Thursday, November 17, 2016

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কর্পোরেট পোষিত জাতিরাষ্ট্রের দালাল মধ্যবিত্ত আর টাকা বাতিল


আমরা ভদ্রলোক মধ্যবিত্তরা একটু ধাক্কা খেলেই সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক ঘোমটা খুললেই কর্পোরেট পোষিত জাতিরাষ্ট্রের দালালির চেহারা খুলে যায়। প্রায় প্রত্যেক চাকরিজীবির টাকার থলেতে অন্তত একটা কর্পোরেট জারিত কার্ড সগৌরবে বিরাজমান।
বাংলা টাকা বাতিলের বাজারে এখন সেই কার্ডওয়ালা মানুষের কৃষি বিষয়ে চিন্তা ভাবনা খুবই বেড়ে গিয়েছে। গ্রামে গঞ্জে কৃষি বা অন্য উদ্যমে কত দালাল ফোড়ে ছেয়ে গিয়েছে তাই নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ছে প্রতিদিন কিছু না কিছু উপায়ে কার্ড ঘষা মধ্যবিত্ত। প্রতিবাদী চিলচিতকার সামলানো যাচ্ছে না - সব রোষ গিয়ে পড়েছে গ্রামের কৃষি ফড়েদের ওপর। মোদির কর্পোরেট ইন্ডিয়ার খাতকদের হঠাতই কেন যেন মনে পড়েছে গাঁয়ে গঞ্জে ফড়েদের উতপাত বেড়ে গিয়েছে – ফড়েদের অত্যাচারে গ্রামের কৃষককুল নাজেহাল। ফড়ে দাদালদের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচানো ভদ্রলোক মধ্যবিত্তের সব থেকে বড় কাজ। অথচ যে লোকটা গ্রামে কৃষির দালালির কাজ করে যে টাকা/সম্পদ/কাজ  গ্রামেই রাখে – এটা সামাজিক গ্রামীন অকর্পোরেটিয় ব্যবসা – কারণ তার ব্যবসায় কার্ড ঘসা নেই, ব্যাঙ্ক মহাজনী নেইতারা গ্রামের উতপাদন গ্রামের হাটেই বিক্রি করে – কিছুটা শহরে আসে। ভারতের অধিকাংশ মানুষই গ্রামে থাকে। তার বাজার গ্রামেই। শহরের মানুষেরা এখনো সংখ্যালঘু।
আমরা যখন হকার সংগঠন করতাম, তখনকার হিসেবে বাংলায় হকারেরা বিক্রি কর ৯৭% ফসল - সেটা ২০০৩-০৪ সাল। এবারে বড় পুঁজির কাগজের সূত্র ধরে বলুন এই হকারেরা ফড়ে, দালাল। আমরা মাথা নামিয়ে মেনে নেব। আমরা এদেশে চাই এ ধরণের ফড়ে আরও বাড়ুক। ফসল বিক্রি করা হকাররেরা, হাটুরেরা মূলত গ্রামের অর্থনীতিকে জোরদার করে।
উল্টো দিকে আমরা চাই ঠাণ্ডা ঘরে আর ইন্টারনেটে কার্ড ঘসে ফসল বিক্রেতা ফড়ে কমুক। ঠাণ্ডা আর নেট বাজারগুলোর বড় বড় কৃষির দালালেরা বড় বড় শহরে থাকে – তাঁদের লক্ষ্য কার্ওয়ালা মধ্যবিত্ত। তাদের ব্যবসায় গ্রামের টাকা শহরে চলে আসে। সেগুলো বিক্রি করে ঠাণ্ডা বাজারের মালিকেরা সেই টাকা লণ্ডন বা নিউইয়র্ক পাঠায়। গ্রাম হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত পোষিত, বড় পুঁজি প্রণোদিত নব্য উপনিবেশবাদের পীঠস্থান।
আমাদের বিনীত প্রশ্ন, ফড়ে মহাজন কোন ব্যবসায় নেই? সব বড় ব্যবসায় রয়েছে কর্পোরেটেরা যে ব্যবসা করে তাতে ক্যারি ফরোয়ার্ড এজেন্টটা কি? তারা দালাল নয়? মধ্যবিত্তের পোষণের জন্য শহরে শহরে ঠাণ্ডা খুচরো বাজার তৈরি হয়েছে, সেটা দালালি নয়, ফড়েমি নয়?  সেগুলি কর্পোরেট এবং মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেদের সন্তান সন্ততিদের চাকুরির লীলাভূমি বলে হাহুতাশ করি না। তাহলে তো ভাণ্ডা ফোঁড় হয়ে যাবার সম্ভাবনা। কারণ আমরা সেই বাজারে গিয়ে অফারের ধাক্কায় একটাকার বাজার ১০০ টাকায়  তুলে নিয়ে যেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি
ফোড়ে, মহাজনি বহু পুরোনো ব্যবস্থা। ব্যাঙ্ক কি মহাজন নয়? চাষীর সঞ্চয় ৪% সুদ দিয়ে কত সুদে তারা টাকা খাটায় ভাই? আমরা হকার ইউনিয়নে হিসেব করে দেখেছিলাম ছোট ছোট ধার দেওয়ার সংস্থাগুলি(যেমন বন্ধন রোজের আদায়ের হিসেবে - খুব কম করে অন্তত ৩৬-৪০% সুদ খায় – গ্রামে জবরদস্তি করে টাকা তোলে – তারা আজ ব্যাঙ্ক – তাই সব খুন মাফ – একদা বন্ধন ব্যাঙ্কের এজেন্টেরা গ্রামে টেরর চালাত তাকা তোলার জন্য – ছোট ছোট ধার দেওয়ার সঙ্গঠনগুলি প্রথম কিস্তিটা কেটে রাখে, প্রসেসিংএর টাকা আলাদা ধরে রাখে – চোখের দেখা সুদ হয়ত ১২ বা ১৪% কিন্তু মন দিয়ে হিওসেব করলে দেখা যাবে তারা খুব কম করে ৭২-১০০% পর্যন্ত সুদ খায়)। আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে এরা সমাজসেবা করছে - এরা আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সংগঠনের দ্বারা তাত্ত্বিকভাবে সুরক্ষিত – তার ওপর ইউনুসবাবু নোবেল পেয়েছেন
আমরা দেখিয়েছি ৬০ লক্ষ পরম্পরার ব্যবসার মানুষ(যা বাঙলার জনসংখ্যার ১০%ও নয়) ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তার বাইরে বিপুল সংখ্যার মানুষ আরও কত ধরণের হাজারো ছোট ছোট ব্যবসা করেন!! চাষ তো বিপুল ব্যবসা। তাঁদের অর্থনীতির কুশনের জোরে ২০০৮এর ইওরোপিয় আর আমেরিকিয় বিষ সম্পদের ধাক্কা নীলকণ্ঠ হয়ে ধারন করেছিল গ্রাম ভারত - অবশ্যই তার শ্রেয় নিয়েছিল কর্পোরেটরা যারা দাবি করেছিল তাঁদের সুগভীর অর্থনৈতিক ফাণ্ডামেন্টালের।
তো বহুজাতিক আর্থিক মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা এই বাজার কেন ছেড়ে দেবে। একবার কার্ড ঘসলেই যদি ২-৩% রোজগার হয় তাহলে তারা যে কোন উপায়েই এই অর্থনীতিকে আঘাত করার চেষ্টা করবে। ক্লিন্টন জেতেনি জিতলে মনসান্টো বাংলা/ভারতকে আরও বেশি খেয়ে ফেলত - তার সংস্থায় মন্সান্তো কত টাকা দান দিয়েছে খবর নিয়ে দেখুন – আমেরিকায় মন্সান্তোর বিরুধে মামলা করা যাবে না – সে আইন হিলারির আমলে করা। বিল গেটস ৫০০ মিলিয়ন ডলার মন্সান্টোতে ইনভেস্ট করেছে যাতে ক্ষুধা নিরসন হয়। হিলারির বড় বন্ধু ইউজেনেটিক্সের কারবারী গেটস পরিবারের বিলবাবু
তো এ ভারতে হর হর  মোদি এই কার্ড ঘষা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেদের প্রতিনিধি - কৃষক মরে গেলে যার একটা বিবৃতি পাওয়া যায় না - জিও বা পেটিএমের বিজ্ঞাপনে তার গর্বিত ছবি ব্যবহৃত হয়।
মোদিকে ক্ষমতায় আনা মধ্যবিত্ত কেন এই গ্রামীন অর্থনীতি বাঁচানোর কাজ করবে বন্ধু? আপনি এর প্রতিবাদ করছেন – সেটা ব্যতিক্রম - আপনি দূরদৃষ্টিতে ভারতের ধ্বংস চিত্র দেখতে পাচ্ছেন, তাই। কিন্তু আম ভদ্রলোক মধ্যবিত্তের কি লাভ? ই গ্রামীন অর্থনীতিতে তার চাকরি হবে না, দালালি হবে না,  একটা টাকাও তার বাবা মা সরাসরি পাবে না হয়ত প্রোক্ষে জীবনটা একটু ভাল হবে বলে আপনি মনে করছেন।
কিন্তু সে তো মনে করে কর্পোরেটরাই তাকে সুখে রাখবে। তাই যদি পেটিএমএর মত হাজারো কোম্পানির বাড়বাড়ন্ত হয় তাহলে তাদের ছেলে মেয়ের চাকরি হবে – তারা এই অর্থনীতির মূল ভোক্তা  তাদের পূর্বজরা পাল-সেন আমলে সংস্কৃতের,  সুলতানি আর মুঘল আমলে আরবি ফারসি আর ব্রিটিশ আমলে এবং তার পরেও ইংরেজ আর ইওরোপিয় পুঁজি আর প্রযুক্তি আর জ্ঞানের  দালালি করেছে সে ক্ষমতার সঙ্গে থাকার,  ক্ষমতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরম্পরাড় জুড়ে রয়েছে অন্তত দেড় হাজার বছরের কাছাকাছি।
স্বাধীনতার আন্দোলনে পুলিশ পেটাত তারা কি ইংলন্ড থেকে আসত? অন্নদাশঙ্কর বা শৈবাল গুপ্ত কি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ ছিলেন? বিপুল প্রতিবাদী কিন্তু সিস্টেমের অংশ রমেশ দত্ত শেষ বয়সে ব্রিটেনে ছিলেন তিনি জগদীশচন্দ্রকে দেশে ফিরতে বারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ না থাকলে জগদীশ হয়ত লন্ডনেই থাকতেন
মূলত ভদ্রলোক মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত বাঙালি জন্ম থেকে ক্ষমতার দালাল সে আজ মোদিদের পাশে দাঁড়াবে সেটাই স্বাভাবিক। না হলে তার রোজগার, তার ক্ষমতায় থাকার দর্শনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। সে মূলত চাকরি করে। আর হাতে গোনা ব্যবসা। কিন্তু সে ব্যবসায়ী তো আর অকর্পোরেট ব্যবসা করা বোঝে না - যে ব্যবসা গ্রমীন বাংলা করে বুক বাজিয়ে - আমরা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকিয় কর্পোরেট দাদালেরা গ্রামে দালাল ফোড়ের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে মাথা ফাটাফাটি করছি। আর যে সব মধ্যবিত্ত কৃষি ব্যবসা নিয়ে উতসাহী, তার কাছে কৃষির ব্যবসা মানে জৈব চাষ - ইওরোপ যাকে জৈব বলে দিয়েছে, সেই তত্ত্ব অবলম্বন করে কৃষককে দিয়ে ফলিয়ে শহরে ঠাণ্ডা ঘরে বিক্রির ব্যবস্থা করা – ফ্যাবইন্ডিয়া মডেল – কারিগর এবং কৃষককে চুষে খাওয়া। সামাজিক কর্পোরেট উদ্যম – অসাধারণ সোনার পাথরবাটি।
১৭৬৩ থেকে যে ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছে তাতে লড়েছে গ্রামীনেরা - আর মধ্যবিত্ত সেই ধারাবাহিক লড়াইয়ের সঙ্গী হয়ে মাত্র ৭৫ বছরে ব্রিটিশদের ছেড়ে যাওয়া ক্ষমতা ভোগ করছে, ভারতকে পুরোপুরি ইওরোপিয় জাতিরাষ্ট্র তৈরি করেছে  
ফেবুতে টাকা বদলির ভারত ধ্বংসের মোদির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মধ্যবিত্তের বিবেক বৃথা টার্গেট করছেন লেখকেরা আসলে ভারত নামের নৌকোতে কর্পোরেট ইন্ডিয়া চেষ্টা করছে লুঠেরা ব্রিটিশের করে দেওয়া ফুটোটাকে বাড়িয়ে দেওয়ার মোদির পরকল্পনার বিরোধীরা গ্রামীণদের সঙ্গে নিয়ে চাইছেন সেই ফুটো থেকে ঢুকে আসা জল প্রাণপনে ছেঁচে বার করারনৌকোর ওপর প্রান্তে গ্যাঁট হয়ে বসে মধ্যবিত্ত ইংরেজি শিক্ষিত ছাপোনারা চাইছে কখন এই গ্রামবন্ধু মধ্যবিত্তরা হতাশ হয়ে পড়ে সে সব ছাঁচার আশা ছেড়ে দিলে নৌকোটা ডুববে তারা এই নৌকোটা ছেড়ে ঝকঝকে ইওরোপিয় জাহাজে চড়বে।
এ নৌকো ডুবলে যে, সে জাহাজে তার আর মধ্যবিত্তের সুপুত্রকন্যাদের চড়া হবে না তা প্রমান হয়ে গিয়েছে গুয়াতেমালা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, গ্রিস, মেক্সিকো, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির অভিজ্ঞতায় - তারা সেই চাষী, গ্রামের পরম্পরার মানুষের সঙ্গে ডুবে মরবেই মরবে।
সেই ডুবে মরার দিকে ক্রমশ এগোচ্ছে মোদির ইন্ডিয়া।
Post a Comment