Tuesday, May 1, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৮৭ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

ওয়িয়েন্টালাইজিং ইন্ডিয়া

নতুন ভাবে সেনাদের শ্রেণী বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ সেনার পরিধেয়তেও পরিবর্তন এল। উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ইওরোপিয় এবং ভারতীয় সেনার একই পরিচ্ছদ হল খাকি প্যান্ট আর জামা, আর ঠাণ্ডার দিনে জ্যাকেট। ভারতীয়দের দেশিয় পাগড়ি দেওয়া হল। শিখদের পাগড়ির কথা আগেই আলোচনা করেছি, অন্যান্য জাতিদের নিজেদের রঙ বাছাই করে পরম্পরার পাগড়ি পরতে দেওয়া হল। ১৮১৫-১৫র গুর্খা যুদ্ধের পর আবার নতুন করে গুর্খাদের সেনায় নেওয়া হতে শুরু করে। তাদের ইওরোপিয় ভঙ্গীর পোষাক দেওয়া হল, যেটা তারা আজও ভারতীয় এবং ব্রিটিশ উভয় সেনা চাকরিতে পরে। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে চোখ টানা মাথায় কিলমারনক টুপি, টুপির সামনে একটি চিহ্ন এবং ব্রিমলেস পিলবক্স দেওয়া হল। বক্সার যুদ্ধের সেবার জন্যে ব্রড-ব্রিমড ফেল্ট হ্যাট হ্যাট দেওয়া হল, যেটি তার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আস্ট্রেলিয় ভঙ্গীতে একদিকে ঝুঁকিয়ে পরত। তাদের পরিধেয় হয় গভীর নীল বা সবুজ।
গুর্খাদের হ্যান্ডবুক লেখা ভ্যান্সিস্টার্ট বলছেন গুর্খারা পাগড়ি পরতে ঘেন্না বোধ করত, কেননা তার পাগড়িকে সমতলের মানুষের পরিধেয় হিসেবে দেখত। ভ্যান্সিস্টার্ট গুর্খাদের স্তুতি করে বলছেন... গুর্খারা খেলাধুলায় দক্ষ, চটপটে, বন্দুক চালাতে পারে, মাছ ধরতে দক্ষ...ধৃষ্ট, ধৈর্যশীল, বিশ্বাসী, অকপট, স্বাধীন, এবং স্বনির্ভর ... তারা ব্রিটিশদের শক্তশালী, সাহসী এবং উচ্চ জ্ঞান দেখেই তাদের সঙ্গে সখ্য পাতিয়েছে এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের পরিধেয়ও মেলে। গুর্খাদের কোমোরে বাঁধা পরম্পরার হাতিয়ার কুকরি, কুড়ি ইঞ্চি বেঁকা ছুরি, যেটা তাদের সম্প্রদায়ের কৌম পরিচয় চিহ্নও বটে।
ব্রিটিশেরা প্রাচ্যের যোদ্ধাদের পোষাক কেমন দেখতে হবে, সেই স্বপ্নভাবনা দিয়েই সেনাবাহিনীর পোষাক তৈরির খেলায় মাতল সাম্রাজ্যের কর্মকর্তারা।  উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে ক্যাভালরি ইউনিটটি সব থেকে রঙ্গিন পোষাক পেল। এর আগেই দেখেছি সিপাহি যুদ্ধের সময় ব্রিটিশেরা কোমরবন্ধ আর পাগড়ির প্রচলন করে। তাদের উইকার(বেত) শিরস্ত্রানে লিনেন আবরণ এল। কিছু ব্রিটিশ মাথাজোড়া পাগড়ি পরতে শুরু করে দিলেন কারণ পাগড়ির একটি সুরক্ষা চরিত্র আছে। একটি সম্পূর্ণ পাগড়ির কাপড় ৩০ থেকে ৪০ ফুট হয়। সেটি দিয়ে গোটা মাথা বার বার পেঁচিয়ে কান ঢাকতে হয়। এইভাবে বিপক্ষের তরবারির আঘাত থেকে অনেক সময় রক্ষা পাওয়া যায়। বেঙ্গল আর্মির কমাণ্ডার হারসে এমন একটি পরিবার থেকে এসেছিলেন যাদের বুংশপরম্পরায় সেনাবাহিনীতে অফিসারগিরি করার পরম্পরা আছে, বহু ব্রিটিশ তাকে ভারতীয়ই রক্তই ভাবতেন। হারসের একটি লম্বা বুটিদার জরির পোষাক পরিধান করে হাতে একটি তরবারি ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি আছে। তিনি কি তার শত্রুর বস্ত্র পরিধান করে তাদের শক্তি নিজের ওপরে নিতে চাইছেন?
উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ইওরোপিয় আর ভারতীয়দের পরিধেয় পরিবর্তন একটা মৌলিক ধারনামূলক পরিবর্তনের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত করে। বিপ্লব উদ্ভুত ফল হল ব্রিটিশ আর ভারতীয়দের মধ্যে যে বিভেদ ছিল তাকে আরও অনমনীয় করে তোলা। উনবিংশ শতকের প্রথমপাদে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের চোখে ছিল উদ্ভ্রান্ত দিগভ্রান্ত বালক। ১৭৫৭-৫৯এর ঘটনায় সেটা বিশ্বাসঘাতকতায় পরিণত হল এবং ব্রিটিশেরা বিশ্বাস করল এদের আর পরিবর্তন করা যাবে না। ওপরে ওপরে হয়ত সে সাহেবের কথায় সায় দিচ্ছে, কিন্তু তাদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে কোন সময় তাদের গভীরে বাসা বাঁধা কুসংস্কার অযৌক্তিক হিংসাত্মকভাবে ফেটে পড়বে এবং বিজেতারা তাদের যে দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, তারা সেদিকে না গিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে। সম্ভাব্য পরিবর্তন করার ভাবনায় যে সব নীতি নেওয়া হয়েছিল সব ব্যর্থ হল। এখন প্রয়োজন লৌহমুষ্ঠিতে রাষ্ট্রদোহ বা বিশ্বাসাঘাতকতাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করা। এখন থেকে ব্রিটিশেরা শাসন করবে প্রাচ্যের প্রজাদের সাসনের দৃষ্টিভঙ্গীতে, ক্ষমতা প্রয়োগ করে আর আত্মনিবেদন আশাকরে।
এই কারণে ভারতীয়দের পোষাক পরিচ্ছেদে আরও ভারতীয় লাগতে হবে; ব্রিটিশ যাদের ভরসা করে তাদের গড়ে তুলে তাদের ভারত রক্ষার ভার দেওয়া হবে। ফলে প্রয়োজন হল সেনাদের আরও ভারতীয় করে গড়ে তোলা, কিভাবে মুঘল সেনা পরিধেয় পরত – সেই গবেষনা করে, সেই পরিধেয়গুলো সম্ভব হলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হল। প্রাচ্যদের আরেকটি অবশ্যম্ভাবী চরিত্র বেছে নেওয়া হল সেটা হল ভদ্রদের বিভিন্ন উতসবে রংচঙে কাপড় পরে সেজে উঠে দেখনদারির মনোভাব নিয়ে যোগ দেওয়া। তারা মনে করল ভারতীয়রা বড্ড নাটুকে এবং উৎসব নির্ভর। ফলে প্রচুর পরম্পরার উতসবের পরিকল্পনা করা হল যেগুলোয় ভারতীয়দের পরম্পরার বস্ত্র পরিধান করিয়ে অংশ নেওয়ানো যাবে। ফলে এর পর  থেকে প্রধান আর তার সাথীরা উজ্জ্বল রঙের কাপড় পরে উতসবে যোগদান করবে – যতই তার মন খারাপ হোক। এই তত্ত্বের প্রথম পরীক্ষা আর প্রয়োগটি হল ১৮৭৬ সালে যখন প্রিন্স অব ওয়েলস ভারতে ঘুরতে এলেন।

Post a Comment