Wednesday, November 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। গোলকুণ্ডার উজির মীর মহম্মদ
মীর মহম্মদের প্রতি আসাফ জাহি(আসফের মত জ্ঞানী)র মত উদেদেশ্যপূর্ণ গুণবাচক বিশেষণ - আসফ মঞ্জিলাত এবং আসফ মরতাবাত প্রয়োগ করে নিজামুদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘সুগভীর জ্ঞানে আর সেবায় সম্পাদিত সুলতানি কাজকর্ম, নানান ধার্মিক দায়িত্ব পালন আর রাজকীয় সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সফল হওয়ায় ধীরে ধীরে তিনি সুলতানের কাছাকাছি আসতে থাকেন। তাঁর ভাগ্য আর জ্ঞানের বলে তিনি শীঘ্রই প্রশাসনিক সংক্রান্ত ব্যবস্থার(অম্র হুকুমত) চরমতম দক্ষ ক্ষমতাশালী পণ্ডিতে(ইস্তাকাল) পরিণত হলেন। তিনি জোর করে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়কারী(আরবাবইদাখিল)দের রোজগারের রাস্তা বন্ধ করেন। অধস্তন কর্মী(উম্মাল) আর ব্রাহ্মণ করণিকদের থেকে বিপুল পরিমান অর্থ উদ্ধার করে সুলতানের কোষাগার বৃদ্ধি করলেন’। সুলতান এই কাজে সন্তষ্ট হয়ে তাকে একটা রত্ন খচিত কলমদানি(কলমদানিইমুরাসসা) উপহার দিলেন। সঙ্গে দিলেন বছরে ৩০০০০ হুন রাজস্ব বিশিষ্ট একটি পরগণাও, যাতে তিনি বেশ কিছু আরবি সৈন্য রাখতে পারেন। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ১০০ আরবি, ইসপাহানি সৈন্য নিয়োগ করেন সুলতানের শিল্লাদার রূপে। মাতা-সাম্রাজ্ঞীর বেশ কিছু কাজ সম্মানজনকভাবে সম্পন্ন করায়, রাজকীয় মাতা তাঁকে প্রচুর উপহার দেন, যার মধ্যে রয়েছে একটি কোমরবন্ধ, রত্নখচিত তরোয়াল (শামশিরইমুরাসসা), ঘোড়া আর হাতি।

এর পরে আরও কিছু জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় দায়িত্বও তিনি পালন করেন। এই দায়িত্বে তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেল। সুলতানের মাতা-সাম্রাজ্ঞীর রাজধানীতে একটিও প্রাসাদ জেনানা-মহলের জন্য পছন্দ না হওয়ায়, মীর মহম্মদের ওপর দায়িত্ব পড়ে মাত্র একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে (রবিউলআওয়াল ১০৪৮, জুলাই ১৬৩৮এর মধ্যেই) চার তলা প্রাসাদ হায়াত মঞ্জিল বানিয়ে দেওয়ার। সেই উদ্দেশ্যে একটি স্থান নির্বাচন করে প্রাসাদ পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হাবিলদার মালিক আলমাসের তত্ত্বাবধানে একটি স্থাপত্যের পরিকল্পনা তৈরি করেন মীর। সেই পরিকল্পনাটি সুলতান কিছুটা সংস্কার করে দিলেন; চারতম তলার চারদিকে, চারটি বিশাল জানালা যুক্ত সুউচ্চ মিনার সংযোজিত হল। প্রাসাদের সাজসজ্জা নিখুঁততম এবং বিশদে তৈরি করতে মীর মহম্মদ রাজ্যের এবং দেশের প্রচুর জ্যামিতিবিদ এবং কারু শিল্পী নিযুক্ত করে, নিজে সারাদিন প্রায় অভুক্ত থেকে স্থপতি এবং কারিগরদের সঙ্গে কাজ করে এটি রূপায়িত করেন। চতুর্থ তলার ছাদের চারটি মিনারের মাঝখানে চাঁদনি (পোর্টিকো), দেহলি(টেরেস), বসার যায়গার সঙ্গে একটি গ্রীষ্ম-ঘর আর একটি গোসলখানা নির্মান করেন; সুলতানের নির্দেশ অনুযায়ী দেওয়ালের বিশেষ চিহ্নআঁকযুক্ত সাজসজ্জাকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যবস্থা করেন। ঘরের দেওয়ালে ইরাণ আর হিন্দোস্তানের শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো হয় রাজসভা, শিকার এবং যুদ্ধের রঙ্গিন চিত্রাবলী। কাজটি এতই সুসম্পন্ন করে সম্পাদিত করা হয় যে নিজামুদ্দিন এই রাজপ্রাসাদকে এরম বা ইডেনের সঙ্গে তুলনা করেন।

মাত্র কয়েক দিন পরেই রবিউলআওয়ালের শেষের দিকে(১ আগস্ট, ১৬৩৮) তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা প্রয়োগ এবং সর্বসমক্ষে প্রয়োগ এবং উপস্থিত করলেন, সকলে তাঁর দক্ষতার মুগ্ধ হয়ে গেল। প্রাসাদ উদ্বোধনে আসবেন সুলতান, উজির, আমীর হাজারো আধিকারিক। মাতা-রাজ্ঞীর ইচ্ছে অনুযায়ী সেই বর্ণাঢ্য, সম্পদশালী উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সমস্ত ছোট ছোট খুঁটিনাটি পরিকল্পনা নিজের কর্মচারীর সঙ্গে মিলে রূপায়িত করলেন মীর মহম্মদ। প্রাসাদের সামনে যে মাঠটি রয়েছে, সেটি পরিষ্কার করে আরশির মত চকচকে করে ফেলা হল। সরনৌবত (সেনা বাহিনী না নহবত?) তাঁদের কাজ দেখাতে এল। মাতা-রাজ্ঞীর বিশেষ দূতের সাহায্যে মীর মহম্মদ ভেলভেটের গালিচা পাতা ১০০০ গজ দীর্ঘ রাস্তা জুড়ে সোনার শিকলি আর ঝালর দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। এই রাস্তায় মোট আটটা বড় বড় তোরণ তৈরি করা হয়। গরীবদের জন্য বিপুল খাদ্য বিতরণ করা হয়। অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য রাস্তায় সার দিয়ে দাঁড়িয়েছিল হাতি, ঘোড়া, উট আর দাস-দাসী। হাতে রত্ন খচিত সোনার বারকোষ(ট্রে)এ বহুমূল্য রত্নরাজি, বস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে ১২টি হারেমের আহুদাদার আর মালিকেরা দাঁড়ানোয় সমগ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জাঁকজমক আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই রত্ন খচিত অনুষ্ঠান চলাকালীন তাঁর বিশালত্ব নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে সুলতান প্রত্যেকটি তোরণ পার হচ্ছেন, আর তাকে নানানভাবে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে, শেষে তিনি সিঁড়ি চড়ে সব থেকে উঁচু আসনে বসলেন। উচ্চপদস্থ আমলারা তাঁকে নানান ধরণের পেশকাশ দিয়ে চলেছেন এবং তিনি তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছেন। মাতা-রাজ্ঞী সুলতানকে একটি সোনার ঝালর এবং শৃঙ্খলে মোড়া একটি হাতি, দুটি ঘোড়া, ইরাকের রত্নখচিত শৃঙ্খল, ইওরোপের ভেলভেট, চৌদ্দটি সোনায় কারুকাজ এবং মোড়া করা সূক্ষ্ম বস্ত্র যার প্রান্তটি রেশমের সুতো দিয়ে সেলাই করা সহ প্রচুর সামগ্রী উপহার দিলেন।

বিপুল সম্পদের অধিকারী মীর মহম্মদ সৈয়দ সোনায় অসাধারণ কারুকাজ করা নানান আনুষঙ্গিক উপকরণে সজ্জিত ১২ মন ওজনের সোনার পালঙ্ক উপহার দিলেন। এছাড়াও দিলেন সোনার গোলক, সোনার তৈজসপত্র, সোনার পাত্র, সূক্ষ্ম বস্ত্র এবং তাঁর রুচি মত অন্যান্য উপহার। মীর মহম্মদের সাম্প্রতিক সেবায় খুশি হয়ে মাতাসাম্রাজ্ঞী তাকে বিশেষভাবে উপহার দিলেন সোনার শৃঙ্খলে মোড়া একটি ঘোড়া, একটি হাতি, একটি কোমর বন্ধনী, এবং একটি রত্নখচিত তরোয়াল।

