Friday, November 25, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। কর্ণাটকে নীর জুমলার দ্বিতীয়বার অভিযান
পূর্ব কর্ণাটক জয়ের সুলতানি গোলকুণ্ডার প্রচেষ্টা এক ধাক্কায় ধুলিতে মিশে গেল। মীর মহম্মদের অনুপস্থিতিতে গাজি আলির অযোগ্য নেতৃত্ব যে গোলকুণ্ডা বাহিনীর সাময়িক পশ্চাদপসরণ হয় সেটা নিশ্চিত। সেই মুহূর্তে গোলকুণ্ডার বাহিনী এতই হতচকিত হয়ে পড়ে যে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন করে আক্রমন শানাবার কথা তাঁদের মনে আসে নি।
একদিকে কুতব শাহকে চেষ্টা করতে হচ্ছিল তাঁদের পশ্চাদপসরেণের সুযোগে যেন বিজাপুর কোন জমি দখল না নিতে পারে, অন্য দিকে কর্ণাটকের যতটুকু জমি তাঁদের দখলে রয়েছে, তা ধরে রাখতে নিজের বাহিনীর জন্য সম্পদ আর অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানোর ব্যবস্থা করা। ১৬৪৪এর শেষে এবং ১৬৪৫এর প্রথম পাদে গোলকুণ্ডাকে, ছোট ছোট রাজা নিয়ে জোট করা রয়্যালের সঙ্গে যুদ্ধ সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়ে শান্তি চুক্তি করতে হয়। কুতুব শাহী কূটনীতি পিছু হঠলমাত্র। কিন্তু নায়কেরা দুই সুলতানের সাহায্য চেয়ে বসায় তাঁর পররাজ্য আক্রমনের বাসনা আবার জেগে উঠল। সুলতান নতুন করে মীর মহম্মদ, বর্তমানের মীর জুমলার জয়ের আস্বাদ মিটে যেতে না যেতেই দ্বিতীয়বার রাজ্য জয়ে পাঠালেন।

সময়টা যেন মীর জুমলার নতুন অভিযানের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল। কর্ণাটক যুদ্ধে যুদ্ধে আর দুর্ভাগ্যের ভারে ক্ষতবিক্ষত। রয়্যালও সমস্যার ভারে বিপর্যস্ত। গোলকুণ্ডার চাপে ডাচেরা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে, ১২ আগস্ট ১৬৪৫ থেকে সুরক্ষিত পুলিকট ডাচ কুঠি তাঁর হাতে রুদ্ধ। অন্য দিকে গৃহযুদ্ধ লেগেছে - তাঞ্জোর, মাদুরা এবং সিনসিদার(জিঞ্জি)এর নায়কদের সঙ্গেও লড়াই চলছে সমানতালে। ১৬৪৫ সালের ডিসেম্বরে নায়কদের যৌথ বাহিনী রয়্যালের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেয়। ফলে পুলিকটের অবরোধকে জোরদার করতে রয়্যাল চাহিদার ভগ্নাংশ মাত্র ৪০০০ পদাতিক আর কিছু খাবারদাবার আর গোলাবারুদ পাঠাতে পেরেছে। বিজাপুরের রয়্যাল রাজ্য আক্রমণের খবর গোলকুণ্ডার হর্ষ বৃদ্ধি করল। ১৬৪৬ সালের শুরুতে আদিল শাহি সেনাপতি মুজফফরউদ্দিন খান মহম্মদ, খানইখানান, কুর্নুলের নান্দিয়ালসহ অঞ্চলের আটটি দুর্গ দখল করে সেই বছরের বসন্তে পশ্চিম দিক থেকে অগ্রসর হয়ে কর্ণাটক বালাঘাট দখল করেন। ব্রিটিশেরা অবস্থা বুঝে তাঁদের নথিতে মন্তব্য করল, ‘মুসলমানের নতুন করে ছেড়ে যাওয়া এলাকা দখল করতে শুরু করেছে’।

এই সব একসঙ্গে ঘটে যাওয়া চলচ্চিত্রসম ঘটনার সুযোগে সুসজ্জিত এবং চরম দক্ষ ইওরোপিয় গোলান্দাজ এবং বন্দুকচি বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা উত্তর আর পূর্ব দিক থেকে রয়্যালের এলাকা আক্রমন করে। দামরালার সিংহাসনে মাল্লাইয়া (চিন্নানা)কে বসান রয়্যাল। তাঁর ছিল ৫০ হাজার সেনা। তিনি চেষ্টা করছিলেন আক্রমনকারী মুসলমান বাহিনীকে তাঁর রাজ্য থেকে দূরে রাখার। গোলকুণ্ডার আক্রমনের সামনে পড়ে ডাচেদের অবরোধ থেকে বিপুল সংখ্যক বাহিনী তুলে নেওয়া হয়। মাত্র হাজার খানেক সেনার অবরোধ ভাঙতে ডাচেরা নতুন করে আক্রমন শানায় কিন্তু রয়্যালের খুব কম ক্ষতি হয়। অবরোধ চলতে থাকে। রাজা ডাচেদের থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসে; না পেলে অবরোধ তুলতে রাজি নন জানিয়ে দিলেন।

কিন্তু ডাচেদের বিরুদ্ধে রয়্যালের সাফল্য মীর জুমলার আক্রমণে ছিন্নভন্ন হয়ে গেল। পাঁচ মাসের মধ্যে কৃষ্ণা নদী পেরিয়ে কুর্নুল জেলার কাম্বামে পৌঁছে এরাগোন্দাপালেমের প্রায় অজেয় দুর্গ দাদ্দানালা দখল করলেন। নায়ক নিহত হলেও এখানে আবার মীর জুমলা তাঁর ফলিত কূটনীতি অবলম্বন করে নিহত নায়েকের পুত্রকে নগদ ৫০ লক্ষ প্যাগোডা আর বছরে এক লক্ষ প্যাগোডার বিনিময়ে দুর্গটির স্বত্ব অর্পণ করে যান। রয়্যাল রাজত্বের পূর্বাঞ্চলের মুকুট রাজধানী উদয়গিরি মীর দখল করলেন। ব্রিটিশ সূত্রে জানতে পারছি ২১ জানুয়ারি আর ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মুসলমান সেনানায়ক রয়্যালের রক্ষণের তিনটে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করলেন। উদয়গিরি দখল হল বিশ্বাসঘাতকতায়। ডাচেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রায় জিততে বসা রয়্যালের সেনানায়ক মাল্লাইয়ার দুর্গ ঘিরে রাখে মীর জুমলা। ৫০ হাজার সেনা থাকা সত্ত্বেও সে মীর জুমলার সঙ্গে বোঝাপড়া করে, নিজে আর তাঁর সৈন্যের স্বাধীনতার আশ্বাস নিয়ে দুর্গটা তুলে দেয় গোলকুণ্ডার দখলে।

উদয়গিরি দখল করে মীর জুমলা পশ্চিমের পানে যেতে যেতে কুডাপ্পা জেলার চিট্টিভেলির ছটা দুর্গ দখল করেন। মালটি সমাজে প্রধান দ্বিতীয় অনন্ত শুধু যে তাঁর রাজ্য হারালেন তাই নয়, তাকে বিপুল অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হল।
(চলবে)
Post a Comment