Sunday, November 27, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

গোলকুণ্ডা থেকে নতুন করে ৬০ মাইল দূরে উত্তর-পূর্বে অনন্তপুর জেলায় মীর জুমলা গুটি দুর্গ দখল করেন। সঠিক তারিখ জানা যায় না। প্রেমাদুর স্মৃতি কথায় জানা যাচ্ছে এটির পতন হয়েছিল ১৬৪৬ সালে। কিন্তু ১৫৭২ শক বা ১৬৫০ সালের তেলুগু লেখ সূত্রে জানা এটি মীর জুমলা শাসন করেছিলেন(হাজারাতি নবাবৌ বা রাজাধিরাজা রাজাপরমেশ্বর), অন্য দিকে তাভার্ণিয়ের ১৬৫২ সালের গাণ্ডিকোটা ভ্রমণ সূত্রে জানা যাচ্ছে, মীর জুমলা গুটি তালুকের বজ্রকোটির হীরে খনির মালিক ছিলেন।

গুটি থেকে মীর জুমলা, রাচুতি হয়ে দক্ষিণ পূর্বের দিকে আগ্রসর হয়ে গুরুমকোণ্ডা দখল করেন। সেই দিকে আরও এগিয়ে গিয়ে উত্তর আর্কোট জেলার চন্দ্রগিরি এবং তিরুপতি পর্যন্ত ঢুকে যান। ৬০০ ফুট উঁচু ওপরে তিরুমালা পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে গ্রানাইট পাথরে তৈরি চন্দ্রগিরি দুর্গ যাদবদের তৈরি জোরদার দেওয়ালে(১০০০ সালে তৈরি) এবং একটি পরিখায় সুরক্ষিত। তাভার্নিয়ে সেখানে দেখেছেন প্রচুর সেনা যেতে। এবং পরে সেখানে তিনি গিয়ে মীর জুমলার সঙ্গে দেখা কররেন এবং দেখেন তিনি অভিজাতদের সঙ্গে শিবিরে আলাপচারিতায় রত।

১০। কর্ণাটক ভাগাভাগি নিয়ে যুদ্ধ
ফলে এটা বোঝাই যাচ্ছিল যে সীমান্ত বা ভাগাভাগি চুক্তি হয়েছে সেটি শুধু যে চন্দরগিরির রাজার বিপক্ষে গিয়েছে তাই নয়, এই চুক্তিতে আদিল শাহের থেকে বেশি লাভ হয়েছে কুতুব শাহএর – বা এই ধারণাটা আদিল শাহের মনে গেঁথে গিয়েছে। অস্থায়িত্বই ছিল চুক্তির চরিত্র। সে সময়ের দাক্ষিণাত্যের রাজনীতি কোন নির্দিষ্ট খাতে না বয়ে এলোমেলোভাবে চলেছে; বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যের দুই সুলতানি রাজ্যের মধ্যে। যে গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বহু কাল ধরে, তা এই চুক্তিতে ওপড়ানো সম্ভব ছিল না। দুই সুলতানই প্রত্যেকে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের আঙ্গুল তুলতে থাকেন। জিঞ্জি অবরোধের সময় আবদুল্লা, পাদশাহকে একটা নাকি সুরে লেখা কান্না ভরা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘আদিল শাহ কিন্তু তাঁর চরিত্র অনুযায়ী সম্রাটের তৈরি করা চুক্তির নির্দেশ মানবে না এবং যে ভাগাভাগির শর্ত হয়েছে তাও উল্লঙ্ঘন করবে।’

কুতুব শাহ তাঁর দিল্লির উকিল(এজেন্ট) ফাসিউদ্দিন মহম্মদকে বললেন, পাদশাহ যাতে দুজন আমিন – একজনকে বিজাপুর অন্যজনকে গোলকূণ্ডায়য় নিযুক্ত করেন, অথবা তিনি যেন গোলকুণ্ডায় আওরঙ্গজেবের দূত মীর মহম্মদ তাহিরকে সঠিকভাবে তদন্ত করে বিষয়টির সমাধান করান, সে বিষয়টি পাদশাহের সভায় গিয়ে জোর দিয়ে বলেন। সুলতান যুদ্ধের (জিঞ্জি ঘেরাওয়ের আগে) আগে একজন আমিন চাইলেন, যাতে আদিল শাহ কোন গণ্ডগোল না করতে পারে। অন্য আরেকটি চিঠিতে কুতুব শাহ পাদশাহকে অভিযোগ করে লিখলেন, বিজাপুর যে চুক্তি ভঙ্গ করেছে, সেটি ইসলাম খান জানেন, এবং ভেতরে ভেতরে বিভেদ যাতে আরও বাড়ে তাঁর ব্যবস্থা করছেন। কুতুব শাহ তাই চুক্তির কতগুলি বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করেন, ১) রাজপরিবার, নায়কদের লুঠে যে নগদ, গয়না-রত্ন, হাতি এবং জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির ভাগাভাগির পুনর্মূল্যায়ন করা, এবং কুতুব শাহ উদার মনে চান আদিল শাহ নিজে এগুলি মূল্যায়ন করুণ; ২) কর্ণাটকে কুতুবশাহী দখল করা অঞ্চল অর্ধেক করে বাঁটোয়ারা করার কথা চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এই চুক্তি পাদশাহ দ্বারা প্রত্যায়িত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কুতুব শাহ অভিযোগ করেন ইসলাম খাঁ প্রাথমিক চুক্তি জানতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর(নভেম্বর ১৬৪৭) সুযোগ নিয়ে আদিল শাহ শাহজীর অধীনে বহু উজির পাঠিয়ে কর্ণাটকের হিন্দুদের সাহায্য করেন, বিশেষ করে রয়াল এবং অন্যান্য জমিদারকে; কিন্তু মীর জুমলা সক্কল শত্রু পরাজিত করে বিজাপুরীদের বিদরের সীমান্তে তাড়িয়ে দেন; এবং আদিল শাহ নিজে বিদরে আসেন, যেটা আসলে যৌথ সীমান্ত; তিনি তাঁর চুক্তি এবং প্রতিশ্রুতি অমান্য করে জোর খাটিয়ে কুতুব শাহের অধিকৃত জায়গা দখল করেছেন, তাঁর অভিযোগ। আদিল শাহের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ যে তিনি হড়বড় করে তাঁর দুই-তৃতীয়াংশ ভাগ নিয়ে নিতে চেয়েছেন, অথচ কুতুব শাহের পাওনা(তিনি যে পাদশাহকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন তা না জেনেই)আটকে দিয়েছেন এবং তাঁর যা পাওনা তাঁর থেকেও বেশি তিনি কেড়ে নিয়েছেন। ব্রিটিশ সূত্র এই তথ্য প্রমান করে যে ভেলোর(১৬৪৭) দখলের সমস্ত ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থ বিজাপুর নিয়েছে।

দুই সুলতানি রাজ্যের মুখোমুখি দ্বন্দ্ব খুব পুরোনো নয়, কিন্তু গভীর। সেটি শুরু হয়েছে জিঞ্জি অবরোধের সূত্রে – যদিও মুস্তাফা আর মীর জুমলা এই চুক্তি সম্পাদন করেন, কিন্তু আবিশ্বাসের মাত্রা এতই কড়া ছিল যে, সেই চুক্তির বোঝাপড়া এড়িয়ে নতুন গোলযোগ পেকে উঠতে শুরু করেছে। এবারে গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে বিজাপুরী উজির খান মহম্মদের অভিযোগ, সম্পর্ক ভাঙ্গার। পাদশাহকে আদিল শাহ লিখলেন, তাঁর নির্দেশ ছাড়াই এবং তাকে অন্ধকারে রেখেই কুতুব শাহ গোন্ডিকোড়া দখল করেছেন। তাঁর আরও অভিযোগ মীর জুমলা যুদ্ধে সাফল্য পেয়ে কুতুব শাহকে জানিয়েই বিজাপুরের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাতে শুরু করেছেন। ঝাউর লিখছেন ‘দুটি-তিনটি জয়ের পর(ভুল বোঝাবুঝির জন্য হয়েছিল), যা আসলে হাজারটা পরাজয়ের থেকেও কলঙ্কের, মীর জুমলা তাঁর কাজ কর্ম গোলকুণ্ডার সুলতানকে না জানিয়েই সম্পাদন করতে শুরু করে। এই শয়তানি যুদ্ধ তাঁর প্রভুর নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে করতে করতে সে এলাকা দখল করতে আদিল শাহের এলাকায় ঢুকে আসত। কুতুব শাহ কাজকর্মের সুতো একজন ভয়ানক মানুষেরর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন দেখে আদিল শাহ মুচকি হেসেছেন এবং মীর জুমলার কাজগুলিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ বিজাপুরী ঐতিহাসিকদের অভিযোগের মূল সূত্রটা হল মীর জুমলা মুলুন্দ আর কর্ণাটকে গিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি করছেন। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছেন, গোণ্ডিকটার বিজয় ঘটেছে আদিল শাহের সেটি ছেড়ে যাওয়ার জন্য। এছাড়াও বিজাপুর কুতুব শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আদিল শাহ যে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন, সেই কাজ কুতুব শাহ করেন নি – বিশেষ করে জিল্লালা এবং নান্দিয়ালের দুটি গ্রাম দখল বিষয়ে, গোয়েন্দাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারে আর সর্বশেষ অভিযোগ, গুটি দখল করায় গোলকুণ্ডার সঙ্গে তাদের বিরোধ বেড়েছে।
(চলবে)
Post a Comment