Wednesday, November 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

নবাব আল্লামি শেখ মুহম্মদ তাঁর নিজের দায়িত্ব ছাড়াও মীর জুমলা(মৌখিক নাম। পদটির সরকারি নাম জুমালাতুল মুলকি) পদের দায়িত্ব সামলাতে থাকলেন। সঙ্গে চলতে থাকল পেশোয়া পদের বিপুল দায় দায়িত্ব নির্বাহ করা। কূটনৈতিক দায় পালনের সম্মানে পেশোয়া পদের জন্য তিনি নববর্ষের আংরাখা খেলাত পেলেন, পেলেন দুটি ইরাকি ঘোড়া এবং তিনি যাতে সসম্মানে রাজ সন্নিধানে পালকিতে আসতে পারেন সেই সম্মানও তাঁকে দেওয়া হল(১৭ রজব ১০৪৫, ১৭ ডিসেম্বর, ১৬৩৫)। সব্বাইকে নির্দেশ দেওয়া হল, রাজ্যের সব ধরণের মামলা তার দপ্তরই সামলাবে।

সুলতান যে তাঁর ওপরে আস্থা পেশ করছেন, এই বিষয়টা দায়িত্ব পালনে তাঁকে আরও উদ্বুদ্ধ করে তুলল। নিজামুদ্দিন মুহম্মদ লিখছেন, জনগনের জীবনের মান উন্নয়নের, চাষের বিকাশে এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে আরও উন্মুখ হয়ে উঠলেন।

নবাব আল্লামি ফাহামির হাতে প্রভূত সরকারি ক্ষমতা আসায় তিনি নিজে রাজকাজে নিযুক্ত কর্মদক্ষ সঠিক মানুষকে প্রশাসনের সঠিক কাজে লাগাবার উদ্যোগী হলেন। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর প্রজ্ঞা বিচার করে বহু শিল্লাদারকে মজলিস (পরামর্শ সভা) পদে, কাউকে তিনি মহাল পদে, কাউকে আবার আমিল বা হাকিম পদে উন্নীত করলেন। আগেই বলেছি, আমাদের বীর, মীর মুহম্মদ শিল্লাদার পদে কাজ করতেন, তখন তিনি হয়ে উঠেছেন সুলতানের অন্যতম প্রিয় কর্মী। ১০৪৫/১৬৩৫-৩৬ সালে তাঁকে মছলিপত্তনম হাবিলদার পদে নিয়োগ করা হল। ভারতের ইতিহাসে প্রভাবের নিরিখে এটাই হয়ত গুরুত্বতম পদোন্নতি বলা চলে।

গোলকুণ্ডা রাজ্যে মূল বন্দর ছিল মছলিপত্তনম। সেই বন্দরে প্রচুর কর্মী কাজ করত, দক্ষিণী চিন্টজ আর ক্যালিকো কাপড় রপ্তানিতে মছলিপত্তনমএর সুনাম ছিল। কাপড়গুলি হয় স্থানীয় তাঁতিরা তৈরি করত বা আসত সেন্ট জর্জ থেকে। ভারতে যত চিন্টজ তৈরি হত সেগুলির মধ্যে দক্ষিণের চিন্টজ আর ক্যালিকো ছিল সূক্ষ্মতম এবং রংদার। পূর্ব উপকূল সূতি বস্ত্র উতপাদকেদের রপ্তানির মূল কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে সূতি বস্ত্র ব্যান্টাম এবং মধ্য প্রাচ্য যেত; এছাড়াও এই এলাকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল সুরাট, বন্দর আব্বাস(গমব্রুম)এর মত পশ্চিমি বন্দর বা পূর্বে পেগুর সঙ্গে। নিজামুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘জাহাজগুলি দক্ষিণের দেশে (জেরবাদ) এবং উত্তরের দেশে(বালাবাদ) যেত, আর যেত আরব এবং আজমের বন্দরের পানে। সারা বছর ধরে এই বন্দরে জাহাজ আসত এবং ছেড়ে যেত। এটাই ছিল এই বন্দরের বিশেষত্ব’। থেভেনট(Thevenot) লিখছেন, ‘তটটি অসাধারণ, প্রায় সব ধরণের দেশ থেকে জাহাজ আসতেও পারে, যেতেও পারে। আমি সেখানে কোচিনি চিনা, সিয়ামের, পেগুর এবং পূর্ব দেশের বহু দেশের মানুষ দেখেছি।’

বহু বছর আগে এই রাজমুকুটসম বন্দরটির পরিচালন ব্যবস্থা ভাল ছিল না। যদিও এটির রক্ষণাবেক্ষণে সর্বক্ষণের এক হাবিলদারের দায়িত্বে থাকত, আর থাকত সেই রাজ্যের(মুস্তাফানগর) প্রধান পদাধিকার সর সিমতো আর বন্দরের জন্য ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শাহবান্দারও। কিন্তু বন্দর পরিচালনায় সর্বস্তরে দুর্ণীতি বন্দরের পতনের বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছিল, রাজ্যের উন্নতির দিকে না তাকিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ আর লাভের জন্য প্রশাসকেরা প্রচুর শুল্ক আদায় করতেন। ব্রিটিশ কুঠির তথ্য থেকে পরিষ্কার যে মছলিপত্তনমের প্রশাসন দুজন হাবিলদার – মুল্লা মুহম্মদ টাকি তাকরিশি এবং তাঁর উত্তরাধিকারী মীর ফাসিউদ্দিন মুহম্মদ তাকিরিশির ওপর ন্যস্ত ছিল। এদের খারাপ ব্যবহারের দরুণ ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ হচ্ছিল। মীরপাস(মীর ফাসিউদ্দিন)কে লেখা চিঠিতে কুঠিয়ালরা জানাচ্ছে, তাঁর সঙ্গে বিবাদের কারণ হল তাঁর পূর্বসূরী মামাটুকি (মুহম্মদ টাকি) এবং কোন রকম পরিবর্তন না করেই তাঁর পূর্বসূরী অনুসৃত নীতিগুলি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে মছলিপত্তনম থেকে চলে গিয়ে আরামগাঁওতে(চন্দ্রাগিরির নায়েকের প্রশাসনের অধীনে) কুঠি বানানোর।

কয়েক বছর পরে(১৬৩০-৩২) এই জেলার প্রশাসক হয়ে এলেন মির্জা রোজবিহানী ইসপাহানি। ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের নথিতে যিনি মীর্জা রসবাহান নামে পরিচিত। তারা তাকে বড় গভর্নর হিসেবেই দেখত; তিনি সামগ্রিকভাবে কাপড়ের শুল্ক অনাদায়ে, বন্দরের কর না দেওয়ায়, ব্রিটিশদের পেটাপল্লি থেকে জাহাজে কাপড় তুলতে দেননি। ফলে কুঠিয়াল মছলিপত্তনমের প্রশসাকের সঙ্গে দেখা করে(২২ নভেম্বর ১৬৩০), সস্তুষ্ট করে, দুটি ব্রড ক্লথ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাহাজ ছাড়েন। যতদূর সম্ভব এই মানুষটি ছিলেন সেই এলাকার হাবিলদার। বাটাভিয়ার ডচেদের দাগ রেজিস্টারে তাকে মছলিপত্তনমের প্রশাসক, গভর্নর হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২৯ আগস্ট, ১৬৩২ সালে লেখা মছলিপত্তনমের একটা চিঠি থেকে জানতে পারি তিনি সেই এলাকার চাষী এবং গোলকুণ্ডার প্রশাসক(সরইখাহিল) ছিলেন।

যাইহোক, মছলিপত্তনম বন্দর হিসেবে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরাও কিছুদিনের জন্য(১৬২৮-৩০) নিজেদের সরয়ে নিলেও ১৬৩০ সালে ফিরে এসে গোলকুণ্ডার সুলতানের থেকে ১৬৩৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যবসার ছাড়পত্রের নির্দেশপত্র স্বর্ণ-ফার্মান অধিকার করল। কুঠির তথ্যাবলী থেকে পরিষ্কার, ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের পাওয়া এই ব্যবসায়িক ছাড়ে উদ্বিগ্ন বন্দর প্রশাসকদের মনে হল, রাজ্য প্রচুর অর্থ রাজস্ব হারাবে। তারা ডাচেদের সঙ্গী করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে ফরমান অপব্যবহারের অভিযোগ আনল। এর ফলে সরইখাহিল(আবদুল্লা খাঁ মাজানদারানি) এবং দবির(মুল্লা ওয়ায়িস, মুন্সিউলমামালিক) ব্রিটিশ কুঠিয়াল রজার্সএর থেকে বাতসরিক ছাড়ের শুল্ক দাবি করল।

বন্দরের প্রশাসনিক অবস্থা স্বাভাবিক করতে আমাদের নায়ক মীর মহম্মদ খুব চেষ্টা করেছেন। নিজামুদ্দিন আহমদ তাঁর চাকরির সময়ের নথি দেখে লিখছেন, হাবিলদার পদে মীর তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমান করেন। তাঁর অসীম দক্ষতা আর পুত চরিত্র তাকে প্রশাসনের সিঁড়িতে চড়তে সাহায্য করেছিল। এক বছর হাবিলদারের পদে কাজ করার পর (১৬৩৭) তিনি তেলেঙ্গানার মুস্তাফানগরের (কোণ্ডাপল্লি)) একটি বিশাল দুর্গ মহলের হাবিলদার নিযুক্ত হলেন। তিনি দুর্গের প্রশাসন ঢেলে সাজালেন এবং তাঁর সম্পদ নতুন করে আদায়ের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর বক্তৃতা এবং কর্মদক্ষতা রাজধানীর প্রত্যেক মানুষের পছন্দ ছিল। তিনি সুলতানের স্বার্থের জন্য রোদেপুড়ে কাজ করে তাঁর উচ্চাসনে ওঠার পথ পাকা করেন। মছলিপত্তনম আর মুস্তাফানগরের হাবিলদারি তাঁকে সরইখাহিল পদে আরহণ করতে সাহায্য করল।
(চলবে)
Post a Comment