Friday, November 25, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৫। বীজাপুর গোলকুণ্ডার কর্ণাটক ভাগাভাগি চুক্তি
কর্ণাটক দখলের দুই দক্ষিণী সুলতানি রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে, আহমদনগর দখলের পর প্রায় পঁচিশ বছর ধরে মুঘল পাদসাহ শাহজাহান দাক্ষিণাত্য বিজয়ের দীর্ঘস্থায়ী একটা অশুভ খেলা খেলতে থাকেন। এই বিজয় মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক বলে করতে হয় নি, বরং দুই সুলতানি রাজ্যের মধ্যে যে কূটনৈতিক লড়াই চলছিল, তাকে ব্যবহার করে মুঘলেরা চতুরতায় কাজটি হাসিল করে। এটি ঘটতে পেরেছিল অনেকটা ইনকিয়াদনামা(আত্মসমর্পণের ইচ্ছে) বা আহদনামা বা তা’হাহুদনামা(চুক্তি)র জন্য আর ১৬৩৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে হওয়া সীমান্ত চুক্তি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভয় দেখানোর রণনীতি আর দুই সুলতানি রাজ্যের মোঘল সাম্রাজ্য সম্বন্ধে অযথা ভয়ের পরিবেশ তেরি হয়ে যাওয়ার জন্য। দুটি রাজ্যের বৈদেশিক নীতি তৈরি হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণে এবং ঠিক সেই জন্যই দুটি রাজত্বের স্বাধীনতা পরাধীনতায় পরিণত হল। অন্য ভাষায় বলতে গেলে, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রীয় নীতির মদতে তারা আরও বড় রাজ্য জয়ের পথে যেতে পারল না বলেই তাঁদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হল। কর্ণাটকে সীমান্ত নীতির ফলে তারা উত্তরের দিকে রাজত্ব জয়ের অভিযানে যেতে পারল না, তাঁদের অভিযানগুলি দক্ষিণের দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য হল, যার জন্য তাঁদের রয়াল আর তাঁর নায়কদের লড়াইয়ের মাঝে পড়ে বিজয়নগর দখল করতে হল।

গোলকুণ্ডা এবং বীজাপুরকে পুর্ব এবং পশ্চিম কর্ণাটক দখলের নীতি প্রণয়নে মুঘলেরা যে প্ররোচনা দিয়েছিল, তার হাজারো পরোক্ষ সূত্র ছড়িয়ে রয়েছে সে সময়ের মুঘল ইতিহাস আর নথিতে। যদিও সরাসরি মুঘল সূত্র এই তত্ত্ব স্বীকার করে না। কর্ণাটকীয় আগ্রাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন তেলুগু নথিতে মুঘল সম্রাট বলতে শাহজাহানকে না তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে দাক্ষিণাত্যে মুঘল সুবাদার আলমগিরকে বোঝানো হয়েছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। কিন্তু গাণ্ডিকোটা কৈফিয়িত নামক নথিতে পাচ্ছি, মুঘল সম্রাটের সরাসরি প্ররোচনায় গোলকুণ্ডা কর্ণাটক জয়ে উৎসাহিত হয়ে, ‘পাদশার উজির মীর জুমলা, আলমগীরের পক্ষে দক্ষিণে আসেন...’। মুঘল হস্তক্ষেপের একটা লেখর প্রমান রয়েছে। গুটি তালুকে উদ্ধার হওয়া তাম্র প্রশস্তিতে পাওয়া যাচ্ছে, পাদশা(পাচ্চায়ি)র হয়ে গোলকুণ্ডা কর্ণাটক এবং গুটি দখল করে।

কুতুবশাহী আক্রমন সংক্রান্ত নথিপত্রেও একই তত্ত্ব সমর্থনের তথ্য পাচ্ছি অর্থাৎ নীতি নির্ধারণে মুঘল সাম্রাজ্যের লুকোনো হাতের অস্তিত্ব, যাদের প্ররোচনায় সুলতান তাঁর সৈন্য নিয়ে কর্ণাটক আক্রমন করেন। পাদশাহ শাহজাহানকে লেখা আবদুল্লা কুতুব শাহ এক চক্রান্ত-পত্রেও এ ধরণের ধারনার প্রমান পাওয়া যায়,

১) কর্ণাটক রাজ্য থেকে লুঠ করা সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ সম্রাটকে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়;

২) রয়াল এবং তাঁর নায়কদের মধ্যে বিভেদ ঘটিয়ে যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হবে, সে সময়ে পাদশাহের একজন আধিকারিক থাকবেন ঠিক হয়;

এরই সঙ্গে শাহজাদা দারার কাছে কুতুব শাহ, নিজেকে তাঁর আজন্ম শিষ্য(মুরিদ) হিসেবে উল্লেখ করে আর্জি পেশ করে (আর্জদস্ত) অনুরোধ করেন দাক্ষিণাত্যের গণ্ডগোলে তিনি যেন মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন।

