Friday, September 15, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বাংলার শিক্ষা আর শিক্ষা ব্যবস্থা৮

ভারতের বিভিন্ন ধরণের উচ্চ পাঠশালা
২৫জুন ১৮৫৩তে(নিউ ইয়র্ক ডেলি ট্রিবিউন, ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) কার্ল মার্ক্স এশিয়াটিক ডেসপটিজম যাকে বলছেন তার অন্যতম প্রধান ভাগিদার ভারতবর্ষ (http://www.marxists.org/archive/marx/works/1853/06/25.htm)। গ্রামীণ ভারতীয়দের সম্বন্ধে তিনি বলেন...and thus brought about a brutalizing worship of nature, exhibiting its degradation in the fact that man, the sovereign of nature, fell down on his knees in adoration of Hanuman, the monkey, and Sabbala, the cow। এই মন্তব্য কতটা মানবিক; হনুমান, বাঁদর, সবলা গরু পুজক, একলাখ পাঠশালা লালন পালন করা ভারতীয় গ্রামীণদের অহংকারে আঘাত করা মন্তব্য, আমেরিকার শিল্পপুঁজি মালিকদের পত্রিকায় লিখে আজও বাহবা পেতে পারেন কী না; অন্ততঃ ছ হাজার বছরের সচল এক সভ্যতার স্রষ্টা ভারতীয় গ্রামীণদের জীবনযাত্রাকে undignified, stagnatory, and vegetative life ...passive sort of existence দেগে দিয়েও কীভাবে তিনি বিশ্বমানবতার মুক্তি সূর্যরূপে আজও পুজিত হন; সে সব উত্তরের ভার মার্ক্সদীক্ষিতপাঠকদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া গেল। কিন্তু গণতন্ত্রের অন্যতম শর্তই যদি বহুত্ববাদ হয়, তবে, মার্ক্স ভারতকে ডেসপটিক বলার ৩০ বছর আগেও ভারতের সমবায়ী গ্রামকৌম ব্যাপকতম বৈচিত্র্যপূর্ণ গ্রামীণ পাঠশালগুলো লালন পালন করে চরমতম গণতন্ত্রের সাধনা করছিল।

তখন কতরকমের পাঠশালার আস্তিত্ব ছিল, তার বর্ণনা এডামের লেখা থেকে পাওয়া যায়। শিক্ষিতমহলে আজও ধারনা রয়েছে একসময় বাঙলার মহিলারা অশিক্ষিত ছিলেন। পাঠশালে যেতেন না। এডামের তালিকায় দেখি তাঁদের জন্যও আলাদা বিদ্যালয় ছিল। মেয়েরা শুধু বাড়িতেই পাঠ নিত না, পাঠশালেও যেত। প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব পাঠশাল ছ্লি। পাঠ দেওয়াহত সে অঞ্চলের বাস্তবতা আর ভাষাভিত্তিতে।

ভারতজোড়া সেই ব্যাপকতম পাঠশালাগুলির নাম উল্লেখ করা গেল।
১।শিখ দেশি পাঠশালা – গুরমুখী
২। মুসলমান দেশি শিক্ষা ব্যবস্থা – মক্তব, মাদ্রাসা(ধর্মীয়, অধর্মীয়), কোরাণ পাঠশালা
৩। হিন্দু দেশি পাঠশালা – চাটশালা(ব্যবসায়ীদের জন্য), পাটশালা(ধর্মীয়), পাটশালা (আধা ধর্মীয়), বিভিন্নস্তরের অধর্মীয় পাঠশালা
৪। মেলানো মেশানো দেশি পাঠশালা – পারসি পাঠশালা, ভারনাকুলার পাঠশালা, এংলো-ভার্নাকুলার পাঠশালা
৫। মেয়েদের জন্য দেশি পাঠশালা – শিখ মেয়েদের জন্য, মুসলমান মেয়েদের জন্য, হিন্দু মেয়েদের বাড়িতে পড়ার জন্য
বাংলার এবং দেশের নানান প্রান্তের সমীক্ষা ভিত্তি করে এডাম দেশিয় পাঠশালাগুলোর আরও বিশদ বিভাগ তৈরি করেছেন
ক)মক্তব অথবা মাদ্রাসা – ১। বিভিন্ন স্তরের এবং নির্দিষ্ট বিষয় পড়াবার জন্য আরবি পাঠশালা(স্কুল) আর উচ্চ পাঠশালা(উচ্চতর পাঠশালা) ২। বিভিন্ন স্তরের এবং নির্দিষ্ট বিষয় পড়াবার জন্য পারসিক-আরবি পাঠশালা(স্কুল) আর উচ্চ পাঠশালা(উচ্চতর পাঠশালা) ৩। কোরাণ পাঠশালা- শুধুই কোরাণ পড়াবার জন্য ৪। পারসিক-কেরাণ পাঠশালা, ৫। কোরাণ-আরবি পাঠশালা, ৬। পার্সি-কোরাণ-আরবি পাঠশালা, ৭। পারসিক পাঠশালা, ৮। পারসি-উর্দু পাঠশালা, ৯। পারসি-উর্দু-আরবি পাঠশালা, ১০। আরবি বৈদ্য উচ্চ পাঠশালা, ১১। পার্সি-আরবি বৈদ্য উচ্চ পাঠশালা,
খ) গুরমুখী পাঠশালা – ১২। গুরমুখী পাঠশালা ১৩। গুরমুখী এবং ল্যান্ডে পাঠশালা
গ) মহাজনী পাঠশালা – ১৪। বিভিন্ন ধরনের ল্যান্ডে পাঠশালা(চাটশালা), ১৫। নাগরি ল্যান্ডে পাঠশালা, ১৬।পার্সি ল্যান্ডে পাঠশালা
ঘ) পাঠশালা- ১৭। নাগরি-সংস্কৃত পাঠশালা ১৮। সংস্কৃত ধর্মীয় পাঠশালা, ১৯। সংস্কৃত অ-ধর্মীয় পাঠশালা(বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হয়), ২০। সংস্কৃত আধা-ধর্মীয়(সেমি-সেকুলার) পাঠশালা, ২১। সংস্কৃত বৈদ্য পাঠশাশালা(চিফলি) ২২। হিন্দি সংস্কৃত পাঠশালা, ২৩। সংস্কৃত জোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষবিদ্যা পাঠশালা(চিফলি)
ঙ) মহিলাদের দেশি পাঠশালা

যে সব সংস্কৃত পুঁথি পড়ানো হত
পাঠশালের পাঠ্যর গুনমান নিয়েও মার্ক্সপন্থী পন্ডিত মহল সরব। কেউ বলছেন ভগবানের আরাধনা, কেউবা ব্রাহ্মণ্যবাদের পদধ্বনী শুনছেন। এডামের তালিকা বলছেন পাঠশালেই কবিরাজ তৈরির আলাদা পাঠ্যক্রম ছিল। মাদ্রাজ সমীক্ষায় দেখেছি বিশদ প্রযুক্তি পাঠের বর্ণনা।

শিক্ষিতরা মনে করেন ব্রিটিশরা এশিয়াটিক সোসাইটি গঠণ না করলে ভারতের ধ্রুপদী (কেন ধ্রুপদী কে জানে!) সাহিত্য অনাবিষ্কৃত থেকে যেত। ম্যাক্সিমিলিয়ন মুলর আর তাঁর মৃত প্রতিদ্বন্দ্বী উইলিয়ম জোন্স শুধু ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্য আবিষ্কারের জন্য ইংরেজ ভারতে পূজিত থেকে যাবেন। এডাম সেই পুজ্যপুজনের বন্ধ ঝাঁপিটিও খুলে দিয়েছেন বাঙলা হাটে। ভারতীয় পাঠশালেই বহু পুঁথি পড়ানো হত, যা ইওরোপিয় দর্শণে ধ্রুপদী। তার জন্য গ্রামীণদের বহু অর্থ ব্যয় করে জোন্স বা মুলরেরমত বুদ্ধিজীবি পুষতে অথবা এশিয়াটিক সোসাইটির প্রয়োজন হয় নি।

কী পড়ানো হত তার তালিকা পড়লে আজ গর্ব হয়। চোখে জল আসে কী গৌরবপূর্ণ শিক্ষা পরম্পরা হারিয়েছে ভারত। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের ব্রিটিশ পদ্ধতির(ভারত থেকেই চোলাই হয়ে যাওয়া) শিক্ষার বীজ বাঙলার মাটিতে রোপণের লালায়িত নগ্ন ইতিহাসে আজও তত্বের ঘোমটা পরিয়ে চিনির সিরা ঢালা হয়ে চলেছে। যাতে সেই ইতিহাস মার্ক্সিয়ধায়ায় ইওরোপগ্রাহ্য হয়। মধ্যবিত্ত মধ্য-ডান-বাম রাজনীতির সকলেই সেই ধংস-চক্রান্ত উত্তরাধিকারের যৌথ অংশিদার।

পাঠ্য পুস্তকগুলোকে বিনয় ঘোষ ধর্মীয় পুস্তক আর পরমেশ আচার্য বলেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদের জয়গান। পাঠশালার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আচার্যমশাই বলেছেন এতে পড়ুয়াদের মুখস্থ করার ক্ষমতা লাগত। কেননা (রাজকণ্যারমতই)পুঁথি কম পড়ত। ছাপা বই ছিল না, তাই ছাত্ররা বেশি পড়তে পারত না। পাঠ্যতে চাণক্য শ্লোক পুঁথি উল্লেখে তিনি বলছেন, ব্রাহ্মণ্যবাদের জয়গানের চতুর উপস্থাপনা। আচার্য মশাইএর বহু আগেই বিদ্যাসাগর বলেছেন পশ্চিম প্রমাণ করেছে সাংখ্য আর বেদান্ত মিথ্যা দর্শণ। বিদ্যসাগরী তত্বে টেনে টুনে সবকটি ভারতীয় দর্শণ জুড়ে দেওয়া গেলে সোনায় সোহাগা – সবই মিথ্যা ভেল।

ভারতীয় ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে রামমোহনরায়ের সময়ের বহু আগে থেকেই শিক্ষিত ভারতীয় জেনেই গিয়েছে সব জাতির শ্রেষ্ঠ (গুরু)জাতি ব্রাহ্মণেরা। যেমন স্ত্রীর গুরু স্বামী, বলছেন আচার্যমশাই। ব্রাহ্মণেরা তাই সব সময়েই ভিলেন। তিনি আরও বলছেন এই পাঠ্যক্রমে পড়ুয়াদের সমাজ সিঁড়ি বেয়ে ওঠার(সোসাল মোবিলিটি) সুযোগ থাকত না(আচার্যমশাইএর এই তত্বগুলি সশ্রদ্ধায় উল্লেখ করেছেন মার্ক্সবাদী তাত্বিক সুমিত সরকার, তনিকা সরকার, উইমেন এন্ড সোসাল রিফর্ম ইন মডার্ন ইন্ডিয়াঃ আ রিডার বইটির ১২৩ পাতায়)। এ প্রবন্ধে এ তত্বগুলো সম্বন্ধে খুব একটা কিছু বলার সুযোগ নেই। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। আর আগে না বেড়ে সোজাসুজি পাঠ্যবস্তুতে ঢুকে পড়া গেল
১।ব্যকরণ- সারস্বত, মনোরমা, চন্দ্রিকা, ভাষ্য, লঘু কৌমুদী, পাণীনি ব্যকরণ, কৌমুদী, সিদ্ধান্ত কৌমুদী, শেখর, প্রাকৃত প্রকাশ
১ক। বালবোধ, অক্ষর দীপিকা
২। শব্দার্থবিদ্যা(লেক্সিকলজি) - অমর কোষ, মালিনী কোষ, হলায়ুধ
৩। কবিতা, নাটক এবং ধর্মীয় ইতিহাস – রঘুবংশ, মহাভারত, মেঘদূত, বেণীসংহার, মাঘ, শকুন্তলা, কীরাত অর্জুণ, নৈষধ চরিত, রামায়ণ, মৃচ্ছকটিক, শ্রীমদ ভাগ্বত, কুমার সম্ভব, অন্যান্য পুরাণ
৪। রেটরিক – কাব্য দীপক, কাব্যপ্রকাশ, সাহিত্য দর্পণ, দশরূপ, কুবলয়ানন্দ
৫। অঙ্ক, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষবিদ্যা- সিদ্ধান্ত শিরেমণি নীলকান্তি, শীঘ্রবোধ, বৃহত্ জাতক, পারাশরীয়, গর্ভলগ্ন
৬। বৈদ্যবিদ্যা – শ্যামরাজ, নিঘান্ত, শুশ্রুত, শার্ঙ্গধর, চরক, ভাষ্য পরিচ্ছেদ, মাধব নিদান, ভাগবত
৭। ন্যায় – ন্যায় শ্রুত বৃত্তি, গদাধরী, ভূতপ্রতিবাদ, তর্কালঙ্কার, তারক সংগ্রহ, কারিকাবলী,
৮। বেদান্ত – আত্মবোধ শরীরক, পাঁচদশী
৯। স্মৃতি – মনুস্মৃতি, পরাশর স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক গৌতম, মীতাক্ষর
১০ দর্শণ – সাংখ্য তত্ব কৌমুদী, পতঞ্জলী ভাষ্যসহ সূত্র বৃত্তি সূত্র, সাংখ্য প্রবচণ ভাষ্য যোগ সূত্র, বেদান্ত- ভাষ্যান্তর, বৈশেষিক- সিদ্ধান্ত মুক্তাবলী সূত্রসহ ভাষ্যসহ বিবৃতি(আ কমেন্ট্রি), মীমাংসা সূত্রসহ ভাষ্য অর্থসংগ্রহ
১১। প্রসডি – শ্রুত বোধ, ভৃত্য রত্নাকর
১২। গদ্য সাহিত্য – হিতোপদেশ, দশাবতার, দশকুমার চরিত
১৩। ধর্ম(রেলিজিয়ন) – ঋগ্বেদ সংহিতা, সংবাদ – মন্ত্রভাগ, যয়ুর্বেদ, শুক্ল য়জুর, ছন্দস্য আচারিকা(বেশি পড়ানো হয় না), বাজস্নেয়ী(Vajasneyi) সংহিতা।

No comments: