Thursday, May 3, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৯৭ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

মহিলাদের পরিচ্ছেদ এবং ইওরোপিয় ধারণায় শালীনতা
মিশনারিদের নাদারদের ধর্মান্তরকরণের পাশাপাশি আরেকটি উদ্যম ছিল, সেটি হল হিদেনদের তৈরি এই ঘৃণিত জাত ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার। তারা মনে করল এই কাজটি করতে পারলে নাদারেরা রাজ্যের রাজার অধীনে থেকেও নিজেদের আলাদা সমাজ তৈরি করতে পারবে, চ্যাপেলে, বিদ্যালয়ে, চার্চে ইত্যাদিতে যেতে পারবে এবং নিজেদের অবস্থা উন্নত করে সমাজে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে পারবে। যেহেতু কোম্পানির ক্ষমতা দিনের পর দিন বাড়ছিল তাই সাধুরা কোম্পানির রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে রাজা আর তাঁর পরামর্শদাতাদের প্রভাবিত করতে শুরু করে। সাধারণত রাজার আমলারা মূলত নায়ার আর নাম্বুদ্রি প্রবার থেকে আসা। তাদের কাজে লাগিয়ে নাদারদের উঁচু জাতের মর্যাদা দাবি করল পাদ্রিরা।
সাধুদের স্ত্রীরা জ্যাকেট ডিজাইন করে তৈরি করিয়ে সেগুলি শ্লীল পরিধেয় হিসেবে খ্রিষ্ট মহলাদের কাছে বিক্রি করছিলেন। কিন্তু নাদার মহিলারা নায়ারদের মত বক্ষাবরণী পরতেই পছন্দ করছিল। ১৮২০ সালে বাজারে এবং জনসমক্ষে বেশ কয়েকটি ঘটনায় নাদার মহিলাদের কিছু ব্যক্তি আক্রমন করে তাদের বক্ষাবরণী খুলে দেয় এবং শ্লীলতাহানি করে এবং মারধোরও করে। চ্যাপেল আর বিদ্যালয়েও আগুণ ধরয়ে দেওয়া হয়। ১৮২৮ সালে হিংসা রুখতে প্রসাসন নাদার মহিলাদের নায়ারদের বক্ষাবরণী পরা বারণ করে খ্রিষ্টদের মপ্ত জ্যাকেট পরার নির্দেশ জারি করে। রাজা বললেন নাদার মহিলাদের অন্যান্য নিচু জাতের মতই উচ্চবর্ণের বেগার খাটতে হবে এবং রাজ্যের প্রথা অনুযায়ী নাদারদের ধর্মান্তরকরণের আগে যা করত তাইই করতে হবে।
১৮৫৯ সালে ত্রিভাঙ্কুরে আবার গণ্ডগোল শুরু হল। ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জেনারেল কালিন মাদ্রাজ সরকারকে লিখলেন, শানার মহিলারা শূদ্র(নায়ার)দের মত কাপড় পরায় এলাকায় এলাকায় হিংসা ছড়িয়ে পড়ছে। কালেন ব্যাখ্যা করে বললেন বহু নায়ার ইংলন্ডের রানীর ১৮৫৮ সালের নির্দেশিকাকে ভুল বুঝে মনে করছে তারা সরাসরি ব্রিটেনের অধীনে চলে এসেছে। তার সনদে তিনি বলেছিলেন আমাদের মতই, আমাদের দেশিয় রাজাদের অধিকার সম্মান এবং গৌরব রক্ষা করতে হবে এবং আরও বললেন আইন তৈরি করতে হবে এবং সেগুলি যথেষ্ট সম্মান দিয়ে রক্ষাও করতে হবে এবং ভারতীয় প্রথা নীতি অনুযায়ী প্রাচীন অধিকার রক্ষা করতে হবে। এই সনদ বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নায়ার এবং আমলারা মনে করল এই সনদের দ্বারা জাতি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার তাদের সব ধরণের বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাই নয় আগের যত প্রথা ছিল সব উঠে যাবে।
যদিও কালেন ভাবছিলেন তিনি রাজাকে বলে নায়ারদের মত কাপড় পরা বন্ধ করার নির্দেশ দেবেন নাদার এবং অন্যান্য নিচু জাতের মহিলাদের, ওদিকে আবার মাদ্রাজ সরকার ইংলন্ড এবং ভারতের মিশনারিদের চাপে পড়ে কালেনকে বললেন আমরা যদি ত্রিভাঙ্কুরের রাজার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিতে পারি তাহলে গোটা সভ্য জগত আমাদের ক্ষমা করবে না।
মাদ্রাজ সরকারের চাপের কাছে পুরোপুরি মাথা নত করলেন না মহারাজা শুধু বললেন আগে শানার মহিলাদের ওপর যে ধরণের বর্বর আচরণ করা হয়েছে সেটার শেষ দেখতে হবে। ১৮৫৯ সালেরর ২৬ জুলাইএর সনদে তিনি বললেন নাদার ধর্মপরিবর্তনকারী মহিলাদের যে সুবিধে দেওয়া হয়েছে সেই সুবিধে সব ধরনের নাদার মহিলাকে দেওয়ার আইন হল, যাতে তার কোন প্রজা অখুশি না থাকে, সক্কলে খ্রিষ্ট নাদারদের মত জ্যাকেট পরবে, প্রত্যেকে মোটা সুতির কাপড় পরবে এবং নিচু জাতের জেলে মাক্কাভাট্টিগাল জাতের মহিলারা শরীর ঢেকে ঊর্ধাংশ জড়িয়ে কাপড় পরেন তারাও সেরকম কাপড় পরতে পারবেন তবে উচ্চজাতির কাপড় পরার আঙ্গিক নকল করা যাবে না। এই অধিকার ছড়িয়ে দেওয়া হল ইরাভার এবং অন্যান্য ছোট জাত যারা খুব তাড়াতাড়ি খ্রিষ্টধর্মান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

মিশনারিরা এই সমাধানে খুশি হল না। তারা একে প্রতিক্রিয়াশীল আইন বলল। লন্ডন মিশন সোসাইটির রেভারেন্ড স্যামুয়েল মাটির লিখলেন ত্রিভাঙ্কুরে খ্রিষ্ট প্রোটেস্টান্ট মহিলারা সমাজে উচ্চ সম্মান লাভ করেন। তারা শিক্ষিত এবং শুদ্ধ, তারা যে লেস তৈরি করে তা এতই উচ্চমানের যে নানান প্রতিযোগিতায় তারা মেডেলও পেয়েছেন। তবু তাদের মোটা কাপড় পরতে বাধ্য করা হয়, যা স্তনের ওপর বাঁধা হয় এবং হাত আর কাঁধ গোটাটা উন্মুক্ত থাকে – শালীন নয়। আদতে এটা জেলে মহিলাদের পোষাক, যাদের নাদারেরা নিচু জাত হিসেবে দেখে। মাটির বললেন কাপড় নিয়ে আইন করা আদতে সভ্যতার অগ্রগতির বিরোধী আর হাতে বোনা মোটা কাপড় পরতে বাধ্য করা একটি আত্মঘাতী নীতি যা ব্যবসা বাণিজ্যকে ধ্বংস করবে।   
Post a Comment