Friday, May 4, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১০২ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পোষাক
১৯০৮। গান্ধী তখন দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন থেকেই তিনি চরকা কাটা আর তাঁত চালানোকে গরীবি দূর করার প্রধান উপায় বলতে শুরু করে দিয়েছেন(বেশ কয়েক দশক পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন, এই তত্ত্বটি ভাবার আগে তিনি কিন্তু একটাও চরকা দেখেন নি)। ১৯১৬ সালে ভারতে ফিরে তিনি এক দল আনুগামী নিয়ে একটি আশ্রম খুলে তার তত্ত্ব প্রচার করতে লাগলেন। উৎসাহিত অনুগামীদের প্রথম কাজ হল চরকা খুঁজে তার তত্ব অনুযায়ী সুতো কেটে শুধু বিদেশি বস্ত্র বর্জন নয় নিজে থেকে নিজের হাতে সুতোয় কাটা এবং বোনা কাপড় পরা শুরু করা – তখনও চরকা তারা পান নি। তাই গান্ধী প্রথমে ভারতীয় মিলে তৈরি সুতোয় কাপড় বুনতে বললেন। ১৯১৭ কি ১৯১৮ সালে প্রথম চরকা বরোদায় দেখলেন তাঁর অনুগামী গঙ্গাবহন মজুমদার, এবং তিনি কিছু চরকা কাটনিকে সুতো কেটে আশ্রমের জন্যে কাপড় তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। সিদ্ধান্ত হল পরের দফা হবে নিজেদের জন্যে আশ্রমে কাপড় তৈরি করা। প্রথম কাপড়টা হল ৩০ ইঞ্চি চওড়া এবং এতই সরু যে ধুতি হিসেবে পরার উপযুক্ত নয়। প্রতি গজের খরচ পড়েছিল ১৭ আনা, সে যুগের জন্যে বেশ দামি। শেষ পর্যন্ত গঙ্গাবাহন একটা মোটা খসখসে কাপড় তৈরি করতে সক্ষম হল এবং প্রথমটাই গান্ধীকে পরতে হল।
আমি আজও বহুখুঁজে পাইনি গান্ধী কখন আর কিভাবে কংগ্রেসের পোষাক তৈরি করলেন। তবে এটা ১৯১৮ থেকে ১৯২০র মধ্যের কোন একটা সময়। ১৯২০-২১এর অসহযোগ আন্দোলনে কিন্তু গান্ধী টুপির চল শুরু হয়ে গেছে এবং কংগ্রেসে চিহ্ন হিসেবে এটি প্রায় প্রতিষ্ঠিত। ১৯২১এর মার্চে গান্ধী শুনলেন কিছু ইওরোপিয় দপ্তরে খাদি টুপি পরা নিষিদ্ধ হচ্ছে। গান্ধী লিখলেন রাবণের রাজত্বে বাড়িতে বিষ্ণুর ছবি রাখা গুনাহ ছিল, আজ মনে হচ্ছে, এই রাবণ রাজে, বিদেশি কাপড় বাদ দিয়ে নিজে সুতো কেটে টুপি বানিয়ে পরাটা একই ধরণের বৈপ্লবিক হবে কি না।
এক মাস পরে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কালেক্টর সরকারি দপ্তরের কর্মীদের দাসা হাল্কা সুন্দর নিরীহ গান্ধী টুপিটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন। কয়েক মাস পরে সিমলায় তৈরি সরকারি চাকরির শর্তের ফরমানে বলা হল গান্ধী টুপি পরলে চাকরি যাওয়ার সুযোগ প্রবল। গুজরাটে এক আইনজীবিকে ২০০ টাকা জরিমানা করে তাকে আদালত চত্ত্বরের বাইরে টুপি পরার নির্দেশ দেওয়া হল, টুপি পরে কয়েক ঘন্টার পরে আবার ফিরে এলে আদালত তাকে দুশ টাকা জিরিমানা করে। এই সব ঘটনায় গান্ধীর পক্ষে প্রচার তুমুলভাবে চলতে লাগল। এক ব্রিটিশ সওদাগরি দপ্তরে যুবা কেরাণীকে টুপি পরার দায়ে বরখাস্ত করা হলে মালিক পক্ষ বলল, এটা সাধারণ চাকরি যাওয়ার ঘটনা, পাজি ভারতীয়রা এতে রাজনৈতিক রঙ লাগাচ্ছে। ব্রিটিশেরা টুপিকে বিদ্রোহ বলে মনে করতে লাগল। ব্রিটিশকে দুমড়ে মুচড়ে দিতে তিনি সারা ভারতকে এই টুপি পরতে আহ্বান জানালেন। গান্ধী বললেন ব্রিটিশেরা অসহযোগের সঙ্গে টুপি পরাকে গুলিয়ে ফেলছে। ব্রিটিশ এত সাধারণ স্বদেশির চিহ্ন দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, তিনি যদি এবারে সরকারের করণিকদের চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন তাহলে ব্রিটিশেরা কোথায় যাবে?

বম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি তার অধীনে থাকা সব বিচারপতিকে লিখলেন তারা যেন উকিলদের আদালতে গান্ধী টুপি পরতে নিষেধ করেন। তারা যদি এই সাবধানবানী না শুনে টুপি পরা চালিয়ে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হোক। তিনি লিখলেন শুধু পাগড়টি ছাড়া কেউই মাথায় কোন কিছুই আচ্ছাদন দেবেন না। গান্ধী লিখলেন গান্ধী টুপি বিক্রির জন্যে একজন ব্রিটিশ একজন মুসলমানকে গুলি করে হত্যা করেছে। 
Post a Comment