অন্য দিকে এই তত্ত্বের পক্ষে সরাসরি সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে ডাচেদের পক্ষ থেকে; ডাচ সূত্রে জানা যাচ্ছে, কর্ণাটক ‘আক্রমন করে, সেটিকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা’ করে নেওয়ার ‘নির্দেশ’ দুই সুলতানকে দিয়েছিল মুঘলেরা।
যখন সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে, দুই সুলতানের একের পর এক আক্রমনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে কর্ণাটকের রয়াল রাজ্য, সে সময় পরস্পর সুলতানের বিরুদ্ধতা কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন রয়াল। এক সুলতানের সেনার পক্ষ নিয়ে অন্য সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাজে লাগাতে রয়াল একজনকে অর্থ, হাতি আর অন্যান্য উপঢৌকন দিয়ে বশ করে। এটা খুব কঠিন কাজ ছিল না, কেননা সেই দুই সুলতানের পরস্পরের মধ্যে গভীর ঈর্ষা আর অবিশ্বাসের বাতাবরণকে কাজে লাগানো হয়েছিলমাত্র। ফলে ইসলামিক আগ্রাসনের প্রাবল্যের গতি কিছুটা হলেও কমে গিয়েছিল সেই পদক্ষেপে।

শনৈ শনৈ দুই সুলতানের কাছে এই তথ্য পরিষ্কার হয়ে গেল যে দুজনের মিলিত আক্রমনের উদ্যোগ ছাড়া কর্ণাটক বিজয় সম্পন্ন হবে না, এবং অবিশ্বাসীর গাছটি(ট্রি অব দ্য ইনফিদেল)র শেকড় উপড়ে ফেলা যাবে না। আদিল শাহ বুঝতে পারলেন, ‘কুতুব শাহের সাহায্য ছাড়া রয়াল বিরুদ্ধে সফলভাবে যুদ্ধ করে জেতা যাবে না; ফলে তিনি কর্ণাটক দ্বিখণ্ডী করণের কুতুব শাহী প্রস্তাব মেনে নিয়ে রয়াল এবং অন্যান্য জমিদারের বিরুদ্ধে ধ্বংসক্রিয়ায় তাকে সামিল করে নিলেন’। ১৬৪৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে দুই সুলতান ঠিক করলেন হিন্দু কর্ণাটকের রাজা শ্রী রঙ্গ’র রয়ালের রাজ্য, যুদ্ধের সামগ্রী, পণ্য, সোনাদানারত্নরাজি এবং নগদ অর্থ আলোচয়া সাপেক্ষে বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে, যার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ পাবেন আদিল শাহ আর এক তৃতীয়াংশ পাবেন কুতুব শাহ।

সেই সময়ে এই সীমান্ত এবং রাজ্যভাগ চুক্তি দুই সুলতানি রাজ্যের পক্ষে খুবই সুখকর ঠেকল। বিজিত আদিল শাহী উজির নবাব মুস্তাফা খান কানাড়ি দেশ এবং কুতুব শাহী উজির মীর জুমলা পূর্ব কর্ণাটকের দিকে এগোতে থাকলেন। ১৬৬৪এর জুন মাসে বিজাপুরী সেনাধ্যক্ষ, মুলুন্দের দিকে এগোলেন। ব্যাঙ্গালোর জেলায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হল মাদুরা, তাঞ্জোর আর জিঞ্জি ইত্যাদির নায়েক, দেশাই এবং আরও অন্যান্যদের। সেখান থেকে তারা রয়াল রাজধানী ভেলোরের দিকে এগোবেন। একই সঙ্গে কুর্নুলে থাকা খান মহম্মদকেও মূল বাহিনী অনুসরণ করতে নির্দেশ দিলেন। চলতি অবস্থা শ্রী রঙ্গর পক্ষে খুব মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠল। যে মানিওয়ারেরা(নায়েক) এক সময় তাঁর অধীন ছিল আজ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, এবং তাঁদের উকিল আর অন্যান্য পেশাদারদেরকে মুস্তাফা খানের কাছে পাঠিয়েছে আদিল শাহী সুলতানির পক্ষে আইনি আধীনতার জন্য কাগজপত্র তেরি করতে। চিন্তিত হয়ে রয়াল ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ঘোড়সওয়ার, এক লাখ পদাতিক এবং ১০০ হাতি পাঠালেন নায়কদের ভয় দেখাতে। জিঞ্জির রূপ নায়েক ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ালেন। তাঞ্জোরের নায়েক বিজয়ার্গভ আর মাদুরার নায়েক তিরুমালা খালপত্তনমে(কয়ালপত্তনম)হাজারো রত্নখণি নিয়ন্ত্রণ করতেন; তারা রয়ালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনায় এড়ে রইলেন। রয়াল বুঝলেন তারা মুস্তাফার সঙ্গে যোগ দিয়ে তার রাজত্ব দখল করবেই। রয়াল শান্তি প্রস্তাব দিয়ে ভেলোরের কাছে কানোয়ি পাসে তাঁর ব্রাহ্মণ গুরু ভেঙ্কান্না সোমাইয়াজী(সোমাজী)কে নবাব মুস্তাফার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পাঠালেন। নবাবের শান্তি শর্ত(নায়েকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে রয়ালকে সরে আসতে হবে, এবং পিছিয়ে ভেলোরে চলে যেতে হবে) শুনে ফিরে এসে রয়ালকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পরামর্শ দিলেন, গুরু। মুস্তাফা খান তখন জগদেব দেশ জয় করতে গেলেন।

