Friday, January 26, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১১ - পশ্চিমি বিজ্ঞান কারে কয় - ক্লদ আলভারেজ

আধুনিক বিজ্ঞানের অবিনিময়যোগ্যতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সব থেকে বড়াই করা বস্তুনিষ্ঠতার দাবি, তথ্যের নিরপেক্ষতা, বিভিন্ন ধর্মের, নীতির এবং দেশের শিক্ষিত এবং যুক্তিপূর্ণ মানুষের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য বিষয়। যুক্তিপূর্ণতা, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা এবং আধুনিক শিক্ষা মানুষের জীবনে প্রশ্নাতীত এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
বিজ্ঞান ভুলে যায় সে জ্ঞানার্জন করেছে তর্ক করতে করতে, বিরোধের মধ্যে দিয়ে, সূত্রগুলির মধ্যে বিতর্ক ধরে, অথচ সে বৈজ্ঞানিক সমাজের বাইরের মানুষের বিজ্ঞান বিষয়ক যুক্তি, তত্বের অথব তার কর্মপদ্ধতির খামতি ধরানোর বিষয়ে খুব স্পর্শকাতর। বৈজ্ঞানিক স্বতঃসিদ্ধতা, পদ্ধতি এবং জ্ঞানের non-negotiabilityটাকে নিয়ে, কয়েকশ বছর ধরে অজ্ঞানী প্রচারকদের প্রচার একটি ক্ষমতার মিথ তৈরি করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে সে বেড়ে উঠে তার অনতিক্রম্য স্থানটি তৈরি করেছে।
ওপরে আমরা দেখলাম, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে আবেগ, বর্ণ, সম্প্রদায়, ভাষা, ধর্ম, এবং বহুজাতিকতা প্রাথমিক এবং পছন্দের হাতিয়ার হয়ে উঠে সবার স্বার্থে শুধু নয় সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল। এ বিষয়ে সারা বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশের উদারপন্থী, সাম্যবাদী, প্রক্রিয়াশীল, গান্ধীবাদী, রক্ষণশীল এমন কি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিজ্ঞানের একনায়কতন্ত্রের ওপর অগাধ নির্ভর্শীলতা লক্ষ্য করেছি।
আধুনিক বিজ্ঞানের আর অন্যান্য জ্ঞানচর্চার মধ্যে বৈরিতাপূর্ণ ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিষয়কে নির্ভর করে উন্নয়ন ভাবনা একটি গতিশীল(সক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক) ক্ষমতা তৈরি করে, এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের বেঁচে থাকার দৈনন্দিনতার রসদের ওপর হুমকি হিসেবে কাজ করে। পশ্চিমি বিজ্ঞানের ধারণা পরম্পরার মানুষের জ্ঞান তার প্রতিযোগী, তাই এটি তার বিরুদ্ধপক্ষ। সে যেহেতু পরম্পরার বিজ্ঞানকে নিচু চোখে দেখে, প্রাকৃতিক ধনসম্বলের ওপর জনগনের অধিকারের বিষয়েও তার শ্রদ্ধা নেই।
সবার ওপরে, উন্নয়ন বিষয়ে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের এই অত্যধিক স্বার্থনির্ভরতার জন্য উন্নয়ন নিজে ব্যক্তির অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে সংঘাতে যায়, ধ্বংস করে, এবং প্রায়ই সেগুলির গুরুত্ব গুরুতরভাবে হ্রাস করে। যে কোন একটি গণতন্ত্রে জনগনই প্রশাসক। কিন্তু জনগণ সেই কাজটি করে উঠতে পারে না, কেননা তাদের সরকার প্রায়শই সক্রিয় থাকে যাতে পশ্চিমি বিজ্ঞানের দর্শনানুসারে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনা যায়।
একবার মানুষের জ্ঞানচর্চার অধিকারের মূল্য অবমূল্যায়িত হলে, রাষ্ট্র মোটামুটি সরকারিভাবে 
পশ্চিমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নির্দিষ্ট কিছু ধারণা এবং চাহিদা অনুসারে এই অধিকারগুলি উচ্ছেদ করার 
কাজে অগ্রসর হয়।
বিজ্ঞানের প্রচার হল, সে একমাত্র প্রকৃতির বৈধ বিররণ দিতে পারে, এবং সে হাতে একটি লাঠি নিয়ে পরম্পরার বিজ্ঞানের(trans-scientific, or folk-scientific) প্রকৃতি বর্ণনাকে পিটিয়ে পিটিয়ে বিকৃত করতে শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন ‘people’s science movement’ সরকারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গঠনগুলির হয়ে এই দায়িত্বটা তারা নিজেদের কাঁধে স্বেছায় তুলে নিয়েছে এবং তারা গ্রামের তান্ত্রিক বা জাদুকরদের বর্বরতাকে আধুনিক বিজ্ঞানের বৈদ্যুতিক চিকিৎসা বা frontal lobotomies(মানসিক রোগের একটি ভুলে যাওয়া একদা ‘বৈজ্ঞানিক’ মার্কা চিকিৎসা - অনুবাদক) দ্বারা প্রতিস্থাপিত করতে সর্বদা উৎসুক।
 
(ক্রমশঃ)
উলফগাং শ্যাকস সম্পাদিত দ্য ডেভেলাপমেন্ট ডিক্সনারি, আ গাইড টু নলেজ এজ পাওয়ার থেকে

No comments: