Saturday, September 30, 2017

তুর্ক আফগান যুগে জরিপ ব্যবস্থা

মোটামুটি গুপ্ত যুগের তৈরি ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামো প্রায় মুঘল আমলের আগে অবদি চলেছে। গুপ্ত যুগে মানুষের ঘরবাড়ি, চাষবাস, জমি ইত্যাদির খতিয়ান তৈরি করতেন গ্রামে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী নাম পুস্তপালস। তার কর্মচরিত্র পাটোয়ারির কাজকর্মের সঙ্গে তুলনীয়। আমিনদের মত যারা জমির বিলিব্যবস্থা করতেন তার পদের নাম ছিল প্রমাতা। ন্যায়করনিক জমির সীমানা প্রদর্শন করতেন এবং জমি সংক্রান্ত বিবাদ-বিসংবাদ ফয়সালা করতেন।
সেন বংশ উচ্ছেদ করে ১২০৪/৬১১ সালে সুলতানি আমল শুরু হল। বখতিয়ার খলজি এবং তার উত্তরাধিকারীরা দেখলেন ভূমিরাজস্ব আদায় ব্যবস্থা ভেঙ্গে লাভ নেই। কর্মচারীদেরও পরিবর্তন করলেন না, শুধু পদের এবং বিষয়ের নামগুলো পরিবর্তন করে দিলেন। গ্রাম হল মৌজা। মণ্ডল হল পরগণা, বিষয়(জেলা) হল সরকার আর ভূক্তি হল সুবা। রাজস্ব কর্মচারীদের নাম হল পাটোয়ারি, মুকদ্দম, কানুনগো, কারকুন ইত্যাদি। রাজস্ব আদায়ের হারটি এক ষষ্ঠাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ এক তৃতীয়াংশ করে নিলেন।
পুরোনো কর্মচারীরাই পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন নামে রাজস্ব তুলতে লাগল। ব্রিটিশ আমলের আগে পর্যন্ত তারা দেশে রাজত্বের উত্থান পতন দেখেছেন প্রচুর, রাজশক্তিও গ্রামের পরিচালন ব্যবস্থায় কর নেওয়া ছাড়া হাতও দেয় নি। গাঁইয়ারা বলতেন রাজাগেল রাজা এল মোদের তাতে কি/ নতুন রাজা আসুন বসুন খাজনা নেবেন কি?
আলাউদ্দিন খলজি ঠিক করলেন কোন সরকারি কর্মচারীরা ধনশালী হতে পারবেন না। ফলে তিনি এমন কিছু নীতি নিলেন যাতে কর্মচারীরা দুঃস্থ হয়ে যায়। তাঁর নীতি প্রয়োগ করলেন অর্থউপমন্ত্রী সরাফ কুইয়ানি। বহু কর্মচারীকে কারারুদ্ধ করা হল, রায়তদের সামনে তাদের হেনস্থা করা হল, যে সব গ্রামে রাজস্ব আদায় হয় নি, সে সব গ্রামে কৃষকদের ওপর অত্যাচার করা হল, জমি কেড়ে নেওয়া হল, কারারুদ্ধ করা হল রায়তদের, গ্রামগুলিতে হাহাকার উঠল। কিন্তু শীঘ্র তার মৃত্যু ঘটায় ক্ষমতায় এল তুঘলকরা।
তুঘলকেরা ক্ষমতায় এসে কর্মচারীদের সম্মান ফিরিয়ে দিলেন। বাজেয়াপ্ত জমি, সম্পদ ফিরিয়ে দিলেন, এবং কৃষকদের, কর্মচারীদের মুক্ত করে আবার নতুন করে চাষে কোমর বাঁধতে বললেন। তারা বুঝেছিলেন কৃষকরাই ফসল উৎপাদন করে, রাজত্বের সম্পদের উৎস তারাই। আর কর্মচারীরাই রাষ্ট্রের কর আদায়ের মূল শৃঙ্খল। তাদের ঠিকমত দেখাশোনা না করলে রাজস্ব ঠিকমত উঠবে না। দেশের অভ্যন্তরে ফসল যাতায়াতের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কেল্লা গড়ে উঠল। কৃষি লাভজনক করতে খাল কাটা হল, সেচের ব্যবস্থা করা হল। ভূমিরাজস্বের হার উৎপন্ন ফসলের দশ শতাংশ করা হল।
রাষ্ট্র সেন-পাল-শশাঙ্ক আমলের কৃষক প্রতিপালন নীতি নতুন করে ফিরিয়ে আনল তুঘলকরা। এই নীতি অপ্রতিহতভাবে চলেছে লুঠেরা ব্রিটিশ আমলের আগে নবাবি আমল পর্যন্ত। রাষ্ট্র রাজস্ব কর্মচারী এবং রাজস্ব সংগ্রাহকদের উদ্দেশ্যে কৃষির উন্নতির জন্য লিখিত ফরমান জারি করল –
১) মাঠের উৎপন্ন ফসল দেখেই যেন খাজনা ধার্য করা হয়।
২) কোন উড়ো খবরে মোটা খাজনা ধার্য করে যেন কোন চাষীকে কষ্ট দেওয়া না হয়।
৩) খাজনা ধার্য করার সময় পাটোয়ারিরা যেন মাথায় রাখে ধার্য খাজনা যেন চাষীরা সহজে পরিশোধ করতে পারে।
