Sunday, June 5, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

সপ্তম অধ্যায়
সম্রাটের বিশেষ ক্ষমতা



তৃতীয়ত সম্রাটকে ছাড়া কারোর মাটি স্পর্শ করে তসলিম অথবা মাথায় হাত দিয়ে কুর্নিশ করার অধিকার ছিল না(এমনকি কোন সুবাদারদের পক্ষেও। তারা তাদের অধস্তনদের দিয়ে এই দুই প্রকারের অভিবাদন করাতে পারত না। এই অভিবাদনগুলি বিশদে স্টাডিজ ইন আওরংগজেব’স রেইন গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে)।
তসলিম দিল্লির রাজসভায় এক বিশেষ ধরণের অভিবাদন করার কায়দা ছিল। এটি শুরু করেন আকবর। আইনিআকবরি বলছে, ‘তসলিম নামে অভিবাদনটি হল, ডান হাতটির পিছন দিকটি মাটিতে ঠেকিয়ে সেটি তুলে নিয়ে আসা হয় যতক্ষণতা ব্যক্তিটি সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, তারপর অসম্ভব সুন্দর এবং মার্জিতভাবে তার হাতের তালুটি মাথার তালুর ওপরে স্থাপন করেন, যাতে মনে হয় তার সব কিছু তিনি সম্রাটের সামনে উজাড় করে দিচ্ছেন। ...আকবর আমাদের বলেছিলেন, এই ধরণের আভিবাদন করার পদ্ধতিটি তিনি হঠাত আবিষ্কার করেছিলেন, এবং হুমায়ুন সেই কায়দায় এতই প্রীত হন যে, তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন এটি যেন চিরকালীন রাজসভার অভবাদনরূপে গণ্য হয়’।
অন্যান্য ইসলামিক দেশে অভিবাদনের কায়দা কিন্তু আলাদা রকমের ছিল, বুকের কাছে হাত জড়ো করে মাথাটি ঝুঁকোনো। এবং বহু সময়ে সম্রাটেরা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে থাকতেন, যখন বিদেশি রাজদূতেরা(বিশেষ করে পারস্যের) আসতেন, তখন যেন সকলে তাকে পার্সি পদ্ধতিতে নয়, ভারতীয় প্রথায় তাকে অভিবাদন প্রদান করেন।
তসলিমএর বিষয়ে বলতে গিয়ে বলা যায়, ১৬৭০ সালের এপ্রিল মাসে আওরঙ্গজেব তার মুসলমান সভাসদেদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, তারা যেন নিজেদের মধ্যে তসলিম পদ্ধতিতে অভিবাদন না করেন। যখন তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলবেন, যেন পরস্পরকে শুধু বলেন সালাম আলেকুম(শান্তি বিরাজ করুক), এবং তাদের হাত মাথায় না তুলতে।
আবুল ফজল কুর্নিশকে এইভাবে বিশ্লেষণ করেনঃ
‘মহামহিম বাঁহাতটি মাথায় রেখে মাথা ঝুঁকোনোর অভিবাদন পদ্ধতিটি চালু করেন। আজকের ভাষায়, এ ধরণের অভিবাদনের নাম কুর্নিশ, অভিবাদনকারী তার মাথা তার হাতের ওপর নম্রভাবে রাখছেন, যাতে মনে হয় তিনি তার সমস্ত সত্ত্বা সম্রাটের উদ্দেশ্যে নিবেদিত করে দিচ্ছেন’।
ছুটি নেওয়ার সময়, সভায় উপস্থিতিতে, কোন মনসব পাওয়ার ক্ষেত্রে, বা জায়গিরের মত কোন সাম্মানিক পরিধেয় উপহার পাওয়ার ক্ষেত্রে, বা উপহার হিসেবে ঘোড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটে তসলিম দিতে হত; অন্যান্য ক্ষেত্রে - বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে আর উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে - মাত্র একবার।
চতুর্থ, কোন সুবাদারই তার সভায় দিল্লিতে সম্রাটের দরবারে যেভাবে গায়ক-বাদকদের ব্যবহার করা হয়, সেভাবে তাদের ইচ্ছে মত ব্যবহার করতে পারতেন না।
এ বিষয়ে আকবরের প্রথা ছিলঃ
‘সূর্য ওঠার তিন ঘন্টা আগে গায়ক-বাদিকেরা সকলে দেওয়ানি খাসে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হত। তারা সে ঘরটি গান, বাজনা আর ধর্মীয় আলাপে ভরিয়ে তুলত; যখন সকাল হতে আর চার ঘড়ি বাকি থাকত, তখন সম্রাট তার ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষের দিকে চলে যেতেন...
‘যখনই মহামহিম রাজসভায় বসতেন, পুরুষ মহিলা গায়ক বাদিকেরা ততক্ষণ অপেক্ষা করত।
‘রাজসভার গায়ক-বাদকদের সাত বিভাগে ভাগ করা হত, একএকটি দল সপ্তাহে একদিন করে তাদের হুনর দেখানোর সুযোগ পেত। যখন মহামহিম নির্দেশ দিতেন, তখন সুরের মাদকতা ছড়িয়ে পড়ত(সারা দরবারে)’।
১৬৬৭ সালে আওরঙ্গজেব রাজসভায় গান বা বাজনা নিষিদ্ধ করে দেন। তাদের সারাজীবনের জন্য ভাতা বরাদ্দ করে দেন। তিনি শুধু উপভোগ করতেন নহবত।
পঞ্চম, যাত্রা শুরুর আগে ডঙ্কা(কেটল ড্রাম) পেটানো হত।
এ প্রসঙ্গে মানুচি(স্তোরিয়া) বলছেন,
‘তিনি(আওরঙ্গজেব) তার হাল্কা ওজনের সিংহাসনটি(তখতইরাওয়াঁ) তার তাঁবু থেকে বার করলে চারিদিকে যুদ্ধের নানান বাজনা বেজে উঠত’।
যখন সম্রাট দেওয়ানিআমে আসনগ্রহণ করতেন, একটা বিশাল ডঙ্কা(দমদমা) ক্রমাগত বেজে চলত, যাতে সকলে বুঝতে পারে রাজসভা চালু হয়েছে।
তার রাজত্বের শেষের দিকে উচ্চতম কিছু অভিজাত রাজদন্ড(আলম) এবং ডঙ্কা(নাকাড়া) তাদের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাবার অনুমতি পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা রাজধানীতে বা সম্রাটের তাঁবুতে কোনভাবেই এই বাজনা বাজাতে পারতেন না, বা সুবায় তারা যখন দরবার করছেন, তখনও এই বাজনা বাজাতে পারতেন না। সাম্রাজ্যকে সেবা দেওয়ার বিশেষ অভিজ্ঞানানুসারে একজন অভিজাতমাত্রকে রাজসভা থেকে তার যুদ্ধযাত্রায় ডঙ্কা বাজাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
  (চলবে)
Post a Comment