Sunday, June 19, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

নবম অধ্যায়


অভিজাততন্ত্রের অবস্থা

১। অভিজাতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ

ইওরোপিয় ভ্রমণকারীরা মুঘল সাম্রাজ্যে অভিজাতদের বংশপরম্পরার সম্পত্তির কোন নিদর্শন দেখতে পান নি। ১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন হকিন্স লিখছেন, ‘যখন কোন অভিজাত মারা যান, তখন সাম্রাজ্য নীতি হল তাঁর সম্পত্তিতে দখল নেওয়া, আর সম্রাটের ইচ্ছেমত সম্পদ মৃতের সন্তানদের দেওয়া; তবে সাধারণভাবে সেই হতভাগ্য সন্তানদের সঙ্গে সম্রাট ভাল ব্যবহারই করতেন; যদি জমি থাকত তা তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে বেঁটে দিতেন, সব থেকে বেশি ভাগিদার ছিল তাঁর জৈষ্ঠ সন্তান এবং সেইই তাঁর পিতার উপাধির উত্তরাধিকারী ছিল’।

এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার, মুঘল ভারতে হাতে গোণা কিছু জমিদার এবং সামন্ত রাজা ছাড়া সাম্রাজ্যে কোন বংশপরম্পরার ধনী ব্যক্তি বা পরিবারের পরম্পরা গড়ে ওঠে নি। প্রত্যেক অভিজাত ছিলেন রাষ্ট্রের ভৃত্য, এবং তাদের জীবনকালে তারা তাদের জায়গির এবং প্রাপ্ত সম্পদ ভোগ করতেন মাত্র। স্বাভাবিকভাবে তাদের দেয় জমি মৃত্যুর পরে বাজেয়াপ্ত হত। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হত কেন?

বার্নিয়ে এই অবস্থাকে বর্বর এবং এর ফল বর্ণনা করেছেন এই ভাবে যে, ‘এই দেশের বর্বর এবং প্রাচীন প্রথাটি হল, যে সব অভিজাত কাজ করতে করতে মারা যান, রাজা তাদর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করেন।

‘বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিটি জমির মালিক হলেন রাজা, এখানে কোন আর্ল বা মার্কুইস বা ডাচেসদের রাজত্ব চলে না। তারা শুধু অবসরের পরে জমি বা ভাতা পান(পেনসন – জায়গির এবং তনখা)। এই সম্পদও রাজা দেন – তিনি এটির পরিমান বাড়াতেও পারেন, ছিনিয়েও নিতে পারেন তাঁর ইচ্ছে মত...হিন্দুস্তানের উমরাহকে(উমরাহদের হয় না, আমিরের বহুবচন উমরাহ – অনুবাদক, সূত্র সৈয়দ মুজতাবা আলি) জমির মালিক বলা চলে না, বা ফ্রান্সের অভিজাততান্ত্রিকদের মত তাঁরা শুধু নিজেদের ভোগের রাজস্ব আদায় করতে পারেন না। তাদের রোজগার হল রাষ্ট্রের বরাদ্দ অবসর ভাতা, যা রাজার ইচ্ছে মত তাদের দেওয়া হয় বা ইচ্ছে হলে রাজা তা কেড়েও নিতে পারেন। আর অবসরের ভাতা কেড়ে নিলে তারা প্রায় মুখাবয়বহীন প্রাণীতে পরিণত হন।
‘রাজা যেহেতু তাদের সমস্ত কিছুর উত্তরাধিকারী, কোন পরিবারই দীর্ঘকাল ধরে তাদের পারিবারিক পরিচয় বজায় রাখতে পারে না। যেমন আমীরের মৃত্যু হলে তাদের সন্তান বা প্রপৌত্র প্রায় রাস্তার ভিখারিতে পরিণত হন এবং সাধারণ সৈন্যরূপে সেনা বিহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য হয়ে পড়েন। আর রাজা তাঁর বিধবাকে হস্তমুষ্ঠিপরিমান বিধবা ভাতা দিয়ে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখেন মাত্র। আর যদি আমীরের জীবন খুব বড় হয় তাহলে তিনি তাঁর সন্তানের জন্য রাষ্ট্রের দয়া জোগাড় করতেও পারেন’।

আমরা আওরঙ্গজেবের এক পত্রে কিছু স্তবক উদ্ধার করতে পারি যেখানে সে সময়ের বাস্তব অবস্থা ফুটে উঠেছেঃ ‘আমীর খাঁ(২০ বছরের আফগানিস্তানের দেওয়ান) মারা গিয়েছেন। আমিও মারা যাব। লাহোরের দেওয়ানকে লেখ সে যেন মৃতের সম্পত্তি সুচতুর অধ্যাবসায় এবং প্রচেষ্টায় (তাঁর সম্পত্তি) রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করেন, যা যতই ক্ষুদ্র আর বৃহৎ যাই হোক, কোন কিছুই, এমনকি একটা ঘাসও যেন বাদ না পড়ে। পাড়া থেকে খবর জোগাড় কর, সর্বশক্তিমানের বান্দার যা কিছু ছিল সব কিছু নিয়ে নাও(রুকাতইআলমগিরি)’।

বাইতুলমাল নামক রাষ্ট্রের একটা দপ্তরই ছিল এই কাজ করার জন্য, বিশেষ করে অভিজাত নিঃসন্তান উত্তরাধিকারীদের সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় করণ করে নেওয়ার জন্য। আর রাষ্ট্রের যারা কর্মচারী মূলত তাদের সম্পত্তি বরামত করার দায়িত্ব ছিল এই দপ্তরের।

(চলবে)

Post a Comment