৪) খুত, পাটোয়ারি, মুক্কোদ্দম, চৌধুরী, কানুনগো প্রভৃতি পদাধিকারীদের জানিয়ে দেওয়া হল, যে জমি আছে সেটার ওপর খুব বেশি রাজস্ব ধার্য না করতে, তাতে চাষীর ওপর চাপ পড়ে। ফলে তাকে পতিত জমি উদ্ধার করিয়ে চাষের জমি এবং তার ফলে রাজস্ব বাড়াবার সুযোগ করে দেওয়া দরকার।
তুঘলকদের মানবিক ফরমানে ফলে চারিদিকে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া কৃষি ব্যবস্থা চাঙ্গা হয়ে উঠল দেশে রোজগার বৃদ্ধি ঘটল। আদায় কমানোর ফলে যে পরিমান রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছিল চাষীর রোজগার বৃদ্ধির ফলে সে ঘাটতিটুকু পুষিয়ে গেল।
মহম্মদ বিন তুঘলকের দোয়াবের চাষী আর রায়তদের খুব খারাপ পরীক্ষানিরীক্ষার পর(কৃষকদের রাজস্ব বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ২০-৩০ গুণ) কৃষকেরা বিদ্রোহ করে খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়, কৃষকদের ওপর চরম অত্যাচার নেমে আসে, তারা ঘর বাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে, তাতেও তাদের রেহাই মেলে না, তাদের জঙ্গল থেকে সেনা দিয়ে বার করে এনে হত্যা/অত্যাচার করা হত।
এরপরে ফিরোজ তুঘলকে ক্ষমতায় এসে আবার রাজত্বে নতুন করে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্থিতাবস্থা আনেন। তিনি বুঝেছিলেন রাজস্বের বড় অংশটাই আসত খরাজ থেকে। ফলে চাষীর জমির খাজনা ধার্য হত ফসলের একটা অংশের ওপর। ফলে সে যতবেশি চাষ করবে ততবেশি রাষ্ট্রের রাজস্ব, চাষীরও দিতে হবে কম। তিনি কতগুলো নীতি তৈরি করেন-
১) কৃষকদের যে কোন রকম অত্যাচার থেকে বাঁচাতে হবে। দেখতে হবে কোনও রকম যেন উৎপীড়ন না হয়।
২) চাষের জমিতে সেচের প্রয়োজন আছে। সেটা রাষ্ট্রের দায়।
৩) চাষীরা হাতে যথেষ্ট উদ্বৃত্ত না থাকলে পরের বছর সে বিনিয়োগ করতে পারবে না।
৪) তার সময়ের আগে যত অতিরিক্ত কর(সেস) বসেছিল সব তুলে নেওয়ার ফরমান জারি করলেন তিনি।
৫) কৃষককে বেশি জমি চাষ করতে দিলে সে বেশি উৎপাদন করবে এবং তাতে রাষ্ট্রের রোজগার বাড়বে।
তিনি সমগ্র রাজ্যের জন্য ভূমিরাজস্ব কর্মচারী নিয়োগ করলেন। সেই কর্মচারী ছ বছর ধরে সারা সাম্রাজ্য ঘুরে জরিপ করে জমির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তৈরি করলেন। সুলতান সেই বিবরণ দেখে রাজস্বে হার কমিয়ে দিলেন। সুলতানি আমলের আগের করগুলিও বাতল হল। রাজস্ব কমে গেল ঠিকই কিন্তু রাজত্বে সুখ শান্তি ফিরে এল।
রাজ্যে পতিত জমি উদ্ধার হল, বেশি চাষও হল কেননা চাষীরা দেখল বেশি ফসল হলে সুলতান খাজনা নেন সামান্য। ফলে বেশি উৎপাদন করলে আদতে তাকে সামান্য পরিমান রাষ্ট্রকে দিতে হয়। সারা দেশে কূপ, খাল এবং সেচ ব্যবস্থা করা হল। যমুনা থেকে ১৫০ মাইল খাল কেটে খরা এলাকায় জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। হিসার শহরের পত্তন এই রাজত্বে হয়। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন কম হারে রাজস্ব আদায় করেও বেশি রাজস্ব রাষ্ট্র রোজগার করতে পারে।
এরপর তৈমুরের আক্রমনে আবার অচলাবস্থা নেমে আসে। সিকান্দর লোদিই ফার্সি ভাষায় আয় ব্যয়ের হিসেব লেখানো শুরু করলেন, তার জন্য তিনি কারকুন পদ সৃষ্টি করেন। তিনি জমির পরিমানের জন্য সিকান্দর গজ মাপের স্রষ্টা। তার আমলে গজ দড়ির পরিমান ছিল ৩২ ডিজিট(কত? জানি না)। এটা জমি মাপের একক। এই এককটা শের শাহ নিয়েছিলেন।
তুর্কি-আফগান যুগে ভারতকে কতগুলী ইকতা-য় ভাঙ্গা হয়, এটা অনেকটা মুঘলদের সুবার অনুরূপ। প্রত্যেকটি ইকতা কতগুলো সরকারে(জেলা) ভাগ করা হল। সরকারকে কতগুলো পরগণায় ভাগ করা হয়। একটি পরগণার রাজস্ব একক ছিল গ্রাম বা দেহাত।
সূত্রঃ প্রাচীন জরিপের ইতিহাস
অরুণ কুমার মজুমদার
Post a Comment