আরও কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা মীর মহম্মদের ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকে এগিয়ে দিল। যারা তাঁর পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের বিরোধিতাকে চূর্ণ করে আরও গর্বিত দর্পে তিনি এগিয়ে চললেন। তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা, মুল্লা ওয়ায়েজ যিনি দবির এবং মুনসিওউলমামালুকের মত পদে থেকেছেন, ঈর্ষার কারণ হয়েছে। সুলতানের নেক দৃষ্টির সুযোগ নিয়ে সমস্ত শোভনতা এবং বাস্তব বিচারবুদ্ধ নাশ করে সরইখাহিল দপ্তরের কাজকর্মে দাখিলা দেওয়া শুরু করলেন মুল্লা। এমন কি পেশোয়া দপ্তরে বা সব কয়জন মনসবদারের সঙ্গে তিনি এমন ব্যবহার করা শুরু করলেন যেন তারা তাঁর অধস্তন কর্মচারী। তাঁর এই বেয়াদপি দেখে, বুঝেও সুলতান নানা কারণে তাকে নিবৃত্ত করেন নি। সরইখাহিল দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক মীর মহম্মদও সুলতানের অতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। এবং তিনি তাঁর প্রতি ন্যস্ত নানা অসামরিক এবং দেওয়ানির রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত দায়িত্ব তাঁর মত করে নিজস্ব যোগ্যতায় পালন করার চেষ্টা করছেন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দপ্তরে অযাচিতভাবে মুল্লা ওয়ায়েজএর মাথা গলানো পছন্দ করেন নি, এবং সুলতানের প্রতি দায়বদ্ধ নন, এমন অভিয়োগ তিনি দৃঢভাবে খণ্ডণ করে চিঠি লেখেন। মীরের ক্ষমতার ডানা ছাঁটতে না পেরে ওয়ায়েজ তাঁর পদত্যাগ পত্র সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দিলে সুলতান তেলেবেগুণে জ্বলে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত রবিউল্লাওয়ালএ(জুলাই ১৬৩৮)) মুল্লাকে পদচ্যুত করিয়ে তাঁর বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখা হয়, এবং উজিরের পদটি নিয়ে আবার অপপ্রয়োগ হতে থাকে। মীর মহম্মদকে এবারে নিজের ১০০ জনকে দেখতে বলা হয় এবং বলা হয় তাকে যে জায়গির দেওয়া হয়েছে, সেখানের রাজস্ব থেকেই তাঁদের বেতন উদ্ধার করতে হবে। মুল্লার দবির দপ্তরটি ২৬ শাওয়ালে, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৯তে মির্জা টাকি নিশাপুরিকে দেওয়া হয়। উজিরাত পদটিকে দেওয়া হয় কাশমকোটা থেকে ডেকে আনিয়ে মির্জা রুস্তমকে। মুল্লার বাহিনীটি মালিক অম্বরের দায়িত্বে ছিল, তিনি সেটি মীর মহম্মদকে অর্পণ করেন। মালিক অম্বর, মীর মহম্মদকে বর্ণনা করেন ‘আধুনিক যুগের আসফ’ রূপে।

ক্রমশ মীর্জার দক্ষতার পরিচিতি এবং ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। দাদমহলের ময়দানে তাঁর ইরাকি সেনা, সুসজ্জিত শিক্ষিত হাতি এবং ঘোড়ার কুচকাওয়াজ দেখিয়ে তিনি কোমর বন্ধনীর সঙ্গে ‘সরইখাহিলএর মত উচ্চপদের সঙ্গে উজিরাতের দায়িত্ব’ও লাভ করলেন। রাজধানীতে উজির পদের একটা নিয়মিতান্ত্রিক কাজ ছিল, উজির যদি রাজধানীতে উপস্থিত থাকেন, তাহলে সপ্তাহে একদিন সারা রাত এবং পরের দিন সক্কালের নদীর ওপারে(রুদ খানা)র নদী মহলের সৈন্য, হাতি, ঘোড়ার কুচকাওয়াজ দেখবেন। তার দেখার পরে সেই কুচ যাবে দাদমহলের ময়দানে সুলতানের নজরদারির উদ্দেশ্যে। সাধারণত রাজত্বে ১২ জন উজির থাকেন। এদের মধ্যে এক থেকে তিনজন উজিরকে একসঙ্গে বসে সারারাত রোজকার সৈন্যের কুচকাওয়াজ দেখতে হবে।
(চলবে)
Post a Comment