একই সময়ে নবাব মীর জুমলা উদয়গিরি দখল করে গোটা পূর্ব উপকূল, নেলোরের দক্ষিণ এবং সেন্ট জর্জ দুর্গের আশেপাশের অঞ্চল দখল করতে উঠেপড়ে লাগলেন। উত্তর আর্কোটের টোন্ডামানাদ, তিরুপ্তি এবং চন্দ্রগিরি ১৬৪৬এর এপ্রিল মাসের আগেই দখল হয়ে গিয়েছে। ১১ ডিসেম্বর পুলিকটের আশেপাশে থাকার সময় ডাচেরা অগ্রগামী গোলকুণ্ডা বাহিনীর আলোচনা সুরু করে বশ্যতা স্বীকার করল। তিনি ডাচ দুর্গের সুরক্ষার ব্যবস্থা দেখে খুবই প্রভাবিত হলেন। যুদ্ধের আবহেই প্রচুর আলোচনার টানাপোড়েনের পর তিনি ডাচেদের এলাকায় কাসিম মাজানদারিনিকে থানাদার নিয়োগ করেন। তিনি শুধু পুলিকটই নয়, স্যান থোমেরও প্রশাসন হাতে নিয়ে রাজ্যজুড়ে শান্তি বজায় রাখায় ব্যবস্থা করে হিন্দু শক্তি দমনের দিকে এগোলেন। মীর জুমলা পুলিকট থেকে এগোবার পথে সমস্ত রাস্তা জুড়ে বাড়ি ঘরদোর পুড়িয়ে মানুষ খুন করে, বিপুল ধ্বংসলীলা চালাতে থাকেন। স্থানীয় অভিজাতরা তাঁর সঙ্গে যোগ দেয়। এলাকার পর এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। তাঁর পৌঁছবার আগেই পোন্নারি, পূনামালি, কাঞ্চি(কাঞ্চিভরম), এবং চিঙ্গিলপুট(যেটি সপ্তম স্বর্গের সঙ্গে তুলনীয়)র পতন হতে থাকল একের পর এক, জনশূন্য এলাকা দখল করতে করতে এগোতে লাগলেন। ৪ জানুয়ারি ১৬৪৭এ জানা গেল রাজার সকাশে(ভেলোর) পৌঁছবার জন্য মাত্র দু দিন হাতে রয়েছে। দেশজুড়ে বিপুল মন্বন্তর নেমে এল, কেউ মীর জুমলার বিরোধিতা করতে এগিয়ে এলেন না।

বিজাপুরী আর কুতুব শাহী সেনার হাতে ভেলোরে হিন্দু সেনাপতি ভাইলুয়ারের চরম বিপর্যয়ের পর রয়াল আত্মসমর্পনের অঙ্গীকার করেন এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ লক্ষ হুণ আর ১৫০টি হাতি দিতে বাধ্য হন(এপ্রিল, ১৬৪৭)। বিজাপুরের আত্মসমর্পণের শর্ত কুতুব শাহ মেনে নেন না। যদিও নায়কেরা নতুন করে রয়ালের পাশে দাঁড়াবার অঙ্গীকার করতে থাকেন, এবং দেশের স্বাধীনতার পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরার নিশ্চয়তা দিতে থাকেন, কিন্তু ততদিনে বহু দেরি হয়ে গিয়েছে। নায়কদের মধ্য কলহ তাদের পতনের কারণ হল। তাঞ্জোর আর জিঞ্জির সামরিক ক্ষমতা এতই সীমিত ছিল যে তারা আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে নি। মহীশূর আর মাদুরার যৌথ সেনা দল বিজাপুরের মুস্তাফা খানের সাহায্যে ওয়ান্ডিওয়াসে মীর জুমলার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও, মীর জুমলা কয়েকজন হিন্দু সেনাপতি যেমন ভেলুগতির প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সমস্ত প্রতিরোধ উপড়ে ফেলেন।

১৬৪৭ সালে মাদ্রাজে ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধি করায় মীর জুমলা পিতলের বন্দুক পেলেন। তাঁর বদলে বাণিজ্য সুবিধা দিলেন। অক্টোবরে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা সমীক্ষা পত্র পাঠিয়ে জানাল যে গোলকুণ্ডার রাজা মোটামুটি সমগ্র রাজত্ব জয় করে নিয়েছেন, এবং আনাবব(নবাব) উপাধিতে দেশ শাসন করছেন।
(চলবে)

Post a Comment