরি হয়েছে, তাকে সঙ্গে নিয়ে আইনি তদন্ত করতে হবে। প্রমান সিদ্ধি বা স্বীকারোক্তির জন্য দুজন পুরুষ প্রয়োজন। চোর যদি অভিযোগ দায়ের করার আগেই চৌর্যলব্ধ দ্রব্যাদি ফিরিয়ে দেয় তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
মৃত্যুদণ্ড(কতল) দেওয়া হয় আইনি প্রমানের পরে, নিম্নলিখিত মামলায়-
ক। যখন মৃতের আত্মীয়রা হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড চায় এবং বিকল্প আর্থিক ক্ষতিপূরণে(রক্তের দাম বা দিয়া) সম্মত হয় না,
খ। কিছু অনৈতিকতায়; মহিলা অপরাধীকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার নির্দেশ,
গ। রাজপথের চোরদের,
ঘ। ধর্মপরিবর্তনকারী(মুরতাদ)দের বিষয়ে কোরাণে বলা হয়েছে, ‘এক অমুসলমান ধর্ম থেকে অন্য অমুসলমান ধর্মে আশ্রয় নেওয়ার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একজন জিন্দিক, যিনি অবিশ্বাসী বা কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে... ‘যে অবিশ্বাসী জিজিয়া দেয় না, তাকে যে কোন মুসলমান, শাস্তি বা অর্থদণ্ডের ভয়ের ব্যতিরেকে হত্যা করতে পারে’। ধর্মপরিবর্তনকারীকে হত্যা করা অবশ্যকীয় কর্তব্য।
ওপরের উদাহরণগুলি ছাড়া হানাফি মতাদর্শ নিচের তিন অবস্থায় হত্যাকে আইনি বলে ঘোষণা করে-
ঙ। যখন আল্লা বা নবীকে আসম্মান করার জন্য কোন গাজী তাঁর আত্মীয়কে হত্যা করে,
চ। যখন কোন ইমান, তাকে মুক্তি দেওয়া আর হত্যা করার তুলনামূলক অবস্থায়, অবিশ্বাসী যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করে,
ছ। নিজের সম্পত্তি, আত্মীয় রক্ষায় এবং আত্মরক্ষায় হত্যা।
সতর্কীকরণ – কোন অধিকার ও ক্ষমতা ছাড়া যদি কেউ মুরতাদকে হত্যা করে, তাহলে তার বিচার হবে কিসাস নয় তাজির অনুসরণে, একইভাবে যদি কেউ ইমানএর অবিশ্বাসী যুদ্ধবন্দীকে নির্দিষ্ট ক্ষমতা ছাড়াই হত্যা করে তাহলেও একই পদ্ধতিতে সাজা হবে।
আমরা এখানে অসামরিক আইনি শাস্তি নিয়ে বিশদে আলোচনা করলাম। যখন একজন উত্তমর্ণ কাজির সামনে অধমর্ণ কে জেলে দেওয়ার জন্য দাবি জানায়, কাজি তক্ষুণি শাস্তি শোনান না, বরং অধমর্ণকে তাঁর অধিকারের কথা বলেন। কিন্তু সে যদি তাঁর রায়কে সম্মান জানাতে অস্বীকার করে, এবং তার অধমর্ণতা প্রমান হয়, তাহলে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে হবে।
যখন দুপক্ষ স্বেচ্ছায় একজন মধ্যস্থতাকারী(সালিশ)কে মেনে নেয়, এবং তাঁর রায় যদি আইনি বৈধ হয়, তাহলে কাজির দায় হবে, সেই রায়কে কার্যকর করানো।
(চলবে)
Post a Comment