Friday, May 25, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - মেকলে, বাংলা/ভারতীয় জ্ঞান - আর কালোচামড়ার হা ইওরোপ ভজনা

ভাই-বন্ধু সুশান্ত মেকলের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্তব্য করতে বলেছিলেন - তাই লেখাটা করলাম।
যেহেতু আমরা কারিগর সংঘ থেকে ব্রিটিশপূর্ব সময় এবং কোম্পানি সাম্রাজ্যে লুঠ অত্যাচার এবং জ্ঞান প্রযুক্তি লুঠ এবং ধ্বংস আর বিশিল্পায়ন নিয়ে গবেষণা করছি, তাই মেকলে আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ছবিতে যা বলা হয়েছে মেকলে সে কথা কখোনো, কোথাও বলে নি। কেন কোন প্রেক্ষিতে প্রেক্ষিত তিনি একথা বলতে পারেন না, তা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।
এই উক্তিটি সর্বৈব মিথ্যে। কারণ ২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ সালে তিনি কলকাতায় উচ্চপদস্থ আধিকারিক – শিক্ষা প্রস্তাব(মিনিট) লিখছেন বেন্টিঙ্ককে দেবেন বলে - যতদূর সম্ভব সেদিন বেন্টিঙ্ক স্বাক্ষর করেন তার প্রস্তাবে। তিনি তখন লন্ডনে এমপি কি করে হবেন? তিনি অনেক পরে এমপি হয়েছেন এবং ম্যাক্সমূলরকে তুলেনিয়ে এসেছেন আর্যতত্ত্ব বলাতে।
মেকলে ছিলেন বাংলার শিক্ষাদপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক। সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক। টাকা রোজগার করে, দেশে ফিরে গিয়ে অন্যান্য নবোবদের মত তিনি এমপি হন। কলকাতায় চাকরি করতে করতে তার বাবাকে তিনি লিখছেন তার উদ্দেশ্য বাংলায় এসে সম্পদ সংগ্রহ করে শেষ জীবনটা সুখে কাটানো। সে সময় ২০০০০ ডলারে (যখন ১০০০ ডলারে সারা বছর লন্ডনে রাজার হালে থাকা যেত) খরচ করলে এমপি আসন পাওয়া যেত। এগুলোকে পকেট বরো বলত। এগুলো থেকে তারা পয়সা ছড়িয়ে জিতে আসতেন। নবোবদের নিয়ে একটা বই অনুবাদ করেছি। সেখানে বিশদে আছে কিভাবে এরা বাংলা লুঠের অর্থে জিততেন আর এমপি হতেন।
যে তারিখটা এখানে দেখছি, তখন তিনি ভারতে। ১৮৩৫ সালে ২ ফেব্রুয়ারি তিনি বেন্টিঙ্ককে প্রস্তাবটা দেন - ইংরেজি শিক্ষার ভাষা হোক, ব্রিটিশ পদ্ধতিতে জ্ঞানে পড়ানো হোক। যে মানুষ বলেন আমি সংস্কৃত আরবি জানি না কিন্তু তাও বলছি সামগ্রিক পূর্বের সাহিত্য আমার বাড়ির একটা তাকই যথেষ্ট এবং আমাকে কালো চামড়ার সাহেব বানাতে হবে যারা স্বপ্নে ইওরোপ দেখবে ভজবে - তিনি এদেশের মানুষ সম্বন্ধে এই চগবিতে বলা মন্তব্য করবেন তা অবিশ্বাস্য। আর ২ ফেব্রুয়ারি তিনি কলকাতায় অশ্লীল মিনিট লিখছেন। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে থাকবেন কোথায়? এটা সর্বৈব মিথ্যাচার। এই সূত্রটা দাবি করছি - কোথা থেকে ওরা এই উক্তিটা পেলেন তারা জানান।
এদেশের মানুষ অশিক্ষিত - ততদিনে তা সাম্রাজ্য-বন্ধু আর আললদের তাত্ত্বিক রামমোহন রায় আর দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেষ্টায় মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত সত্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। রামমোহন কম্বুকণ্ঠে বলে দিয়েছেন ভারতের উন্নতি করতে গেলে পশ্চিমি জ্ঞান আমাদের নিতেই হবে। হায় তার আশেপাশের সময়েই রামমোহনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু উইলিয়াম এডাম সমীক্ষা করে বাংলা-বিহারে একলক্ষ পাঠশালার(১৯টা মেয়েদের বিদ্যালয়) যে বিদ্যালয়ে পড়ে মাত্র ১৫% উচ্চবর্ণ, সেগুলোর কথা বলবেন আর চার্লস উইশ দক্ষিণ ভারতে মাধবের কলনবিদ্যা পাঠদান দেখবেন এবং বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকায় লিখবেন। লন্ডনে তখন ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া ক্রুসিবল স্টিল নিয়ে গিয়ে গবেষণা হচ্ছে - কেন জং পড়ে না। রেনেল মুঘল জ্ঞান অবলম্বন করে লুঠের জন্যে মানচিত্র তৈরি করছেন, যা আগামী দিনে ইওরোপের জ্ঞান বলে পরিচিত হবে। লন্ডনে হাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেন ব্রিটিশ হালে বেশি উতপাদন হয় না তা বুঝতে। পূর্বের ভারতের জেলাগুলোর হাল নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তাঁত নিয়ে গিয়ে অকাজের কাপড় বোনা মেসিনের অদলবদল হচ্ছে। দুশ বছর আগে ম্যাটিও রিশি এসে অঙ্ক - কলনবিদ্যা শিখে গ্যাছেন পঞ্জিকা সংস্কারে। ইওরোপিয়রা ভারত খুঁজতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চলে যাচ্ছেন, আমেরিকা আবিষ্কার করে ফেলছেন, টিপু সুলতানের হাউইতে(রকেটে)এর আঘাতে হারতে হারতে সেই হাউই উলরিচে নিয়ে গিয়ে গবেষণা করে নেপোলিয়ানকে যুদ্ধে হারিয়ে দিলেন। বাংলায় টিকা দেওয়া হয় জেনারের আগে। চোখ অপারেশন, রাইনোপ্লাস্টি জলভাত। ১৭০০ সালের অনেক পরে মানমন্দির হয়েছে যার মর্ম উদ্ধার করতে ব্রিটিশদের জান কয়লা হয়ে গ্যাছে। এরকম হাজারো জ্ঞান লুঠের কথা বলা যায়। ইওরোপিয়দের কি জ্ঞানের পরিধি! ততদিনে পলাশীর লুঠ, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বিশিল্পায়ন সব হয়ে গ্যাছে, তারপরেও বাংলায় ১ লক্ষ বিদ্যালয়। ১৮০০ পর্যন্ত ব্রিটেনে সার্বজনীন শিক্ষাই ছিল না।
তো প্রেক্ষিত না জেনে, নিজেদের দেশের জ্ঞানচর্চা সম্বন্ধে না জেনে নবজাগরণের মাথারা পশ্চিমের নতুন জ্ঞানার্জনের জন্যে উদ্বেল হয়ে উঠছেন। তিনি যে চেয়েছেন যে কালো চামড়ারা সারাক্ষণ হা ইওরোপ হা ইওরোপ করবে, সে দিকে শিক্ষিত বাংলা খুব তাড়াতাড়ি এগোচ্ছে।
তাই যে মিনিটটির(প্রাস্তাবনা) সূত্র দিলাম সেটা মন দিয়ে পড়ুন। তার উদ্দেশ্য বিধেয় সব পরিষ্কার হবে। বিদ্যাসাগর থেকে বিনয় ঘোষ থেকে আজ পর্যন্ত একজনও এই প্রস্তাবনাকে নিন্দা করেন নি। সক্কলে মাথা নামিয়ে মেনে নিয়েছেন। বরং প্রগতিশীল বলেছেন।
আমরা সে সময়ের মেকলে যতকিছু বলতে পারেন সব খুঁজেছি। উনি লন্ডনে গিয়ে এম্পি হওয়ার পর সব বক্তৃতা পড়েছি, কোথাও তিনি এই কথা বলেন নি। তার মত মানুষ বলতে পারেন না - তাহলে তার সাম্রাজ্য সাধনা বৃথা হয়ে যায়।
গোটাটা সঙ্ঘ পরিবারের চালাকি। তারা মূলত ইওরোপিয় ধারণায় চলে। যদিও সামনে ইওরোপকে গালাগালি করে। জাতি রাষ্ট্র তাদের মৌলিক তত্ত্ব। ফলে তারা এসব করে কি যে আনন্দ পায় কে জানে। তাতে আমরা যারা বাংলা তথা ভারতের জ্ঞান দক্ষতা ইত্যাদি খোঁজার কাজে থাকি তাদের কাজে প্রশ্ন উঠে যায়।
ওনার প্রস্তাবনার - মিনিটের লিঙ্কটা রইল। সঙ্গে কলনবিদ্যা লিয়ে একটা লিঙ্ক রইল
http://www.columbia.edu/.../txt_minute_education_1835.html
https://www.facebook.com/biswendu.nanda/posts/10214933605564512
Post a Comment